নির্মোচন পর্ব ২১

0
832

#নির্মোচন . ❤
#পর্বসংখ্যা_২১ .
#ফাবিয়াহ্_মমো .

অস্থিরতার কাঁটা নড়ে উঠার আগেই সকলের মুখ থমথম করে উঠল। কী হচ্ছে এসব? এমন অমাবস্যার মতো অন্ধকার হলো কেন? কেন এমন ঘুটঘুটে আঁধারে তলিয়ে গেল হলুদ ছোঁয়ার বর্ণিল সাজসজ্জাটুকু? নীচে থেকে গুম গুম ভারী দামাল হর্ণে নিভু নিভু করে বারি খাচ্ছে নীচের বৈদ্যুতিক সংযোগ। ছাদে উপস্থিত সকলেই তখন হতভম্ব, রক্তশূন্য মুখে ঢোক গিলছে। হুড়মুড়িয়ে ছাদের রেলিং ধরে নীচের দিকে তাকালে চোখ ধাঁধানো দৃশ্যটুকু দেখতে পায়। বিয়েবাড়ির সমস্ত আলোকে গায়ে মাখিয়ে বজ্রগম্ভীর মেজাজে প্রবেশ করছে কালো ক্যালিনান গাড়ি। মনে হচ্ছে কোনো দৃঢ়সংকল্প রাজাধিরাজ স্ব-দাপটে প্রবেশ করছে তার বিশাল বড়ো অট্টালিকায়। উপস্থিত মহলের মধ্য থেকে চোয়াল ঝুলিয়ে বলে উঠল তপন,

– বাংলাদেশের মাটিতে আর আর কোম্পানির গাড়ি ব্যবহার করছে! কী দেখছি আমি?

তপনের কথাতে সায় জানিয়ে কিছু বলতে নেবে হাসিব, তার আগেই মসৃণভাবে থেমে গেল কালো চকচকে গাড়িটা। খট্টাশ করে খুলে গেল গাড়িটার সম্মুখ দরজা। এটুকু দৃশ্য দেখে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর মধ্যে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। বুকের ভেতরে ধ্বক্ ধ্বক্ কাঁপছে অদম্য হৃৎযন্ত্র। কী দেখবে ওই গাড়িটার মধ্যে? কে এসেছে অমন অদ্ভুত, অশান্ত, ঝড়ো ঝড়ো ভঙ্গিমায়? ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কঠোর কর্তৃত্বপরায়ণ এক মুখ। যার কপালের গড়ন অতিশয় সুন্দর, দুই ভ্রুঁর নীচে কৃষ্ণাভ চোখের তারায় তারায় এক আশ্চর্য গাম্ভীর্য্যতা লুকিয়ে আছে, দুটি ঠোঁট আশ্চর্য রকম সুন্দর এবং নিখুঁত খয়েরি লালের সৌন্দর্যটুকু বুঝিয়ে দিচ্ছে তার সিগারেটে টান দেওয়ার অভ্যাস নেই। ঢোক গিলে জলপাই রঙা শাড়িতে তন্নি মেয়েটা জুলজুল চোখ করে বলল,

– মনে হচ্ছে চোখের সামনে আমি এমন একজনকে দেখতে পাচ্ছি, যে কিনা হাসতে পারে বলে মনে হচ্ছে না। তবু তার মধ্যে কী যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার লুকিয়ে আছে। তুই কিছু ধরতে পারছিস তাজু?

সুন্দর দেখতে তাজরিন নামের মেয়েটা নিজেও কিছুটা অগোছালো ভঙ্গিতে বলে উঠল,

– হুঁ। বেশ হ্যান্ডসাম দেখতে। চুলের হেয়ারস্টাইলটা হুবহু রিকার্দো কাকার মতো। ইয়াং এজে কাকার চুলটা যেমন খেলার মাঠে এলোমেলো হয়ে থাকতো, উনার চুলটাও সেম ওই ক্যাটাগরির। সমস্যা হচ্ছে এনাকে দেখলে কেমন একটা ভয় ভয় ফিল হয়। মানে গনমান্য ব্যক্তিদের সামনে গেলে যে ধরণের চাপা অস্থিরতা কাজ করে ওরকম একটা ভয়।

পালটা উত্তর দিল তন্নি,

– মন্দ বলিসনি। সত্যিই কেমন যেন একটা অস্বস্তি ফিল হচ্ছে। কিন্তু আসল কথা হলো ইনি কে? চিনিস কেউ? ইনি কী দীপ ভাইয়ার বন্ধু?

শ্যামা মেয়েটা কী যেন বলতে গিয়েও বলতে পারল না। আড়চোখে সে তাকিয়ে দেখল আমেনাবুর মুখখানা। কোলে দু’বছরের সন্তানকে ঘুমের দোলা দিতে গিয়ে এখন আর কোনো হুঁশ নেই। আজও তার চোখজুড়ে প্রবল রাগ, খেদ, প্রতিশোধের আগুন ঝরার পরিবর্তে বিস্ময় আকর্ষণটুকু জ্বলজ্বল করে ফুটছে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এই মানুষটার সাক্ষাৎ এই জীবনে আরো একবার হয়ে যাবে। এতোগুলো বছরেও এই নিষ্ঠুর লোকটা এতটুকু বদলায়নি। তার গায়ে লেগে থাকা টানটান ইস্ত্রিযুক্ত হালকা আকাশি রঙের শার্ট, কোমরে বেল্ট দিয়ে আঁটকানো ফর্মাল কালো প্যান্ট, মাথায় এলোমেলো হয়ে থাকা পাতলা সুন্দর চুলগুলো আজও ওর পাজরের তলায় অসহ্য ধুকপুকনিটা তুলে দিচ্ছে। চোখ নামিয়ে বিষণ্ণভাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আমেনা। ছেলেকে নিয়ে দ্রুতগতিতে সেখান থেকে সটকে পরে। এমন সময় নীচ থেকে আনন্দ উচ্ছাসে চিৎকার দিয়ে উঠেন রোকসানা,

– সাঈদ! ও আল্লাহ্! কী দেখছি আমি! আমার বাড়ির আঙিনায় এ আমি কাকে দেখছি গো? তুমি এসেছ বাজান? এ্যাই কে কোথায় আছিস? জলদি আয় বলছি!

রোকসানার চিৎকার শুনে ভেতরবাড়ি থেকে ছুটে এলো অনেকগুলো মহিলা। দীপ অনেকক্ষণ আগেই নতুন মেহমান আপ্যয়নের উদ্দেশ্যে নেমে গেছে। এদিকে বিষ্ময়-বিমূঢ় অবস্থায় দু’ঠোঁট ফাঁক হয়ে যাচ্ছিল ছাদে উপস্থিত মেয়েগুলোর। একে অন্যের দিকে অত্যাশ্চর্য দৃষ্টিতে তারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কেউ বোধহয় চিন্তাও করেনি এই লোকটিই কিনা সেই কুখ্যাত লোক, যিনি দেওয়ান বংশের বড়ো মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস দেখায়। শুধু তাই নয়, বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের যৌতুকটা যেখানে ভালো ভালো পুরুষের লোভ চটিয়ে দিতে পারে, সেখানে এই লোক মোক্ষম জবাবে সেটা ফিরিয়ে দিয়েছিল। শ্যামা ঢোক গিলে মনে মনে শুধু এটাই ভাবছে যদি জেঠামিয়ার সাথে এনার মুখোমুখি অবস্থা হয়, তাহলে কী ধরণের এসপার ওসপার ঘটনা ঘটতে পারে! সকলের অমন উৎকণ্ঠিত অবস্থা দেখে নীরবে হেঁটে এসে সুফিয়ার পাশে দাঁড়াল ফিহা। দুই চোখ নীচের দিকে ফেলতেই শিরশির কাঁপুনিটুকু সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরে। দু’হাত মুঠো করে তাঁর অবিচল মুখ, তাঁর কথা বলার ধরণ, বলার সময় তাঁর সুস্পষ্ট তেজের ভঙ্গিটা দেখে চলে। কারো চোখে যেটা ধরা পড়েনি, সেটাই অতোদূর থেকে দেখতে পেয়ে ভ্রুঁ কুঁচকায় ফিহা। সুফিয়ার আঁচলটা বাঁপাশ থেকে ছোট্ট বাচ্চার মতো টানতে টানতে বলে,

– কপালের ডানদিকে ব্যান্ডেজ কেন? আপনার বাবা আপনার কাছে এ বিষয়ে কিছু বলেছে?

আকাশ থেকে ঠাস করে পরার মতো আশ্চর্য হয়ে গেলেন সুফিয়া। বিস্ময় মাখা চোখে একবুক কৌতুহল মিশিয়ে বলে উঠলেন,

– কার কথা কইতাছ তুমি? যার কথা বুঝাইতাছ হেয় তো সুস্থ! হের আবার ব্যান্ডেজ লাগব কোন হান থিকা?

দু’চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ ওই মানুষটার দিকে ফেলে রেখে আরো দ্বিগুণ উত্তেজিত হলো ফিহা,

– নিজের দু’চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি কপালের ডানকোণে ব্যান্ডেজ! ছোট্ট। উনি সবসময় মাথার ডানদিকে সিঁথি করেন। অথচ আজ তিনি চুলটা বাঁদিকে সিঁথি করেছেন। এই ব্যান্ডেজ আমি গতকাল সন্ধ্যার সময়ও দেখতে পাইনি! দেখুন আপনি। আপনি দেখুন চুল দিয়ে ব্যান্ডেজটা আড়াল করা।

সারা মুখজুড়ে অশান্ত অবস্থা এঁটে থাকলেও ফিহার চোখদুটোতে লেগে আছে ভয়। এই ভয় কীসের ভয় সেটা বুঝতে পারছেন না সুফিয়া। তবে ব্যান্ডেজের কথাটা শুনে উজবুক মন নিয়ে তিনি পাশে দাঁড়ানো ফাহাদের দিকে চাইলেন। ফাহাদ সব কথাই শুনেছে। সে সুফিয়ার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নীরবে বুঝিয়ে দিল, ফিহা সত্যি কথাই বলেছে। এতোদূর থেকে যদিও ছোট্ট ব্যান্ডেজটা সকলের চোখে পড়ার কথা না। এমনকি ফিহার কথাগুলো আড়ি পেতে না শুনলে ফাহাদ নিজেও ব্যাপারটা ধরতে পারতো না। অথচ, সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওইটুকু মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ও পর্যবেক্ষণশীল ক্ষমতা দেখে ভীষণ অবাক হল সে। আড়চোখে দেখতে পায় তার বন্ধুর জন্য ওই ছোট্ট বুকের ভেতরে অসহ্য চিন্তার হুঁল ফুঁটছে। ছটফট করে অস্থিরভাবে ঠোঁট কামড়াচ্ছে। এই চিন্তা কী তবে মনকাননে কোমল অনুভূতির চিহ্ন? নাকি শুধু সহানুভূতির উৎকণ্ঠা?

.

রান্নাঘরে উত্তপ্ত চুলার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আফসানা। চুলায় টগবগ করে ফুটতে ফুটতে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, তবু চায়ের চাপাতা দিতে একটুও হুঁশ নেই। দু’চোখ ভয়ংকর ভাবে স্থির হয়ে সামনের দেয়ালে চেয়ে আছে। কান্না গেলার মতো বারবার ফুলে উঠছে নাকের পাটা। তবে চোখ এখনো শুকনো আছে। ডানহাতের মুঠোয় কাটা চামচের হ্যান্ডেলটা শক্তমুষ্ঠির ভেতর থরথর করে কাঁপছে। জানেন না এই বিয়েবাড়ির আমেজটুকু আর একটা মূহুর্ত কীভাবে তিনি সহ্য করবেন। রোকসানার ভাসুর আলী আজগর দেওয়ান বেশ প্রতাপশালী একজন ব্যক্তি। তার কাছে অর্থের দাপট, বিত্তের জৌলুশ, মানুষকে ছোটো করার ঝোঁক অত্যন্ত বেশি-ই। আজ থেকে ক’বছর আগে যখন এই লোকটাই নিজের একমাত্র কন্যার বিয়ের প্রস্তাবে ঘরজামাই হিসেবে সাঈদকে চেয়েছিল, তা মোটেও মেনে নেননি সচেতন আফসানা। তার কাছে সেসময় দুনিয়াবি সকল ভোগবস্তুর চাইতে ছেলের ইচ্ছা, রুচি ও আত্মসম্মানের গুরুত্ব প্রচুর। ছেলেকে এমন উন্নতমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করেননি যে শ্বশুরবাড়ির হারামের টাকায় আয়েশ লুটতে যাবে। তাই তিনি ঘরজামাই হবার প্রস্তাবটা ঠান্ডা জবাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবু দমেননি মোহাম্মদ আলী আজগর দেওয়ান। একের পর এক চালাকচতুর পন্থা অবলম্বন করে সম্মতির ঢেঁকুরটুকু তখনো পেতে চাইছিলেন। এরপরই আফসানা কড়া কথাটা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন,

– দেখুন ভাইসাব, আমার ছেলেকে আপনি জামাই হিসেবে চাইছেন এটা নিঃসন্দেহে খুশির সংবাদ। কিন্তু আমি আপনার প্রস্তাবে বারবার যেহেতু নাখোশ হচ্ছি, আপনারও উচিত প্রস্তাবের ফিরিস্তি নিয়ে আমার বাড়িতে না আসা। আমার ছেলে উচ্চশিক্ষিত এবং আপনার মেয়ে এইট পর্যন্ত পড়েছে বলে আমি ওদের শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছি এমনটা ভাববেন না ভাই। আমার কাছে মেয়ের গুণ, বৈশিষ্ট্য এবং ছেলেকে সামলানোর মতো গভীর চিন্তাবোধের মূল্য অনেক বেশি। আপনি বাবা হিসেবে যেমন অনৈতিক চাল চেলে আমার সম্মতি পেতে চাইছেন, তেমনি একজন মা হিসেবে আমি চাই আমার ছেলেবউ শুধু ঘরসংসার নয়, পরবর্তী প্রজন্ম নিয়েও যথেষ্ট দায়িত্বশীল হবে।

আফসানার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে গভীর যুক্তিবাণে কিছুক্ষণ অপ্রস্তুত মুখে তাকিয়ে থাকলেন আলী আজগর দেওয়ান। এরপর অসভ্যের মতো হো হো হাসিতে মেতে উঠে হাস্যমুখে বলে উঠেন,

– হবে হবে, সব হবে। আপনার মতো সুন্দরী, গুণবতী, উচ্চ জ্ঞানের মহিলা যদি আমার বাচ্চা মেয়েকে নিজের কাছে রাখেন, ওরে একটু একটু করে শিক্ষা দেন, তাহলে সব পানির মতো পরিষ্কার হবে ইনশাআল্লাহ্। যে পাত্রে রাখবেন ওই পাত্রের মতো আমার বাচ্চা মেয়েটা হয়ে যাবে আপা। একটা টু শব্দও করবে না। আপনি তো আপা এমনি এমনি ব্যাটাছেলেদের মতো কোম্পানি চালাচ্ছেন না . . হে হে. . . সতরো ঘাঁটার ঘোলা জল খেয়েই এ মাঠে খাটতে নেমেছেন। আমার মেয়ে নাহয় বাবার সহায় সম্বলে একটু আরাম আয়েশে থাকল, ক্ষতি কী? ক্ষতি আছে আপা? দুটা কাজের বেটি, একটা বাজার করা ছোকরা, আর সঙ্গে কিছু দানাপানি দিয়ে দিলে তো আপনার পুত্রও খুশি, আমার মেয়েও খুশি। ওদের খুশিতে আমরা খুশি। কী বলেন আপা, খুশি হবেন না?

রান্নাঘরে ধারালো বটিটা হাতে নিয়ে ছটফট করছেন সুফিয়া। যদি এই শয়তানটাকে এখন উঁচুনিচু কিছু করতে দেখেন, তবে এক কোপে ঘাড় থেকে গর্দান নামিয়ে ফেলবেন। এই ভদ্রবেশী অসাধুটা এখনো বুঝতে পারেনি এ বাড়ির দুটো মহিলা ওর মতো নির্লজ্জকে ভয় পায় না। চায়ের শেষ তলানিটুকু পান করে কাপটা টেবিলে রাখলেন আফসানা। রাজেন্দ্রাণীর মতো বাঁকা হাসি দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে উঠেন,

– সতেরো ঘাঁটার জল খেয়ে বিশাল বড়ো কোম্পানি, সেই কোম্পানিতে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান, সকলের একচেটিয়া নিরাপত্তা এবং আপনার মতো বড়ো বড়ো মাপের চাপাবাজদের শায়েস্তা করেই এই মাঠে টিকে আছি। সুন্দরী হলেই বিশ্বজয় করা যায় না। মাথার ভেতরে বিবেকবুদ্ধি এবং সৎ ধরণের মানসিকতা রাখা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, সুন্দরের কথা সবাই মনে রাখে কিন্তু সুন্দর মানসিকতার কথা মনে রাখে যুগ যুগ। আপনার মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো এ বাড়িতে রাণী করে রাখতাম। কিন্তু আপনার মেয়ে কেন এইট পর্যন্ত পড়েই পড়ালেখাটা বন্ধ করল সেটা কিন্তু আমার অজানা নেই। এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে তিনটা উল্লেখ্যযোগ্য কারণ— আপনার ঘরজামাই করার প্রস্তাব, আপনার জান্নাতি টাকার গরম, আমার ছেলেকে নিজের অসৎকর্মে লোভ দেখানোর কুচিন্তা। তাছাড়া আপনার মেয়ে এক সেকেন্ডও আমার ছেলের মেজাজটা সহ্য করতে পারবে না। তাই আমি অভিভাবক হয়ে এটা অবশ্যই চাইব না, বাবা-মায়ের কোনো একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দুটো ছেলেমেয়ের জীবনে ডিভোর্স নামক শব্দ জুটুক। এই শব্দ কতটা ভয়াবহ আর সমাজের নজরে কতটা কুৎসাজনক এটা আমি ব্যাখ্যা দিতে গেলাম না। আপনি অনুগ্রহ করে নিজের ছিঁটেফোঁটা মান-ইজ্জত নিয়ে এবার আল্লাহ্ হাফেজ জানান ভাই। আপনার মেয়ে যথেষ্ট ভালোঘরের যাবার যোগ্যতা রাখে। সেখানে আমার ছেলের সঙ্গে ওর বোঝাপড়া হবে না। হলে নিজেই এ বিয়েতে রাজি করানোর দায়িত্ব নিতাম। এবার আসুন।

মুখ লাল করা রাগ নিয়ে সেদিন চলে যান আলী দেওয়ান। কিন্তু এই ঘটনার রেশ ধরে অত্যাচার চালান রোকসানার উপর। তিনি সারা জায়গায় ছড়িয়ে দেন রোকসানা তার মেয়ের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে সুন্দর প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দেয়। এ ঘটনার হালকা পাতলা খবর আফসানার কান অবধি আসে ঠিকই, কিন্তু পঁচা শামুকে পা কাটার ভুল তিনি মোটেও করেন না। ভেবেছিলেন এই পুরোনো ঘটনার অতীত কালেভদ্রে ভুলে গিয়ে সবকিছু ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু নির্লজ্জভাবে আবারও এই লোক কানের কাছে বলে গেছে,

– আমার নাতিটারে দেখছেন আপা? গেল মাসে দুই বছর হইলো। দেখতে দেখতে ক্যামনে যে এখন সময় যায় আল্লাহ্ জানে! আপনি ওইদিন শুভকাজটা সেরে ফেললে আজকে আপনার দিনটা অন্যরকম হইতে পারতো। গেল মাসে নাতির জন্মদিনে আপনাদের ধানমন্ডির ওইদিকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিয়ে আসলাম। জায়গা-সম্পত্তির কী দাম আপা! গরীব মানুষের জন্য ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট কেনাও খুব কষ্ট হয়ে গেছে। জামাই বাবাটা আবার ভালো আছে। বুঝায় সুঝায় দিছি, আসছে বছর জানুয়ারির দিকে প্লটবাড়ির কিছু জায়গা তাকে বুঝিয়ে দিব। দিনকালের যা অবস্থা চলে আপা, কখন জানি আজরাইল এসে সামনে দাঁড়ায় সারাক্ষণ এই ভয়ে থাকি।

আফসানা এ কথার প্রেক্ষিতে মৃদু হাসেন শুধু। কথার পিঠে কথা তুললে এখুনি এই ভদ্রবেশী জোচ্চোরটার সাথে তর্কযুদ্ধ লেগে যাবে। হয়ত জোচ্চোরটা এরকম কিছু মতলব এঁটে এই ধরণের কথা বলছে। তিনি কীভাবে এসব সহ্য করে আছেন কে জানে। শুধু দীপের দিকে তাকিয়ে চোখটা বন্ধ করে আছেন।

– খালামনি কী করছ তুমি!

ঝটকা লাগার মতো চমকে উঠতেই ডানে তাকালেন আফসানা। ফিহা দৌড়ে এসে তাড়াতাড়ি চাবিটা মোচড় মেরে চুলা নেভাল। চায়ের পানিটা শুকিয়ে পাতিল থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ফিহা একদমই তোয়াক্কা না করে ভীষণ চটানো গলায় বলে উঠল,

– আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি! কী হয়েছে তোমার? তোমার মনযোগ কোথায় থাকে? চুলার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ ধরণের অসর্তক কাজ কীভাবে করো! এখন যদি আমি না আসতাম কী হতো?

আফসানা হেসে দিয়ে ফিহার রাগ মাখানো মুখটা আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে দিলেন। আবারও পাতিলভর্তি পানিটা চুলায় দিয়ে বললেন,

– ধুর পাগল, অতো ভয় পেলে চলে নাকি। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে সংসারের কাজকর্ম শিখবি? থাক! এখন সে কথা বাদ। ছাদে সবগুলো বাতি নাকি নিভে গেছে? ওগুলো কীভাবে নিভল জানিস?

– সেটা তো আমি জানি না। দীপ ভাই জানাল লাইনের মধ্যে কী যেন একটা সমস্যা হয়ে সবগুলো বাতি নিভে গেছে। আর মেইন লাইনে যে সংযোগটা ছিল সেখানে একটা ছোট্ট শর্টসার্কিট হয়েছে। এখন এগুলো কেন হলো, কীভাবে হলো এ প্রশ্নের উত্তর কেউ বলতে পারছে না।

– আজগুবি কাণ্ড না? এভাবে হঠাৎ করে এগুলো নষ্ট হবে কী জন্যে? একটু আগেও তো সব ঠিকঠিক মতো চলছিল।

এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে যায় ফিহা। এতোগুলো মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিল, সবাই বয়সে বড়ো বড়ো বা সমবয়সী, কিন্তু কেউ এটা খেয়াল করল না যে, ওই মানুষটার আগমনেই এমন সব অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হয়েছে। এখনো ফোনের ডানকোণটায় নেটওয়ার্ক নেই। শর্টসার্কিট হবার কারণটুকু এখনো ব্যাখা করা যাচ্ছে না। এ কেমন ঘটনার সংকেত? এগুলো কী সত্যিকার অর্থেই স্বাভাবিক? রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ফিহা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে কোত্থেকে যেন উদয় হলো। ওর পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে থাকলে পুঁচকে পুঁচকে আঙুলে তর্জনী তুলে বলল,

– তোমার নাম কী ফিহা?

ছোট্ট ছেলেটার ভাবভঙ্গি দেখে খিলখিল করে হেসে দিল ফিহা। বয়স বোধহয় চার কী পাঁচ হবে, কণ্ঠে এখনো আধো আধো ভাবটা লুকিয়ে আছে। মুখ জুড়ে কী মায়া মায়া ঘোর! গায়ে সুন্দর একটা কমলা রঙের পান্ঞ্জাবী। বাচ্চাটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসতেই তার নরম তুলতুলে গালদুটো টেনে দিল ফিহা,

– হ্যাঁ, আমিই তোমার ফিহা। তোমার নাম কী জেন্টেলম্যান? তুমি আমার খোঁজ করছ কেন?

ছেলেটা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,

– তোমাকে একজন খুঁজছে। সে বলেছে তুমি তার সাথে এখনই দেখা করো।

কথাটা শুনতেই মরমে মরমে ঠান্ডা শিহরণ অনুভব করল ফিহা। সে ওকে খুঁজছে! এখানে এসে নিশ্চয়ই ওকে খুঁজে গেছে! সকালে যেই কলজনিত কাণ্ডটা করল, এরপর ও তার সামনে কীভাবে হাজির হবে? ছোট্ট ছেলেটা ফিহার গলা জড়িয়ে ধরতেই হঠাৎ দারুণ একটা অপ্রত্যাশিত কাণ্ড করে বসলো! টুপ করে ওর ঠোঁটে চুমু খেল বাচ্চাটা। মিটিমিটি হাসি দিয়ে বলে উঠল,

– সে তোমাকে একটা চুমু দিতে বলেছে। দূর থেকে তো সে চুমু দিতে পারবে না, তাই তার চুমুটা আমিই তোমাকে দিয়ে গেলাম।

ছোট্ট ছেলেটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাতের বন্ধন ছাড়িয়ে ছুটে পালাল। বিয়েবাড়ির হৈচৈ হট্টগোলে মিলিয়ে গেল সে। অথচ, দূর থেকে কারো সুক্ষ্ম মনের সুঁতোয় বাঁধা পড়ে যায় ফিহার মন। কঠিন লজ্জায় দু’চোখ খিঁচিয়ে ঢোক গিলে ও। দূর থেকে ওই মানুষটা কতটুকু অস্থির হয়ে আছে ওর জন্য? কতটা ব্যাকুল হয়ে পড়লে এভাবেও কাজটা করতে পারে? ওর কী একবার যাওয়া উচিত? দেখা কী উচিত কেন কপালের ডানকোণে চোট লেগেছে?

#FABIYAH_MOMO .

#নোটবার্তা : আমার মাথার যন্ত্রণাটা বেড়েছে। সম্ভবত অতিরিক্ত লোড নেবার ফলে এই ধরণের সমস্যা। দেরি করার জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত। আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এখন কিছুটা স্বস্তিতে আছি। মাথাব্যথাটা কমেছে। আলহামদুলিল্লাহ্। ❤

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here