প্রিয়তার প্রহর (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) পর্ব ৪

0
98

#প্রিয়তার_প্রহর
পর্ব সংখ্যা (৪)

সন্ধ্যার মাঝামাঝি। কুচকুচে অন্ধকার আশপাশে। বাড়ির ভেতর থাকা সব বাল্প নেভানো। আরহামের চোখেমুখে বিস্ময়। সে স্বপ্ন দেখছে মনে হচ্ছে। ছোট্ট হাত দ্বারা চোখ ডলে আবারো সামনে তাকাল সে। গোলাকার চোখ উজ্জল হলো মুহুর্তেই। ঝাঁপিয়ে পরল সামনে থাকা মানুষটার বক্ষস্থলে। আঁকড়ে ধরল মানুষটার শার্টের অংশ। পেশিবহুল বুকের আচ্ছাদনে মিইয়ে রইল। অভিমানে নত হলো আরহামের মুখশ্রী। বলে উঠল,

” তুমি এতদিন আসো নি কেন? আমি তোমাকে মিস করেছি।

প্রহরের মুখে স্লান হাসি। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল আরহামের মোলায়েম শরীরটাকে। চোখ চিকচিক করে উঠল প্রহরের। এতদিন পর বাচ্চাটাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হলো। বক্ষস্থলের উন্মাদনা টের পেল। চোখ পরল সদর দরজার দিকে। প্রিয়তার অস্তিত্ব টের পেল না সেথায়। আরহামের ললাটে গাঢ়ভাবে চুম্বন করল সে। গালে গাল ঘসে বলে উঠল,

” তুমিও তো আমার খোঁজ নাও নি। আমি তো তবুও এলাম।

” তোমার ফোন নম্বর আপুর ফোনে নেই। কিভাবে ফোন দিবো বলো? আপুকে বারবার বলেছি তোমার সাথে কথা বলতে চাই। শোনেইনি। আপু এখন সারাদিন আমায় বকে জানো? সবসময় রেগে থাকে।

” তোমার আপু বড্ড পাষাণ, নির্দয়া। প্রেমের উত্তাপে আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভষ্ম করার পরিকল্পনা করেছে সে। আমাকে রক্তাক্ত, জখম, ছন্নছাড়া করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

আরহাম পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। প্রহরের গায়ে শুভ্র শার্ট আর কালো প্যান্ট। গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে কালো টাই। চুলগুলো এলোমেলো। জোড়া ভ্রুদ্বয় যেন আর্ট করা। স্নিগ্ধ হাসি প্রহরের মুখে। সতেজ লাগছে খুব। আরহাম বলে উঠল,
” তুমি আমায় মিস করেছো?

– খুব করেছি।

প্রিয়তা বেরিয়ে এসেছে সদর দরজার সামনে। আরহামকে প্রহরের কোলে দেখে হাসল সে। এগিয়ে এলো প্রহরের অতি নিকটে। প্রিয়তার গায়ে হলদে রঙের জামা। বড় ওড়না দ্বারা শরীরের অর্ধেকাংশ ঢেকে রাখা। চুলগুলো আলতো করে খোঁপা করে রেখেছে। অন্ধকারে আচ্ছন্ন এই এলাকাটিতে রঙ না থাকলেও প্রিয়তার ওষ্ঠাদ্বয়ে লেগে থাকা গোলাপি রঙের লিপবাম চিকচিক করছে। প্রহর দৃষ্টি মেলল অসাবধানতায়। প্রহরের এমন সম্মোহনী দৃষ্টি নজর এড়াল না প্রিয়তার। সেসব এড়িয়ে প্রশ্ন করলো,

” এখানে হঠাৎ কি করতে এসেছেন ইন্সপেক্টর?

আরহামকে কোলে রেখেই প্রিয়তার উদ্দেশ্যে বাঁকা হেসে প্রহর বলে উঠল,

” এখানে আসার প্রথম রিজন আপনারা। আপনাদের দেখতে এসেছি। অ্যান্ড সেকেন্ড রিজন হলো মেলায় আসা। সামনে যে মেলা বসেছে সেই মেলার আয়োজনের সব দায়িত্বে রয়েছে শফিক শাহ্। উনার জমিতেই মেলাটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি উনি। মেলায় যেন গোলমাল, হানাহানি, চুরি-ডাকাতি, গ্যাঞ্জাম না হয় এজন্যে আমাদের ফোর্সকে টহল দিতে বলেছে। আমি টিমকে সবটা বুঝিয়ে দিতে যাচ্ছি।

” আপনি বললে আমরাই যেতাম থানায়। এই সন্ধ্যায় এখানে এসেছেন কেন? বাড়িওয়ালী জানলে ভিষণ রাগারাগি করবেন। তিল কে তাল করে ফেলবেন। কতশত কুৎসিত বাক্য ছুড়বে আমার অগোচরে জানেন?

” সেসব আমি দেখে নিবো। আমি আপনাকে নিতে এসেছি প্রিয়।

” কোথায়।

” মেলায়।

অধরযুগলে দাঁত চেপে হাসল প্রিয়তা। বলল,
” আপনি এমন ভাবে বললেন যেন আমি আপনার বিয়ে করা বউ। রাগ করে চলে এসেছি বলে আপনার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন।

” আপনি চাইলে সেটাও করতে পারি।

‘ থাক, আরহাম মেলায় যেতে চেয়েছিল। ওকে নিয়ে যান তবে।

” আপনি যাবেন না?

” আমি কেন যাবো?

” চলুন প্রিয়তা। কতদিন আমাদের ভালো করে কথা হয় না। চলুন আমাদের সাথে। আরহামের ভালো লাগবে।

প্রিয়তা থামে। মিইয়ে যায়। কণ্ঠরোধ হয়। অজানা ভালো লাগায় আপ্লুত হয় মন। নির্নিমেষ তাকিয়ে রয় সম্মুখে। জড়তা চেপে ধরে বক্ষস্থলে। অস্থিরতা চলমান রয়ে যায়। আরহামের মলিন মুখ নজরে পরল প্রিয়তার। আরহাম ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললো,

” চলো না আপু। আমি কিচ্ছু খাবো না। কিনবোও না। শুধু দেখবো।

প্রিয়তা ঘরে ফিরে আসে। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ঘরে থেকে লোহার ছোট্ট তালা বের করে দরজা বন্ধ রেখে তালা দেয়। ওড়নার কোণা থেকে বের করে কয়েকটা খুচরো নোট। হাতের মুঠোয় পুড়ে এগিয়ে আসে প্রহরের সামনে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে মাথা নত করে বলে ওঠে, ” চলুন”।

আরহাম খিলখিলিয়ে হাসে। হাত তালি দেয় শব্দ করে। প্রহরের হাসি গাঢ় হয়। প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় হৃদয়। সাহসটা বেড়ে যায় যেন। আচমকা তড়িৎ বেগে আলতো করে ধরে প্রিয়তার কব্জি। অতি নিকটে এসে ধরা দেয় প্রিয়তা। অক্ষিযুগল ধারাল হয়। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয় প্রিয়তা। লজ্জায় মূর্চ্ছা যায়। তবুও তেজ কমে না। ঝাঁঝ আর তেজ দেখিয়ে সে বলে উঠে,

” কি করছেন? হাত ছাড়ুন।

” ছাড়বো না। আজীবন ধরে রাখার যেই শপথ আমি করেছি সেই শপথ ভাঙার প্রশ্নই ওঠে না।

” লোকে দেখে ফেলবে প্রহর। আমি কিন্তু যাবো না এমন করলে। মাত্রা ছাড়াবেন না।

প্রহর ছেড়ে দিল। আরহামকে ভালো করে কোলে নিল। নিস্তব্ধ রজনীতে দুরত্ব বজায় রেখে হাঁটল দুজন। শনশন বাতাসে দুলে উঠল প্রিয়তার চোখের সামনের চুলগুলো। ঘাড় বাঁকিয়ে লম্বাটে, বলিষ্ঠ দেহের লোকটার পানে নজর আটকাল। কিছুটা ভয় হলো প্রিয়তার। তটস্থ চিত্তে দমিয়ে রাখল নিজেকে। একটা দিনই তো। এরপর না হয় লোকটাকে জীবন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করবে।

___________

থানায় পৌঁছানোর পর ইহানকে কোথাও দেখতে পেল না তানিয়া। কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে ” ইহান স্যার তো আজ থানায় আসেনি”। তানিয়া হতবাক। এ দুদিন থানায় আসতে না পারার জন্য ইহান ছটফট করছিল। আজ যখন সিলেটেই আছে তখন থানায় আসল না কেন? প্রশ্ন জাগে তানিয়ার মনে। তৎক্ষণাৎ প্যান্টের পকেটে রাখা মুঠোফোন বের করে আঙ্গুল চালিয়ে ইহানের নম্বরে ডায়াল করে। ফোনের ওপাশ থেকে নারীকণ্ঠে কেউ বলে উঠে,

Sorry, The number you have dialed is currently unreachable. Please call later or leave a massage..

তানিয়া এইবার একটু বেশিই চমকাল। ইহান স্যারের ফোন অফ থাকে না কখনো। হঠাৎ ফোন বন্ধ করে থানায় না আসার কারণটা ধরতে পারল না তানিয়া। মাথার ক্যাপটা খুলে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে অটো ধরল সে। দ্রুত পৌঁছাল ইহানের বাড়ি। ইহান স্যার না থাকলেও উনার আম্মা তো থাকবে। এইভেবে বাড়িতে পা রাখল তানিয়া। ড্রইংরুমের মেঝেতে ইলমা বেগম কে বসে থাকতে দেখল। ইলমা বেগম কাঁথা সেলাই করছেন। চোখে চারকোণার চশমা। সুচ ফুটিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজটি করছেন তিনি। তানিয়া এগিয়ে গিয়ে বসল সোফায়। জিজ্ঞেস করল,

” এত ছোট কাঁথা কার জন্য আন্টি?

ইলমা বেগম হাসলেন। বললেন,

” আমার ভবিষ্যত নাতি-নাতনির জন্যে। তুমি কেমন আছো মা?

” ভালো আছি আন্টি। আপনার শরীর ঠিক আছে? ইহান স্যার কোথায়?

” আমি ভালো আছি। ইহান তো ঘুমোচ্ছে।

” ঘুমোচ্ছে?

” আর বলো না, ছেলেটা এত চিন্তায় থাকে যে ভালোমতো ঘুমোতেই পারে না। এজন্যে সকাল সকাল ওর ফোন অফ করে রেখেছি আমি। এলার্ম বাজেনি তাই ঘুম থেকেও ওঠেনি। আমিও ডাকতে যাইনি।

” উনাকে তো আজকে একটু থানায় যেতে হতো আন্টি। আমি আজ থানায় থাকবো না বেশিক্ষণ।

” ওহ। অনেক বেলা হয়েছে। যাও এখন ওকে ডাকো গিয়ে। এখন যেতে পারে।

তানিয়া ধীর পায়ে নির্দিষ্ট কক্ষে এলো। ইহানের ঘরটা বরাবরের মতোই গোছানো, পরিপাটি। ঘরের দেয়ালে সুন্দর সুন্দর পেইন্টিং। উদাম গায়ে সফেদ বিছানায় শুয়ে আছে ইহান। কোকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। রোমশপূর্ণ বুকটা দেখে থতমত খেল তানিয়া। ইহানের বুক অবধি কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখা। এসি চলছে ঘরে। এভাবে ইহানকে দেখে একটু ভড়কাল তানিয়া। নিঃশব্দে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে। ডেকে উঠল নরম স্বরে। উঠল না ইহান। পুনরায় ডেকেও লাভ হলো না। তানিয়া এইবার একটু জোরেই ডেকে উঠল।

” ইহান স্যারররররর।

ধরফরিয়ে উঠে বসল ইহান। ড্যাবড্যাব করে তাকাল তানিয়ার পানে। হুট করে জেগে ওঠায় মাথায় একটা চিনচিন ব্যথার উৎপত্তি হলো। খানিক বিরক্ত হলো ইহান। চোখ ছোট ছোট করে ফেলল। ললাটে ভাঁজ দেখা দিল। পাশে থাকা ছাই রঙা শার্ট জড়িয়ে নিল শরীরে। বললো,

” এভাবে চিৎকার করছো কেন তানিয়া? উফফ মাথা ধরিয়ে দিলে।

” ক’টা বাজে সে খেয়াল আছে? থানায় যাবেন না?

” কটা বাজে? আমি তো এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম।

” আনফরচুনেটলি আন্টি আপনার ফোন অফ করে রেখেছে যাতে আপনি অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেন। এখন বাজে এগারোটা। উঠুন জলদি।

ইহান উঠে দাঁড়াল। আম্মার উপর ভিষণ রাগ হলো তার। এমনিতেই দুদিন গ্যাপ দিয়েছে। উপর মহল থেকে চাপ দিচ্ছে। এখন এভাবে লেইট করে থানায় যাওয়া বেমানান। ইহান ব্রাশ মুখে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। পাঁচ মিনিটের মাথায় পুলিশ ইউনিফর্ম গায়ে জড়িয়ে বের হলো সে। রিভলবার কোমড়ে গুঁজে নিয়ে পা বাড়াল বাইরে। ইলমা বেগম টিফিন দিলেন হাতে। তা নিয়েই বেরিয়ে পরল ইহান আর তানিয়া। ইহানের গাড়ি চলতে লাগল স্বাভাবিক গতিতে। দু মাস আগে মাইক্রোটা কিনেছে ইহান। ড্রাইভার ও রেখেছে। ইহান আর তানিয়া পেছনে বসেছে। তানিয়া ইহানের ভাবভঙ্গি বুঝে বলল,

” আমি দুপুর পর্যন্ত থানায় থাকবো। দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরতে হবে আমাকে।

” কেন?

” আজ ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে আমায়। আন্টি বলেছে তাড়াতাড়ি ফিরতে।

” ও।

” আপনি কবে বিয়ে করবেন স্যার? আন্টিকে দেখলাম নাতি-নাতনির জন্য কাঁথা সেলাই করছেন। অথচ আপনার বিয়ের কোনো নামগন্ধই নেই। বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তো।

শেষের কথাটা তানিয়া খুব ভয়ে ভয়েই বলে উঠল। ইহান নামক মানুষটা রাগী, বদমেজাজি। কখন, কোন কথা বলে কাকে কষ্ট দিবে তা সে নিজেই জানে না। থানার লোকজন খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা না হলে ইহানকে সে কথা বলতে আসে না। তানিয়ার মাধ্যমেই সব কথা ইহানের নিকট পৌঁছায়। ইহানকে এরূপ কথা বলার সাথে সাথেই ধুকবুক করে উঠল তানিয়ার বুক। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইল ইহানের পানে। এই বুঝি ইহান তেতে উঠে দু কথা শুনিয়ে দিল, ধমক দিল। তানিয়া অপেক্ষা করলো বিস্ফোরন সামলাবার জন্য। ভীত হলো মুখশ্রী। চক্ষুদ্বয় বুজে নিল ভয়ে। কিন্তু ঝাঁঝালো স্বর শুনলো না। আড়চোখে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে ইহান বলে উঠল,

“সত্যিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি?

তানিয়া যেন প্রাণ ফিরে পেল। বোকা হাসল সে। উক্ত কথায় সাহস পেল কিছুটা। দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে বললো,

” হ্যাঁ। বিয়ের বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে আপনার। আমার ও বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। এজন্য আন্টি জোড়াজুড়ি করছেন বিয়ের জন্য।

ইহান চুপ রইল। গ্লাসের বাইরে থাকা পরিবেশ দেখতে লাগল। ততক্ষণাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যিই তো। বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে। জীবন সঙ্গী নির্বাচন করা আসলেই প্রয়োজন। ইলমা বেগমের নাতি-নাতনি নিয়ে খেলার অধিকার আছে। বিয়ে না করলে সে ইচ্ছে পূরণ হবে কিভাবে আম্মার? ভাবতে বসল ইহান। তানিয়ার দিকে তাকাল কয়েক পল। তানিয়ার বুদ্ধিমত্তা প্রখর। তবু কেন মেয়েটা ইহানের অনুভূতি বুঝতে পারে না? নাকি বুঝে? বুঝে না বোঝার ভান করে?

______

স্কুল থেকে ফিরে আরহাম টিভি দেখছে। সাথে খেলনা খাটে বিছিয়ে রেখেছে। মটু পাতলু কার্টুনটা তার প্রিয়। দেখতে বসলে হাসতে হাসতে পেটে খিল লেগে যায় ছেলেটার। প্রিয়তার আজ দুটো টিউশনি ছিল। সেগুলো শেষ করে বাসায় ফিরল বাজার নিয়ে। কলমি শাক আর বেগুন ভাজা করবে ভেবেছে প্রিয়তা। বেগুন ভেজে চটকে ভাত মাখালে আরহাম খুব ভালো খায়। গত রাতে মেলায় গিয়ে জিলাপি, খুরমা কিনেছিল প্রিয়তা। কেনার পর বয়ামে আটকে রেখেছে। ভাত না থাকলে আরহামকে খেতে বলেছে ওগুলো। মেলায় প্রহরের সাথে আরহাম অনেকক্ষণ ঘুরেছে। নাগরদোলায় চড়ছে, ট্রেইনে চড়েছে, আচার আর জুস খেয়েছি। এদিক ওদিক ঘুড়ে বেরিয়েছে। বাধ্য হয়ে প্রিয়তাও ওদের পিছু পিছু হেঁটেছে। প্রহর কয়েক মিনিট পর পর এটা ওটা প্রিয়তাকে কিনে দিতে চেয়েছে। প্রিয়তা নেয়নি সেসব। চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে ছিল শুধু। চিল্লাচিল্লি করেছে অনেকবার। আরহামের জন্য খেলনা কিনে দিয়েছে প্রহর। সেসব পেয়ে আরহাম খুব খুশি।

বাজারের ব্যাগটা রেখে প্রিয়তা জিজ্ঞেস করলো,

” খেয়েছো?

” ভাইয়া বলেছে দুপুরে খেতে না। আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। ভাইয়ার সাথে খাবো।

” কোথায় যাবে তুমি?

” জানি না।

” দ্রুত ফিরবে। আমি যেন বাসায় এসে তোমাকে পাই।

” আচ্ছা।

বলতে না বলতেই বাইকের শব্দ শোনা গেল। আরহাম তড়িৎ গতিতে খাট থেকে লাফিয়ে সদর দরজার কাছে গেল। প্রিয়তাও পিছু ছুটল। আরহামকে নিয়ে কোথায় যাবে তা তার জানা প্রয়োজন। বাইরে এসে প্রহরের মুখটা দেখতে পেল প্রিয়তা। প্রহরের গায়ে নীল রঙের শার্ট।শার্টের দুটো বোতাম খোলা। হাতা ফোল্ড করে রাখা। ঠোঁটে নিদারুণ হাসি। প্রহরের নজরকাড়া রুপে যে কোন মেয়েই ঘায়েল হতে বাধ্য। সবাই বলে ভালোবাসা রুপ দেখে হয় না। এটা মিথ্যে। প্রিয়তা যেমন প্রহরের ব্যক্তিত্বে মজেছে, ঠিক তেমনি প্রহরের সৌন্দর্যে ঘায়েল হয়েছে। মাঝে মাঝে প্রিয়তার খুব করে বলতে ইচ্ছে হয়,

” আপনি সুন্দর বলে আপনাকে ভালোবাসি না ইন্সপেক্টর সাহেব। আপনাকে ভালোবাসি বলেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ আপনাকেই লাগে।

প্রহর হুট করেই বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। শার্টের কলার ঝাঁকিয়ে আচমকা প্রিয়তার অতি নিকটে এসে দাঁড়াল। প্রিয়তার বক্ষপিঞ্জর কেঁপে উঠল। অস্থির হয়ে উঠল মুহুর্তেই। ঘন ঘন শ্বাস ফেলল। আশপাশে তাকিয়ে লোকজনের উপস্থিতির দিকে খেয়াল রাখল। প্রহর ঝুঁকে এলো প্রিয়তার কপোলের দিকে। তাকিয়ে রইল কয়েক পল। প্রিয়তার বাহুতে পেশিবহুল হাতের চাপ প্রয়োগ করল। বাকরুদ্ধ প্রিয়তা। শ্বেতজ্বল গড়াল ললাট বেয়ে। নাসিকারন্ধ্রে পারফিউমের কড়া সুগন্ধ পেল। তীক্ষ্ম, তুখোড় চোখ দ্বারা আশপাশ পর্যবেক্ষণ করে প্রহর ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ ফাঁক করে একজোড়া শুষ্ক, শীতল ওষ্ঠাদ্বয় দ্বারা সশব্দে, সজোরে চুমু খেল প্রিয়তার ললাটের মধ্যিখানে। বলে উঠল,

” আপনাকে আমার করে নিলাম প্রিয়। সিল মেরে দিলাম। এটা ট্রেইলার ছিল। পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা জান।

শিরশির করে উঠল প্রিয়তার শরীর। কম্পিত হলো হৃদয়। ইষৎ কেঁপে উঠল। হৃদস্পন্দন থেমে গেল যেন। বরফের ন্যায় জমে গেল খানিকক্ষণের জন্য। দূরে সরে গেল ততক্ষণাৎ। ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল। মস্তিষ্ক কাজ করল না প্রিয়তার। কাঠের মতো জড় বস্তুর ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। কথা আটকে গেল গলায়। একটু আগে কি হলো তা ভেবে কান্না পেল প্রিয়তার। নোনাজল গড়াল চোখ বেয়ে। নাকের পাটা ফুলে উঠল। রাগ হলো অনেকটা। চোখ পাকিয়ে তাকাল। ধমক দেবার আগেই আরহামকে কোলে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো প্রহর। শো শো করে ছুটে গেল বাইক। নিমিষেই উধাও হলো দুজন। ধুলোবালি উড়ল প্রিয়তার সম্মুখে। দেখা গেল না প্রহরের অবয়ব।

_______

রাত নয়টার দিকে বাড়ি ফিরল ইহান। ঘর্মাক্ত শরীরে ঘরে ঢুকল সে। ঘুম পাচ্ছে খুব। অলসতা ঝেঁকে বসেছে। বাড়িতে ফিরেই গোসল করে নিল ইহান। টাওয়াল দিয়ে সিল্কি চুলগুলো মুছতে মুছতে ওয়াশরুম হতে বের হলো। বিছানায় সালোয়ার কামিজ পরে বসে আছেন ইলমা বেগম। ছেলেকে দেখে টেবিল থেকে পোলাও আর মাংসের বাটিটা বিছানায় রাখলেন তিনি। বললেন,

” তাড়াতাড়ি খাবি আয়।

ইহান হাসল। ভালো লাগায় ছেয়ে গেল হৃদয়। কোনোরকমে মাথা মুছে বিছানায় বসল পা ভাঁজ করে। মাংসের বাটি থেকে খানিক মাংস আর ঝোল পোলাওয়ের বাটিতে ঢেলে নিল। হাত দ্বারা নেড়েচেড়ে মুখে নিল খাবারটুকু। হেসে বলে উঠল,

” আম্মা।

” কি?

” তোমার হাতের রান্না বেস্ট। খুবই সুস্বাদু।

” ভালো করে খা।

ইহান খেতে লাগল। ইলমা বেগম খানিক সময় নিয়ে বললেন,

” বিয়ে কবে করবি আব্বা?

হাত থেমে গেল ইহানের। মাথা উঁচু করে চাইল আম্মার পানে। পুনরায় খেতে আরম্ভ করল। একটু চুপ থেকে বলল,

” করবো আম্মা।

” কবে করবি? তানিয়ার বিয়ে হয়ে গেলে?

দ্রুত মাথা উঁচিয়ে বিস্ময় নিয়ে আম্মার পানে তাকাল ইহান। থতমত খেল একটু। পানি ঢকঢক করে গলায় ঢেলে নিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে উঠল,

” কি বলছো আম্মা?

ইলমা বেগম টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি বই বের করলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “প্রথম আলো” বইটা ইহানের সামনে রাখলেন তিনি। হকচকিয়ে গেল ইহান। এই বইটা তার ঘরের বুকশেল্ফে থাকে। অনেকদিন ধরে ধরা হয়নি বইটা। ইলমা বেগম যে বেছে বেছে এই বইটাই পড়ার জন্য নিবেন তা ভাবেনি ইহান। ইলমা বেগম ছেলের এহেন হকচকিয়ে ওঠাটা ভিষণ উপভোগ করলেন। বললেন,

” কি ভেবেছিস? আমি কিছুই বুঝবো না? বইয়ের ভাঁজে চিঠি দেখেই আমি পড়তে শুরু করলাম। প্রথমে পড়তে চাইনি বিশ্বাস কর। পরে ভাবলাম ছেলের প্রতি মায়ের অধিকার সবচেয়ে বেশি। মায়ের কাছে ছেলের পার্সোনাল জিনিস আবার কি? জানার অধিকার তো আমার আছে।

” আচ্ছা। কি বুঝলে পড়ে?

” তানিয়াকে ভালোবাসিস। মেয়েটার উদ্দেশ্যে চিঠি লিখেছিস। কিন্তু সে চিঠি পাঠাসনি তানিয়ার কাছে। কেন?

” আমার ভালোবাসাটা একতরফা আম্মা। এমন শত শত চিঠি আমি লিখেছি তানিয়ার নামে। সেসব চিঠি প্রেরণ করা হয়নি। ইউনিফর্ম গায়ে দিলে আমি তানিয়ার স্যার হই। আর নরমাল ড্রেসআপে আমি শুধু মাত্র ওর বন্ধু। এর বেশি ও আমাকে কিছু ভাবে না।

” ওকে বলেছিস তোর ভালোবাসার কথা? মেয়েটাকে আমার ও খুব পছন্দ রে। কি সুন্দর ওই দুদিন আমার খেয়াল রাখল। ব্যবহার ও অনেক ভালো। ছেলের বউ হিসেবে তানিয়াকে মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

” ভালোবাসার কথা বলা হয়নি। বন্ধুত্ব ভাঙতে চাইনি আমি। নিজের অনুভূতির কথা জানালে তানিয়া হয়তো আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথাই বলতে পারবে না।

” তাহলে কি অবিবাহিত থাকবি সারাজীবন? বিয়ের বয়স তো পেরিয়ে গেছে।

” জানি না আম্মা।

ইলমা বেগম চলে গেলেন ঘরে। বেলকনি বেয়ে ঠান্ডা,শীতল বাতাস ঘরে প্রবেশ করল। ইহানের আর খাওয়া হলো না। হাত ধুয়ে ল্যাপটপ অন করল। কিছু টাইপ করার পর তানিয়ার উজ্জ্বল মুখশ্রী ভেসে উঠল। প্রশান্তি অনুভব করল ইহান। তাকিয়ে রইল দীর্ঘসময় ধরে।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

বিঃদ্রঃ রি-চেইক দেওয়া হয়নি। সবাই মতামত জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here