পরাণ দিয়ে ছুঁই (২য় পরিচ্ছেদ) পর্বঃ২৬

0
201

#পরাণ_দিয়ে_ছুঁই (২য় পরিচ্ছেদ)
#পর্বঃ২৬
#Jhorna_Islam

সারাদিনের ক্লান্তিতে শোয়ার সাথে সাথে দুই চোখের পাতায় আপনা আপনি ঘুম নেমে আসে নূরের।এতোসময় সৌন্দর্যের পাশে শুয়ে অস্বস্তি হলেও চোখের পাতায় ঘুম ভর করার সাথে সাথে যেনো সকল জড়তা কর্পুরের মতো উড়ে গেছে। চোখে ঘুম ধরা দিলে আর কোনো কিছু মাথায় কাজ করে না। কিছু ভাবার ও সময় পায়নি নূর।ফাতিহাকে জড়িয়ে ধরে শোয়ার সাথে সাথে দুই চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসে,মুহূর্তের মাঝে ঘুমিয়ে ও যায়।ফাতিহার ও একই অবস্থা ঘুমিয়ে গেছে।

দুই মা মেয়ে গলা জরিয়ে আরামছে ঘুম দিয়েছে। দিন দুনিয়ার কোনো খবর নাই। এইদিকে ওদের পাশেই যে একজন মনে মনে ছটফট করছে সেই দিকে কারো খেয়াল নেই। সৌন্দর্য কিছুতেই দুই চোখের পাতা এক করতে পারছে না। ঘুম ধরা দিচ্ছে না চোখে। এতক্ষন নূরের অস্বস্তি নিয়ে মজা করলেও এখন নিজেই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পরে গেছে। কিছু সময় এপাশ ওপাশ করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নূর আর ফাতিহার দিকে তাকিয়ে বারান্দায় চলে যায়। সৌন্দর্য ভেবেছিল গত রাতের মতো এইবার ও বারান্দায় ই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিবে কিন্তু এখানে ঘুমের মতো পরিস্থিতি পেলো না। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে হুট করে। বৃষ্টির পানি বারান্দায় ও এসে পরছে।বাতাসের সাথে বৃষ্টি বিষয় টা সৌন্দর্যের কাছে ভালোই লাগছে। শীতল পরিবেশ উপভোগ করতে করতে হুট করেই মনে হলো এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না আর সাথে যদি প্রিয় একজন থাকে তাহলেতো কথাই নেই। প্রিয়জন, সাথে ধোয়া উঠা গরম চা আর বাইরের বৃষ্টির রাত।প্রিয়জন ভাবতেই সৌন্দর্যের মনে হলো নূর।নূরের দিকে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকায় সৌন্দর্য। দুইজন কি সুন্দর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।

অনেকটা সময় সৌন্দর্য রাতের বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতি বিলাস করে। খুব উপভোগ করছিল বিষয় টা কিন্তু ধীরে ধীরে যেনো বৃষ্টির গতি কমার বদলে বাড়তে থাকে। বৃষ্টির পানিতে সৌন্দর্য ও ভিজে যাচ্ছে তারউপর ঠান্ডা বাতাস এসে শরীরে যেমন কাপন ধরিয়ে দিচ্ছে। সৌন্দর্যের শরীরে এখন শুধু নরমাল একটা টি-শার্ট। এরকম ভাবে ভিজতে থাকলে জ্বর আসবে নিশ্চিত। তাই তারাতাড়ি বারান্দা থেকে রুমে এসে পরে। এবার সৌন্দর্যের ও ঘুম পেয়েছে। ভেবেছিলো ফাতিহার এই পাশে ঘুমাবে কিন্তু উপায় নেই একটুও জায়গা নেই এই পাশে। ওদের এতো সুন্দর ঘুমে ব্যাঘাত ও ঘটাতে চায়নি সৌন্দর্য তাই গিয়ে নূরের পাশেই শুয়ে পরে।

সৌন্দর্য শোয়ার মিনিট দুয়েক পরই নূর ঘুরে সৌন্দর্য কে ঝাপটে ধরে বুকে মুখ লুকায় আর ঘুমু ঘুমু কন্ঠে বলে,,,এতোক্ষন কোথায় ছিলে? আমার শীত করছিল তো। আরো কি কি যেনো বলে ঘুমিয়ে যায় নূর।

সৌন্দর্য নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,, “তুমি তো শীত নিবারনের জন্য আমার বুকে মুখ লুকালে পরাণ, কিন্তু আমার ভিতরে যে তৃষ্ণা জেগেছে। মনে হচ্ছে ভিতর টা মরুভূমি হয়ে গেছে পরাণ।”

পিকনিক থেকে আসার তিনদিন হয়ে গেলো।এইদিকে ভার্সিটিতে যাওয়া অনেক দিন মিস দিয়েছে। এবার ঠিক মতো না গেলে পিছিয়ে যাবে। তাই নূর ঠিক করে নেয় আজ ভার্সিটিতে যাবে। ইসরাতের সাথেও কয়েকদিন ধরে যোগাযোগ হচ্ছে না। কি এমন কাজ নিয়ে বিজি কে জানে যে ফোন তুলে কথা বলারও সময় পাচ্ছে না মেয়ে টা। আজ শুধু দেখা হোক সামনা-সামনি ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাবে বেয়াদবটা কে। আজ ভার্সিটিতে যাবে বলার জন্য কল দিয়েও পায় না ফোন সুইচ অফ বলছে বারবার। নূর তাই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেরিয়ে পরে। ইসরাত কে তার বাড়ি থেকে একেবারে নিয়ে তারপর ভার্সিটিতে যাবে। ইসরাতদের বাসায় আসতেই ইসরাতের মা দরজা খুলে দেয়।নূর কে খুব পছন্দ করেন তিনি। নূর সালাম দিতেই হাসি মুখে বলে,,তুমি ইসরাতের রুমে যাও মা আমি তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসছি।

— না না আন্টি কিছু আনতে হবে না। আমি এখন কিছু খাবো না। আমার পেট ফুল আছে মা জোর করে খাইয়ে দিয়েছে। তুমি বরং ইসরাতের খাবার দাও তারাতাড়ি ভার্সিটিতে যেতে নয়তো লেট হয়ে যাবে।

— কিন্তু কিছু একটা তো খাও মা।

— এখন কিছু খাবো না আন্টি প্লিজ প্লিজ।

— হাহ্ আচ্ছা ঠিক আছে। পরের বার আসার আগে কখনো খেয়ে আসবে না ঠিক আছে?

— নূর মুচকি হেসে বলে,, আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর ইসরাতের রুমে ঢুকে। মেয়েটা নাকে মুখে কাঁথা দিয়ে শুয়ে আছে। ইশশশ কি আরামের ঘুম, দাড়া তোর ঘুমের আমি বারোটা বাজাচ্ছি বলেই নূর এক টানে ইসরাতের উপর থেকে পুরো কাঁথা সরিয়ে ফেলে। হুট করে এরকম হওয়ায় ইসরাত ধরফর করে উঠে বসে। কাল ও সারারাত ঘুমাতে পারে নি ইসরাত।শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছে সারারাত চোখের পানি ঝড়িয়ে। বিরক্ত মুখে কিছু বলতে নিবে কিন্তু নূরকে দেখে কিছু সময় থম মেরে বসে থাকে।তারপর চোখ ডলতে ডলতে বলে,,, দোস্ত তুই এখানে? তারপর বল কেমন আছিস? আর তোদের ট্যুরই বা কেমন কাটলোরে?

এসব কথা আগে রাখ বল তোর কি হয়েছে? ফোন ধরিস না কোনো খবর নাই। এই কয়েকদিনে চোখ মুখের কি অবস্থা করেছিস তুই ইসু? আর এরকম করে শুকাচ্ছিস যে ডায়েট করছিস নাকি? সন্দিহান গলায় বলে নূর।

ইসরাত জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলে,,আমার কথা রাখ তোদের কথা বল।বাড়ির সবাই ভালো আছে?

— হ্যা সবাই ভালোই আছে।

— ওহ ভালো আর তূর, তূর কেমন আছেরে?

— ইসু সবার মধ্যে তূর ও পরে। আর তূর ও ভালো আছে।

— হুম ভালো থাকারই কথা। তুই বস আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি বলেই ইসরাত তারাতাড়ি ওয়াশরুমের ভিতর ঢুকে।
নূর বলে তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নে ভার্সিটিতে লেট হয়ে যাবে নয়তো। নূর বুঝলো কিছু একটা হয়েছে ইসরাতের। মুখ দেখেই বোঝা যায়। এখানে কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না তাই বাইরে গিয়ে সব জেনে নিবে ঠিক করে নেয়।
*************

সৌন্দর্যের আজ ভার্সিটিতে আসার একটুও ইচ্ছে ছিলো না একটা ইম্পরটেমেন্ট ক্লাস থাকায় আসতে হলো।সেই সকাল থেকে মাথা ব্যাথা করছে।মনে হচ্ছে মাথার ভিতরের সব আউলিয়ে যাচ্ছে। মাথা ব্যাথার সাথে ঘাড়ের র’গ গুলো ও যেনো দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। চোখ যেনো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। এখন মনে হচ্ছে আজ আসাটা উচিৎ হয়নি। যদিও বা ক্লাস টা গুরুত্বপূর্ণ তবুও কাল নিলেই পারতো। এটলিস্ট এতোটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। কিছু সময় টেবিলে মাথা হেলিয়ে বসে থাকে সৌন্দর্য। এরমধ্যে ক্লাসের টাইম ও হয়ে যায়। ক্লাসে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়।

এইদিকে ইসরাত আর নূর ভার্সিটিতে এসে পৌঁছায়। নূর অবশ্য জেনে নিয়েছে আজ তাদের প্রথম ক্লাস টা হবে না। এই সময়টুকু তে ইসরাতের কি হয়েছে তা জেনে নেওয়া যাবে আর ঐ কথাগুলো ও বলা হয়ে যাবে।

একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে দুইজনই বসে। নূর কিছু বলার আগে ইসরাতই বলে তারপর বল সিলেট গিয়ে কি কি হলো?

নূর ভেবেছিলো প্রথমে ইসরাতের বিষয় টা জিজ্ঞেস করবে কিন্তু ইসরাত এটা জানতে চাওয়ায় আগে ঐ বিষয় টা ই বলে। ফাতিহার সম্পর্কে সবকিছু বলে জানতে চায় বলতো এটা আমার থেকে লোকানোর মানে কি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

ইসরাত একটু ভাবুক হয়ে বলে,তোর কেন মনে হচ্ছে তোর থেকে লুকানো হয়েছে? এমনও হতে পারে সৌন্দর্য স্যারদের দিক থেকে হয়তো ভাবা হয়েছে তুই বিষয় টা জানিস। আর তোর বাবা ও হয়তো ভাবেনি যে তুই ভেবে নিবি একটা বিবাহিত ছেলের সাথে তোর বিয়ে ঠিক করেছেন তিনি।

নূর ইসরাতের কথায় যুক্তি খুঁজে পেলো।মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলে,,হতেই পারে। এসব কথা বাদ দিয়ে এবার বল তোর এই অবস্থা কেন?

ইসরাত চোখ ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে বলে,, আমার এই অবস্থা কি অবস্থা? আমাকে নিয়ে পরলি কেন বলতো?

কি লুকাচ্ছিস ইসু তুই আমার থেকে?

— ক-কই কি লুকাচ্ছি ইসু? তোর মাথা টা গেছে আমি কি লুকাবো?

— তুই কি আমার হাতে মা’র খেতে চাস ইসু?

হ্যা নূর কয়টা লাগিয়ে দাও।মা’রের দরকার আছে, লাগাও কয়টা।

নূর আর ইসরাত দুইজনই পিছনে তাকিয়ে দেখে তালহা পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তালহা স্যার কে দেখে নূর তারাতাড়ি বসা থেকে উঠে পরে।ইসরাত এখনও বসে আছে। নূর চোখের ইশারায় ইসরাত কে উঠতে বলে,,স্যার এসেছে এখনও বসে থাকাটা কেমন দেখায়। কিন্তু ইসরাত উঠে না একি ভাবে বসে থাকে। নূর তালহা স্যারের দিকে তাকিয়ে বলে,, স্যার ইয়ে মানে আসলে।

কি অবস্থা নূর কেমন আছো? সব ঠিক ঠাক?(তালহা)

— এইতো স্যার ভালো আছি আপনি কেমন আছেন? আপনি কি অসুস্থ? না মানে দেখে মনে হচ্ছে।

–ঐ আর কি একটু জ্বর এসেছিলো। (তালহা) জ্বরের কথা শুনে তালহার দিকে ইসরাত তাকায়। তালহা তখন ইসরাতের দিকেই তাকিয়ে ছিলো দুইজনেরই চোখাচোখি হয়ে যায়। তালহা ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলে,,নূর ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড আমি কি ওর সাথে একটু কথা বলতে পারি?

— এমা ছিঃ ছিঃ স্যার আপনারা কথা বলুন আমি কিছু মনে করবো না। আমি বরং ক্লাসে যাই।ইসু কথা শেষ হলে চলে আসিস বলেই এখান থেকে কেটে পরে নূর।বুঝতে পারে দুইজনের মাঝে কিছু একটা হয়েছে। ওদের ব্যাপারটা না হয় ওরাই মিটিয়ে নিক। এসব ভাবতে ভাবতে নূরের সৌন্দর্যের কথা মাথায় আসে।দুই দিন ধরে লোকটার কোনো খবর নেই না কল না অন্য কিছু। এখন যেহেতু দ্বিতীয় ক্লাস শুরু হতে অনেক সময় আছে তাই ভেবে নেয় সৌন্দর্য কে এক ঝলক দেখে আসা যাক। লোকটার মুখ দেখার জন্য চোখ দুটি বড্ড তৃষ্ণার্ত।

সৌন্দর্যের ক্যাবিনের সামনে গিয়ে উঁকি জুঁকি দিতে থাকে নূর। দরজাটা সামান্য ভিরানো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে কি করা যায়। ভাবতে ভাবতে উল্টো দিক থেকে ফিরতে গিয়ে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে যেতে নেয়। মুখ দিয়ে আপনা আপনি চিল্লানি বের হয়ে যায় ওমা বলে।

সৌন্দর্য ফুল ক্লাস না করেই এসে পরেছে। বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হবে চিল্লানি শুনে বাইরে বের হয়ে দেখে নাহিদ স্যার নূরকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
পায়ের শব্দে নূরের হুঁশ আসে। তারাতাড়ি নাহিদ স্যারের থেকে নিজেকে ছারিয়ে নিয়ে সৌন্দর্যের দিকে তাকায়।

সৌন্দর্য নূরের দিকেই তাকিয়ে আছে। নূর সৌন্দর্যের মুখ দেখে ভয় পেয়ে যায়। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, চুলগুলো সব সময়ের মতো নেই অগোছালো। নূর কিছু বলতে নিবে তার আগেই সৌন্দর্য হাঁটা ধরে। পিছন থেকে নূর ডাকে কোনো সারা দেয় না। সৌন্দর্যের পিছন পিছন আসতে আসতে গাড়ির কাছে চলে আসে। তাও কিছু বলে না সৌন্দর্য। নূর কে অবাক করে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। নূর সৌন্দর্যের যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বুকে কেন যেনো সূক্ষ ব্যথা অনুভব করছে। লোকটা কি তাকে ভুল বুঝলো?

#চলবে,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here