পরাণ দিয়ে ছুঁই (২য় পরিচ্ছেদ) পর্বঃ২২

0
170

#পরাণ_দিয়ে_ছুঁই (২য় পরিচ্ছেদ)
#পর্বঃ২২
#Jhorna_Islam

রাতের আধারিতে গাড়ি ছুটে চলেছে তাদের গন্তব্যে। সিলেট যাচ্ছে তারা।রাত যতো বাড়ছে চারদিক টা ততো শুনশান নিরবতা ছেয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি চলাচল কমে আসছে।বাইরে চাঁদের আলোয় রাস্তার ধারের বাড়ি,গাছপালা সব দেখা যাচ্ছে। গাড়ির ভিতর সব আলো বর্তমানে অফ আছে। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে আলো আসছে জানালার কাচ ভেদ করে। এই আলো আধারীর খেলাটা খুব ভালো লাগছে নূরের। জীবনে প্রথম তার এতো রাতে বাইরে এভাবে বের হওয়া। অবশ্য নিজের কলেজের পিকনিক অন্য রকম ছিলো আর এটা ও অন্য রকম দুইটার দুই রকম অনুভূতি। ফাতিহা সেই কখন ঘুমিয়ে গেছে। আজ দিনের বেলা এক্সাইটমেন্টে একটুও ঘুমোয়নি মেয়ে টা। কি কি করবে সব কিছু ঠিক করে রেখেছে। এতোটাই আনন্দিত ছিলো যে নিজের ব্যাগ নিজে ঘুছিয়েছে। গাড়ির ভিতর একটু কথা বলার পরই নূরের দিকে তাকিয়ে বলে,,, মাম্মা আমার খুব ঘুম পেয়েছে, তোমার কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাই?

নূর কোনো উত্তর না দিয়ে নিবিড় ভাবে নিজের সাথে ভালো করে আগলে নেয় যেনো আরামসে ঘুমোতে পারে। সৌন্দর্য দুইজনের কান্ড দেখলেও কিছু বলে না চুপচাপ গাড়ি চালাতে থাকে। নূরের খুব ইচ্ছে হলো বাইরের হাওয়া গায়ে মাখাতে এই এসির হাওয়া আর ভালো লাগছে না তার। কিন্তু সৌন্দর্য কে বলতেও দ্বিধা কাজ করছে।হাসফাস করতে থাকে সৌন্দর্য হয়তো নূরের বিষয় টা লাইটের আবছা আলোয় কিছু টা টের পেয়েছে। দক্ষ হাতে গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলে,,, এনি প্রবলেম নূর? ইউ নিড সামথিং ওর ওয়াশরুমে যাওয়া লাগবে কি?

নূর সৌন্দর্যের কথায় লজ্জায় মিইয়ে যায়। লোকটা কি অকপটে জানতে চাইছে ওয়াশরুমে যাওয়া লাগবে কি না।

— উহুু।

— তাহলে অন্য কোনো সমস্যা?

— আসলে গাড়ির জানালা একটু খুলে দিবেন?

— বাইরে তো ধুলোবালি। নূর সৌন্দর্যের কথায় চুপ হয়ে যায়। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলেও কিছু বলে না। কিন্তু হুট করে দমকা হাওয়া এসে শরীরে লাগতেই চোখ ঘুরিয়ে দেখে জানালার কাচ খোলা। নূরের চোখ জোড়া খুশিতে জ্বল জ্বল হয়ে উঠে, বিষয় টা সৌন্দর্য আড় চোখে তাকিয়ে লক্ষ করে। বাইরের বাতাস টা নূরের এতো ভালো লাগছে যা বলার বাইরে। এতোসময় ঘুমে না ধরলেও এখন বাতাসের তোড়ে চোখ যেমন আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।অনেক চেষ্টা করেও নূর তার চোখ খোলা রাখতে পারলো না একসময় নিজেও ফাতিহার মতো ঘুমিয়ে পরে। শেষ রাতে বাইরের বাতাস শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নূর ফাতিহা শীতে দুইজনই জরোসরো হয়ে ঘুমিয়ে আছে।মাঝে মাঝে কেঁপে ও উঠছে।শরীর যেনো হীম হয়ে গেছে। নূর ঘুমে চোখ খুলতে পারছে না। শীতের তুপে কপাল কোচকে বলে,,,উফফ তূর ফ্যান টা অফ করে দে না শীত লাগছে আর একটা কাঁথা দে আমায়। নূরের কথা শুনে সৌন্দর্য হেসে ফেলে। গাড়িটা এক রাস্তার এক সাইডে রেখে পিছন থেকে নিজের ব্যাগ নেয়। ফাতিহার শীত লাগতে পারে ভেবে একটা শাল নিয়ে নিয়েছিলো সেটা বের করে। নূরের আর ফাতিহার শরীরের উপর সুন্দর করে দিয়ে দিতে দিতে বলে,,মেয়ের জন্য নিয়েছিলাম এখন মা মেয়ের দুইজনেরই কাজে লাগছে। তারপর জানালার কাচ বন্ধ করে দিয়ে আবার গাড়ি চালায় প্রায় ওরা এসে পরেছে বেশি সময় আর লাগবে না।

****************
ইসরাত ঘুমিয়ে ছিলো হুট করেই বিকট শব্দে তার ঘুম ভাঙানোর জন্য ফোনটা বেজে উঠে। ফোনের রিংটোনে কিছু সময় গাঁইগুঁই করে আবার ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু ফোনটা বড় অবাধ্য সে হয়তো পণ করেছে যতক্ষন পর্যন্ত কল না তোলা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে বেজেই যাবে। ফোনের রিংটোনে ও ইসরাতের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটলো না সে নিশ্চিন্তে পরে পরে ঘুমাচ্ছে। ইসরাতের মা ইতিমধ্যে কয়েকবার ডাক দিয়ে ফেলেছে ঘুম থেকে উঠে ফোন রিসিভ করার জন্য কিন্তু কিসের কি মেয়েটা কানে তার মায়ের কথা পৌঁছেছে কিনা কে জানে।ফোনের আওয়াজে না টিকতে পেরে ইসরাতের মা নিজেই উঠে আসে কাজ ফেলে।বকতে বকতে যেই না ফোন নিতে যাবে অমনি ইসরাত চোখ খুলে তাকিয়ে মায়ের নেওয়ার আগে নিজেই খপ করে ফোন টা হাতে নিয়ে নেয়। ইসরাতের মা তো বেশ অবাক, এতোসময় ধরে ফোন বাজছে ধরার নাম নেই, উনিও কয়বার ডাকলেন কিন্তু উঠলো না আর যেই না তিনি ফোন নিবেন ওমনি উঠে গেলো। মেয়ের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

ইসরাত মায়ের চাহনি দেখে হাসার চেষ্টা করে বলে,,আসলে আমার একটা বান্ধবী শুধু শুধু কল দিয়ে জ্বালাতে চাচ্ছে তাই ধরিনি। তুমি যাও আমি দেখে নিচ্ছি।

মায়ের মুখ দেখে বুঝলো তার কথা মায়ের বিশ্বাস হয়নি।তবুও কিছু না বলে কিছু সময় ইসরাতের দিকে তাকিয়ে চলে যান তিনি।

ইসরাত হাফ ছেড়ে বাঁচে। আড়মোড়া ভেঙে ফোনের দিকে তাকিয়ে নাম্বার দেখে টাস্কি খায়। একি দেখছে সে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। সকাল সকাল খুশিতে মনটা নেচে উঠে। ভাবতেও পারছে না তালহা স্যার নিজে থেকে এতো সকাল সকাল কল দিয়েছে। খুশি মনে তারাতাড়ি করে ফোন রিসিভ করে।

–‘ এতো সময় লাগে ফোন রিসিভ করতে? হ্যালো বা সালাম দেওয়ার বদলে এই কথা শুনে ইসরাত একটু অবাক হয়। বুদ্ধি করে নিজেই সালাম দেয় আগে। সালাম পেয়ে তালহা কিছুটা ভরকায়।থতমত খেয়ে সালামের জবাব দেয়। তারপর কোনো কিছু না বলে,,, আমি একটা এড্রেস সেন্ট করছি আধা ঘণ্টার মধ্যে ঐ জায়গায় এসে দেখা করো আমার সাথে। কথাটুকু বলেই কল কেটে দেয় তালহা।

ইসরাত কিছুই বুঝলো না ফোনের দিকে তাকিয়ে মন বলে উঠলো মনে হয় আজ তোর কপাল খুলতে চলেছে ইসু তালহা স্যারের মতি ফিরেছে। প্রপোজ করবে মনে হচ্ছে বলেই দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে। হাতে সময় বেশি নেই, এইসময়ের মধ্যেই সাজুগুজু করে তৈরি হতে হবে। সাজুগুজু না করলে ছবি সুন্দর আসবে না আর ফেসবুকে আপলোড ও দিতে পারবে না।
ফুরফুরে মনে তৈরি হয়ে বের হয় ইসরাত।একটা পার্কের মতো জায়গায় তাকে ডেকেছে তালহা।প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালোই লাগছে ইসরাতের। নিদিষ্ট জায়গায় হাসি মুখে পৌঁছায়। কিন্তু মুখের হাসি সময়ের সাথে সাথে ঠোঁট থেকে বিলীন হয়ে যায়, যখন দেখতে পায় তালহা আরেকটা মেয়ের হাতে গাজরা ফুলের মালা বেঁধে দিচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখবে ভাবেনি চোখ উপচে পানি আসতে চাইছে৷ মেয়েটা কে পিছন থেকে দেখতে পেলো না ইসরাত। মেয়েটা কলেজ ইউনিফর্ম পরে আছে। মনে মনে ভাবছে তালহা স্যার কি মেয়ে টা কে দেখার জন্য এখানে ডেকেছে? লোকটা ইসরাতের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে চাচ্ছে। একটু সামনে এগিয়ে যায় কাঁপা কাঁপা পায়ে দেখার জন্য মেয়েটা কে। একটু সামনে এগিয়ে একসাইড দেখেই চিনতে অসুবিধা হলো না মেয়ে টা কে। সে আর কেউ নয় প্রান প্রিয় বান্ধবীর ছোট বোন তূর। কি সুন্দর দুইজন হাসছে দেখে মনে হচ্ছে সুখী কাপল।

************
ভোর রাতের দিকে এসে সৌন্দর্যরা নির্দিষ্ট হোটেলে এসে পৌঁছায়। ঘুম থেকে ডেকে তুলে সৌন্দর্য নূরকে।আর ফাতিহা কে কোলে তুলে নেয়। নূর গিয়ে বড় বিপাকে পরে যখন দেখে তাদের জন্য একটা রুম। ফ্রেশ হয়ে শোইতে গিয়ে অস্বস্তি তে পরে যায় কি করে ঘুমাবে এখানে? সৌন্দর্য হয়তো কিছু টা আন্দাজ করতে পারছে বিষয় টা একটা বালিশ নিয়ে আর চাদর নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। নূর যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। পরমুহূর্তে মাথায় আসে লোকটা সারা রাত না ঘুমিয়ে একটানা ড্রাইভ করেছে। তাও নূর ঘুমিয়েছে আর না ঘুমালেও চলবে। কিন্তু উনি ঐখানে গিয়ে ভালো করে ঘুমাতে ও পারবে না আরো অসুস্থ হয়ে যাবে। নূর ধীর পায়ে গিয়ে ডাক দেয়,, শুনছেন? আপনি গিয়ে বিছানায় ঘুমান।

কোনো সারা শব্দ পায় না। এতো তারাতাড়ি ঘুমিয়ে গেলো লোকটা। নূর আবার ডাক দেয় এবার সৌন্দর্য বলে,,,পরাণ ঘুমুতে দাও,,,,চাইলে তুমিও আসো ভালোই লাগছে এখানে ঘুমোতে। এই কথা শুনে নূর আর কথা বলে না উল্টো ঘুরে চলে যেতে নেয়। কিন্তু কি মনে করে আবার পিছনে ঘুরে তাকায় সৌন্দর্য ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। সৌন্দর্যের মুখের দিকে চোখ আঁটকে যায়। সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাঁটু গেড়ে বসে নূর। নাক,মুখ,বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ায়,, সুন্দর,, উহুু সৌন্দর্য,, না,না সুন্দর,, সুন্দর মানুষ, আমার সুন্দর মানুষ বলেই মুচকি হাসে। পরোক্ষনে নিজের ভাবনা দেখে বেশ অবাক হয় লজ্জায় মুখ ঢেকে দৌড়ে রুমে ঢুকে যায়।

,,,,,,,,,,,,,,,,,,

সারা রাত জার্নির পর সকলেরই অনেক লেট করে ঘুম ভাঙে।সৌন্দর্যের ঘুম ভাঙে সবার পরে। ঘুম ভেঙে রুমে নূর আর ফাতিহা কে দেখতে পায় না। এইদিক ওইদিকে তাকিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে আসতেই দেখতে পায় সকলে এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করছে যে যার মতো ইনজয় করছে। সৌন্দর্য চোখ ঘুরিয়ে নূর আর ফাতিহা কে খোঁজার চেষ্টা করলো, পেয়েও গেলো ফাতিহা তার ফ্রেন্ডদের সাথে খেলা করছে কিন্তু নূর ঐখানে নেই। নূর কে খুঁজতে খুঁজতে পেলো এক মহিলার সাথে। মহিলাটা কি যেনো বলছে নূরের মুখ কেমন ফ্যাকাশে রক্ত শূন্য দেখা যাচ্ছে।

” আর ইউ গন মেড? আপনি কি করে ফাতিহার মাম্মা হবেন বলুনতো? ফাতিহার মাম্মা তো বছর দেড়েক আগে,,,,,,, মহিলা টা আর কিছু বলার আগেই সৌন্দর্য চিৎকার করে বলে,,,স্টপ!

#চলবে??,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here