প্রেমরাঙা জলছবি পর্ব ১০

0
66

#প্রেমরাঙা_জলছবি
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_১০

রাগ আর ঘৃণায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে আবরারের। শক্ত গলায় বলে ওঠে,“তোর জান আমার কাছে শু*তে এসেছে।”

কল কেটে দেয় আবরার। এশা ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় আবরারের কাছে থেকে৷ আবরার রক্তিমচোখে এশার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এশা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

আবরার এশার চিবুক শক্ত করে চেপে ধরে বলে,“ আমাকে তবে অপশনাল রেখেছিলে? আর কত বদগুন বাকি আছে তোমার? একাধারে চিটার, চরিত্রহীনা, খু*নী আর কী বাকি আছে?”

এশা আবরারের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,“ ভালোই হলো৷ জেনেই যেহেতু গেলে তাহলে আমার আর লুকানোর কিছু রইল না। আমাকে আর নেক্সট টাইম বিরক্ত করবে না।”
“আমি না তোমাকে আজ অবধি বুঝে উঠতে পারলাম না। ভালোবাসনি তাই না?”
“হ্যাঁ, তোমার মতো মানুষকে ভালোবাসা যায় না। আর কী যেন বলছ আমি খু*নী? তুমি কি ধোয়া তুলসীপাতা নাকি?”
“তোমার মতো জঘন্য নই।”
“তুমি দুর্গন্ধময় ডাস্টবিনের নোংরা। আমার আশেপাশে থেকে আমাকেও তাই বানাতে চেয়েছ।”

মেজাজ খারাপের চরম পর্যায়ে গিয়ে এশার গালে জোরেশোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় আবরার। চোখের সাদা অংশ রাগে লাল হতে শুরু করেছে। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“তোদের মতো মেয়েদের বাঁচাতে লড়াই না করে ধাক্কা দিয়ে মাঝ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া উচিৎ। তোরা মেয়েরা ছলনাময়ী। চোখে পানি নিয়েও ছলনা করতে পারিস তোরা।”

আবরার এশার হাত ধরে বলে,“খুব অন্যকারো হওয়ার ইচ্ছে তাই না? চল তার কাছেই পৌঁছে দিয়ে আসব। আমি আবার অন্যকারো মানুষ তো দূরের কথা বস্তুও রাখতে পছন্দ করি না। যেটা অন্যকারো সেটার এক কোণাও আমার না। আমার মানে পুরোটাই আমার৷ হোক সেটা ভালো বা খারাপ।”

এশার হাত শুক্ত করে ধরে আবরার। এশাকে বাহিরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। এশা গাড়ি থেকে নামার জন্য ছটফট করেই যাচ্ছে তবুও কোনো কাজ হচ্ছে না৷
আবরার গাড়ি ড্রাইভ করা শুরু করে। গাড়ির গতিটা যেন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। এশার ভয় লাগছে৷

সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে, “গাড়ির গতি কমাও আবরার। তোমার তো ফালতু জীবন না আমার। আমার জীবনের মায়া আছে৷ তোমারটা গোল্লায় যাক আমার দেখার নেই। আমাকে নামিয়ে দাও।”

আবরার এশার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,“এখন মনে হচ্ছে তোমাকে অন্যকারো হতে দেয়া যায় না৷ বেঁচে থাকতে তুমি আমার। মরে গেলে সেটা ভিন্ন বিষয়। তুমি আমার সাথে চিট করেছ।”

এশা আমতা আমতা করে বলে,” ম মা মানে?”
আবরার মৃদু হেসে বলে,“সামনে দেখো।”
এশা শুকনো ঢোক গিলে বলে,“ আমাকে মাফ করে দাও, আবরার। বিশ্বাস করো আমি তোমাকেই ভালোবাসি, তোমাকেই চাই। তুমি ছাড়া বাকিসব মিথ্যা।”

আবরার গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলে,“ আমি তোমার কোনো ক্ষতি করে থাকলে আমার মৃত্যু চেয়ো আমাকে আর চেয়ো না।”
______

হৃদিতা সুরাইয়ার সাথে বসে বসে গল্প করছিল। নাহার বেগম চা নিয়ে হৃদিতার রুমে আসে। তাদের দুজনের সাথে তিনিও আড্ডায় যোগ দেন। রাসেল শেখ বসে বসে ল্যাপটপে কোনো কাজ করছিলেন।
হৃদিতা চায়ে চুমুক দিয়ে সুরাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,“তারপর? ফুপি হচ্ছি কবে? তোমরা দুজন কি আমাকে নিয়ে ভাবছ না?”

নাহার বেগম মৃদু হেসে বলেন,“ হৃদ কিন্তু ভুল কিছু বলেনি, সুরাইয়া। আর কত একা থাকবে? একটা বাচ্চা নিয়ে নাও। বাচ্চার সাথে থাকলে সময় কেটে যাবে।”

সুরাইয়া সে বিষয়ে কথা না বলে হৃদিতাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “ আমাদের নন্দাই কবে হবে সেটা বলো। নন্দাইয়ের খবর দাও, ফুপিও বানিয়ে দেব।”

নাহার বেগম উঠে দাঁড়ান। বাহিরের দিকে যেতে যেতে হাসতে হাসতে বলেন,“ তোমরা চোখকান খোলা রাখো৷ ভালো ছেলে হলেই ননদকে খবর দাও। এসব আবার বলে দেওয়া লাগে নাকি?”

নাহার বেগম চলে যেতেই হৃদিতা বলে ওঠে,“ দুইটা কেস আমার হাতে। একটা প্রায় কমপ্লিট হয়তো দুই একেই সেটা ক্লোজ হয়ে যাবে। আরেকটার জন্য দোয়া করো আমি যেন নিজেকে সঠিক রায় শোনাতে পারি। এসবের পর হয়তো একাই থাকব নইলে যদি কখনো কেউ আমার জীবনে আসে তবে তাকে নিয়ে ভাববো।”

সুরাইয়া মৃদুগলায় বলে,“ সেইরাত আমি এখনো ভুলতে পারি না হৃদি।”

হৃদিতা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে,“ আর আমি ভুলতে চাই না।”

বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুজনের কথা চলতে থাকে৷ নাহার বেগম বাহিরে থেকে উচ্চস্বরে হৃদিতাকে ডেকে বলেন,“ হৃদি, তোর ফোন বাজছে। দুইবার বেজে কেটে গিয়েছে। দেখ তো কে কল দিল!”

হৃদিতা সুরাইয়াকে বসতে বলে বাহিরে চলে আসে। কিছুক্ষণ আগে বাহিরেই বসে ছিল তখন ফোনটা বাহিরে রেখেই হয়তো সুরাইয়ার সাথে রুমে চলে এসেছিল।
সে এসে ফোনটা হাতে নিতেই দেখে আজহার রেজা আঙ্কেল নামটা ফোনস্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। হৃদিতা তাড়াতাড়ি করে কলটা রিসিভ করে।

সালাম দিতেই ওপাশ থেকে আজহার সাহেব বলে ওঠেন,“কোথায় আছ? জলদি সদরের হসপিটালে চলে এসো।”

হৃদিতা তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করে,” ইজ এভ্রিথিং অলরাইট, স্যার?”
“ কিচ্ছু ঠিক নেই। তুমি জলদি এখানে চলে এসো। আমি আর সময় দিতে পারছি না তোমাকে।”
“ স্যার কী হয়েছে সেটা তো বলুন।”

হৃদিতার প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই ওপাশে থাকা ব্যক্তি কল কেটে দেয়। হৃদিতা মাকে গিয়ে জানায় তার এখনই বের হতে হবে অফিস থেকে কল দিয়েছিল। নাহার বেগম মনটা মলিন করে বলেন,“গতকালই তো বাসায় আসলি, এখনই যেতে হবে?”

মাকে সামলে, বাবা-মা দুজনের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় হৃদিতা। ঘণ্টাখানেকের মাঝে হাসপাতালের সামনে পৌঁছেও যায়। নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসে পৌঁছলেও কিছুতেই ভেতরে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না সে। বারবার আজহার রেজাকে কল দিয়ে যাচ্ছে। ছয় বারের সময় ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।

হৃদিতা ভিড় ছেড়ে একপাশে চলে যায়। সামনের দিকে তাকিয়ে ফোন কানে নিয়ে বলে,“স্যার, কোথায় আপনি? বাহিরে এত ভিড় কেন?”

ওপাশ থেকে পুরুষালি গলা ভেসে আসে,“ তুমি চলে এসেছ? দুই মিনিট দাঁড়াও। আমি অফিস থেকে এক্ষুনি আসছি। তুমি কারো সাথে কোনো কথা না বলে সোজা ভিড় থেকে দূরে এসে সামনের দিকে দাঁড়াও।”
“ ঠিক আছে স্যার।”

বাহিরে ভিড় বাড়ছে। গেইটের দিকে দারোয়ান দুইজন দাঁড়িয়ে মানুষগুলো সামাল দিয়ে উঠতে পারছে না। মানুষ যেন গেইট ভেঙেই ভেতরে ঢুকে যাবে। হৃদিতা সামনের দিকে এসে দাঁড়ায়।

পরিচিত একজনকে সেখানে দেখে হৃদিতা এগিয়ে যেতেই আজহার সাহেব গাড়ি নিয়ে হৃদিতার সামনে এসে দাঁড়ায়। হৃদিতা দাঁড়িয়ে যেতেই তিনি বলে ওঠেন,“ গাড়িতে উঠে বসো। পিছনের গেইট দিয়ে যেতে হবে আমাদের। সামনে দিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।”

হৃদিতা একমুহূর্ত দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসে। আজহার সাহেব ড্রাইভ শুরু করে রাস্তা পরিবর্তন করে নেন। হৃদিতা পাশে থেকে বলে ওঠে,“ স্যার, আবরার সাহেবের নাম শুনতে পাচ্ছিলাম। উনার কিছু হয়েছে?”
আজহার রেজা সামনেই মনোযোগ রেখে বলে ওঠেন,“ হ্যাঁ। এক্সিডেন্ট হয়েছে। গাড়ির অবস্থা আর বোঝার উপায় নেই। এশা, আবরার সাহেবের হবু স্ত্রী যিনি ছিলেন উনার অবস্থা ভয়াবহ। আবরার সাহেবেরও জ্ঞান ফিরেনি।”

হৃদিতা অপ্রস্তুত স্বরে বলে ওঠে,“ কী বলছেন, স্যার? এরকম কখন হলো? এশা এভাবে কীভাবে ম*রতে পারে? ওকে তো আমি মা*র*বো। ও এভাবে কষ্ট সহ্য না করে এমনি এমনি কীভাবে মা*রা যেতে পারে? ”

আজহার রেজা বিদ্যুদ্বেগে বলে ওঠেন,” আপাতত এসব মাথা থেকে ঝেরে ফেলো। তোমাকে এখানে একটা কাজে রাখা হবে। নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করবে। আবরার সাহেবের কেবিনে লক্ষ্য রাখতে হবে তোমার। উনার রুমে যেন বাহিরের কেউ প্রবেশ করতে না পারে। এশার বাবা আবরারকে ভালো চোখে দেখছে না।”

হৃদিতা দুই হাত দিয়ে কপালে আর চোখ ঢেকে আফসোসের স্বরে বলে ওঠে,” এটা ঠিক হলো না, আঙ্কেল। ওই মেয়ের মৃ*ত্যু এভাবে হতে পারে না। আমি খুব করে চাই ও বেঁচে যাক। আমি নিজে শা*স্তি দিতে চাই ওকে। খুব কঠিন শা*স্তি।”

#চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here