নিভৃতে তেজস্বিনী পর্ব ১৩

0
87

#নিভৃতে_তেজস্বিনী
#পর্ব_১৩
#লেখায়_নামিরা_নূর_নিদ্রা

গোসল করার সময় মাহতাব আর নিমুকে একসাথে চিৎকার করতে দেখে সিরাত আপনমনে চানাচুর চিবোতে থাকে। পাশেই নাবিহা ক্লে দিয়ে খেলছে। বাবার চিৎকারের আওয়াজ শুনে সে মা’কে প্রশ্ন করে,

“বাবা এভাবে চিৎকার করছে কেন মাম্মা?”

“তোমার বাবা পঁচা তো, শীতকালে গোসল করতে চায় না। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে হচ্ছে তো তাই এমন করছে।”

“আন্টি চিৎকার করছে কেন? আন্টিও কি পঁচা?”

“হ্যা সোনা, তোমার আন্টিও পানি দেখলে ভয় পায়। তুমি ওদিকে পাত্তা দিয়ো না আম্মু।”

মেয়েকে এমন কথা বললেও সিরাত জানে আসল ঘটনা কি!
নাবিহাকে ঘরে রেখে দরজা কিছুটা চাপিয়ে দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে সিরাত। মাহতাব ভেজা শরীরে ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে একটা চেয়ার টেনে বসে। সাথে ফ্যানও ছেড়ে দেয়।

“এই শীতকালে তোমার গরম লাগছে? গন্ডা*রের চাম*ড়ায় পরিণত হলো নাকি তোমার শরীর?”

সিরাতের কথায় দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকায় মাহতাব। হলদে ফর্সা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লালচে দাগ পড়েছে। পিঠ, হাত, বুক, সবখানে ছোপ ছোপ লালচে দাগ। শরীরে হাত বুলাতে বুলাতে মাহতাব ভীষণ রাগী কণ্ঠে বলে,

“গোসলের পানি এত গরম কীভাবে হলো?”

“ওমাহ্ সেটা আমি কীভাবে জানব?”

“তুমি আসার পর থেকেই গোসলে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিলে আমাদের। এসব ইচ্ছে করে করেছ তাই না?”

“আমি তো একটু আগেই বাসায় আসলাম। এসব করব কখন? সবসময় আমাকে দোষ দেওয়া বন্ধ করো তুমি। কিছু হলো কি হলো না, সব দোষ আমার!”

আচানক নিমু এসে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় সিরাতকে। আকষ্মিক ঘটনায় সিরাত ছিটকে গিয়ে টেবিলের এক কোণার সাথে পা লেগে ভীষণ ব্যথা পায়। ব্যথায় চোখ বন্ধ করে নিয়ে মৃদু আওয়াজ করে ওঠে সে। বেশ কিছুক্ষণ পর কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে নিমুর দিকে তাকায়। নিমুর মুখের একাংশ ভীষণ লাল হয়ে আছে। চোখে তার তেজি ভাব। সিরাতের দিকে তাকিয়ে আঙুল নাচিয়ে বলে,

“আমি জানি এসব তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছ। দিন দিন তোমার অত্যা*চার বেড়েই চলেছে। অনেক সহ্য করেছি, আর না। এরপর একদম ছাড় দেব না বলে দিলাম।”

নিমুর এমন ব্যবহার মোটেই মেনে নিতে পারে না সিরাত। কোনোকিছু না বলে নিমুর গালে হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দেয় সে। তার এমন ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে যায় মাহতাব। সে কিছু বলার আগেই সিরাত বলে ওঠে,

“এই ভুল দ্বিতীয় বার করার চেষ্টাও করবে না। আমার গায়ে সামান্য আঘাত লাগলেও আমি তার চেয়ে তিনগুণ পরিমাণ বেশি আঘাত ফিরিয়ে দিতে জানি। এতদিন চুপ করে আছি তার মানে এই নয় যে আমি কিছু বলতে পারি না। আমি সহজে কারোর উপর হাত তুলি না। কিন্তু একবার হাত উঠে গেলে আমাকে সামলানো কঠিন হয়ে যায়। আজ কেবল একটা থা*প্পড় খেয়েছ৷ এরপর আমার সাথে লাগতে এলে কতগুলো খাবে সেটার হিসেব কিন্তু আমার কাছেও নেই। তাই বলছি, সাবধান হয়ে যাও।”

ব্যথায় ফুলে যাওয়া পা নিয়ে ঘরে চলে যায় সিরাত। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল বেশ খানিকটা ফুলে গিয়েছে। পা নাড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে নিমুর গালেও বেশ ভালো রকমের ব্যথা শুরু হয়েছে। মাহতাবের পাশে বসে নিমু কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,

“আমাকে এভাবে ওই মেয়েটা মা*রল, আর তুমি কিছু বললে না?”

“তোমারই বা ধাক্কা দেওয়ার কি দরকার ছিল?”

“এখন সব দোষ আমার তাই না? আগের বউয়ের প্রতি প্রেম বেড়েছে তোমার। এখন সব দোষ তো আমারই দেখবে তুমি।”

“আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। সিরাতের থেকে দূরে থাকায় ভালো। কারণ ওর নতুন রূপের সাথে আমি নিজেই মানিয়ে নিতে পারছি না।”

“আমার মুখের বারোটা বেজে গেল। আমাকে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ো। আমি ফেসিয়াল করতে যাব।”

“ত্রিশ হাজার টাকা? এত টাকা দিয়ে কী করবে তুমি?”

“ফেসিয়াল করব বললামই তো।”

“আমার কাছে এখন টাকা নেই।”

“আমি টাকা চাইলেই তোমার কাছে টাকা থাকে না। টাকা নেই তো আমাকে বিয়ে করেছ কেন? এভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য?”

“রাগ করো না নিমু। আচ্ছা আমি টাকা দিলে খুশি হবে তো? আগামীকাল পেয়ে যাবে।”

“সত্যি বলছ?”

“হুম সত্যি।”

নিমুর চোখেমুখে খুশির আমেজ দেখা দেয়। মাহতাবকে জড়িয়ে ধরে সে বলে,

“এজন্যই আমি তোমাকে এত্ত ভালোবাসি।”

“এখন ফ্রেশ হয়ে নাও। আমিও ভালোভাবে গোসল করে আসি। শরীর এখনো জ্ব*লছে গরম পানির জন্য।”

“তোমার ওই বউকে একটা উচিত শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব আমি।”

মাহতাব কিছু না বলে উঠে যায়৷ নিমু গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার খোঁজে। কিন্তু আজ বাসায় কিছুই রান্না করা হয়নি। ক্ষুধার জ্বালায় ফ্রিজ থেকে বাসি রুটি আর তরকারি বের করে খেয়ে নেয়। আর কিছুটা খাবার মাহতাবের জন্য রেখে দেয়।

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘরে যাওয়ার সময় দরজার সামনে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমড়ে আঘাত পেয়ে মাটিতে বসে পড়ে নিমু। তার চিৎকারে তড়িঘড়ি করে গোসল সেরে বের হয় মাহতাব। নিমুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“কী হলো আবার? চিৎকার করছ কেন?”

“কে যেন দরজার সামনে তেল ফেলে রেখেছে। এটা নিশ্চয়ই সিরাতের কাজ। এই মেয়েকে আমি খু*ন করে ফেলব বলে দিলাম।”

“আচ্ছা আচ্ছা তুমি শান্ত হও। তোমার আওয়াজ আশেপাশের সবার কানে পৌঁছালে যাচ্ছে তাই কাণ্ড ঘটে যাবে।”

“কোমড়ে এত ব্যথা পেয়েছি যে এখন নড়তেই পারছি না। তুমি ওই মেয়েকে কিছু বলবে? নাকি আমিই ওর একটা ব্যবস্থা করব।”

“আগে তোমাকে ঘরে রেখে আসি। তারপর ওর সাথে কথা বলছি।”

নিমুকে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে মাহতাব সিরাতের ঘরের সামনে গিয়ে কড়া নাড়ে। একটু পর দরজা খুলে দিলে মাহতাব সিরাতের দিকে তেড়ে এসে বলে,

“সমস্যা কী তোমার? নিমুর পেছনে এভাবে লেগেছ কেন? মেয়েটা কত কষ্ট পেয়েছে কোনো ধারণা আছে তোমার?”

সিরাত মাহতাবের দিকে এক ধ্যানে চেয়ে মলিন হেসে বলে,

“আধ ঘন্টা আগে আমিও পায়ে ভীষণ ব্যথা পেয়েছি। কই? তুমি তো আমার খোঁজ নিলে না একবারও৷ আমি কতটা ব্যথা পেয়েছি, ওষুধ খেয়েছি কি-না এসব তো জানতে চাইলে না তুমি। নিমু কষ্ট পেয়েছে এটা তোমার কাছে এত বড়ো হয়ে গেল যে আমার কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে গেলে তুমি? আরে আমি তো তোমার সন্তানের মা। আমি ছাড়া নাবিহার যত্ন নেওয়ার মতো কেউ নেই এখানে। এমন অবস্থায় আমার কষ্ট একবারও ভাবাল না তোমায়? এতটা স্বার্থপর কবে হলে তুমি?”

“এত ন্যাকামি করছ কেন? ঘরে তো ওষুধ আছে। ওষুধ খেয়ে নিলেই ব্যথা দূর হয়ে যাবে। আর শোনো, সারাক্ষণ আমাদের পেছনে পড়ে না থেকে বাচ্চাকে সময় দাও। সেটা বেশি ভালো হবে তোমার জন্য।”

কথাটা বলে চলে যায় মাহতাব। সিরাত দরজার কোণ ঘেঁষে বসে পায়ে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

“তোমাকে যেমন ভালোবেসে আগলে রাখতে জানি, প্রয়োজনে সেভাবেই ভেঙে চু*রমা*র করতেও জানি আমি। মেয়েদের ভালোবাসা খুব তীব্র হয়। কিন্তু একবার সেই ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত হলে সেটাও ভীষণ তীব্র হয়। আমাকে তুমি যতটা কষ্ট দিয়েছ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কষ্ট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব কথা দিলাম। আজ অবধি যা যা করেছি তা ট্রেইলার ছিল। আগামীকাল থেকে আমি যা যা করব সেটাই হবে আসল খেলা। মিস্টার মাহতাব শাহরিয়ার শেখ তুমি যেভাবে আমার জীবন নিয়ে খেলছ আমি ঠিক সেভাবেই তোমার অস্তিত্ব নিয়ে খেলব। তৈরি হও তার জন্য।”

চলবে??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here