তোর পরশে প্রেম পর্ব ১১

0
72

#তোর_পরশে_প্রেম
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -১১

নিজের বাবার লাশ কাঁধে করে, বয়ে এনে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার মত কঠিন কাজ হয়তো পৃথিবীতে নেই। রাতটা কিভাবে পার করেছে সেটা হয়তো পরশ ছাড়া আর কেউ জানেনা৷
যেই মানুষটার হাত ধরে চলতে শেখা আজ তাকেই কাঁধে তুলে নিয়েছে বিদায় দেয়ার জন্য।ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে মসজিদে নামাজ পরতে যাওয়া। বাবার নকল করা। হুবহু বাবার মত হওয়ার কত চেষ্টা করেছে।ভালো, খারাপ সব সময় যে মানুষটা পাশে থেকে সাপোর্ট দিয়ে এসেছে। সেই মানুষটা আর পৃথিবীতে নাই।
অপেক্ষা করতে, করতে একটা সময় আমরা মায়া ছেড়ে দেই। কিন্তু তুই মনে রাখিস এই কবরের মাটির সাথে আমি তোর প্রতি থাকা ভালোবাসাও মাটি দিয়ে দিচ্ছি। হারিয়ে যাওয়া জিনিস হয়তো ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু আমি তোকে কখনো ফিরে পেতে চাইনা। তুই ফিরে আসবি তবে আমার আর তোর আর এক হওয়া হবে না।আমি খুঁজবো না তোকে কোন পথে, ভেবে নেবো অতিথি পাখি উড়ে গেছে খাঁচা ছেড়ে।
পলাশ সাহেব পরশের কাঁধে হাত রাখলেন। পরশ উঠে পলাশ সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘মন খারাপ করে না। তুই তো আমার সাহসী ছেলে। জীবনে কত রকম পরিস্থিতি পার করতে হবে,ভেঙে পরা যাবে না।
‘জানাজায় পরাণ ছিলো৷ এখনো দাঁড়িয়ে আছে এককোণে। চোখ দুটো নিজের অজান্তেই কেমন ভিজে উঠলো৷ মনে পরে গেলো সেদিনের কথা…..
‘পরাণ চল আমি তোকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি। ছোট বেলায় না বুঝে যা ভুল করেছিস সে-সব সবাই ভুলে গেছে। যা হওয়ার হয়েছে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চল।
‘বাহহহ মিস্টার পিয়াস বেপারী বাহহহ, আজ হঠাৎ মনে পরলো আমি ঘরের ছেলে! এতোদিন মনে পরেনি? আমি সেদিন বুঝতে পারিনি প্রিয়াকে ধাক্কা দিলে ও ওখান থেকে পরে মারা যাবে। কিন্তু আপনারা একটা আট বছরের বাচ্চাকে সাজা দিয়ে দিলেন! আমি একা থাকা শিখে গেছি। আর বছর খানিক পর ডাক্তার হয়ে যাবো আর আমার বিজনেস ও এগিয়ে যাচ্ছে এখন আর আপনাদের কাউকে আমার চাই না৷
‘তুই কিসের বিজনেস করিস?
‘নারী পাচার। আপনি কি পার্টনার হবেন মিস্টার পিয়াস বেপারী ?
‘পিয়াস সাহেব স্ব-জোড় এক চড় দিয়ে বলে,আজকের পর থেকে মনে করবি তোর কোন পরিবার নেই তারা তোর জন্য মৃত।
‘তা আমি আগে থেকেই মনে করি। তবে একটা শর্তে আমি ফিরে যেতে পারি। আপনার এক ভাতিজীকে হ্যতার অভিযোগে এতো বছর আমি একা থেকেছি, এবার আপনার আরেক ভাতিজীকে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিন।খুব মনে ধরেছে মেয়েটাকে।
‘আমি বেঁচে থাকতে তা সম্ভব না। তোর মত জানোয়ারের সাথে আমার আদরের ফুলকে কখনোই তুলে দেবো না।
‘ওকে মিস্টার বেপারী এখন না হোক আপনার মৃত্যুর পর না হয় বিয়েটা করবো আপনার আদরের ফুলকে।
সে-সব কথা ভাবতে ভাবতে পরাণ ছুটে এলো নিজের বাবার কবরের কাছে। পরাণের সাথে দু’জন পুলিশ এসেছে। পরাণ বাবার কবের উপর মাথা রেখে বলে,বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। ছোটবেলায় না-বুঝে ভুল করেছিলাম আর বড় হতেই নিজের আপন মামা আমাকে ভুল পথে ছেড়ে দিয়েছে৷ বাবা আমার তখন অনেক কষ্ট হতো তোমাদের ছেড়ে থাকতে। সেই কষ্ট বাড়তে বাড়তে তোমাদের উপর ঘৃণা জমেছিল। বাবা আমি ভালো হয়ে যাবো একবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলো, বাবা পরাণ এদিকে আয় তো। সেই ছোট বেলায় যেভাবে বলতে একবার সেভাবে ডাকো বাবা।
‘পলাশ সাহেব পাশ থেকে বলেন,সময় চলে গেলে আর ঘুরে আসে না। আর মানুষ মারা গেলে আর ফিরে আসে না। তুমি যদি সত্যি তোমার ভুল বুঝে থাকো,তবে আমাদের এই কেস সলভ করতে সাহায্য করলে, আমি তোমার শাস্তি কম করতে পারবো।
‘পরাণ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,চাচ্চু তোমার মেয়েকে আমি এই হাতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম। বিশ্বাস করো চাচ্চু আমি বুঝে দেইনি। আমি জানতাম না ও পরে গেলে মারা যাবে।তোমরা তো জানতে প্রিয়া আমার খেলার সাথী। চাচ্চু একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরতে দিবে?
‘পলাশ সাহেব পরাণকে জড়িয়ে ধরলেন।

✨বাড়ির এমন পরিবেশ তবুও সুফিয়া বেগমের চিন্তা তার মেয়েকে নিয়ে। পুরো একটা রাত কেটে গেলো এখনো তার মেয়েটার কোন খোঁজ নেই। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেন।নিজের ভাইদের লাগিয়েছেন পুতুলের খোঁজ নিতে।
সুফিয়া বেগম নিলুফা বেগমের রুমে আসলেন।
নিলুফা বেগম বেডের সাথে মাথা ঠেকিয়ে আনমনে বসে আছেন। চোখের কার্নিশ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরছে। সুফিয়া বেগমকে দেখে করুণ স্বরে বললেন,মেয়েটার কোন খোঁজ পেলি?
‘না ভাবি আমার মেয়েটার কোন খোঁজ নেই।তোমরা সবাই মিলে আমার মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে দূর করে দিয়েছো। আমার এক মেয়েকে তোমার বড় ছেলে খুন করেছে আর এখন ছোট মেয়েটাকে তোমারা সবাই মিলে তাড়িয়ে দিলে। কেন করলে এমন? তুমি না বলতে, পুতুল তোর না আমার মেয়ে। তাহলে আজ মেয়ের কোন খোঁজ নেই কেন?সবাই স্বার্থপর ভাবি। আমিও স্বার্থপর তাই আমার মেয়েকে ফেরত চাই।এক মেয়েকে হারিয়েছি এই মেয়েকে হারাতে পারবো না।কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই আমার মেয়েটাকে নিয়ে।
‘জুলিয়ার আম্মু লিজা বেগম বলেন,ভাবি তুমি কি জানো তুমি যার সাথে কথা বলছো,সে সদ্য স্বামীহারা হয়েছে! তোমার মেয়ে জীবত আছে। সে যেখানেই আছে নিজের ইচ্ছেতে আছে। আর যে মানুষটা চলে গেছে সে আর কখনো ফিরে আসবে না। তোমার মেয়ে এতো অবুঝ তাহলে সে তোমাকে না বলে কেন গেলো?
‘সুফিয়া বেগম কেঁদে, কেঁদে বলে,আমি স্বার্থপর আর আমার মেয়ে নিজের ইচ্ছেতে যায়নি তাকে বাধ্য করা হয়েছে।
‘পরশের বড় ফুফু আয়েশা বেগম বলেন,এই বাড়িতে আমি কোন অশান্তি চাই না। আমার ভাইটা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তোমার মেয়ের চিন্তা করতে ইচ্ছে হলে,এই বাড়ির চৌকাঠ পার হয়ে করো। বলেই কান্না শুরু করলেন।
‘সুফিয়া বেগম উঠে নিজের রুমে আসলেন।নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে তার ভাইকে বললেন,চলো আমি আর এ বাসায় থাকবো না। আমার মেয়ে আমার কাছে আগে। তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।


মাহমুদ সাহেব বললেন,শাওন আমাকে সবটা বলেছে,তোমার আশাকরি আমাদের বাসায় কোন সমস্যা হবে না। আমার মেয়ের মতই থাকবে।আর ঠিকমত পড়ালেখা করবে।
‘আঙ্কেল আমি একবার বাসায় কথা বলতে চাই।
‘জার্নি করে এসেছো যাও ফ্রেশ হয়ে আগে কিছু খেয়ে নাও৷ তারপর তোমার সাথে আমার কথা আছে। এরপরে তোমার যা ইচ্ছে ডিসিশন নেবে।
‘রাবেয়া বেগম বলে,নিরব তুইও যা ফ্রেশ হয়ে আয়।তোদের দুই ভাইবোনকে একসাথে খাবার দেবো।
‘নিরব অবাক হয়ে বলে,ভাই বোন মানে?এই মেয়ে আমার বোন না। সে মিস চাঞ্চল্যবতী ব্যাস এই বোন-টোন বলবা না একদম।
‘রাবেয়া বেগম হেসে বলে যা তুই আগে ফ্রেশ হয়ে আয়।
‘পুতুল তখন দাঁড়িয়ে আছে। কোন রুমে যাবে তাতো,জানেনা।
‘রাবেয়া বেগম বললেন,মা’তুমি আমার সাথে চলো। আজকে থেকে আমার মেয়ের রুমে তুমি থাকবে। আসো তোমাকে রুম দেখিয়ে দেই। পুতুল রাবেয়া বেগমের পিছু পিছু রুমে গেলো। পুতুলের মনে কোন শান্তি নেই। কেমন অস্থীর লাগছে। ভিষণ কান্না পাচ্ছে। ওয়াশরুমে ঢুকেই ট্যাপ ছেড়ে কান্না শুরু করে দিলো। কখন মায়ের থেকে দূরে থাকেনি পুতুল। পুতুল কাঁদতে কাঁদতে বলে, তোমাকে কখন ক্ষমা করবো না পরশ ভাই। আমার জীবন থেকে আমার সব কেড়ে নিয়েছো তুমি। আমি কি করে থাকবো? আমার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here