প্রেমনদীর মাঝি পর্ব ১৩

0
120

#প্রেমনদীর_মাঝি
#পর্ব_১৩
#মুসফিরাত_জান্নাত

পছন্দের প্রায় সব ভার্সিটিতে পরীক্ষার পর্ব চুকিয়েছি আমি।বেশিরভাগ ভার্সিটিতে পরীক্ষার তিনদিনের মাথায় রেজাল্ট দিয়ে দেয়।কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে রিটেন এক্সাম থাকায় রেজাল্ট দিতে এক মাস সময় নেয়।সে হিসেবে প্রায় সব ভার্সিটির রেজাল্ট বেরিয়ে গিয়েছে।আর প্রায় সবখানেই আমি ভর্তির সুযোগ পেয়ে গিয়েছি।এ এক অমূল্য প্রাপ্তি আমার জন্য।আর তাই বেশ পুলকুত হয়ে আছি আমি।সফলতার,প্রাপ্তির আনন্দ এত গভীর তা আমি আগে জানতাম না।একটা সময় আমার প্রতি ওনার কঠোর আচরনের জন্য ওনাকে প্রচুর বকা দিয়েছি মনে মনে।কিন্তু এই আনন্দগুলো পাওয়ার পর ওনার প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে পারিনি।আমার জীবনে উনি না আসলে হয়তো কখনোই আমি কোথাও চান্স পেতাম না।আর সেখানে সবার এত ভালোবাসা,এত মূল্যায়ন এসব পাওয়া তো বৃথা ভাবনা ছিল।

এত আনন্দের ভীরেও আজ আমার বেশ খানিকটা চিন্তা হচ্ছে।পড়ার জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দের শীর্ষে আমার।আমি মনে প্রানে চাচ্ছি ওখানে পছন্দের একটা সাবজেক্ট আসুক।কিন্তু কি হবে কে জানে! মাথায় ঘুরঘুর করছে যত সব অপ্রীতিকর চিন্তা-ভাবনা।ধীরে ধীরে অস্থিরতা বাড়ছে আর হাঁস ফাঁস করছি আমি।আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন টেস্টের রেজাল্ট দিয়েছে।রেজাল্ট কি এসেছে এই চিন্তায় তটস্থ আমি।আদৌ চান্স পেয়েছি কিনা তাও জানি না।এখনো মেসেজ আসেনি।সার্ভার ডাউন বলে রেজাল্টও লোড হতে সময় নিচ্ছে।চিন্তায় মাথাটা ধরে আসছে আমার।আমি কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছি।উনি বাসায় নেই।সারাদিন রাত ব্যস্ত থাকেন উনি।হসপিটাল, রুগী,স্টাডি এসব আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে ওনাকে।এতো ব্যস্ততা ঠেলে উনি আমাকে এতদিন পড়িয়েছেন, সময় দিয়েছেন তা ভেবে বেশ অবাক হয়েছিলাম আমি।ওনার এই কষ্টের প্রতিদান দিতে পারবো তো? ধৈর্য্যহারা হয়ে নিশির রুমে যাই।গিয়ে দেখি ও পড়াশোনা করছে।আমাকে দেখে অবাক হয়ে ও জিজ্ঞেস করে,

“কোন ঘুর্ণিঝড় তোমার উপর দিয়ে বইছে পুষ্পাপু?চোখমুখ এত শুকনো কেনো?”

আমি তপ্ত শ্বাস ছাড়ি।অতপর অধৈর্য কন্ঠে বলি,

“আমি টেনশনে মা’রা যাচ্ছি বইন।এখনো রেজাল্ট দেখতে পারছি না।মনে হচ্ছে এখনই টুপ করে আমার সব বাতাস বের হয়ে যাবে।”

কথাটা বলে বিষন্ন মুখে তাকালাম আমি।নিশি আমার কথা শুনে রসিকতা করে বলে,

“তাহলে রহিম চাচাকে বলো পাম মেশিন নিয়ে আসতে।তোমার হাওয়া বের হলে পাম দিয়ে হাওয়া ভরে দিবনি।”

কথাটা বলে ফিক করে হেসে ওঠে নিশি।ওর এমন রসিকতায় আমি এক ধমক দিয়ে বলি,

“চুপ বেদ্দব,কান গরম করে দিবো কিন্তু।আমি কব্বরে যাইতেছি, আর তুই বসে বসে মজা নেস।ফাজিল কোনহানকার!”

এবার ও বিরক্ত গলায় বলে,

“উফ! এমন ভাব করছো,যেনো তোমার বর ভেগে গেছে।আরে ভাই সামান্য রেজাল্টই তো দিয়েছে।এখন সবাই এক সাথে হুমড়ি খেয়ে রেজাল্ট দেখতে বসছে বলে লোড হচ্ছে।এই সমস্যা কি তোমার একার হচ্ছে নাকি? অনেকে এমন সমস্যায় আছে।এতে এত ভয় টেনশনের কি আছে?তাছাড়া এখানে চান্স না পেলেও তো তোমার সমস্যা হওয়ার কথা না।এমনিতে তুমি অলরেডি অন্য টপ তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট দখল করে আছো।”

আমি এবার মিনমিনে গলায় বলি,

“কিন্তু স্বপ্নটা তো এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে।”

নদী আপু ঘরেই ছিলো।এতক্ষন চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিলো সে।এবার সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।আমাকে স্বান্তনার বাণী শুনিয়ে বললো,

“রেজাল্ট যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে এখন তুই টেনশন করলেই তা বদলে যাবে না। যা হওয়ার তাই হবে। সো রিলেক্স।তাছাড়া পরীক্ষা তো ভালোই দিয়েছিস।চান্স হয়েছে হয়তো।একটু ধৈর্য ধর। ফলাফল দেখতে পাবি।”

আমি দুঃখী দুঃখী কন্ঠে বলি,

“হুম।”

অতপর চুপ হয়ে যাই।এবার নিশি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে,

“এত হাইপার হইয়ো না তো আপু।চিন্তায় প্রেশার বেড়ে যাবে।তারচেয়ে বেটার এমন কিছু করো যেনো রিল্যাক্স লাগে।আচ্ছা মুভি দেখবে?”

নিশির কথাটা শুনে আমি ওর দিকে চকিতে তাকাই। অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে থাকি।বলে কি মেয়ে!আমি চিন্তায় বাঁচি না আর ও মুভি অফার করছে! এ সত্যি আমার থেকে আধ মণ ওজনের এক থা’প্পড় ডিজার্ভ করে।আমি সরু চোখে তাকিয়ে ওকে কিছু বলতে যাবো তার আগেই এক গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ শুনতে পাই আমি।

“পুষ্প!”

ওনার ডাক শুনতেই চটপট নিজের রুমে যাই আমি।ওনার মুখ পানে তাকিয়ে আরও হতাশা ঘিরে ধরলো আমার মাঝে।আমি জানি এই অসময়ে নিজের কাজ ফেলে উনি বাসায় রয়েছেন একমাত্র আমার রেজাল্টের জন্য। তাছাড়া উনি লাঞ্চ করে চেম্বারে চলে যান। আমার প্রতি ওনার দেওয়া পরিশ্রমের চুড়ান্ত ফলটা দেখতেই উনি বাসায়।ওনাকে হতাশ হতে হবে না তো!এসব ভাবনার মাঝে উনি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

“তোমার রেজাল্ট এসেছে।”

কথাটা কর্ণপাত হতেই আমি তড়িৎগতিতে ওনার কাছে চলে যাই। কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করি,

“আমার রোল আছে ওই লিষ্টে?”

কথাটা শুনার সাথে সাথে ওনার অধর প্রশস্থ হয়ে আসে। প্রদর্শিত হয় স্মিত হাসি। কি অমায়িক দেখায় তাকে।উনি ঠোঁটের কোনে সেই হাসির রেখা বিদ্যমান রেখেই ‘হ্যাঁ সূচক’ মাথা দোলান। যা দেখা মাত্র আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাই৷ কথাটা যেন আমার বিশ্বাসই হতে চাচ্ছিল না।আমি অতি আনন্দে এক চিৎকার দিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু বসিয়ে দেই। তারপর দৌড়ে বাকিদের খবর দিতে ছুট লাগাই। আমার এহেন কান্ডে উনি বেশ ভড়কে যান।আশ্চর্যান্বিত চোখদুটি নিবদ্ধ করেন আমার পানে।আমি সেটা ভালোমতো খেয়ালই করলাম না।দৌড়ে এসে ড্রয়িং রুম অবধি এসে ঘটনাটা মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করতেই আমি থমকে দাঁড়াই ।ইয়া মাবুদ! এটা কি করেছি আমি!মুহুর্তেই লজ্জায় যেন মাথা হেট গেলো আমার।গাল দু’টি ছেয়ে গেলো রক্তিম আভায়। ইচ্ছে করলো মাটির সাথে একদম মিশে যাই।ঘরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম তিনি আমার দিকে ভ্রুকুঞ্চন করে এখনো তাকিয়ে আছেন।ক্ষনেই লজ্জা বাবাজি দ্বিগুন হারে হানা দিলো আমার মাঝে।
আমি দৌড়ে খালামনির ঘরে গিয়ে লুকালাম।তারপর নিজের রেজাল্টের খবর শোনালাম।
____________________

এই বাসায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। আমি ঢাবিতে চান্স পেয়েছি তা শোনামাত্র খালাম্মু এসেই আমার কপালে একটা চুমু খেলেন এবং আল্লাহর নিকট কোটি কোটি শুকরিয়া জানালেন। চট চলদি ফ্রিজ থেকে মিষ্টির বক্স বের করে একটা মিষ্টি বের করে আমার মুখ মিষ্টি করিয়ে দিলেন। সেই সাথে সবার মাঝে আরেকদফা মিষ্টি বিতরন চললো। খালুজানকেও আরেকবার তার পুত্রবধুর সাফল্যের খবরটা জানিয়ে দিলেন। খবরটা পেয়ে যেন সেও খুশি হলেন।ওইদিকে আম্মু আর আব্বু খবরটা শুনে খুশিতে আত্মহারা। ওনারা খুশির চোটে ফোনেই কেঁদে দিয়েছেন।আমাকে নিয়ে কত গর্ব করছেন।মসজিদে আর সিরনি বিলাবেন বলেছেন।পারছেন না কেবল এখানে ছুটে আসতে।এমনিতেই এ বাড়িতে ওনাদের যাতায়াতের অভ্যেস নেই।তারউপর আবার মেয়ের শশুর বাড়ি।তাই হুটহাট আসা যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের।আর এইদিকে খবর নিয়ে দেখি বন্যারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়েছে।আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এখনো আমার সাথে থাকবে ভাবতে আরও খুশি হলাম আমি।খুশি হয়ে গিয়ে আরেকটা চিৎকার দিলাম আমি। আমার এত খুশি দেখে বন্যা খোঁচা মারা শুরু করে দিয়েছে,

“কে জানি পড়বে না বলে বিয়ে করেছিল?সে এখন এত বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় কেমনে!হাও?”

আমি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে হেসে ফেলি।

“সবই কপাল মনু,সবই কপাল।”

বন্যা ব্যঙ্গ করে বলে,

“হ আসলেই কপাল মনু।তাছাড়া কি কেও পড়তে না চেয়ে এতো জায়গায় চান্স পায়!আমি তো কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনেটুনে চান্স পেলাম।আর তুই কিনা মেরিট লিস্টের প্রথম একশো জনের মধ্যে!এটা জানলে তো মানুষ পোলাপান বিয়ে দেওয়ার লিজ্ঞা উঠেপড়ে লাগবে!”

বন্যার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠি।অল্প কথায় সমাপ্তি টেনে ফোন কে’টে দেই।তারপর মনে মনে বলি,

“সেজন্যও এমন একটা জামাই লাগবে।হুহ!”

_____________________

বাকি সময় এদিক সেদিক কাটিয়ে রাতে পড়লাম বিপাকে।ওনার ঘরে আজ শুতে যাব কি-না তা নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছি। কেন না তখনের ঘটনার পর আমার ওনার সামনে যেতে প্রচন্ড লজ্জা করছে।যেন তেন লজ্জা নয় মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে লজ্জা করছে। এমন এক কান্ড করার পর ওনার সামনে দাঁড়াই কি করে?জড়িয়ে ধরা তাও এক ভাগের ছিলো,তাই বলে ডাইরেক্ট চুমু!বান্ধবীদের সাথে থেকে এই বদ অভ্যেস হয়েছে আমার।খুশির কিছু হলেই ওদের এমনে একটা চুমু দিতাম।বাড়িতে আম্মুকে দিতাম।কিন্তু সেই অভ্যেসটা যে এমন অসময়ে অজায়গায় প্র্যাকটিস করবো তা ভাবিনি।নিজের এই বাজে অভ্যেসের জন্য মনে মনে নিজেকে শ’খানেক গালি দিলাম। এখন এই মুখ কিভাবে দেখাই? কোথায় গিয়ে লুকাই? কথাটা ভেবেই নিশির মুখ ভেসে উঠলো। আমি ঠোঁট ফুলিয়ে ওর রুমে গেলাম।নিশি আর নদী আপু এক রুমে থাকে।আমাকে এত রাতে এখানে দেখে দেখে দুজনেই অবাক হলো।আমি তটস্থ হেসে বললাম,

“আজ রাতটা তোমাদের সাথে থাকবো।”

আমার এহেন কথায় ওরা আকাশ থেকে পড়লো যেনো।নদী আপু নিভৃত ভাইয়ের মতো চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে।কিন্তু তিনিও উচু গলায় বললেন,

“কোন খুশিতে?”

আমি চোর ধরা পড়ার মতো কাচুমাচু করে জবাবে বললাম,

“আমি কি তোমাদের সাথে থাকতে পারি না?”

আপু সন্দিহান হয়ে বললো,

“কোন অঘটন ঘটিয়ে এখানে শিফট হলি বল তো!”

আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম।আপুকে কিভাবে বলি তোমার ভাইকে চুমু দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি! এটা বলার চেয়ে তো ম”রন ভালো।আমি আমতা আমতা করে বললাম,

“কোনো অঘটনই ঘটাই নি।”

নিশি এবার দাঁত কেলিয়ে বললো,

“তোমাকে দেখে তো অন্য কিছু মনে হয় !”

এবার আমি বিপাকে পড়ে গেলাম।সত্যিটা লুকাতে মুখ ভার করে বললাম,

“দিস ইজ নট ফেয়ার নিশি।তোর ভাইকে বিয়ে করেছি বলে ভাবিই বানিয়ে দিলি তোরা?আচ্ছা থাক চলে যাচ্ছি আমি।তাও অপবাদ দিস না।”

কথাটা বলে চলে আসতে নিলাম আমি।এবার ওরা জাপ্টে ধরলো আমাকে।সেধে সেধে আটকে রাখলো।যদিও এতো সাধাসাধির দরকার ছিলো না,আজ আমি এমনি থাকতাম।তবুও কপট রাগ দেখালাম।সাথে ওদের তেল মালিশ করা লুফে নিলাম।সারা রাত বেশ আড়ামেই গল্পে গল্পে কেটে গেলো।পরদিন যথারীতি উনি ব্যস্ততায় আবিষ্ট হলেন।হসপিটাল, রুগী সহ ওনার নিত্যাদিনের কর্মে অনেক রাত অবধি বাইরে রইলেন।এতে আমার সুবিধাই হলো।আজ আমি ফট করে বিছানায় গিয়ে আগেভাগে শুয়ে পড়বো।এতে ওনার সামনে পড়তে হবে না ভাবলাম।কিন্তু খালামনি হুট করে বললেন,

“আমার শরীরটা ভালো লাগছে না পুষ্প।তুই আজ রাতে নিভৃতকে ডিনার করাস।আমি শুয়ে পড়লাম।”

কথাটা শুনে মাথায় বাজ পড়লো আমার।ওনাকে ডিনার করানো মানে ওনার সামনে পড়া।এটা কিভাবে সম্ভব?অথচ খালামনিকে নাও করতে পারলাম না।তাই বাধ্য মেয়ের মতো মাথা দুলিয়ে রাজি হলাম।খালাম্মু স্মিত হসে ঘরে চলে গেলেন।

_______
উনি ফিরেছেন বেশ খানিকটা সময় হলো।শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে এলেন টেবিলে।আমি চটপট সব গরম করে টেবিলে সাজাচ্ছিলাম।উদ্দেশ্য উনি আসার আগেই সব রেডি করে কোথাও গিয়ে আত্মগোপন করবো।ওনার খাওয়া শেষ হলে সব গুছিয়ে ফেলবো।এতে ওনার সামনে পড়তে হবে না।কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার আগেই উনি হাজির হলেন।একটা চেয়ার টেনে বসলেন টেবিলে।প্লেটে ভাত বেড়ে খাওয়া শুরু করলেন উনি।আমি কাচুমাচু করে ওনার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সব গোছাতে লাগলাম।শেষের আইটেম টেবিলে রেখে যেই না ছুট লাগাতে যাব তখন উনি থমথমে কণ্ঠে বললেন,

“আমার থেকে এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছো কেনো?আমি কি তেমাকে একবারও বলেছি তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়েছো, এটা আমি নোটিশ করেছি?”

ওনার কথাটা শুনে থমকে দাঁড়ালাম আমি।লজ্জায় গাল লাল হয়ে আসলো আমার।বলা আর বাকি রাখলো কই?ঠোঁটকাটা, খাটাশ বেটা একটা!

“মনে মনে বকা না দিয়ে ফ্রী ফিল করো।আমি ওসবে কিছু মনে করি নি।”

ওনার সহজ সরল বিবৃতিতে খানিকটা সহজ হলাম আমি।মিনমিন করে বললাম,

“আমার এই প্রাপ্তির সব ক্রেডিট আপনার।আমার জন্য এত চেষ্টা করায় ধন্যবাদ।”

আমার কথায় উনি খাওয়াতে মন রেখেই বললেন,

“সব ক্রেডিট আমার না।তুমি পথিক ছিলে,নিজ পরিশ্রমে গন্তব্যে পৌঁছেছো।আমি কেবল সঠিক রাস্তা বানিয়ে দিয়েছি।এর বেশি ক্রেডিট আমার নেই।”

“হুম।কিন্তু এই রাস্তাটাই বা বানায় কে?”

আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না উনি।বরং নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন,

“আজ নিজ ঘরেই ঘুমিয়ো।ওদের জ্বালানোর দরকার নেই।”

ওনার এহেন কথায় স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।ওটা আমার নিজ ঘর এই কথাটা ওনার মুখে শুনে অন্য রকম এক ভালোলাগা কাজ করছিলো।উনি মাথা নত করে খেয়ে চলেছেন।আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করছি।কেমন বউ বউ ফিল আসছে নিজের মাঝে।কখনো ওনার জন্য খাবার নিয়ে বসে থাকি নি।কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এমনটা না করে এক অজানা অনুভুতি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।যেই অনুভুতির সবটা আজ শুষে নিলাম আমি।না চাইতেও এখন ওনার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
____________________

ভর্তির সকল কার্যক্রম শেষ করে আবার বগুড়ায় ফিরেছি আমরা।এখন একদম ফ্রী আমি।কোনো প্যারা বা চিন্তা নেই।তাই বেশ অলস দিন কাটে আমার।আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে হিম বাতাসের শীতল ছোঁয়া উপভোগ করছি। বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে উড়চ্ছে বন্য চুলগুলো।আমি উদাস হয়ে ধরনীর বুকে সকাল দেখছি।আর ভিতরে উনি শাওয়ার নিচ্ছেন।হসপিটালে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।সারাদিনের মনে বের হবেন হয়তো।লোকটাকে দেখলে ইদানীং বেশ মায়া লাগে আমার।কত ব্যস্ত সময় কাটান।দম ফেলার অবকাশ পান না এখন।ওনার অভিধানে সব দিনই সমান।অফ ডেতেও মুক্তি নেই।গিজগিজ রুগীর যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়।তারপর ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরে শাওয়ার নিয়ে নাস্তা করে আবার পড়তে বসেন।ওনার এই পড়াশোনা বৃদ্ধকাল অবধি হয়তো চলেই যাবে।কি এক অদ্ভুদ জীবন!

আমি ওনাকে নিয়ে ভাবতে থাকি।বেশ কিছুক্ষণ পর উনি আমার পাশে এসে দাঁড়ান। তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে আমি তার দিকে চোখ মেলে তাকাই। ছোট একটা সৌজন্যমূলক হাসি দেই সাথে সাথেই। উনি একপলক আমার দিকে চেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেন। অতঃপর শীতল কন্ঠে বলেন,

“ব্যাগ পত্র গুছিয়ে রেডি হয়ে থেকো।আজ বিকেলে আমরা তোমার বাবার বাড়ি যাচ্ছি।”

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here