নির্মোচন পর্ব ২৭

0
204

#নির্মোচন . ❤
#পর্বসংখ্যা_২৭ .
#ফাবিয়াহ্_মমো .

সবচাইতে আশ্চর্যজনক নজিরটুকুই দেখতে পেয়েছেন আফসানা। এখনো ঘোরগ্রস্ত অবস্থা থেকে বের হতে পারেননি তিনি। দু’চোখ বিস্ফোরিত, চোয়াল ঝুলোনো, বুকের ভেতরে বাঁধ ভাঙা প্রশ্ন তাঁকে স্তব্ধ, বিমূঢ় বানিয়ে দিয়েছে। তিনি জানতেন তার ছেলে অন্য দশটা ছেলের মতো মিশুকে নয়, স্বাভাবিক নয়, হাসতেও তেমন জানে না। বড্ড কম, বড্ড অল্প . . সেই ছোট্ট বয়স থেকে নিজের ভেতরে একটু একটু করে গড়তে শিখছে সবকিছু। যেন কোনোকিছুর প্রতি প্রচণ্ড এক রাগ, ক্ষোভ, অব্যক্ত এক খেদ থেকে নিজেকে আত্মনির্ভর বানাতে একপ্রকার যুদ্ধই চালিয়েছে। স্কুলের টিফিনের জন্য মায়ের আঁচল ধরে আবদার করেনি, ছুটিতে বাবা বাড়ি থাকলেও টাকা চাওয়ার প্রবণতা দেখায়নি, স্কুলের হোমওয়ার্ক থেকে শুরু করে কোনোকিছুর জন্যই সাহায্য চায়নি, কিচ্ছু না! একরোখা ওই স্বভাবের জন্য কম যে মার খেয়েছে তাও বলা উচিত না। কোনোকিছু জিজ্ঞেস করলে বোবার মতো মুখ বন্ধ করে রাখার ব্যাপারটা প্রায়শই আফসানাকে তুমুল রাগিয়ে দিতো। মাঝেমধ্যে কড়া শাষণ করতে গিয়ে ঠাস করে এক চড় লাগিয়ে দিতেন ছেলেকে। আর কতো সহ্য করা যায় একগুঁয়ে ভাব? জরুরি প্রশ্ন শুধালে জবাব না দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার ব্যাপারটা দেখলে তারও তো মেজাজ খিঁচড়ে আসে। তারও তো সসীম ধৈর্যের বাধটা বাজেভাবে ভেঙে যায়। স্কুলের পুরো প্রাইমারি জীবনটাই বন্ধুহীন, নিঃসঙ্গ, একা একাই পার করে হাইস্কুলের ধাপটাতে পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু কখনো স্কুল থেকে এ খবর শোনেননি তার ছেলে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি, মন্ঞ্চনাটকের মতো কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিসে যুক্ত হয়েছে। বরং স্কুলের কিছু কিছু টিচারের কাছে খোঁজ নিলে জানতে পারতেন,

– সাঈদ বাকি স্টুডেন্টের সাথে মিশতে চায় না ম্যাডাম। আমরা খুব চেষ্টা করেছি এ ব্যাপারে। ও খুব চুপচাপ। আমরা তাকে শান্তশিষ্ট বাচ্চা বলে ভাবি। আপনার ছেলে কিন্তু পড়াশোনাতে খুবই ব্রাইট! ইংলিশ মিডিয়ামে না দিয়ে বাংলা মিডিয়ামে দেওয়াটাই আপনার জন্য বরং সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। সে বেশ পড়ুয়া একটা বাচ্চা। বাকি বাচ্চাদের চাইতে তার ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম অনেক স্পিডে শেষ হয়। কিন্তু সমস্যা একটাই ম্যাডাম, সে ক্লাসের বাকিদের মতো ফুরফুরে নয়। সাঈদ প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। ওর দিকে একটু বিশেষ খেয়াল রাখবেন . . কেমন?

খেয়াল রাখার ব্যাপারে অনেকভাবে নানা চেষ্টা চালিয়েছেন আফসানা কাদির। কিন্তু মুখ থুবড়ে ব্যর্থ হওয়া ছাড়া কিছুই পাননি তিনি। হাল ছেড়ে দেওয়া বিপন্ন পথিকের মতোই আশা শূন্য হয়ে যায় তার মাতৃ মন। তিনি ভুলতে পারেন না জীবনের দুঃসহ স্মৃতি। তার মলিন মন বারবার স্মরণ করে অতীতের কালো অধ্যায়ের কথা। আজও পেটের কাছে সেই সেলাইয়ের দাগ, সেই অপারেশনের একেকটি চিহ্ন হালকা ভাবে ফুটে রয়েছে। কবে, কোনদিন এই দেহ থেকে সেই চিহ্নগুলো মিলিয়ে যাবে এ কথাও নিশ্চিত নয়। এখনো সেলাইয়ের উপর হাত রাখলে বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠে। পাথর চাপা দেওয়া দুঃসহ দুঃখগুলো ভীষণ পীড়া দিয়ে কাঁদায়। তার প্রথম সন্তান, তার এই পুত্রধন যেদিন পৃথিবীর বুকে ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা নিয়ে এলো, সেদিন ছিল সোমবার। কালবৈশাখীর মহাতাণ্ডবে দিনের আলো যেন গা ছমছম করা ঘুটঘুটে অন্ধকারে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষ ভয়ে বাড়ির বাইরে পা দিচ্ছে না। মটমট করে কোথাকার কোন হিজল গাছ উপড়ে পরল যেন। ভয়ে সকলের মুখে কালিমা, দুয়া ইউনুস জপা শুরু হয়েছে। সেসময়কার পুরোনো এক রেওয়াজ ছিল এই রকম, মেয়েকে প্রথম অন্তঃসত্ত্বার সময় বাপের বাড়িতে থাকতে হবে। সেবা শুশ্রূষার মধ্য দিয়ে সন্তান জন্মদানের পর স্বামীগৃহে ফিরে যাওয়ার নিয়ম। এমনই একটি হাতে বানানো নিয়মের জোরে আফসানা ছিলেন বাবার বাড়ি। ওই অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। উত্থাল পাত্থাল ঝড়ের ভেতর আফজাল কাদির দ্রুত একদল লোক জুটিয়ে বাজারের দিকে ছুটে যান। কেন ছুটে যান, সে খবর পান সন্তান হওয়ার ক’ঘণ্টা পর। কাপড়ে মুড়োনো ছোট্ট একটা পুটলি সদ্য মা হওয়া আফসানার কোলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পুটলির ভেতর আরামে ঘুমুচ্ছে তার ছোট্ট শিশু। এ যেন জান্নাতের বাগান থেকে ছোট্ট একটা প্রাণ আল্লাহ্ তা’য়ালা তার কোলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। গালদুটো রক্তজবার মতো লাল টকটকে, দুটো ফর্সা ফর্সা ছোট্ট হাত, একটুখানি ঠোঁট, চোখ পিটপিট করে তাকাতে গিয়ে আবারও ঘুমিয়ে পরছে ছেলেটা। আফসানা পরম আদরে ছোট্ট ছেলেকে বুকের ওমে জড়িয়ে রাখেন। তার নাড়িছেঁড়া টুকরো, তার গর্ভের ছোট্ট প্রাণ, এইটুকুনি দেহের তাপ তার গায়ে মিলেমিশে এক হয়ে রইল। নিষ্পাপ সন্তানের গায়ের ঘ্রাণে সবটুকু শারীরিক যন্ত্রণা কোথায় যে কর্পূরের মতো কোথায় উড়ে গেল আর টের পেলেন না আফসানা। ঠিক তখনই কানে আসে, মেজর সাহেব আসার পথে ছোটোখাটো অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। হাতে গুরুতরভাবে আঘাত লেগে সেলাই পেরেছে তাঁর। ওদিকে মেজর সাহেবকে দেখতে যাওয়ার পথে আব্বা আফজাল অত্যধিক উত্তেজনায় মাইনর স্ট্রোক করেন। এ খবর শুনে বাড়ির ভেতরে হৈহৈ পরে যাওয়া অবস্থা সদ্য জন্মানো ওই নবজাতকের মাঝে আঘাত হানে। ফুটফুটে পবিত্র একটি ছোট্ট প্রাণ, সেই প্রাণের উপর নৃশংসভাবে আখ্যা পরে যায় “অপয়া, অলুক্ষণে শিশু”। এ শিশু সুখ সুখ খবরের বদলে একঝুড়ি মন্দ বার্তার আগমন নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে। গ্রামের কিছু সেকেলে ভাবনার বয়োবৃদ্ধ মহিলারা চড়াও করে ঘোষণা দিয়ে বসলেন এ শিশু যেন কেমনতর! আফসানা তখনও জানতেন না তার অবুঝ জীবনে ওইটুকু ব্যাপারই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছিল এই সেলাইয়ের নীচে চাপা কষ্ট।

– বড়োবু, এখানে দাঁড়িয়ে আছ? খাবে না?

আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে ভীষণ চমকে উঠলেন আফসানা কাদির। “হ্যাঁ. . কে?” কথাটা বলতে বলতে মুখ ফিরিয়ে পিছু চাইতেই ছোটোবোন নাজনীনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি যে ফোনে ডিলারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে বলতে প্লটের বাইরে, এদিকে চলে এসেছেন, তা খেয়াল হলো মাত্র। ঠোঁটে হাসি জড়িয়ে বোনের কাছে এগুতে এগুতে শান্ত স্বরে বললেন,

– ওহঃ, নাজু! আমি এখানে কথা বলতে বলতে ব্যস্ত গেছিলাম। ওখানে সবাই খেতে বসেছে?

কথার মাঝে কেন জানি নাজনীনের মনে হচ্ছে বড়োবু কিছু একটা ঘটনায় বিমর্ষ। তার চোখ অন্যকথা বলছে, মুখের ভাবও কেমন বিষণ্ণ। চট করে কথাটা না শুধিয়ে পারলেন না নাজনীন,

– হয়ত আমি ভুল হতে পারি বু। কিন্তু তোমার মুখ আর চোখ দেখে স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। তুমি কী কোনো ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত?

ঠাস করে ছোটোবোনের কাছে ধরা খেয়ে যাবেন ভাবলে আরেকটু সতর্ক হতেন আফসানা। কিন্তু এখন সত্য না বলে উপায় নেই। ছোটোবোন নাজনীন যথেষ্ট বিচক্ষণ মহিলা। একচুলও ছাড় দিবে না। ঠোঁটের হাসিটা জিইয়ে রেখে এবার বোনের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

– বিশেষ কোনো কারণ নিয়ে চিন্তা করছি না নাজু। ছেলের এই পরিবর্তন দেখে অতীতের দিনগুলোতে ফিরে গেছিলাম। সেই দুর্ঘটনার পর ওকে আমি হাসতে দেখিনি। আমি ভুলেও গিয়েছি ওর হাসিটা কেমন . .

বুকের বড্ড গহিন কোণ থেকে চাপা রুদ্ধ শ্বাসটা বেরিয়ে এলো আফসানার। বুনো ফুলের গন্ধ মাখানো বাতাসে একবুক হাহাকার মাখানো মাতৃশ্বাস মিশে গেল অজান্তে। নীরব মুখে হাঁটতে লাগলেন তিনি। চোখদুটো মাটির দিকে। টুপ করে একফোঁটা জলবিন্দু মাটির ওপর পড়ল কিনা বোঝা গেল না। নাজনীন দীর্ঘশ্বাসের নীচে চাপা চাপা কষ্টগুলো অনুমান করে ভীষণ উদ্বিগ্ন সুরে বললেন,

– তুমিও কী মনে করো ওটা সাঈদের দোষ? ওর কী সেসময় এখনকার মতো বুঝ ছিল?

প্রশ্নটা শুনেই কলিজে নিংড়ে উঠা যন্ত্রণায় প্রচণ্ড ব্যথিত হলেন আফসানা। গলার কাছে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকা কান্নাগুলো এ বয়সেও প্রাণপণে সামলে নিলেন তিনি। ভীষণ যুদ্ধ করে গলা স্বাভাবিক রেখে বললেন,

– আমি কখনোই মনে করিনি ও একটা “অপয়া সন্তান নাজু। আমার কাছে কখনোই সাঈদ ওরকম ছিল না। ও যে ওইটুকু বিষয়কে মনের ভেতরে পুষতে পুষতে এরকম হয়ে যাবে এমনটা আমি চাইনি. .কল্পনা করিনি। এটা ঠিক সেসময় স্বাভাবিক ছিলাম না। ওমন ধাক্কাটা নেওয়ার মতো মানসিক পরিস্থিতি কোনো মায়েরই থাকে না। আজও আমি ভারি কাজ করতে পারি না নাজু। সেলাইটার জন্য নিজেকে কেমন পঙ্গু পঙ্গু মনে হয়। ছেলেটাও গা বাঁচিয়ে দূরে দূরে থাকে। আমার ভাগ্যে আর কোনো সন্তান জুটেনি যে আমাকে এই নিঃসঙ্গ সময়ে সঙ্গ দিয়ে চলবে। আমি . . আমি . .

এবার বড়োবুর ডানহাতটা ধরে রাখলেন নাজনীন। কথা আঁটকে যাওয়া আফসানার স্বরটা অনুভব করতে পেরেই আশ্বস্তের স্পর্শটুকু বড়োবুর হাতে চাপ দিয়ে রাখলেন। যখন দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভাবা হয়েছিলেন আফসানা, তখন ছোট্ট সাঈদের বয়স ছিল সবে সাত। স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা। আদর, আহ্লাদ, সোহাগ পাওয়ার জন্য ওই নিষ্পাপ সুগভীর চোখদুটো বড্ড ব্যাকুল হয়ে থাকতো।একদিন কী একটা ঘটনায় মায়ের সাথে ভীষণ খটোমটো চলতেই ব্যাপারটা মারাত্মক পর্যায়ে আগ্রাসী রূপ নেয়। ছেলে প্রচণ্ড জিদ দেখিয়ে দুহাতে তখন সজোড়ে এক ধাক্কা মারতেই ব্যালেন্স হারিয়ে বাথরুমের দরজায় পিঠ ঠেকাতে যান আফসানা। কিন্তু বিধি বাম! বাথরুমের দরজাও ছিল খোলা। খোলা দরজাটা ভেতরে ঢুকে ভারি শরীরটা তখুনি ছিঁটকে যায় ফ্লোরে। গগনবিদারী আর্তনাদে দেয়ালে দেয়ালে বেজে উঠে চিৎকার! রক্তের বন্যার কাছে দু’চোখ ছাপানো অশ্রু, অমানুষিক পীড়া, নিজ শরীর থেকে জরায়ু হারানোর মূহুর্তগুলো তিনি কখনোই ভুলতে পারেন না। “সাত” সংখ্যাটা বড্ড বেশি ক্ষুদ্র ছিল, ওই ক্ষুদ্র সংখ্যার বাচ্চাটি তখনও বুঝতে পারেনি কী ঘটিয়ে ফেলেছে সে। তখন তার চোখের সামনে ছিল রক্ত আর রক্ত। ওইটুকু মস্তিষ্ক নিজে নিজে বুঝে নিয়েছে, “মা বলেছে লাল মানে রক্ত। রক্ত মানে খু° ন°। খু° ন° মানে খু° ন° করা। সে মাকে খু° ন° করে ফেলেছে . . !

.

ছিমছাম ঘরের দুটো জানালাই খোলা। বেশ শব্দ করে উত্তুরে হাওয়া ঢুকছে। মাথার উপর ঘুরঘুর করতে থাকা সিলিং ফ্যানকে টেক্কা দিয়ে সারা ঘরময় বিচরণ করছে ঠান্ডা শীতালু হাওয়া। এমন ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশে ধোঁয়া উঠা গরম চা, প্লেট ভর্তি করা মচমচে গরম পিয়াজু, মিষ্টি রসে টসটস করা জিলাপির পিসগুলো সুন্দর করে সাজানো। জিলাপির দিকে আকুঁপাকুঁ করা নিয়াজ সাহেবের মন বড্ড উগ্র হয়ে ডায়াবেটিসকে ধাওয়া পালটা ধাওয়া শাষাচ্ছে। কাজে দিচ্ছে না। ‘ খাই খাই ‘ করা শয়তানী চিন্তাকে শেকল পড়িয়ে তিনি চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বললেন,

– আপনি আমার কাছে সংকোচ করবেন না ভাইজান। বড়ো লজ্জিত হচ্ছি। ঘরের মানুষের কাছে কোনো কথা বলতে যদি দুবার ভাবতে হয়, তাহলে ভাইজান সে সম্পর্কের মূল্য কোথায়? আপনি নিঃসংকোচে ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলুন। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব সবটা বুঝে নেওয়ার।

কথাবার্তার এমন সাবলীল ভদ্রতায় আরো একবার মুগ্ধ হলেন সোয়াদ জাকির। মনে মনে পাথর সমান চাকাটা বুক থেকে অজান্তেই সরে গেল তাঁর। তিনি ভারমুক্ত হৃদয়ে আপনার কাপটি তুলে নিতেই প্রসন্ন হাসিতে বলে উঠলেন,

– আপনার সাথে যতটা খোলামেলা কথা বলি, ততটা স্বাভাবিক কথাবার্তা আর কারো সাথেই আসে না। আপনি সবসময় এমন কিছু কথা বলেন যেটা শুনলে আপনা থেকেই কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আজকের বিষয়টি বেশ গুরুতর নিয়াজ সাহেব। ধরে নিতে পারেন, এটি বিবাহ বিষয়ক। আজ আমি আপনার সামনে “বড়ো ভাইজান” হয়ে আসিনি, এসেছি একজন “বাবা” হয়ে। কথা কতদূর কী নিয়ে আমি এগোতে চাইছি, আপনি কী তা বুঝতে পারছেন নিয়াজ সাহেব?

একটা থতমত ভাব খেলে গেল নিয়াজ সাহেবের চোখে-মুখে। তবে দ্রুতই তিনি সেটা সামলে উঠে ব্যাপারটাকে গুরুত্বের সাথে দেখলেন। বুঝতে পারছেন কী ব্যাপারে আলাপ হতে পারে এবং সে ব্যাপারে তিনি যথাযথ প্রস্তুত। বেশ প্রস্তুতের সাথেই সামান্য আড়ষ্ঠ ভাব মিশিয়ে বলে উঠলেন তিনি,

– জ্বী . . হয়ত বুঝতে পেরেছি আপনি কোন্ বিষয়ে আলাপ করতে চাইছেন।

– নিয়াজ সাহেব, আমি এখানে ছেলের বাবা হয়ে আরেক বাবার কাছে মেয়ে চাইতে এসেছি। বলতে পারেন, ভিক্ষার থলিটা নিয়েই মূলত আপনার কাছে আসা। আমার সেনাজীবনটা কেমন কেটেছে তা তো দেখেছেনই, তার উপর বেগমের জীবনে যত দুঃসহ ব্যাপার ঘটেছে তার জন্য আমার বাড়িটা একা। একটা কাকপক্ষি সেখানে নেই। আমার ছেলেটা নিজে নিজেই বড়ো হওয়া মানুষ। আমার হাত ধরে বা অন্য কারো ছায়াতলে মানুষ হয়নি। ছেলেটার উছিলায় আপনার বাড়ির ছোটো সদস্যকে চাইতে এসেছি নিয়াজ সাহেব। আমার নাবিলা মায়ের জন্য। মেয়েটার ফুরফুরে চন্ঞ্চলতা আমার বাড়ির জন্য ভীষণ দরকার। আমার ছেলেটাও চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। বাবা হয়ে আমিও চাই ছেলেটা নিজের আখেরি বুঝে নিক। আপনার মেয়েটা আমার কাঁধের বোঝাটা তুলে নিলে আমিও এবার নিশ্চিন্তে মরতে পারব। মেয়েটার উপর আমার বিশ্বাস আছে।

দোনোমনা করতে থাকা নিয়াজ সাহেব কী করে ব্যাপারটা বোঝাবে, তাই বুঝতে পারছিলেন না। অনেক ভাবনা শেষে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন,

– আপনি একমাত্র সন্তানের কথা চিন্তা করে বললেন ভাইজান। কিন্তু আমার কাঁধে তো দু দুটো সন্তান আছে। প্রথমজনকে পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয়জনের কথা কীভাবে ভাবি? অন্যায় হয়ে যায় তো এটা।

– অন্যায় হওয়ার প্রসঙ্গ আসছে না নিয়াজ সাহেব। আমরা কথাবার্তা এগিয়ে ব্যাপারটাকে সুষ্ঠু আর হালাল পর্যন্ত আনতে পারি। আমি বলতে চাইছি যে, আংটি পড়িয়ে কাবিন করে রাখলে তো আপনার সমস্যা নেই। মেয়ে আপনার কাছেই থাকল। যখন সবদিক সামলে আপনার জায়গা থেকে সহজ হবে. .ইচ্ছে হবে, তখন একটা দিনক্ষণ ঠিক করে তুলে দিলেন। এতে তো আপত্তি নেই। আজ হলে হোক, কাল হলে হোক, আপনার ছোটো মেয়ে আমার বাড়ির বউ হবে এটুকুর শুধু নিশ্চয়তা চাইছি। আপনি যদি রাজী হন, আমি আগামী মাসে . . .

বলতে বলতে হঠাৎ মাঝপথে আঁটকে গেলেন সোয়াদ জাকির। তাঁর পান্ঞ্জাবীর পকেটে বিকট শব্দ করে সেলফোনটা বাজছে। ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে সেলফোনটা বের করতেই স্ক্রিনে ফুটে থাকা নামটি দেখে টেনশনে পড়ে গেলেন। এমন মারদাঙ্গা সিরিয়াস মূহুর্তে কীসের জন্য কল করল? নিয়াজ সাহেবকে সৌজন্য মাফিক ভদ্রতা দেখিয়ে কলটা কানে চাপলেন তিনি,

– হ্যালো,

পুরো মাপা বাক্যে পরিষ্কার কণ্ঠটা ভারিক্কি মেজাজে বলে উঠল,

– আপনার পাশের ঘরেই আছি। সবই শুনতে পাচ্ছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। ট্রান্সফার ইস্যু সাবমিট হয়ে গেছে। আপনি বলুন, এই আসছে জুম্মাবার, আজ থেকে ঠিক পাঁচদিন পর শুধু কাবিনটা হবে। আর কাবিনের পর ঠিক আটমাস আঠারো দিন বাদে আর্মির ক্যালেন্ডার মোতাবেক আরেক ছুটি। অর্থাৎ, আপনি তখন ছুটি পাচ্ছেন। সেই ছুটিতে দু’পক্ষ মিলে কন্যা সম্প্রদান কাজটা করে ফেলবেন। আর ওহঃ হ্যাঁ . . আপনার “ভিক্ষাবৃত্তি” নিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলটা যথেষ্ট হয়েছে। এবার আঙ্কেলকে জিলাপি সাধুন। একপিস খেলে উনার পোক্ত শরীরে কিছুই হবে না।

সুন্দরমতো কথাগুলো বলে সেরে আবার মুখের উপরই কলটা কেটে দেয় ছেলে। আশ্চর্যের উপর এক চিমটি কৌতুহল ছড়িয়ে তাঁর মনের উদ্বেগটা ভীষণ যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে নিজেকে নিয়ে সূক্ষ্ম একটা দম্ভ করে বেড়াতেন তিনি, অথচ আজ সেই দম্ভের উপর নিজেরই ঔরসজাত রক্ত এভাবে নুনের ছিঁটা দিচ্ছে! জোঁকের মুখে নুনের ছিঁটা লেগেই যেন এইটুকু হয়ে গেল সোয়াদের মুখ।

#FABIYAH_MOMO .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here