নিভৃতে তেজস্বিনী পর্ব ৭

0
88

#নিভৃতে_তেজস্বিনী
#পর্ব_৭
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

“নিজের ব্যক্তিগত মানুষটাকে আমরা যখন অন্য কারোর সংস্পর্শে দেখি তখন না আমাদের পুরো দুনিয়া থমকে দাঁড়ায়। একজন স্ত্রীর পক্ষে এই বিষয়টা মেনে নেওয়া যে কত বেশি যন্ত্রণার তা কেবল সেই জানে যে এই মুহূর্তের সম্মুখীন হয়েছে। কোনো মেয়েই পারে না তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে। কিন্তু শত অপমান, অবহেলা, লাঞ্ছনা সহ্য করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। আমরা মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের সস্তা বানিয়ে ফেলি। অথচ আমাদের হওয়া উচিত তেজস্বিনী। যে আমাদের তেজের কারণে পুরো পুরুষ জাতির নত হওয়ার কথা সেখানে আমরা তাদের কাছে হয়ে উঠি খেলনা পুতুল। এমনটা কেন হয় বলতে পারিস তারিন? কেন বারবার আমাদেরই পরীক্ষা দিতে হয়? জীবন এতটা জটিল করা উচিত নয় যেখানে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যায়।”

একটা কফিশপে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে সিরাত। সামনেই তার কলেজ জীবনের বান্ধবী তারিন বসে আছে যে কিনা পেশায় একজন আইনজীবী। আজ অনেক দিন পর তারা দু’জন দেখা করল। সিরাত নিজেই ডেকেছে তারিনকে।

সিরাতের মুখ থেকে উপরিউক্ত কথাগুলো শুনে তারিন হতাশ স্বরে বলে,

“তোর সাথে কখনো এমন হতে পারে সেটা হয়তো আমরা কেউই কোনোদিন কল্পনা করিনি রে। যে মেয়েটা পুরো এলাকা কাঁপিয়েছে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিটা ক্ষেত্রে যার পদচারণ ছিল চোখে পড়ার মতো সেই মেয়েটা আজ কাঁদছে? তোর চোখে তো পানি মানায় না রাত। তোর তেজি রূপ কোথায় হারিয়ে গেল? কেন তুই এখনো চুপ করে আছিস?”

চোখের পানি মুছে সিরাত মলিন হেসে উত্তর দেয়,

“আমি এমনি এমনি চুপ করে নেই তারিন। এর পেছনে কারণ আছে। দেখ, রাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি। আমি যদি এখন রাগ করে ওই বাসা ছেড়ে চলে আসি কিংবা বিবাহবিচ্ছেদের কথা ভাবি তাহলে আমি ওদের শা’স্তি দিতে পারব না।”

“ওই অসভ্য ছেলের সাথে থেকে কী করবি তুই? তোর বয়স ই বা কত? সবে তো সাতাশে পা দিলি। তুই চাইলেই আবার নতুন করে সবটা শুরু করতে পারিস।”

“বাচ্চা আছে তোর?”

সিরাতের এমন প্রশ্নে তারিন স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়,

“না। আমার বিয়েই তো হলো দেড় বছর আগে। এখনো এসবের পরিকল্পনা করিনি আমরা।”

“শোন, তোকে আজ কিছু কথা বলি। মনোযোগ দিয়ে শুনবি কিন্তু।”

“আচ্ছা বল।”

“আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই অনেক ডিভোর্স হচ্ছে। এটা এখন খুব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। একসাথে থাকতে না পারলে ডিভোর্স নেওয়া অন্যায় নয়। তবে যাদের সন্তান আছে তারা যখন বিবাহবিচ্ছেদের পথে পা বাড়ায় তখন কি একবারের জন্য হলেও সন্তানের কথা ভাবে? আমি সংসার করতে পারছি না। আমার স্বামীর সাথে আমি থাকতে পারছি না৷ তাই ডিভোর্স একমাত্র সমাধান। ঠিক আছে, ডিভোর্স হয়ে গেল। এরপর আমি নতুন করে জীবন শুরু করলাম অন্য একজনের সাথে। আমার প্রাক্তনও বিয়ে করে সুখেই আছে। মাঝখান থেকে সমুদ্রের মাঝে আটকে গেল নিষ্পাপ সন্তানেরা। মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ দেখা, তাদের নতুন করে জীবন শুরু করতে দেখা, সবকিছুই দেখে বাচ্চাগুলো। কিন্তু এসবের জন্য নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়ে তা কেউ জানে না। আরে ভাই, আমি যদি বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাকে ঠিকভাবে বড়ো করে তুলতেই না পারি তাহলে আমার বাচ্চা নেওয়ার কী দরকার? বাচ্চার বাবা সন্তানের কথা ভাবেনি বলে আমিও মা হয়ে ভেবে দেখব না আমার বাচ্চা কীসে ভালো থাকবে? তাহলে আমি মা হলাম কেন? আজীবন যদি নিজের কথা ভেবেই চলতে হয় তাহলে তো বাচ্চা জন্ম দেওয়ার দরকার নেই।”

“মানছি তোর কথাগুলো ঠিক। কিন্তু বাচ্চার কথা চিন্তা করে নিজের জন্য একটুও ভাববি না তুই?”

“আচ্ছা ধরে নে, তোদের কথা মেনে নিয়ে আমি মাহতাবকে ডিভোর্স দিলাম। এরপর অন্য একজনকে বিয়ে করলাম। সে বিয়ের আগে কথা দিল, আমার মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো করেই আগলে রাখবে। কিন্তু বিয়ের পর যদি সে বদলে যায়? আমার মেয়েকে যদি নিজের মেয়ে ভাবতে না পারে? যদি বলে মেয়েকে হোস্টেলে দিয়ে দাও? অথবা এমন হলো যে সেই সংসারেও আমি সুখী হলাম না। তখন তোরা কী বলবি? একেও ডিভোর্স দিয়ে দে। আবার নতুন করে জীবন শুরু কর। এটাই বলবি তো?”

তারিন কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে সিরাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“তুই তো আইনজীবী। তোর কাছে তো ডিভোর্স এর কেসই সবচেয়ে বেশি আসে। তুই যাদের ডিভোর্স করিয়েছিস তাদের মধ্যে কারোর যদি বাচ্চা থাকে তাহলে একদিন তার সাথে দেখা করে জিজ্ঞাসা করিস, তুমি ভালো আছ তো? আমি ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি সেই বাচ্চার উত্তর হবে, আমি ভালো নেই। নিজের বাবা-মা ছাড়া আমি ভালো নেই। আমার বাবা-মা আমার কথা একবারও ভাবেনি। আমি ওদের ঘৃণা করি। হ্যা, বেশিরভাগ সন্তানই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তাদের ঘৃণা করতে শুরু করে। আমি চাই না আমার মেয়েও আমাকে ঘৃণা করুক। আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলুক, মাম্মা তুমিও আমার কথা ভাবলে না। নিজের জীবন সুন্দর করে সাজাতে গিয়ে আমাকে একা করে দিলে। আই হেইট ইউ মাম্মা!”

নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে সিরাতের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তারিন। কাঁধে হাত রেখে সাহস যোগায় তাকে।

“তুই চিন্তা করিস না। আমরা আছি তোর পাশে। শুধু আমি না, আমাদের পুরো বন্ধুমহল পাশে আছে তোর। তুই যা ভাবছিস সেটাই কর৷ আমাদের বিশ্বাস আছে তোর উপর। অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকার মেয়ে তুই না। ডিভোর্স দিবি কি-না এটা সম্পূর্ণ তোর বিষয়। তবে যেকোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবি।”

“এজন্যই আজ তোকে এখানে ডেকেছি। আমার এখন তোকে প্রয়োজন।”

“বল কী সাহায্য দরকার তোর?”

“তোর ননদ ল্যাবে কাজ করে না?”

“হ্যা রাবেয়া ল্যাবে কাজ করে।”

“আমার দু’টো জিনিস দরকার যেটা শুধুমাত্র রাবেয়া দিতে পারবে।”

“কী লাগবে?”

সিরাত কিছু একটা ভেবে ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে বলে,

“এর ভেতরে সব লেখা আছে। যেভাবেই হোক, আগামী সাত দিনের মধ্যে আমার এগুলো চাই।”

“আচ্ছা আমি ওকে বলব। তুই সময়মতো তোর জিনিস পেয়ে যাবি।”

“আজ তাহলে উঠি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আবার দেখা হবে আমাদের।”

“সাবধানে যা।”

তারিন নাবিহাকে কোলে নিয়ে আদর করে হাতে একটা উপহারের প্যাকেট দিয়ে বিদায় জানায় তাদের। বান্ধবীর থেকে বিদায় নিয়ে কফিশপ থেকে বের হওয়ার সময় কিছু একটা দেখে থেমে যায় সিরাত। একজনকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। নিজের ফোনের ক্যামেরা অন করে সেই ব্যক্তির কিছু ছবি তুলে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

অন্যদিকে নিমু আজও তুলির সাথে দেখা করতে এসেছে। একটা খাম তুলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,

“এখানে পঁচিশ হাজার টাকা আছে। তুই ভাইকে দিয়ে দিস।”

“আচ্ছা দিয়ে দেব। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে নিমু? তোর ভাই তোকে ব্ল্যাকমেইল করে দিনের পর দিন টাকা নিচ্ছে। আর তুই কোনো স্টেপ নিচ্ছিস না কেন? কী এমন জানে সে তোর বিষয়ে যার জন্য এভাবে ভয় পাচ্ছিস তুই?”

“এখন এসব কথা থাক। তোকে আমি সব বলব সময় করে। আপাতত এই বিষয় নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।”

নিমুকে ঘাবড়ে যেতে দেখে তুলি আর কিছু না বলে টাকাগুলো নিয়ে চলে যায়। তুলি চলে গেলেও নিমুর ভয় দূর হয় না। ঠাণ্ডার মাঝেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে তার।

“নিজের সুখের জন্য আমি যা যা করেছি তা জানাজানি হয়ে গেলে আমি শেষ হয়ে যাব। আমার অতীত সামনে আসা যাবে না। মাহতাবকে কিচ্ছু জানতে দেওয়া যাবে না। তার জন্য যা করার দরকার আমি সব করব।”

চলবে??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here