পাশে থেকো প্রিয় পর্ব ১

0
680

তা বউমা রোজা তো এসে পরেছে, তোমার বাপের বাড়ি থেকে তো এখনো রোজার বাজার সদাই করে পাঠালো না। নাকি মেয়ে বিয়ে দিয়ে তোমার বাপ সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছে?

ভুলে গেছে মেয়ের বাড়িতে যে রোজার জন্য বাজার সদাই পাঠাতে হয়? আমাদের কে কি ছোট লোক ভেবেছে? যে উনার কাছ থেকে এই সামান্য জিনিস গুলো চেয়ে নিতে হবে? মেয়েকে আমাদের ঘা*ড়ে চাপিয়ে সকল দায়িত্ব থেকে উনি রেহাই পেয়ে গেছেন এটাই ভাবছে নাকি?

পাশের বাসার করিম ও তো আমার ছেলের আরো কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছে। ওর বউয়ের বাপ কে তো কিছু বলে দিতে হয় না। সব কিছু আগে আগে পাঠিয়ে দেয়। এইতো কাল বিকেলে করিমের মা আমাকে নিয়ে তার ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে পাঠানো সকল জিনিস পত্র দেখালো। সব কিছু ভর্তি ভর্তি করে পাঠিয়েছে।বিয়ের কয়েকবছর হয়ে গেছে এখনো মেয়েকে কোনো কিছু কম দেয় না।

করিমের মা যখন সবকিছু দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো আমার ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে রোজার বাজার সদাই কি কি পাঠিয়েছে আমি কিছু বলতে পারলাম না।

এক বছর দিয়ে তোমার বাপ কি ভাবছে আর দিতে হবে না? গত বছর শুধু বুট, মুড়ি আর খেজুর পাঠিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করেছিলো।

কি কম দামি খেজুর পাঠিয়েছিলো।মুখে দেওয়ার মতো ছিলো না, একটার সাথে একটা লেগে গিয়েছিলো। এবার যেনো ভুলেও এমন খেজুর না পাঠায়।

আর হ্যা বলে দিও এবার বুট,মুড়ি আর খেজুরে হবে না। তেল ডাল চিনি থেকে যেনো সব পাঠায়।

আবার আমরা চেয়ে নিচ্ছি বলতে যেও না। বলবা তুমি নিজে বলছো দেওয়ার জন্য।

আমার এতো আদরের ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি আমাদের ও তো ইচ্ছে করে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে জিনিস পত্র দিবে সেটা দেখে চোখ জোড়ানোর।

বিয়ের সময় তো তোমার বাপ বেঁচে গেলো তেমন কিছুই দিতে হয়নি।এবার অন্তত বলো বাপের পকেটে একটু ঝাড়া দিতে।

কথাগুলো বলে মিসেস খেয়া আমিরার দিকে তাকায়। একনাগাড়ে কথা গুলো বলে প্রায় হাঁপিয়ে গেছে মিসেস খেয়া।

আমিরা তার একমাত্র ছেলের বউ। যে কিনা শ্বাশুড়ির কথাগুলো এতো সময় ধরে একমনে মাথা নিচু করে শুনে গেছে আর মেঝেতে পায়ের নখ দিয়ে খুঁটে গেছে। চোখ তার ছলছল করছে। কিন্তু এখন কিছুতেই কাঁদা যাবে না। কাঁদলে শাশুড়ী মা আরো কথা শুনাবে।
“কি বললাম তোমার কানে ঢুকেছে,?”

আমিরা মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। তার কানে ঢুকেছে।

এবার যাও আমার জন্য পানি নিয়ে আসো গলা টা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখনই কি গরম পরেছে। ফ্রিজ থেকে পানি নিয়ে আর জগ থেকে পানি নিয়ে মিশিয়ে নিয়ে আসো।বেশি ঠান্ডা পানি খেতে পারবো না। গলা বসে যাবে আবার।

আমিরা মাথা নাড়িয়ে শ্বাশুড়ির জন্য তারাতাড়ি পানি আনতে যায়।

যাওয়ার সময় শ্বাশুড়ির আরো কিছু কথা কানে এসে লাগে।

ফ্রিজ টা ও পুরোনো হয়ে গেছে। বরফ জমে না বেশি।আর কতো চলবে? মানুষের ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে কতো কিছু পায়।এসব কি চেয়ে নিতে হয়? মেয়ে বিয়ে দিলে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি তে কি কি দরকার বা প্রয়োজন সব কিছুর খেয়ালই রাখতে হয়।

আমিরা রান্না ঘরে এসে আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়। আরো অনেক কথাই বলে যাবে আজ শ্বাশুড়ি। অন্য র বাড়ির রোজার বাজার সদাই দেখে এসেছে বলে কথা।

আমিরা চুপচাপ শুনা ছাড়া কিছু বলতে পারলো না। তার বাবার জন্য খুব খারাপ লাগছে।

শ্বাশুড়ি মা তো তার বাবার বাড়ির কথা জানে। তার বাবা গরিব মানুষ দিন আনে দিন খায়।টানা পো’ড়নের সংসার তাদের। বাবা বেশির ভাগ সময় অসুস্থ ই থাকে। একটা বিবাহ উপযুক্ত বোন ও রয়েছে।

তার বিয়েই কতো কষ্ট ধার দেনা করে দিতে হয়েছে।সেই ধার দেনা তার বাবা এখনো পরিশোধ করতে পারে নি।

যার নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার কাছে রোজার বাজার সদাই কি করে চাইবে সে? শ্বাশুড়ি কে সে মুখ ফোটে বলতে পারলো না কিছু। নয়তো আরো অশান্তি করবে।

আমিরা যদি এখন তার বাবার কাছে এসব বাজার সদাই চায় তার বাবার মাথায় এখন বা*জ পরবে। এসব কিছু চাইলে বাবার মুখটা কেমন দেখাবে সেটা ভেবেই আমিরার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে।

বাবার অসহায়ত্ব মাখা মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

এর মধ্যে শ্বাশুড়ির ডাক শুনতে পায় আমিরা।

“এক গ্লাস পানি এনে দিতে এতো সময় লাগে? তুমি তো দেখছি মানুষ কে মে’রে ফেলবে মেয়ে। বাপের বাড়ি থেকে কাজ শিখে আসো নি,? সংসার তো করছো কম দিন হচ্ছে না। এখনো কিছু শিখোনি?

শিখবা কেন? ” কম পানির মাছ বেশি পানিতে পড়লে যা হয় আরকি।” পায়ের উপর পা তুলে শরীর বাঁচিয়ে খাওয়ার ধান্ধা সব।

আমিরা চোখের পানি মুছে তারাতাড়ি তার শ্বাশুড়ির জন্য পানি নিয়ে আসে।

পানি খেয়ে মিসেস খেয়া আমিরার দিকে তাকায়। তারপর বলে,,যা বললাম সব মনে আছে তো?

হু-,হুম আম্মা।

ভালো মনে করে বলে দিও। করিমের মা কে যেনো ডেকে এনে দেখাতে পারি তার ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে বেশি বাজার আমার ছেলের শ্বশুর পাঠিয়েছে।

কথা গুলো বলে মিসেস খেয়া আরো কি কি যেনো বিরবির করতে করতে নিজের রুমে চলে যায়।

আমিরা শ্বাশুড়ির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পরে। তার মাথা কাজ করছে না কিছুতেই।চোখে সব অন্ধকার দেখছে সে।তাকে আলো দেখাবে কে?

এর মধ্যে কলিং বেল বেজে উঠে। আমিরা তার ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। মাথা থেকে আঁচল টা পরে গেছে। তারাতাড়ি মাথায় আঁচল টা টেনে নেয়।

একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে।

দরজার অপর পাশের মানুষ টা কে দেখে আমিরার কোনো ভাবান্তর ঘটলনা। হাত থেকে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে এসে পরে।

মুখে নেই কোনো হাসি। অফিস থেকে ফিরে আসা স্বামী কে দেখে নেই কোনো উচ্ছাস।

আমিরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তার স্বামী দেলোয়ার ব্রু কোচকে তাকিয়ে রয়। মূলত মেয়েটার ভাব ভঙ্গি বা কি হয়েছে সেটা বোঝার চেষ্টা মাত্র। কিন্তু আমিরা ব্যাগটা নিয়ে নিজেই রুমে চলে যায়।

দেলোয়ার খুব ক্লান্ত। রোজার মাস আসছে কাজের চাপটা এখন অনেক বেশি। রোজায় যেহেতু কাজের আওয়ার কমিয়ে দিবে তাই এখন সকলের উপর দিয়ে দ্বিগুণ খাটুনি টা যাচ্ছে।

ক্লান্তি তে হাত পা যেনো চলছে না তার।সোফায় ধপ করে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে এক প্রকার শুয়ে পরে।

আমিরা ব্যাগটা রুমে রেখে এসে রান্না ঘরে ছুটে যায়।গিয়ে তারাতাড়ি এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে নেয় ঝটপট।

তারপর আবার বসার ঘরে ফিরে এসে দেখে দেলোয়ার কিভাবে শুয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে শরবত টা এগিয়ে দিয়ে বলে শরবত এনেছি।খেয়ে নিন ভালো লাগবে।

আমিরার কথায় দেলোয়ার ভালো হয়ে বসে।হাত বাড়িয়ে শরবত টা নিয়ে নেয়।তারপর এক ঢুকে পুরো গ্লাস ফাকা করে দেয়।

আমিরা জিজ্ঞেস করে,, পানি লাগবে?

নাহ্। তোমার কি হয়েছে মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? মা কিছু বলেছে? বা কিছু নিয়ে কথা শুনিয়েছে তোমায়?

আমিরা তার স্বামীর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকায়।

দেলোয়ার আবার জানতে চায় মা কে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। মা কোথায়?

ঘরে আছে।

ওহ আচ্ছা।

এবার বলোতো তোমার কি হয়েছে?

কি হবে কিছুই হয়নি।রোজা চলে আসতেছে।রোজার বাজার সদাই লাগবে।আমার বাবা কে তো বলতে হবে মেয়ের বাড়িতে বাজার পাঠানোর কথা।

এই নিয়ে বুঝি মন খারাপ? কিভাবে বলবে বুঝতে পারছো না তাই তো?

আমিরা কিছু বলবে তার আগেই আবার দেলোয়ার বলে,,এটা নিয়ে এতো ভাবার কি আছে? সোজা বলে দিবে বাবা আপনার মেয়ের শ্বশুর বাড়ি তে অভাব লেগেছে। তাই তারা রোজার বাজার করতে পারছে না। আপনাকেই করে পাঠাতে হবে।
কথাগুলো বলে দেলোয়ার হাসতে হাসতে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।

আমিরা অবাক হয়ে দেলোয়ারের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কি বলে গেলো লোকটা?

#চলবে,,,,,,,
#পাশে_থেকো_প্রিয়
#সূচনা_পর্ব
#Jhorna_Islam

প্রথম পর্ব পরে সবার হয়তো মনে হচ্ছে মেয়েদের নিচু করে অ’ত্যা’চা’রিত বানিয়েই শুধু গল্প লিখা হয়। এমন কিন্তু চোখের সামনে অহরহ ঘটে চলেছে। আমি শুধু তার কিছু টা ধরে তোলার চেষ্টা করছি।আশা করি পাশে থাকবেন। পুরো গল্প টা পরলেই বুঝতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here