প্রিয়তার প্রহর (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) পর্ব ১১

0
87

#প্রিয়তার_প্রহর (২য় পরিচ্ছেদ )
পর্ব সংখ্যা ( ১১)

তানিয়ার ঘুম ভেঙেছে সকালে। ইলমা বেগমের সাথে রান্নাবান্না করেছে। যদিও তিনি তানিয়াকে কিছুই করতে দেননি। কেবল হাতে হাতে এটা ওটা এগিয়ে দিয়েছে তানিয়া। ইহান ঘুমোচ্ছে। ডাকতে হবে তাকে। তানিয়ার অসস্তি লাগে কিছুটা। ইহানের ঘুমোতে ঘুমোতে রাত বারোটার বেশি বেজে যায়। এত সকালে উঠতে কি লোকটার আলসেমি লাগে না? ভাবে তানিয়া। ঘরে ঢুকে। ইহানের গায়ে আজ শার্ট আছে। গায়ে কাঁথা নেই। দু হাঁটু ভাঁজ করে শুয়ে আছে। তানিয়া ইহানকে ডাকতে ভয় পায়। অন্যভাবে জাগিয়ে তোলার উপায় খোঁজে। ফোনটা বের করে হাই ভলিউমে গান ছেড়ে দেয়। গানটা ভালোমতো বেজে ওঠার সাথে সাথেই নড়েচড়ে উঠে ইহান। কপাল কুঁচকে ফেলে। চোখ না মেলেই বলে,
” এত সকালে কে আউলফাউল গান বাজাচ্ছে? ধ্যাত।

তানিয়া মজা পায়। মিটিমিটি হাসে। ওয়াশরুমে গিয়ে ইউনিফর্ম পরে বেরিয়ে আসে। পুনরায় গান বাজায়। ইহান বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে। তানিয়ার হাতে ফোন দেখে রাগী কণ্ঠে বলে,

‘ কাজ নেই তোমার? এত ভলিউম দিয়ে গান শুনছো।

তানিয়া চুল আচরাতে আচরাতে উত্তর দেয়,
” আপনার কাজ নেই? ঘুমোচ্ছেন তো নাক ডেকে। থানায় যাবেন না?

ঘুম ততক্ষণাৎ ভেঙে যায় ইহানের। উঠে বসে। ওয়াশরুমে যায় তড়িঘড়ি করে। ইউনিফর্ম জড়িয়ে দিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। তানিয়া তখনও আয়নার সামনে। ইহান তাড়া দেয়। বলে,

” এখন ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছো। সরো। রেডি হতে দাও আমায়।

ভেংচি কাটে তানিয়া। এক চুল ও নড়ে না। চিরুনি দিয়ে লম্বা চুলগুলোকে পরিপাটি করতে করতে বলে,

” সময় লাগবে আমার। আপনি যেমন কাজে যাচ্ছেন, আমিও কাজে যাচ্ছি। ভাব নিবেন না একদম।

ইহান হতবাক। মেয়েটা আজকাল একটু বেশিই পাকনামো করছে, বেশি কথা বলছে। হুটহাট অসস্তিতে ফেলছে ইহানকে। ইহানের রাগ হয়। ক্রোধটুকু গিলে ফেলে সে। নম্র কণ্ঠে বলে,

” সরে দাঁড়াও। তাড়া আছে আমার।

তানিয়া ইহানের দিকে ফিরে। চুলগুলো খোঁপা বেঁধে নিয়ে বলে,

” আপনাকে যেতে দিবো। কিন্তু আমাকে একটা হেল্প করতে হবে।

” কি?

” আবিরের সাথে দেখা করতে যাবো। আপনিও আমার সাথে যাবেন।

ইহান থমকায়। আবির নামটা মারাত্মক ভাবে জ্বালায় তাকে। তানিয়ার সাথে কোনো ছেলেকে ভাবতে পারে না ইহান। কেমন শ্বাসরোধ হয়ে আসে। অথচ ইহান আর তানিয়ার সম্পর্ক আর পাঁচটা স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। তবুও হালাল সম্পর্কের প্রতি একটা টান বোধহয় তানিয়াও অনুভব করে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকায় ইহান। বোঝার চেষ্টা করে তানিয়ার আবিরের প্রতি কোনো সফট কর্ণার রয়েছে কিনা। না, বুঝতে পারে না ইহান। তানিয়াকে সরিয়ে আয়না দখল করে সে। শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বলে ওঠে,
” তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে। যাও তুমি। আমাকে টানতে চাইলে আমি তোমায় সাথে নিবো না।

” আপনি একা দেখা করবেন ? কিন্তু আবির আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে।

” তুমি আর আমি কি আলাদা তানিয়া?

মনোযোগী চোখে তাকিয়ে কথাটুকু বলে ইহান। ইহানের অদ্ভুত চাহনিতে অসস্তি হয় না তানিয়ার। গাঢ় হাসে সে। মজা করে বলে,

” না। আমি তো আপনার অর্ধাঙ্গীনী।

” উহু! সম্পূর্ণাঙ্গীনী।

সম্মোহনী চোখে তাকায় ইহান। গাঢ়ভাবে হাসে। তানিয়াও হাসে। মন্ত্র মুগ্ধের ন্যায় তাকায় দুজন দুজনের দিকে। সময় গড়ায়। ঘড়ির কাটা টিকটিক করে সময় জানান দেয়। ইহান তাড়াহুড়ো করে বের হয়। পিছু বের হয় তানিয়া। মেসেজ করে আবিরকে। বলে,

” Coffee Shop – a aschi. Stay There at 2 PM!

___

প্রহরের কাজ পরেছে। প্রিয়তাও অনুরোধ করেছিল হুট করে সিলেট না যাওয়ার জন্য। এখানে আরহামের স্কুল আছে। ট্রান্সফার সার্কিফিকেট নিতে হবে, সাধারণ গোছগাছ ও আছে। সবটা ভেবে প্রিয়তা আজ সিলেটে যেতে রাজি নয়। এদিকে প্রহরের নতুন চাকরি। এখন চলে যাওয়া মানে কথা দিয়ে কথা না রাখা। প্রহর যে কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে সে কোম্পানির ওউনার প্রহরকে প্রথম দেখায় চিনে ফেলেছে। ইন্টারভিউ ছাড়াই প্রহরকে উঁচু পদে চাকরি দিতে চেয়েছে। প্রহর মানেনি। বলেছে ইন্টারভিউ নিয়ে যাচাই-বাছাই করে তবেই তাকে চাকরি দিতে। ইন্টারভিউ দিয়েছে প্রহর। প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে নিখুঁত ভাবে। চাকরিটাও পেয়ে গেছে অনায়াসে। বলেছিল পরেরদিন থেকে আসবে। দু দিন কাজে যাওয়ার পর হুট করে সিলেটে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু দেখায়। তবুও রাগ করে কাল সে বলেছিল সিলেটে চলে যাবে, বিয়ে করবে প্রিয়তাকে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রিয়তার না করায় দমে গিয়েছে প্রহর। সামলে নিয়েছে সব দিক ভেবে।

সোহেলের সাথে প্রিয়তার দেখা হলো আরহামের স্কুলে। বিশাল বড় মাঠটার আনাচে কানাচে মানুষ রয়েছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের ফুলগুলো পরে আছে ঘাসের উপরিভাগে। সোহেল দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে। ছেলেটার দৃষ্টি নত। প্রিয়তা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে ওঠে,

” বলুন, চুপ করে আছেন কেন?

সোহেল মাথা উঁচু করে। আশপাশে নজর বুলায়। মার্জিত ভঙ্গিতে বলে,
” তুমি আমার লেখা চিঠি পড়তে না?

” প্রথম কয়েকদিন পড়েছি।

” স্যার তোমাকে অফার করেছে? নাকি তুমি?

স্থির দৃষ্টিতে তাকায় প্রিয়তা। ছেলেটার মনোভাব ধরতে পারে সে। সোহেল ছেলেটার লেখার হাত ছিল দারুন। বাচনভঙ্গি ছিল চমৎকার। সোহেলের এমন চমৎকার চিঠি পড়লে যে কেউ সেই লেখার প্রেমে পড়বে। প্রেমে পরবে সোহেলেরও। এমন চিঠি বোধহয় প্রত্যেকটা মেয়েই চায়। কিন্তু প্রিয়তার মন তো গলেনি। সোহেলের এহেন প্রশ্নে প্রিয়তা কিছু ভাবে। বলে,

” আজওয়াদ ইশতিয়াক, এই নামটা সর্বপ্রথম দেখার পর আগ্রহ জ্বন্মেছিল খুব। আমি নিউজ দেখি না। আর উনিও সেই সময় এত ফেইমাস পুলিশ অফিসার ছিলেন না। তাই উনাকে চিনতাম না। প্রথম দেখায় উনি আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। হ্যাঁ আমার ক্ষতি করার জন্যই উনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেননি উনি। ক্ষতি করেননি আমার। আপনি তো জানেন, আমার জীবনটা অন্যান্য মেয়েদের মতো সহজ-সরল নয়। আমি সংগ্রাম করার জন্য জন্মেছি। নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর আমি কারো সাহায্য পাইনি। উনিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে আমি ভরসা করেছি। তখন আমার জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু আসুক আমি তা চাইনি। আপনার প্রেমপত্র পড়তে আমার ভালো লাগতো। কিন্তু প্রেমে পড়িনি আমি। তখন আমার ভাবনা ছিল শুধু আমার ভাইকে নিয়ে। কিভাবে এ সমাজে দুজন টিকে থাকবো সেই চিন্তা ছিল মাথায়। কোন কাজ করবো, কিভাবে সবটা সামলাবো এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। আপনার লেখা আমার মন গলাতে পারেনি। হঠাৎই আমি থমকে গিয়েছিলাম প্রহরের ব্যক্তিত্বে। এই মানুষটার সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ম-ধারালো চোখ, মার্জিত দৃষ্টিভঙ্গি সবটাই আমার হৃদয় কেড়েছে। কিন্তু প্রকাশ করার মুরোদ আমার ছিল না। সরে আসতে চেয়েছি, ভুলে যেতে চেয়েছি উনাকে। পরিশেষে সফল না হওয়ায় চলে এসেছি ঢাকায়। এখানে আসার পূর্বে উনাকে ওয়াদা করিয়েছিলাম উনি যেন আমাকে না খুঁজে। যেজন্য আপনি আমাকে খুঁজে পেলেও উনি আমাকে খুঁজে পাননি। আসলে খুঁজতে পারেইনি। অবশেষে জানতে পারলাম এখানে চলে আসায় উনি আমার শূন্যতা বুঝতে পেরেছে। আমাকে যে উনি ভালোবাসেন তা উনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আর সব বাঁধা আস্তে আস্তে উধাও হয়ে দিয়েছেন উনি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি বাঁচবো। কোনো একজনের ভালোবাসা আঁকড়ে ধরে বাঁচবো। কোনো একজনের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুখের নিদ্রায় আচ্ছাদিত হবো। একাকীত্বে ভুগবো না কখনো।

সোহেলের চোখের কার্ণিশে অশ্রুকণা জমেছে। ছেলেটা আড়াল করতে চাইল সেই অশ্রু। প্রিয়তার নজর এড়ায় না। মুচকি হেসে সে বলে,
” আমরা যা চাই সবসময় আমরা তা পাই না। পৃথিবীর নিয়মটাই এমন ভাইয়া। আপনি যাকে ভালোবাসবেন সে অন্যকে ভালবাসবে। আবার আপনার ভালোবাসার মানুষ যাকে ভালোবাসে সে আবার অন্য কাউকে চাইবে। এমনটাই হয় প্রায় ক্ষেত্রে। জীবনে সবকিছু পেয়ে গেলে চাওয়ার মতো কিছু থাকবে না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। একটু বেশিই ভালোবাসি। উনাকে কোনোভাবেই ছাড়তে পারবো না আমি। আপনাই ভুল মানুষকে ভালোবেসেছেন।

সোহেল মুচকি হাসে। বলে,
” তোমার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা প্রিয়তা। জীবনের পরবর্তী সময় গুলো তুমি আনন্দে কাটাও এটাই চাইবো।

সোহেল চলে যায়। প্রিয়তার খারাপ লাগে ছেলেটার জন্য। ফোনটা বেজে ওঠে প্রিয়তার। প্রহরের কল। কলটা ধরে দ্রুত। প্রহরের কণ্ঠস্বর অন্যরকম শোনাচ্ছে। চিন্তিত কণ্ঠে ছেলেটা ওপাশ থেকে বলে উঠল,

” আপনি কোথায় প্রিয়তা?

” আরহামের স্কুলে। ওকে নিতে এসেছি। কেন?

” আমাদের সিলেটে ফিরতেই হবে প্রিয়তা। আমি বসের থেকে ছুটি নিয়েছি।

” এ নিয়ে কথা তো হয়ে গিয়েছে আমাদের। কয়েকদিন পর তো যাবো বলেছি।

” আপনি আরহামকে নিয়ে স্কুলেই অপেক্ষা করুন। আমি আসছি। জরুরী কথা আছে।

কল কেটে দেয় প্রহর। প্রিয়তার চিন্তা হয়। কি হলো আবার? সকালেই তো ঠিক হলো সিলেটে ফিরবে কিছুদিন পর। এখন হঠাৎ ছেলেটা মত বদলে ফেলল কেন? আরহাম ক্লাস থেকে বেরিয়ে বোনের সম্মুখে এসে দাঁড়াল। মাঠে ঝালমুড়ি ওয়ালা বসেছে। আরহাম ঝালমুড়ি খাওয়ার বায়না ধরল। দশ টাকার ঝালমুড়ি নিয়ে বেঞ্চে বসে রইল আরহাম আর প্রিয়তা। কয়েকমিনিট বাদে স্কুলে উপস্থিত হলো প্রহর। ছেলেটাকে এলোমেলো লাগছে। প্রিয়তা বসে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞেস করে,
” এখানে এলেন কেন আবার?

প্রহর বসে আরহামের পাশে। কোলে নেয় আরহামকে। চুমু খায় ছেলেটার ললাটে। প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলে,

” আপনাকে আজ সিলেটে ফিরতে হবে প্রিয়তা।

” কেন?

” আপনার আব্বু সম্ভবত স্ট্রোক করেছেন।

হতভম্ব হয়ে তাকায় প্রিয়তা। বুকের পাশটায় চিনচিন ব্যথা অনুভব করে। অক্ষিযুগল মোলায়েম হয় প্রিয়তার। পুরোনো স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে মানসপটে। আরহামের দিকে তাকায় সে। চোয়াল শক্ত হয় তার। জিজ্ঞেস করে,

” আপনি কি করে জানলেন?

” আপনার সৎ মা আমাকে কল করেছিল।

” উনি? আপনাকে কিভাবে কল করল?

” সেসব পরে জানবেন। আগে যেতে হবে আমাদের।

” আমি যাবো না কোথাও ।

প্রহর প্রিয়তাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তিনজন হাঁটতে থাকে একসাথে। প্রিয়তার হৃদয়ে ঝড় উঠে। আব্বুর জন্য পরান পুড়ে প্রিয়তার। আরিফ যতই প্রিয়তাকে তাড়িয়ে দিক, প্রিয়তা তো ভালোবাসে তার আব্বুকে। অভিমান-অভিযোগ যতই থাকুক, বাবার অসুস্থতা মানতে কষ্ট হয় প্রিয়তার। শক্তপোক্ত খোলস বেরিয়ে আসতে চায় সে। টলমল করে ওঠে চোখ। বেহায়া মন ছুটে যেতে চায় প্রিয় শহরে। প্রহর বুঝতে পারে। হাতে হাত রাখে প্রিয়তার। বলে,

” আপনাকে যেতে হবে প্রিয়তা। এতটা কঠোর আপনি নন। আরহামের অ্যাক্সিডেন্টের সময় উনি এসেছিলেন। অন্তত কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে আপনার ওখানে যাওয়া উচিত। আপনি যে উনাদের ভালোবাসেন প্রিয়তা। না গেলে এখানে বসেই আপনি দুশ্চিন্তা করবেন। আপনার কষ্ট হবে। কাঁদবেন আপনি। আমি সহ্য করতে পারবো না প্রিয়তা।

“হ্যাঁ কষ্ট হবে। কষ্ট হবে আমার। কি করবো? ওখানে ফিরে যাবো? আব্বুকে অসুস্থ অবস্থায় দেখলে আমি ভেঙে পরবো। নরম হবো। আমি চাই না এটা প্রহর। চাই না।

” আপনাকে যেতেই হবে প্রিয়তা। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো। কথা দিচ্ছি প্রিয়তা, আপনাকে সামলে নিবো আমি। টালমাটাল হতে দিবো না, এত সহজে নরম হতে দিবো না। এত এত অপমানের জবাব আপনি দিবেন। আর কষ্ট পেতে দিবো না আপনাকে।

প্রিয়তা আরহামের দিকে তাকায়। ছেলেটাকে বেশ শান্ত লাগছে। প্রিয়তা আর প্রহরের সব কথাই শুনেছে সে। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে আরহাম পিটপিট করে করে তাকায় প্রিয়তার পানে। প্রহর কোলে নেয় ছেলেটাকে। আদুরে স্বরে বলে,

” তুমি তোমার আব্বুর কাছে যাবে না আরহাম?

আরহাম বারংবার মাথা নাড়ে। জড়িয়ে ধরে প্রহরের কাঁধ। আকুল কণ্ঠে বলে,

” আমি যাবো। আব্বুকে দেখবো।

____

দুপুর দুটো বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। থানার ডেস্কে বসে আছে ইহান আর তানিয়া। তাদের বিয়ের খবরটা কেউ জানে না। জানলে অনেকজন অনেক কথাই তুলবে। সে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার মতো মনোবল তানিয়ার নেই। তাই কাউকে এ বিষয়ে জানাতে না করেছে সে। ইহান বসে আছে তারই সম্মুখে। তানিয়া আড়চোখে তাকায় ইহানের পানে। টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বলে,

” ছুটি দিন না।

ইহান রাগী দৃষ্টিতে তাকায়। অনেকক্ষণ করে এক কথা বলে চলেছে মেয়েটা। পাত্তা দেয় না সে। ফাইলে মনোনিবেশ করে। খুঁতখুঁত করে তানিয়া। করুণ চোখে পুনরায় তাকায় ইহানের দিকে। ইহান বিরক্ত হয়। তেজী কণ্ঠে বলে,

” দু-দিন ছুটি নিয়েছো। আজ আবার কিসের ছুটি?

” ঘন্টাখানেক পরই চলে আসবো। প্রমিস।

” উঁহু। এখানেই থাকবে তুমি। আমি একটা কাজে বাইরে যাবো। থানায় যখন তখন উপর মহলের লোক আসবে। দুজনকেই না পেলে ঝামেলা হবে।

” কিন্তু আমি তো কথা দিয়েছিলাম উনাকে।

” সব কথা রাখতে নেই। আমার স্ত্রী তুমি। আমার কথা শুনবে নাকি বাইরের ছেলেটার কথা?

তানিয়া চুপসে যায়। অভিমান হয় খানিক। ঘাড় ঘুরিয়ে বসে থাকে। কথা বলে না আর। ইহান বেরিয়ে যায় থানা থেকে। থানা থেকে আধঘন্টা গেলেই পুরোনো একটা কফিশপ। এখানেই আবিরকে থাকতে বলেছে তানিয়া। ইহান তানিয়াকে আসতে দেয়নি। তানিয়াকে না জানিয়ে নিজেই এসেছে। ঘড়ির কাটায় সই দুটো বেজেছে। ইহান থাই গ্লাস টেনে শপের ভিতরে ঢুকে। আবির দেখতে পায় ইহানকে। দু মিনিট আগেই এখানে এসেছে সে। তানিয়ার অপেক্ষায় আছে। ইহানকে ঢুকতে দেখে ঘাবড়ায় আবির। ইহান ছেলেটাকে তার মারাত্মক সুন্দর লাগে। ইহানের পরনে নেভি ব্লু রঙের পুলিশ ইউনিফর্ম। নেমপ্লেইটে মাঝারি অক্ষরে লেখা “Ehan Talukder”। ছেলেটার চাহনি গম্ভীর। পকেটে গুঁজে রেখেছে রিভলবার। শ্যামলাটে মুখশ্রীতে অজানা জাদু আছে বোধহয়। তাই তো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেটার এমন ফটো দেখে ফলোয়ার বেড়েছে প্রচুর। ইহান আবিরের নিকটে আসে। আলতো হাসে ছেলেটা। চেয়ার টেনে বসে। চুলগুলোকে পেছনে ঠেলে দিয়ে বলে,

” কি খবর?

আবির ছোট ছোট চোখ করে তাকায়। এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না সে। উল্টো প্রশ্ন করে,

” তানিয়ার আসার কথা ছিল। আপনি কেন?

‘ তানিয়া আর আমি কি আলাদা? আমরা স্বামী স্ত্রী। দুজন-দুজনের পরিপূরক। তানিয়া আমাকে পাঠিয়েছে।

তীর্যক দৃষ্টি মেলে কথাটুকু বলে ইহান। চোখ দ্বারা ক্রোধ চেপে রাখে। আবিরের ললাটে স্বেদজল জমে। বলে,

” আপনার সাথে আমার কোনো কথা নাই।

” কিন্তু আমার আপনার সাথে কথা আছে। মিস্টার আবির চৌধুরী, আপনি কোন সাহসে আমার স্ত্রীকে মিট করতে বলেন এখানে? কোন সাহসে আমার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ রাখতে চান? আমার স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকালে আমি কি করতে পারি তা আপনার ধারণারও বাইরে। জ্বালিয়ে দিবো সব। শেষ করে দিবো আপনাকে। আপনার কি মনে হয় ইহান তালুকদার তার স্ত্রীকে এত সহজে তার প্রাক্তনের সম্মুখে আসতে দিবে? এত সহজ? আমি আপনাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি, তানিয়ার সাথে কনট্যাক্ট করার চেষ্টাও করবেন না। করলে আমি আপনাকে আইনের জ্বালে ফাঁসিয়ে একদম জেলে ভরে দিবো। প্রয়োজন হলে খুন করবো আপনাকে। আমার স্ত্রীর থেকে দূরে থাকবেন। বুঝেছেন?

ইহান জোরেই কথাগুলো বলে ওঠে। আবির থমকায়। পুলিশের সাথে লড়াই করার মতো দুঃসাহস হয় না তার। ইহানের এই থানায় বেশ নামডাক আছে। সততার সাথে জনগণকে সেবা দেয় ওরা। ইহানের সাথে তর্কে জড়ানো মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। কথা বলে না আবির। রাগে প্রচন্ড। ক্রোধ টুকু চেপে রেখে হনহন করে বেরিয়ে যায়।

চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ

[ মাঝারি আকারের মন্তব্য চাইইইই ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here