নির্মোচন পর্ব ২৬ এর ২য় অংশ

0
222

#নির্মোচন . ❤
#পর্বসংখ্যা_২৬ .
#ফাবিয়াহ্_মমো .
[অংশ ০২]

কঠিন হ্যাং-ওভারের জন্য মাথাটা তখনো ভার ভার হয়ে আছে। চোখ মেলে তাকালেও অসহ্য মাথাব্যথার জন্য স্থির থাকতে পারছে না। দু’হাতে মাথার চুল খামচে আরো কিছুক্ষণ নিজের সাথে খামটি চালাল তিন ব্যক্তি। এরপরই কানে সরাসরি বিদ্ধ করল ইস্পাতের মতো শক্ত, অটল, নিরুদ্বেগ গলার গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর,

– লেমনোয়েডটা খেয়ে নিন জেন্টেলম্যান্স। চেষ্টা করবেন এতেই যেন আপনাদের সুদুরপ্রসারী কাজ হয়। আর না হলে যেই অ্যানাদার পন্থাটা আপনাদের উপর প্রসিকিউট করা হবে, সেটা আপনারা নিতে পারবেন না।

পায়ের উপর পা তুলে এলিট শ্রেণীর একজন ভদ্রলোকের মতো বসে আছে সুদর্শন গম্ভীর পুরুষটি। সাদা মখমলি কাপড়ের গদি বসানো সোফাটায় তার পুরুষ্ট বাঁ হাত রেখেছে সোফার বামদিকের হ্যান্ডেলটার উপর। ডানহাতের কনুইটা সোফার ডানদিকের হ্যান্ডেলটায় ঠেকা দিয়ে হাতটা ঠোঁটের কাছে ভাবুক ভঙ্গিতে রাখা। যেন হিংস্রসুলভ চোখদুটো দিয়ে ভেবে চলেছে কীভাবে এদের সাথে ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করা যায়। সোফার ঠিক উলটোদিকে, টানটান বিছানায় সদ্য হাতমুখ ধোয়া হাসিব, তপন ও শিহাব বসা। কালরাতের পোশাক কোনোরকমে বদলে টিশার্ট, ট্রাউজার পরে নিয়েছে তারা। হাসিব হাত বাড়িয়ে লেবুর ঘোলাটে পানির গ্লাসটা নিঃশব্দে তুলে নিল হাতে। এরপর একে একে তার ডানদিক থেকে আফিদের হাত এবং বামদিক থেকে শিহাবও চোখ লাল করা দৃষ্টিতে কাঁচের গ্লাসটা তুলে নেয় সাদরে। খোলা জানালা দিয়ে আসা একফালি সোনা রোদ গ্রিলের ভাঁজে ভাঁজে কাঠের টি টেবিলের উপর পরেছে। সারা ঘরময় এক অসহ্য নীরবতা ছেয়ে থাকলেও ‘ ঢকঢক ‘ পানি গেলার শব্দগুলো অনুরণিত হলো। একটা মৃদু ঢেঁকুরের শব্দে নীরব, স্তব্ধ অবস্থা কিছুটা ছিন্ন হলে এবার ঠোঁটের উপর থেকে হাত সরালো জুনায়েদ সাঈদ। গলাটা একটু স্বাভাবিক করে আলোচ্য ব্যাপারে কথা বলল সে,

– আপনারা সবার কাছে বিশ্রীভাবে ধরা খেয়েছেন। ধরাটা আমি-ই আপনাদের খাইয়েছি। কেন খাইয়েছি সেটার ব্যাখ্যা মনে হয় না নার্সারী শিশুদের মতো ভেঙে ভেঙে এখন বোঝাতে হবে। হ্যাংওভার কাটিয়ে যাদের কাছে মাফ চাওয়া দরকার, ভদ্রভাবে সেটা চেয়ে আসবেন। গাফিলতি দেখাবেন না একদম।

লজ্জায়, কুণ্ঠায়, বিব্রত হয়ে মাথানত করে রেখেছে তিনমূর্তি। এরকম একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা কাল ঘটবে এটা তারাও মূলত চায়নি। মান-সম্মান বলতে যেটুকু ছিল সেটাও পানির সাথে মিশে গেছে। বন্ধু দীপের সামনে কী মুখ নিয়ে দাঁড়াবে সেটাই এখন ভাবনার বিষয়। একটু থেমে আবারও নিজের চিরচেনা ভূমিকাটা পালন করল জুনায়েদ সাঈদ,

– হাসিব সাহেব, আপনার বাবা নিশ্চয়ই আপনাকে মাতলামো করার জন্য আটদিনের ছুটি মন্ঞ্জুর করেননি। যদি আপনার বাবা হাবিব ইকবাল জানতে পারেন, আপনি এখানে কী লীলাটা দেখিয়েছেন, আমার মনে হয় না ‘ডিজিএম’ পদের চেয়ারটা আপনার জন্য ফাঁকা থাকবে।

হাসিব ইকবালের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল আরো। সূঁই দিয়ে বেলুনের টানটান চামড়ায় কে যেন ফাজলামি করে ফট্টাশ করে টাটকা বেলুনটা ফাটিয়ে দিয়েছে। ডানহাতে শূন্য গ্লাসটা নাড়াচাড়া করতেই সামনে রাখা টি টেবিলে গ্লাসটা রাখতে রাখতে বলল,

– সাঈদ সাহেব, কালকের ব্যপারটা নিয়ে..

হঠাৎ তীব্র কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরটা হাসিবকে চটান শুধরে দিয়ে বলল,

– অ্যাড্রেস ইট ‘ভাই’। আমি আপনার বন্ধু সরফরাজ দীপের বড়ো। আপনাদেরও বড়ো। স্টে ফর্মাল উইথ মি।

হাসিব অপ্রত্যাশিত কুণ্ঠায় আরো মিইয়ে যেয়ে আমতা আমতা সুরে বলল,

– জজ্বী. . ভাই। আমি কালকের ব্যাপারটা নিয়ে নিজেও খুব লজ্জা ফিল করছি। এভাবে ওয়েডিং অকেশনে ব্যাপারটা ঘটে যাবে এটা আমরা কেউই জানতাম না। আমরা কখনো এতোটা হেভি ড্রিং° ক করি না যে মা° তাল হয়ে পুরোপুরি আউট হয়ে যাব। কাল যে কি থেকে কি হয়েছে, স্টিল কান্ট ফিগার আউট। স্যরি ভাই।

হাসিবের কথায় মনে মনে একটু সাহস পেয়ে আফিদও একটু অনুযোগ করে বলল,

– আমরা আসলে ব্যাচেলার পার্টি করতে চেয়েছিলাম। দীপের বাবা, দুলাল আঙ্কেল আমাদের পারমিশন দেননি। এদিকে আমরাও সবসময় ফ্রেন্ড-কলিগদের যেকোনো অকেশনে ড্রি° ঙ্ক করে এসেছি, ব্যাপারটা আমাদের জন্য পুরোপুরি নরমাল। তাই কালকের মতো ব্যস্ততা পেয়ে আমরাও আর লোভ সামলাতে পারিনি। জাস্ট একটু ‘আমরা-আমরা’ স্টাইলে এনজয় করতে চেয়েছিলাম। এছাড়া আর কিছু নয় ভাই।

দু’জনের কথা শেষ হতেই ভেতরে ভেতরে আকাশসম অস্বস্তি চেপে এই প্রথম মুখ খুলল শিহাব। সামনে বসা লোকটি বয়সের কোঠায় গুণে গুণে বেশ বড়ো হলেও আচরণটা খুবই মার্জিত এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। একজন কায়দাবাজ পুরুষের মতো প্রত্যেককে সে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করে, যেটা অকাট্য প্রশংসার দাবীদার। এটুকু ব্যাপারে শিহাবও কিছুটা দোনোমনা ছেড়ে কালকের সমস্ত ঘটনা লাইনে লাইনে বুঝিয়ে বলল,

– ড্রিঙ্কের জন্য আমিই সবাইকে প্রেশারাইজ করেছি ভাই। আই নিড অ্যা° লকো° হল টু ফুলফিল মাই থ্রাস্ট। বাংলাদেশে এসব জিনিস নীচুচোখে দেখা হয় আর এটা এখানে অ্যালাউ না। কালকের মতো ব্যস্ততা সবার মধ্যে থাকবে না জেনেই পিসফুলি একটু ড্রি° ঙ্ক করতে চেয়েছিলাম। আই অ্যাকসেপ্ট মাই ফল্ট। অলসো ফিলিং স্যরি লাইক দেম।

পরপর তিনজনের মুখ থেকে সহজ অক্ষুন্ন স্বীকারোক্তি শুনে গম্ভীরভাবে শ্বাস ছাড়ল সাঈদ। তিনজন নিজেদের ব্যাপারটা নিজ নিজ বিবেকের দংশনে বুঝতে পেরেছে এটাই তার মূখ্য কাম্য। যা ঘটে গেছে তা যেহেতু এখন আগের মতো বদলানো যাবে না, তাই আপাত পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে সে বলল,

– নীচে সবাই খেতে বসেছে। এই ফাঁকে আপনারা নীচে যেয়ে সবার সামনে ম্যাটারটা স্যাটেল ডাউন করবেন। কোনো গ্রাজ রাখবেন না মনে। আমি এখানে রিভেন্ঞ্জ কম্পিটিশনে খেলতে নামিনি। যা বলেছি, যেভাবে বলেছি সেভাবে যদি করেন, কালকের ইন্সিডেন্টটা কারো কাছে পৌঁছাতে দেব না। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার জেন্টেলম্যান্স?

কাঁচুমাচু মুখটা নিয়ে তিনজনই একইসাথে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি বোঝাল। তারা কেউ চায় না বিশ্রী একটা ঘটনা পরিবার, পেশা, অন্য অবধি পৌঁছাক। এমন সময় চাপানো দরজার বাইরে থেকে ‘ঠকঠক’ কড়া নেড়ে প্রবেশ করল লাবিব। চোখের চাহনি দিয়ে সুক্ষ্ম একটা ইঙ্গিত বুঝিয়ে এবার বাকিদের উদ্দেশ্যে সেও কিছুটা বলে উঠল,

– তোমাদের তিনজনকে নীচে ডাকা হয়েছে যাও। খেতে যাও। আজগর জেঠা কী বলতে চান সেটাও শুনে আসবে। কাল তোমরা যে যে কীর্তি করেছ সেটা কীভাবে মিটমাট করা যায়, সেটা নিজেরা নিজেরা ঠিক করে নাও। সম্ভবত তোমাদের বন্ধু আপসেট হয়ে আছে। সেটাও সলভ্ করে নিয়ো। যাও।

লাবিবের কথায় চুপচাপ তিনমূর্তি বিছানা ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। এতোদিন যেই হৈ-হুল্লোড় আর ঠাট্টা-তামাশার হিড়িকটা ছিল, তা গতকালকের ঘটনায় একদম চুপটি হয়ে গেছে। ভালো হয়েছে। যদিও লাবিব প্রথম প্রথম চায়নি সাঈদ ওদের রুফটপ থেকে ওরকম করে সাহায্য করুক। এখন বুঝতে পেরেছে কেন তার চতুর বন্ধুটা এমন একটা চাল চেলেছে। যেখানে অবশ্য লাঠিও ভাঙেনি, সাপও মরেনি, শিক্ষা হয়ে গেছে সবগুলোর। লাবিব দরজাটা চাপিয়ে এসে ধপ করে বিছানার উপর বসলো। সামনের টি-টেবিলের উপর নিষ্পলক দৃষ্টি তাক করে বুকভরা দমটা ছাড়তে ছাড়তে বলল,

– সন্ধ্যায় দেখছি তোর ভাই বিরাট আয়োজন করেছে। ডিজে-ফিজে ডেকে বাম্পার আয়োজন। পাশের খোলা প্লটে বেশ ডেকোরেট করা চলছে। সন্ধ্যায় রিসেপশন পার্টির জন্য রেডি থাকিস।

কথার মর্মার্থ কিছুটা বুঝতে পারলেও ব্যাপারটা তখনো সাঈদের কাছে ঝাপসা। সে নিজের কাজে এতোটা বেশি মগ্ন ছিল যে সন্ধ্যের বিষয়টা তার কাছে অনেকটাই অজানা। এ নিয়ে কৌতুহলপ্রবণ মনটা সরাসরি প্রশ্ন করল তাকে,

– আমার আয়োজন সম্পর্কে কিছু জানা নেই লাবিব। কী ব্যাপারে বলতে চাচ্ছিস খুলে বল্।

– খোলাখুলির কিছুই নেই এখানে। যা আছে সব ফকফকা। সন্ধ্যায় সব একপ্রকার রিসেপশনে যুক্ত হচ্ছে, সেখানে তুইও আসছিস ব্যস্। নিজেকে কষ্ট করে ইজি কর। বারবার একই ডায়লগ দিতে মন চায় না।

– যেটা পারব না, সেটা নিয়ে জোড়াজুড়ি করাও ঠিক না। যদি মন চায় আসব, না চাইলে নেই। আমি ওসব পরিবেশে

– হ্যাঁ, মানাতে পারিস না জানি। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। এমনিই মেয়েটা গতকালকের ঘটনা নিয়ে ছোটোখাটো ট্রমার ভেতর থাকতে পারে। সমস্যা হচ্ছে বাইরে থেকে ব্যাপারটা তোকে-আমাকে একদমই বুঝতে দিতে চাচ্ছে না। এটা-ওটা করে মাইন্ড ডাইভার্টের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ওর সাইকোলজি প্যাটার্নটা এখন কেমন। ওদিকটা বিবেচনা করে আজকের মতো শেষ ফাংশনটা সুন্দরভাবে কাটানো উচিত। নিজের জন্য না, অন্যের জন্য কাটা।

স্বল্প পরিসরে কথাগুলো বুঝিয়ে দিয়ে লাবিব সেখান থেকে উঠে যায়। আর মনে হয় না টুকরো টুকরো করে বোঝাতে হবে বন্ধু সাঈদকে। নীচে ওই তিনজন কীরকম পরিস্থিতি সামলাচ্ছে সেটা দেখার জন্য বেরিয়ে যায় লাবিব। এদিকে সাঈদ দোটানার ভেতর যুঝতে যুঝতে একপর্যায়ে কিছু একটা ভেবে নেয় মনে। বসা থেকে চট করে দাঁড়িয়ে দ্রুততার সহিত মোবাইল, ওয়ালেট এবং গাড়ির রিমোটটা নিয়ে তাড়াহুড়োতে বেরিয়ে যায়।

.

রুমের দরজা চাপিয়ে রাখলেও বারবার কেউ না কেউ এসে প্রাইভেসিটা ক্ষুণ্ণ করে। বিছানা ঝেড়ে আরাম করে একটু ঘুমোতে গেলে খট্টাশ করে খুলে ফেলে দরজাটা। এরপর এটা-ওটা জিনিস আনা নেওয়া করে দরজাটা হাঁ করে ওভাবেই খুলে রেখে যায়। এভাবে কী একটু বিশ্রাম নেওয়া সম্ভব? সবে ফাহাদের দেওয়া ঔষুধটা খেয়ে ঘুমোতে চেয়েছিল ফিহা। কিন্তু মানুষের মধ্যে নূন্যতম মনুষ্যত্বের এমন করুণ অবস্থা দেখে আর ঘুমোতে পারল না। কানের ব্যথাটা আবারও একটু একটু করে ফিরে আসছে। ভুল করেও সেখানে আঙুল স্পর্শ করা যায় না। কিন্ঞ্চিৎ যদি ছোঁয়া লাগে, তাহলে মনে হয় রূহটা বুঝি ওর বেরিয়েই গেল! জ্বালাময়ী এক যন্ত্রণা সহ্য করে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল পাশের বাড়ির শৈলী আন্টিদের ওখানে চলে যাবে। আপাতত ওই বাড়িতে মেহমানের গিজগিজ অবস্থা বলতে প্রায় শূন্য, আর সবাই এখন এখানে ভিড় জমিয়ে মাছির মতো ভনভন করে যাচ্ছে। বিছানা থেকে উঠে মোবাইল ফোনটা নিয়ে সরাসরি নিচতলার সেই রান্নাঘরটার ওখানে হাজির হয় ফিহা। ভেতরে দুই খালামণির পাশে মাকেও সঙ্গে কাটাকুটি করতে দেখে ফিহা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বলল,

– মা? মা শোনো, আমি শৈলী আন্টিদের ওখানে যাই? এখানে প্রচুর হৈচৈ হচ্ছে আর রুমেও আমি শান্তিমতো বিশ্রাম নিতে পারছি না। আমার প্রচুর অসহ্য লাগছে। আমি শৈলী আন্টিদের ওখানে গেলে সমস্যা হবে কোনো?

বটিতে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে গিয়ে মুখ তুললেন নাজনীন। মেয়ে দরজার ত্রিসীমানায় দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ি শৈলী আপাদের ওখানে যেতে চাইছে। কালরাতে কোথায় পরে গিয়ে যে কানের অমন দুর্দশাটা করল, এটা নিয়ে এখনো মেয়ের প্রতি বেশ রাগ রাগ ভাব আছে তার। আবারও পেঁয়াজের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে প্রত্যুত্তর করলেন তিনি,

– নিজে নিজে তো পুরো দুনিয়া উলটে ফেলছ, এখন আমার কাছে ঢঙ দেখাতে আসছ কেন? যা খুশি তাই করো গে, আমি কি বলার কেউ? যাও এদিক থেকে তুমি। বিরক্ত করবে না কাজের সময়।

মাকে ‘তুই’ থেকে অন্য সম্বোধন করতে দেখে মুখটা প্রায় অসহায়ের মতো করে ফেলে ফিহা। আর কতো ঝামেলা পোহাবে বাবা? এমনিতে কী তার ছোট্ট সরল জীবনটাতে কম যন্ত্রণা হচ্ছে? রাতভর কানের অসহ্যকর টনটনে ব্যথায় চমকে চমকে উঠেছে, আর এর মধ্যে মায়ের ক্রোধপূর্ণ অভিমান। ফিহা মুখ তুলে শেষ আশা হিসেবে আফসানার দিকে বিষণ্ণমুখো চাহনিতেই চাইল। চোখে চোখে যেন বুঝিয়ে বলল, তোমার বোনকে একটু সামলে দাও। আমি আর নিতে পারছি না খালামণি। আফসানা চুলার কাছে সেমাই নাড়ানো বাদ দিয়ে সেকেন্ডের ভেতর এক হুংকার ছেড়ে বললেন,

– সমস্যা কী নাজু? মেয়ে কি বলছে শুনতে পাস না? ও শৈলী আপাদের ওখানে যেতে চাচ্ছে এখানে সমস্যা কোথায়? থম মেরে বসে আছিস কেন? জবাব দে।

– আপা, ওর ব্যাপার নিয়ে তুমি কিছু বোলো না। সারাদিন টইটই করে সারা দুনিয়া চষে খাবে আর ব্যথা-ট্যথা পেলে খবর হবে মায়ের, এ কেমন ফাজলামো? হাঁটতে গিয়ে নাকি অন্ধের মতো পরে যায়, বাঁকানের ঝুমকো বেঁকে কান কাটে, হাঁটু ছিলে, এগুলো কী গা জ্বালানো কথা না? সহ্য হবে এগুলো শুনলে? নতুন ওড়নাটা কিনে দিয়েছ, সেটা পর্যন্ত কোথায় ফাসিয়ে ছিঁড়ে এনেছে! এতো দামড়ি মেয়ে এখনো উশৃঙ্খল কাণ্ড করে বেড়ালে রাগ উঠবে না?

মনের ঝাঁজ মিটিয়ে কথাগুলো বলে উঠলেন নাজনীন মিলা। মেয়ের দুরন্তপণায় তিনি যে রীতিমতো বিরক্ত এবং অসহিষ্ণু হয়ে গিয়েছেন, তাই যেন বাক্যে বাক্যে স্ফুলিঙ্গের মতো ঝলসে উঠেছে। রান্নাঘরে থাকা বাকি মহিলারাও সামান্য একটু খুঁত পেয়ে বেশ মান্ঞ্জা মেরে কথা জমাতে শুরু করেছেন। আফসানা সবার চেহারা এক এক করে দেখে নিতেই দরজায় দাঁড়ানো ফিহার দিকে ছোট্ট ইশারায় বোঝালেন, ‘ তুই যা ওখানে। একদম মন খারাপ করবি না তুই। আমি তোর মাকে দেখছি। যা! ‘। রান্নাঘরের চৌকাঠ ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে দীপদের ত্রিসীমানা পেরিয়ে ডানের শৈলী আন্টিদের সেখানে প্রবেশ করে ফিহা।

.

ছোটো ছোটো দুটো ছেলে বাচ্চা নিয়ে দোতলা সুন্দর নান্দনিক বাড়িটায় থাকে শৈলী। স্বামী চাকরীর সুবাদে মালয়েশিয়া থাকায় গাজীপুরের এই ছিমছাম, ঠান্ডা, শব্দহীন এলাকাটা বেছে নিয়েছেন তিনি। ফুটফুটে সাদা রঙে শোভিত সুন্দর বাড়িটার প্রশস্ত বারান্দাটা ঘুরে দেখল ফিহা। বারান্দার ঠিক নীচেই ফুলে ফুলে সজ্জিত বাহারি রঙের মন মাতানো ফুলের বাগান। মুক্ত বাতাসের সাথে টাটকা, মনোরম গোলাপফুলের মন সম্মোহন করা সুগন্ধি সুভাষে জায়গাটা ভীষণ ভালো লেগে গেল। কী অপার শান্তি! কী অদ্ভুত মন জাগানো ভুলো ভুলো সুখ! শৈলী আন্টির দেওয়া গরম ধোঁয়া উঠা চা-টুকু বড্ড শ্রান্তি, বড্ড তৃপ্তি জোগাল মনের কোণে। ফোমের তুলতুলে বেডে বসে কাপের শেষ তলানিটুকু একচুমুকে খালি করতেই বাঁদিকে থাকা বেডসাইড টেবিলে ওটা রেখে দিল। ফলের খোলস ছাড়াতে কখনো আঙুল, কখনো ছুরি, কখনো ধারালো বস্তুর ব্যবহার করে। নরম ফলের ক্ষেত্রে আঙুল দিয়ে একটু একটু করে কমলার খোসা ছাড়াতে হয়, কখনো ছুরি দিয়ে কেটে কেটে আসল ফলটুকু বুঝে নেয় মানুষ। কিন্তু যার মনের আব্রুটা শত শত পর্দার নীচে বহুবছর ধরে ঢেকে আছে, তার মনের নির্মোচনটুকু কী করে খুলে আনবে? কী করে দুর্গম মনের একেকটি অন্ধকার পথ উজ্জ্বল করবে ও? যে পথে কখনো কোনো নারী-মন অনুভূতির শিখা জ্বালায়নি, যেখানে কখনো আছড়ে পরেনি আবেগের ঝড়, কোনোদিন বেরোতে পারেনি স্বতন্ত্র গাম্ভীর্যের খোলস থেকে, এমন এক ব্যক্তির জীবনে সত্যিই কী ফাহাদ ভাইয়ের মতো নির্মোচন সম্ভব? বাবার পর এই একটিমাত্র বহিরাগত পুরুষ, যে পুরুষ সেদিন তার কাঁটা হাতে গ্যারেজের ভাঙা দরজা রুখে দিয়েছিল, শক্ত বাহুবলে ভুলবশত পরতে যাওয়া থেকে আঁটকে নিয়েছিল, তার চোখের চাহনি মুখের ভাষার চেয়েও অর্থবহুল, নমনীয়। তার ওই চওড়া কাঁধ, তার বুকের উষ্ণতাটুকু রোমে রোমে যেন টের পাচ্ছে ও। স্পষ্ট এখন মনে পরছে, সেদিন গাড়ির ভেতর ব্যাকসীটের কোণে থরথর করে কাঁপুনি দেওয়া জ্বরতপ্ত শরীরটা নিজের বুকের ওমে পূর্ণ করে ধরেছিল। সারাটা পথে একফোঁটাও বুঝতে দেয়নি কতটা লম্বা জার্নি শেষে খালামণির দুয়ারে পৌঁছেছে। দু’চোখ বন্ধ করে এবার জ্বরের ঘোরের সবটুকু লোপাট স্মৃতি মনে করতে পারল ফিহা। এও বুঝতে পারল, বিগত দু’দিনে যত যত ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে ওই মানুষটার একাকী, নিজের, আপনার মূহুর্ত বলতে কিছুই নেই। সে যে কতটা অস্থিরপ্রবণ, উৎকণ্ঠিত, বারবার ওর মনের দুয়ারে কড়া নেড়ে শূন্যমুখে ফিরে ফিরে গেছে, তা যেন অস্থিতি চিত্তে বুঝতে পারল ও। হঠাৎ পিনপতন নীরবতার মাঝে তিনটে ‘ঠক ঠক’ মৃদু করাঘাত হলো। বুজে রাখা চোখদুটো মেলে তাকাতেই চিত্রার্পিতের মতো ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পরল ফিহা! বিস্ময়ের ধাক্কায় মুখ ছিঁটকে অস্ফুটে বেরুল,

– আপনি এখানে কেন?

সাদা রঙ করা কাঠের নকশাকার দরজাটা খুলে গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল দীর্ঘকায় নীরব পুরুষটি। গায়ে তার ডার্ক নেভি ব্লু রঙের টিশার্ট, জগিংয়ের কালো ফর্মাল ট্রাউজার পরা, সূর্যের তাপে গায়ের চামড়া কিছুটা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। তবু কী যেন এক ভুবন দোলানো আকর্ষণ তার সুদেহী চলনে, আম্ভরিক মুখজুড়ে, ওই একরাশ ঠান্ডা নির্মল চাহনিতে, যেখানে খোদাই করা আছে তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পৌরুষ। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ফিহার পেছনে থাকা বিছানায় ফেলল দু’খানা ব্যাগ। ফিহার সম্পূর্ণ দৃষ্টি ব্যাগের চাইতে এখন সামনে দাঁড়ানো এই নীরবে অটল মানুষটার প্রতি। চোখ ছিঁটকে চলে গেল মানুষটার কপালের ওই ব্যান্ডেজ বসানো কোণে। ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ। এখনো খুলেনি সেটা। রঙ চটে গিয়ে ময়লা, বিবর্ণ দেখাচ্ছে। কখন যে দু’জনের ভেতরকার অল্প ফাঁকটুকু কমিয়ে নিয়েছে মানুষটা, তা বুঝতে পারেনি সপ্তদশী বিস্ময় বিমূঢ়া ফিহা। হাত বাড়িয়ে সেই বিমূঢ়ার রক্তিম কানের আশপাশ থেকে সমস্ত চুল সরিয়ে দিল আস্তে আস্তে। ফিহা অনুভব করল, তার সমস্ত সত্তাটা যেন আপন করে নিয়েই কানের কাছে মুখ নীচু করল মানুষটা। পরপর দু’বার, ধীরে ধীরে আলতো স্পর্শে ছুঁয়ে দিল সেই ব্যথাতুর কানের কাছটুকুতে। এই প্রথম কোনো ব্যাকুল পরশে প্রচণ্ড বিহ্বল হয়ে মিইয়ে রইল ফিহা। ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্দুরের মতো সমস্ত শরীর, হাত-পা, মস্তিষ্কের ভেতর তীব্র ছটফটানি বয়ে গেল। গলার কাছে সবটুকু নিঃশ্বাস নিষ্ঠুরভাবে মতো আঁটকে রাখলে সেই জ্বরদগ্ধ দিনের মতোই মদির স্বরে ফিসফিসিয়ে উঠল মানুষটা,

– আমি অপেক্ষা করব নাবিলা। এমন করে সেজে আসবেন, যেন এই অধম মানুষটা শুধু আপনাকে দেখেই স্থির হয়ে যায়। আর কিছুই চাই না আমি, চাইবও না . . আসি।

মুখ সরিয়ে নিজের কবোষ্ণ অস্তিত্বটুকু নিঃশব্দে হটিয়ে প্রস্থান করল সাঈদ। যখন ফিহা খিচুনি চোখের কপাটদুটো মেলে তাকাল, তখন রুমে কেউ নেই। ফাঁকা। তিরতিরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বিছানার পানে ফেলতেই সেখানে থাকা ব্যাগদুটো উপুড় করে ধরল সে। মচমচ শব্দ করে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অত্যাশ্চর্য কিছু জিনিস! পাতলা ঠোঁটের আগায় আস্তে আস্তে ফুটে উঠল রৌদ্র ঝলমলে টুকলো হাসি। দু’চোখ জুড়ে ছেয়ে রইল কৌতুহলী আশ্চর্য।

.

বারবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে অবাধ্য, বেয়াড়া, অভদ্র ছেলের কীর্তিকাহিনি দেখছেন। হাতঘড়িতে ষোল মিনিট তেঁতত্রিশ সেকেন্ড পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো আলোচ্য বিষয়ে কথা উত্থাপন করেনি এই চূড়ান্ত খারাপ ছেলে। ছেলের এই ধরণের অমানুষিক কর্মকাণ্ড দেখলে মেজাজ ভীষণ খিঁচড়ে আসে, তবু নিজেকে কড়া কমাণ্ডে সাবধান করেন ভদ্রলোক সোয়াদ। নিজের অস্তিত্ব আরো একবার জানান দিতেই গলাটা ইচ্ছে করে জোরে খাকারি দিয়ে উঠলেন। শব্দটা নিস্তব্ধ রুমে বিশ্রী একটা প্রতিধ্বনি তুলে থেমে গেল। অথচ, যার জন্য তিনি শক্তি খরচ করে গলার অবস্থা চৌদ্দটা বাজিয়ে খুশখুশে করলেন, সেই মহাপণ্ডিত ছেলে তাকে পাত্তাই না দিয়ে ড্রেসিংটেবিলের কাছে তেমনি তৈরি হতে ব্যস্ত। কী নিষ্ঠুর নৃশংস অপমান! ঝট করে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে দু’হাত কোমরের কাছে বাঁধলেন এস জাকির। এক কদম এগিয়ে এসে আয়নার ভেতর দিয়ে জিজ্ঞাসু কণ্ঠে শুধিয়ে উঠেন,

– আমাকে বিশেষ প্রয়োজনে ডাকা হয়েছিল?

আয়নায় ফুটে উঠা কট্টর প্রশ্নকর্তার দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না সাঈদ। ইস্ত্রি করা কালো রঙের শার্টটা উন্মুক্ত দেহে গলিয়ে নিতেই পারফিউমের বোতলটা ডানহাতে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,

– মনে হচ্ছে ডাকা হয়েছিল।

পুরোদস্তুর এমন ত্যাড়া ধরণের কথা শুনে ভ্রুঁদুটো কোঁচকালেন সোয়াদ। ধৈর্যটা আবারও প্রাণপণ সংযত করে শান্তসুরেই বলে উঠেন,

– সতের মিনিট যাবৎ আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছ। তোমার প্রতি কী বিরক্ত হওয়া উচিত না?

– আমার প্রতি আপনি জন্ম থেকেই বিরক্ত। নতুন করে বিরক্ত হওয়ার টপিক এখানে আসে না।

– তুমি কিন্তু আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে চলছ। ভালো করেই জানো তোমার এই ধরণের কথাবার্তা আমার মোটেই পছন্দ না।

– আপনার পছন্দ-অপছন্দ শুনে আমার কিছুই যায় আসে না। ধৈর্যের পরীক্ষা আপনার সেনানিবাসে দিবেন। আপনাকে যে কারণে ডাকা হয়েছে সেটা শুনে রাখুন। আপনি কীভাবে কী করবেন জানি না, আপনি আজই মার সাথে আলোচনা করে ছোটো আংকেলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখবেন। প্রস্তাবটা নাবিলা হকের জন্য। প্রস্তাবের সারাংশের হবে এই— কোনোপ্রকার যৌতুক মানা হবে না, বিয়েতে বখশিশও দেওয়া চলবে না, যতদিন ইচ্ছা ততদিন মেয়ের পড়ার স্বাধীনতা থাকবে, পড়াশোনা নিয়ে মেয়ের ইচ্ছা ব্যতীত অন্যকোনো ব্যক্তি, এমনকি আমিও আঙুল তুলতে যাব না। উনার দুই মেয়ের পড়াশোনার জন্য যে আর্থিক সংকটের ব্যাপারটা সামনে আসবে, সেটা আমি নিজ কাঁধে তুলে নিতে রাজি। কিন্তু এ কথাও স্পষ্ট করে বলে দিবেন, আমি কোনোদিনও ঘরজামাই হতে রাজি না। যদি ঘরজামাই বানানোর ইচ্ছে থাকে, সেটা বড়োটাকে দিয়ে বানাতে বলবেন। আপনার আঠার মিনিট খরচ করার পেছনে এই কারণই ছিল, এখন আপনি দায়িত্ব পালনে যেতে পারেন। যান।

সম্পূর্ণ কথা শুনতে শুনতে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেছে ভদ্রলোকের। ঘোর ধাক্কায় কখন যে কোমরের কাছ থেকে হাতদুটো আলগা হয়ে এসেছে তা নিজেও বলতে পারেন না। দু’কানে যা শুনল সব কী ঠিকঠাক, নির্ভুল, সত্য শুনেছে? গলাটা কাঠ কাঠ হয়ে গেছে ছেলের অমৃত বাক্য শুনে। হ্যাঁ, এই বাক্যই তো শুনতে চেয়েছিলেন তিনি! কিন্তু, তা এভাবে তো নয়। চরম আশ্চর্য হয়ে ভোম্বল দাসের মতো দরজার দিকে হাঁটা দিলেন সোয়াদ। হঠাৎ মুখটা পিছু ফিরিয়ে তুমুল উত্তেজনার স্বরে বলে উঠলেন,

– তুমি নাটক করছ না তো? যা বলেছ সব সত্যি? নিয়াজের মেয়েকে নিশ্চিত বিয়ে করবে?

বিরক্তি মাখা মুখটা বাঁয়ে ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকাল সাঈদ,

– আমাকে দেখে কী আপনার নাটক বলে মনে হচ্ছে?

সোয়াদ জাকির দ্রুত নিজেকে প্রস্তুত করে ছেলের সামনে সুউচ্চ অহং ফুটিয়ে বললেন,

– ঠিকআছে, ঠিকআছে বুঝেছি। আমি আজই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব। ভদ্রলোক বিষয়টা কেমন ভাবে নিবেন কে জানে। তোমাকে দিয়ে যদি সুশীলা গুণসম্পন্ন একটি মেয়ে আমার বাড়িতে আসে, তবে সেক্ষেত্রে কথা বলতে আপত্তি দেখছি না। কথা বলব।

– জ্বী। কথাটা এমনভাবেই বলবেন যেন আপনার প্রস্তাবটা তিনি ফিরিয়ে দিতে না পারেন। অলরেডি আপনার নিয়াজ সাহেব ‘বিসিএস ক্যাডারের মতো সুপাত্রের প্রস্তাব দু’দুবার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাই—কথাবার্তায় সাবধান।

ছেলের ছোট্ট ইঙ্গিতে সজাগ হয়ে মনে মনে প্রস্তাবটা সাজাতে লাগলেন সোয়াদ। না না, প্রস্তাব উলটো পায়ে ফিরে আসবে কেন? কোন দুঃখে? যদিও তিনি আজ পর্যন্ত এমন কোনো কাজ করেননি, যেখানে সাফল্য ছাড়া অন্যকিছু এসেছে। তবু যদি হিতে বিপরীত হয়? এই প্রথমবার ভদ্রলোকের দুর্ধর্ষ-সাহসী কলিজাটা ভীতু সৈনিকের মতো চিপ মেরে রইল!

.

সন্ধ্যা সাতটার ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে অনেকক্ষণ হলো। আকাশের কালো কুচকুচে অন্ধকার ঘনানো ঝাঁপিতে দুষ্টু দুষ্টু চোখে উঁকি দিচ্ছে নক্ষত্র। এখনো গাঢ় বেগুণির ছাঁচটা আকাশ থেকে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। কড়া লাইটিংয়ের চমৎকার সুসজ্জায় মাঠখোলা প্লটটা এখন দারুণ দেখাচ্ছে! দলে দলে সেখানে সেজেগুজে ঢুকে পরছে আত্মীয়, মেহমান, প্রতিবেশীর দল। এবার যেন প্রচণ্ড বেশি বিরক্ত হয়েই পকেট থেকে সেলফোনটা বের করল সাঈদ। কলের জন্য ডায়ালে বসাতেই পাশ থেকে লাবিব হাসতে হাসতে একটা খোঁ° চা মারল,

– মেয়ে মানুষের লেট কী জিনিস এবার তুই বুঝবি শা° লা! এতোদিন খালি ছোঁয়ার ম্যাটারে শুধু শুধু দুষলি না? আজকে বুঝবি।

লাবিব নিজের বাগদত্তা ছোঁয়াকে নিয়ে ছোট্ট একটা তামাশা করলে ফাহাদও এবার আসল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বলল,

– কাকু, তোমার ট্রাউজার‍ের ঘটনা কি মনে আছে? কোনদিক দিয়ে খুলে জানি কোন সাইড দিয়ে পরে গেছিল! মনে আছে না?

– হপ্ ব্যাটা, চুপ কর! কীসের মধ্যে কী লাগাস? তোকে আমি বলছি ওই টপিকে খুঁচায় খুঁচায় কথা বের করতে?

– তোর কপালটা আসলেই ভালো রে লাইব্বা! ওইদিন যদি নরমাল স্যান্ডেল না পরে খটখটা মার্কা জুতা পরতাম, তোর অবস্থা আজকে ল্যাং° ড়া ফাহিমের মতো প° ঙ্গু প° ঙ্গু হতো।

– ছিঃ! এখনো টিনেজ পোলাপানদের মতো আচরণ করোস। লজ্জা তো আগে থেকেই নেই, এখন আরো দুই ডিগ্রী বেশি বাড়ছোস।

– মেডিকেল লাইনে না° ঙ্গু কঙ্কাল নিয়ে যতবার থিসিস লিখছি, ততবার আইএসএসবি এক্সামও তুই দেস নাই। বুঝছস হিসাব?

তৎক্ষণাৎ লাবিব অবাক হয়ে ফাহাদের দিকে শুধাল,

– না° ঙ্গু কী?

দুই বন্ধুর যুক্তি ছাড়া কথায় ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড হাসি পেলেও সাঈদ তখন কল দিতেই মহাব্যস্ত। সাতটা পনেরো বেজে গেল এখনো কেন আসছে না? কলটা তো অন্তত ধরবে? অন্যদিকে ফাহাদ বিজ্ঞবান ডাক্তারের মতো দু’হাত বুকে ভাঁজ করে বলল,

– যেটা বলছিস ওটার লাস্টে প° ঙ্গু অ্যাডজাস্ট কর। তারপর বুঝবি কী মিনিং।

ফাহাদের ওই ক্লু পেয়ে ফট করে ব্যাপারটা বলে উঠল লাবিব,

– না° ঙ্গু প° ঙ্গু? মানে ক্যাকলাস ক°ঙ্কা° ল?

ফোনটা কানে চেপেই এবার ওদের দিকে তাকাল সাঈদ। দু’জনের উদ্দেশ্যেই কিছুটা মেজাজ তপ্ত করে বলল,

– দেরি হচ্ছে ভালো কথা, কলটা তো রিসিভ করবে? কল ধরছে না কেন? একটা দুটো কল দিয়েছি এই দশ মিনিটের মধ্যে? লাবিব, উপরে গিয়ে চেক দিয়ে আয় তো। অসহ্য লাগছে এখন! মেজাজটা . . .

ডায়ালকৃত ফোনটা কানে চাপা অবস্থাতেই আকস্মিকভাবে মুখের কথা আঁটকে গেছে তার। অখণ্ড আইসবার্গের মতো নিস্পন্দ হয়ে সামনেই দু’চোখ স্থির করে ফেলল সাঈদ! তার অপ্রত্যাশিত এমন অদ্ভুত আচরণে তৎক্ষণাৎ লাবিব আর ফাহাদ সেই দৃষ্টি লক্ষ করে সামনের পানে তাকাল। অবিশ্বাস্য চোখে চোয়াল ঝুলিয়ে ফেলল দুই বন্ধু! তৎক্ষণাৎ একে অন্যের দিকে জুলজুল চাহনি বিনিময় করতেই আবারও ওরা অবাক-বিস্ময়ে সামনের দিকে মিটিমিটি হাসিতে তাকিয়ে রইল। যা দেখছে, তা সত্যি দেখছে তো? এবার কি স্থির থাকতে পারবে তাদের বন্ধু?

#নোটবার্তা— এ যাবৎ লেখা সবচেয়ে বড়ো পর্ব। শব্দসংখ্যা ৩৩০০+। কমেন্টে ছোট্ট করে হলেও মনের অনুভূতি জানাবেন সবাই। এই কষ্টটা একটু স্বার্থক হোক একটু।

#FABIYAH_MOMO .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here