প্রেম পুকুর পর্ব ১২

0
82

#প্রেম_পুকুর
[১২]
লেখনীতে মারিয়া মুনতারিন

সুদর্শন দুই পুরুষের মাঝে বসে আছে এক সুশ্রী রমণী। খুশিতে তার দু’চোখ চকচক করছে। প্রিয় পুরুষকে পারিবারিক সম্মতিতে কজনই বা নিজের করে পায়।
হলুদ শাড়ি পরিহিতা রমণীর রূপ যেন ঝলমল করছে।
দু’ভাইয়ের হৃতপিণ্ড প্রিয় বোনের আনন্দে পুলকিত হচ্ছে।

__________

সারাদিনের ধকলে শিমু ভিষণ ক্লান্ত শরীর আর তার সায় দিচ্ছেনা। পরনের শাড়ি এলোমেলো হয়েগেছে। এখোন ওর একবার শাওয়ার নেওয়া প্রয়োজন।
শিমু দ্রুত নিজের পোশাক নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।
সাফোয়ান ও ক্লান্ত হয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করল।
কিন্তু ঘরে নিজের স্ত্রী কে না দেখতে পেয়ে হতাশ হলো।
প্রায় ত্রিশ মিনিট পর শাওয়ার শেষে শিমু বের হলো। পরনে ডিলেডাল সাদা রঙের কামিজ।
সাফোয়ান শিমু কে দেখে মুখ একটু গোমড়া করে বলল,”আমরা চাইলে কিন্তু একসাথে শাওয়ার নিতে পারতাম।”

মুহুর্তেই শিমুর লজ্জায় কান গরম হয়ে গেল।

কাছে এসে সাফোয়ানের সামনে কোমড়ে হাত রেখে দারালো,”আপনি কিন্তু দিনদিন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেন।”
সাফোয়ান শিমু কোমড়ে রাখা হাত টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো।দু হাত গলিয়ে কোমড়ে হাত রাখল।ঘাড়ে নাক ঘষতে লাগল।

শিমু ছোটার চেষ্টা করতে চাইলে সাফোয়ান শিমুর কানের লতিতে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিল।শিমু লজ্জায় লাল নিল হলো বারবার।
অতঃপর সাফোয়ানের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শিমু সাফোয়ানের হাতে চিমটি কেটে দেয়।
সাফোয়ান আহ শব্দ করে শিমু কে ছেড়ে দেয়।

শিমু খলখলিয়ে হেসে উঠে।
সাফোয়ান শিমুর হাতের দিকে লক্ষ্য করে দেখে শিমুর হাতে মেহেদী লাগিয়েছে।
সাফোয়ান শিমুর দিকে এগুতে চাইলে শিমু সাফোয়ানের দিকে বালিশ ছুড়ে মারে।

“আর এগোবেন না আমি ক্লান্ত আমার ঘুম প্রয়োজন। ”
সাফোয়ান শিমু কে উদ্দেশ্য করে চোখ টিপ দেয়। মুখে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,এ কয়দিন দুরে থাকো সমস্যা নেই আর পাঁচ দিন তার পর তোমার এই পালাই পালাই লজ্জা সব ভেঙে দিবো প্রমিজ।”

সাফোয়ান ওর জামার দিকেইশারা করে শিস বাজাতে বাজাতে ওয়াশ রুমে চলে যায়।
শিমু জামার পিছনে দিকে তাকাতেই লাল রঙ দেখতে পেল।
দ্রুত ক্যালেন্ডারে তারিখ লক্ষ্য করে ওর আর বুঝতে বাকি রইলো না সাফোয়ান ওকে কি ইশারা করেছে।

শিমু বিছানায় বসে লজ্জায় মুখ ডেকে ফেলল। ওর লজ্জা ভীষণ লাগছে।লজ্জায় ও আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে বারবার।সাফোয়ান ওকে লজ্জায় ফেলার কোন কারন ছাড়ছেনা।

____________

একটি মিষ্টি সকাল, নতুন একজোড়া কবুতরের মিলনের জন্য সেজে উঠেছে পুরো বাড়ি। সকাল থেকে বিয়ে বাড়ি হৈহুল্লরে মুখরিত।
অনিকা বার বার আয়নায় নিজেকে দেখছে আর লজ্জায় লাল নিল হচ্ছে। শরীরে হলুদ আভা ছড়িয়ে আছে।
জুমার নামাজের পড়ে সে তার প্রণয় কুমারের হবে ভাবতেই অন্তর শিহরিত হচ্ছে বারেবার।
নিজের মানুষটাকে আপন করে পাবার আনন্দ কতক্ষানি অনিকা সেটা বারবার অনুভব করছে।
আনন্দ দুষ্টু মিষ্টি লজ্জা ওর শরীর কে শিহরিত করছে।

আয়ান বোনের কক্ষে ডুকতেই দেখতে পেলো অনেক গুলো মেয়েদের হাসাহাসি। সে ডুকতেই সবাই কিছুটা চুপ হলো।

কিন্তু এতগুলো মেয়ের মাঝে অনিকার এক বান্ধবি বলে উঠল,”ভাইয়া অনিকাতো আপনার পাঁচ বছরের ছোট সেই বিয়ে করে নিচ্ছে কিন্তু আপনার সিঙ্গেল থাকার রহস্য কি?”

আয়ান এটিটিউড নিয়ে বলল,”আমি এইসব বিয়ে টিয়ে এখনই করতে চাই না।”

অনিকার ইচ্ছে করল ভাইকে একটু পচাতে কিন্তু বন্ধু মহলে আর কাজিন মহলের সামনে প্রিয় ভাইকে লজ্জা দিতে মন চাইলো না।
কিন্তু ভীরের মাঝে আয়নদের ছোট ফুপির মেয়ে বলে উঠল,”ওহ জানি!তুমি কেমন বিয়ে পাগলা।
আসলে কোনো মেয়েই তোমায় পাত্তা দেয়না এই ব্যাপার। ”
মুহুর্তেই ঘর জুড়ে হাসি শব্দ ছড়িয়ে পরল।

আয়ান তার ছোটা ফুপির মেয়ে তোহার দিকে রাগি চোখ করে তাকালো ।মেয়েটা তার চেয়ে বয়সে ছোট কিন্তু সম্পর্ক দা আর মাছের ন্যায়।

“দেখ তুই আমাকে বললি আমাকে মেয়েরা পাত্তা দেয়না। আজকেই আমি দশটি মেয়ে পটাবে আগামী এক মাসের ভিতরে বিয়ে করে হানিমুনেও যাবো।”

আয়ান নিজের কথা শেষ করে রেগে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো এই পুচকি মেয়ে তাকে অপমান করার সাহস কোথায় পেলো ।
সেই হয়তো প্রথম ছেলে যে বোনের বিয়েতে বউ খোজার মিশনে নেমেছে।
তাকে নাকি তোহা বলে মেয়েরা পাত্তা দেয়না। ওই তাইতাই কে ও দেখিয়ে দিবে ও কি জিনিস।

আয়ান বেড়িয়ে যেতেই তোহার আত্মা স্যাত করে উঠল।এ ছেলে যদি গার্ল ফ্রেন্ড মিশনে তবে তার কি হবে।

_____________

অনিকার বিয়ের বর যাত্রী নিচে এসেগেছে। অনিকার কাজিন মহল আর বন্ধুমহল ছুটে গেছে নিচে।
অনিকাও নিজের লেহেঙ্গা টা উঁচু করে বেলকোনির দিকে ছুটলো।
ওর কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে দেখে ওর চক্ষুদ্বয় শিতল হলো। এই মুহুর্তে মনে হলো ওর পাশে হাজারো প্রজাপতি উড়ছে। কি নিদারুণ ভালোলাগা কাজ করছে ওর মাঝে।

আমান কে হালকা মিষ্টি মুখ কড়িয়ে বাড়িতে প্রবেশ করালো সবাই। আমান বাড়িতে প্রবেশ করার সময় অনিকার বেলকোনির দিকে তাকালো এক বার। কিন্তু তার দেখার পূর্বেই অনিকা নিজেকে পর্দার আড়াল করে নিলো।
আমান যদিও কিছুটা হতাশ হলো কিন্তু পরক্ষনেই ওর ঠোটঁ জুড়ে মুচকি হাসি ছড়িয়ে পরল।

____________

অনিকার আর আমানের শুভ বিবাহ সমপন্ন হলো। সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে মিষ্টি মুখ করল।
একটু পরেই চলে এলো বিদায়ের সময়। অনিকার হাসি মুখটা কালো হতে লাগলো।ওর ভাবতেই অবাক লাগছে ওর এতো ভালোবাসার পরিবার ছেড়ে ওকে চলে যেতে হবে এবার।

শিমু ধীর পায়ে হেটে গিয়ে অনিকার কাধে হাত রাখে। নিজের কাধে প্রিয় ভাবীর হাত পেয়ে অনিকার ছলছল চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরে।
বোনের মতো ভাবীকে শক্ত করে আকড়ে ধরে কান্না করতে শুরু করে।
লায়লা বেগম মেয়ের কান্না দেখে নিজের কান্না সমালাতে পারেনা। রাজিয়া বেগম গিয়ে ছেলে বউকে নিজের বুকে আগলে নেয়। আলতাফের শক্ত খোলসের ভিতর থেকে পিতৃসত্তা হাহাকার করে উঠে। সাফোয়ান আর আয়ান নিজ বোনের বিদায়ে কলিজা ছিড়ে যাওয়ার বেদনা অনুভব করে। কি নিদারুণ মর্মবেদনা।

মেয়ের, বোনের বিয়ে দেওয়াটা যতটা সুখের তার থেকে বেশি কয়েকগুন কষ্টের। এই দুঃখ শুধু মাত্র মেয়ের পরিবারই বুঝতে পারে। কিন্তু ওইযে সমাজ বলে একটা কথা আছে যার নিয়মে আমরা বাধা সেই নিয়মকে উপেক্ষা করার সাধ্যি কোন ভদ্র লোকের নেই। দীর্ঘ সময় কান্না কাটি চলল।অনিকা কিছুতেই তার পরিবার ছেড়ে যেতে চায়না।
কিন্তু ওইযে স্বামীর ঘরে যেতেই হবে।

সবাই অনেক কষ্টে অনিকাকে আমানের গাড়িতে তুলে দিলো। সাফোয়ান আমানের হাত ধরে বলল,”ভাই তুমি আমার কলিজা টুকড়া কে নিয়ে যাচ্ছো ওকে একটু দেখে রেখো।তোমার সাধ্য অনুযায়ী ওকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখো। ও ভুল করলে শাসন ও করো। ও আমার একমাত্র বোন আমি যেহেতু তোমাকে ওর হাতে তুলে দিলাম আমি আশা রাখছি ওকে তুমি আগলে রাখবে।”

আমান সাফোয়ানের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বলল,”ভাইয়া এখোন ও আমার স্ত্রী। আমি কখনোই চাইবোনা আমার স্ত্রী কখনো কোনো কষ্ট পাক।আপনি আমার ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন।
আমি আপনার বিশ্বাসের অমর্যাদা কখোনোই করবোনা।”

আয়ান এগিয়ে গিয়ে আমানের কলার ধরে বলল,”দোস্ত তোর কারনে যদি আমার বোন কষ্ট পায় তবে তোরে আমি যে কি করমু তুই নিজেও জানিস না।আর বোনের বড় ভাই হিসেবে বলছি আমাদের কলিজাটাকে একটু দেখে রাখিস।ওকে অবহেলা করিস না দোস্ত।”

“অবহেলা করলে না হয় তুই আমাকে শুলে চড়াস “।

শেষ বারের মতো বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল আমান।

অনিকা নিজের ভাইদের দিকে তাকিয়ে হাওমাও
করে কাদতে শুরু করল।আমান অনিকাকে নিজের বুকে আগলে নিলো।

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here