তুমি নামক প্রশান্তি পর্ব ৫

0
387

#তুমি_নামক_প্রশান্তি
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_পাঁচ

“নীল আমি চাইনা ডিভোর্সি একটা মেয়ের ছায়া তোর উপর পড়ুক। নিজের জীবনটাকে তো নষ্ট করেছে। এখন তোর জীবনটাও নষ্ট করব। ”
মায়ের কথা শুনে নীলাভ্র ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো। সীমা চায়ের কাপটা নীলাভ্রর দিকে এগিয়ে দিলো। আবারো বললো,
“আমি কি বলি শুনতে পাচ্ছিস? ”
নীলাভ্র চায়ের কাপটা নিতে নিতে ঝটপট উওর দিলো,
“মা আমি তোমাকে বারণ করেছিলাম বেলীকে নিয়ে বাজে কথা বলবে না। ওকে নিয়ে তোমার এত না ভাবলেও চলবে। ওকে নিয়ে ভাবার জন্য ফুপ্পি আছে। ”
ছেলের কথা মনে ধরলো না সীমার। তাই কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলতে লাগলো,
“দেখ বাবা? আমি তোর মা। তোর কোনো ক্ষতি হোক আমি চাইনা। তাইতো এত দুশ্চিন্তা করি।”
রাগে নীলাভ্রর শরীর জ্বলে উঠলো। মা না হয়ে অন্যকেউ হলে এতক্ষণে কি কি বলতো ও নিজেও জানেনা? মাথা ঠান্ডা রেখেই জবাব দিলো,
“মা তুমি এখন যাও। আমার কাজ আছে। ”
নীলাভ্রর কথা শেষ হতেই, সীমা কিছু বলার জন্য তৈরি হলো। কিন্তু বলতে পারলো না। নীলাভ্রই বললো,
“আর একটাও কথা শুনব না আমি। যাও তুমি প্লিজ।”
সীমা বুঝতে পারলো ছেলের সাথে এখন কিছু বললে হিতের বিপরীত হবে। তাই কিছু বললো না। স্নেহের সাথে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলো। তিনি যেতেই নীলাভ্র হাফ ছাড়লো। মনে মনে আওড়াতে লাগলো,
“মা তো আগে বেলীকে কত ভালোবাসতো। তাহলে কেনো হঠাৎ এমন হয়ে গেলো? বেলী ডিভোর্সি সেই জন্য নাকি এর মধ্যে অন্য কারন আছে?”
ভাবতে পারলো না। ঘড়ির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে একবার তাকালো। রাত ১২টা বেজে ৫ মিনিট। কিছুতেই আজ কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। বেলীর কোমরের পোড়া ক্ষতটা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মেয়েটাকে কি অসহ্য যন্ত্রণা দিয়েছে? ভাবতেই শরীর শিউরে উঠছে। চোখের সামনে একবার বেলীর অসহায় মুখটা ভাসলো। সেদিন যদি তানিশা ঠিক টাইমে খবর না দিতো। তাহলে, কি হতো? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে লাগলো। নিজেকে শান্ত করার জন্য একবার বেলীর রুমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। রুমের দরজার বাইরে এসেই থেমে গেলো। এত রাতে একটা মেয়ের রুমে যাওয়া কি ঠিক হবে? যতই মেয়েটা ওর আপনজন হোক। তাও মস্তিস্ক সায় দিলো না। তাই আবার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। নীলাভ্র পেশায় একজন ডান্সার। কিন্তু, কয়েকমাস হলো ডান্সের থেকে দূরে আছে। আগে অল্পস্বল্প রাজনীতি করলেও এখন সম্পূর্ণ জড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করা মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করছে৷ সেই দিক দিয়ে নীলাভ্রর দিন দিন শত্রুর সংখ্যা বাড়ছে। বিছানায় মাথা রেখে বালিশটাকে বুকে জড়িয়ে পুরনো কিছু ভাবনায় ডুব দিলো। তখনি হুট করে মাথায় আসলো ‘রাফিন কাগজটায় কি লিখেছিলো? যে করেই হোক জানতে হবে।’

ভার্সিটিতে যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও সবার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যেতে হচ্ছে বেলীকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়ে একটা আকাশী কালার থ্রি-পিস পড়ে নিলো। চুলগুলো বেনুনী করে নিলো। খাবার খেয়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই পেছন থেকে নীলাভ্র চেঁচিয়ে বললো,
“গেটের বাইরে এক পা রাখবিনা। গাড়িতে উঠে আয়।”
বেলী পেছনে তাকালো। নীলাভ্র গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। আজকেও চোখে মোটা ফ্রেমের একটা চশমা। শ্যামবর্ণ গায়ের রঙে ছেলেদের একটু বেশিই সুন্দর লাগে। নীলাভ্রকে দেখে মাঝে মাঝে বেলী ভাবে ‘ছেলেদের জন্যই শ্যামবর্ণ রঙটা পারফেক্ট’। কি ব্যাপার? আজ নীলাভ্রও আকাশী রঙের শার্ট পড়েছে। বেলীর অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো,
“ম্যাচিং হয়ে গেলো কি করে?”
ছোট ছোট চোখ করে নীলাভ্রর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে । তা দেখে নীলাভ্র বড়সড় ধমক দিয়ে বললো,
“কচ্ছপের গতীতে হাঁটলে আজ আর ভার্সিটি যাওয়া লাগবে না তোর। ইডিয়েট।”
নীলাভ্রর ধমক খেয়ে বেলী তাড়াতাড়ি হেঁটে আসলো। পেছনের সীটে বসার জন্য দরজা খুলতেই, নীলাভ্র বললো,
“আমার পাশে বসলে কি আমি খেয়ে ফেলবো?”
বেলী মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ ‘না’। কেউ আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ যে যার জায়গায় উঠে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বেলীকে শান্ত স্বরে বললো,
“সীট বেল্টটা বেঁধে নেওয়ার জন্য কি তোকে দাওয়াত দিতে হবে?”
বেলী কেমন চোখে নীলাভ্রর দিকে তাকালো। উত্তর না দিয়ে বেল্ট বাঁধতে লাগলো। গাড়ির মধ্যে দুজনের একজন ও কথা বললো না। ভার্সিটির সামনে এসে গাড়ি থামলো। বেলী নেমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, নীলাভ্র কেমন বিষন্ন কন্ঠে ডেকে উঠলো,
“বেলীপ্রিয়া”
বেলীর মনে হলো ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠলো। এই কন্ঠস্বর এত নেশালো কেনো? একবার ডাকলে না ফিরে কোনো উপায় নেই। বেলী মুখে হাসি টেনে বললো,
“কি বলবেন নীলাভ্র ভাই?”
প্রশ্ন শুনে নীলাভ্র সময় নিলো না। উত্তর দিলো,
“আমাকে একবার ভালোবাসলি না কেনো?”
প্রশ্নটা শুনেই বেলীর মনে হয় ওর গলা কেউ আচমকা চে’পে ধরলো। হঠাৎ প্রশ্নে থমকালো কিছুক্ষন। ভাষা গুলো হারিয়ে গেলো। উত্তর দেওয়ার জন্য অবশিষ্ট কোনো ভাষা নেই। কোথাও নেই? এমন প্রশ্ন কেনো করলো হঠাৎ? বেলী উত্তর না দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। ভার্সিটির ভেতরে ঢুকে যেতেই নীলাভ্র তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বললো,
“বেলীপ্রিয়াও একদিন নীলাভ্রকে ভালোবাসবে। খুব ভালোবাসবে। শুধু দেরি না হয়ে যায়।”


বেলী ক্যাম্পাসে ঢুকে গোল চত্বরের বেঞ্চ গুলোতে বসলো। নীলাভ্রর প্রশ্নটায় মন,মস্তিস্কে ঝড় বইছে। এই ঝড়ের শব্দ কি কেউ শুনতে পাচ্ছে? কেউ কি দেখতে পাচ্ছে বেলীর ভেতরটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে? চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই বেলী মুছে নিলো। আনমনে বললো,
“আপনার বেলীপ্রিয়া আপনাকেই ভালোবাসে নীলাভ্র ভাই৷ আগেও ভালোবাসতো, এখনো বাসে, সারাজীবন বাসবে। ”
এর মধ্যেই কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পেয়ে হকচকালো বেলী। দেখলো তানিশা ওর দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। বেলীকে তাকাতে দেখে তানিশা ওর পাশে বসতে বসতে বললো,
“একলা একলা বইয়া কি ভাবতাছোস?”
বেলী যথা সাধ্য মুখে হাসি টানার চেষ্টা করলো। বললো,
“আজ তোর দেরি হলো যে?”
তানিশা বুঝি এই প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলো। চোখে, মুখে রাগ ফুটে উঠলো। ক্ষীপ্ত স্বরে বললো,
“রাকিব্বার লেইগা দাঁড়াইয়া রইছিলাম। শা”লায় এক নাম্বার চা’পাবাজ জানোস না? আমারে এক ঘন্টা দাঁড়া করাইয়া রাখছে। আর আমি ফোন দিলেই কয় ‘এই তো আর পাঁচ মিনিট’ তাই আমি চইলা আইছি। ওর লেইগা দাঁড়াইয়া থাইকা সময় নষ্ট করুম ক্যা? সময় কি ওর বাপের?”
তানিশার কথা শুনে বেলীর হাসি পেলো। মুচকি হেসে বললো,
“তোরা দুইটায় সা’প আর নেউলের মতো সারাদিন ঝগড়া করিস কেনো?”
তানিশা, রাকিব, বেলী তিন বেস্ট ফ্রেন্ড। কেউ কারোর চেয়ে কম না। ওরা তিনজনেই তিনজনকে সমান ভাবে ভালোবাসে। একজনের বিপদে আরেকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তানিশা আর রাকিব দুজন দুজনকে পছন্দ করে। কিন্তু, তাও ওদের বন্ধুত্বটা সুন্দর। বন্ধুত্ব শব্দটাই সুন্দর। মারাত্নক সুন্দর। বেলীর কথার উওর দেওয়ার জন্য তানিশা শব্দ গোছালো। ওর মধ্যেই চোখ গেলো গেটের দিকে। দেখলো রাকিব গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। রাকিব আজ কালো একটা শার্টের সাথে ম্যাচিং করে কালো ঘড়ি, জিন্স, কেডস্ এমনকি মাথায় একটা কালো ক্যাপ পড়ে এসেছে। চোখের সানগ্লাসটাও কালো। রাকিব ফর্সা হওয়ায় সম্পূর্ণ কালো রঙটা ওর গায়ে ফুটে উঠেছে। রাকিবকে দেখেই তানিশার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কয়েকটা মেয়ে রাকিবের দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে। মুহূর্তেই তানিশার চোখ দুটো গরম হয়ে গেলো। রাগে ফোসফোস শব্দ করতে লাগলো। বেলী বুঝতে পারছে আজ রাকিবের কপালে শনি, রবি,সোম, মঙ্গল সব গ্রহ ঘুরছে। ইশারায় রাকিবকে কিছু বুঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাকিব বেচারার আর কি দোষ? সে বেলীর ইশারা বুঝেনি। তানিশার পাশে দাড়িয়ে তানিশার গাল টেনে বললো,
“দেখতো আজকে আমারে কেমন লাগে? সুন্দর লাগে তাইনা। লাগবোই তো। দেখতে হইবো না। আমি কে? কি আমার পরিচয়?”
বলে ভাব নিয়ে কলারটা ঠিক করলো। রাকিবের কথা শুনে তানিশা চুপ থাকলেও বেলী মিনমিনিয়ে বললো,
” তুই কে? আর তোর কি পরিচয়? এক্ষুনি বুঝে যাবি।”
বেলীকে মিনমিন করতে দেখে রাকিব বেলীর লম্বা বেনুনী টেনে ধরে বললো,
“ওই ছেমড়ি তুই মিনমিনাইয়া কি কইতাছোস?”
রাকিব যত কথা বলছে, তত তানিশার রাগ বাড়ছে। রাকিবের কথা শুনে বেলী চা’পা রাগ দেখিয়ে বললো,
“আমার চুল ধরবি না। ব্যাথা পাই।”
বেলীর কথায় রাকিব পাত্তা দিলো না। চারদিকে তাকিয়ে বললো,
“দেখ তানিশা দেখ? চারদিকের ওয়াও, ওয়াও মাইয়া গুলা আমার দিকে ক্যামনে চাইয়া রইছে। আর তুই একবারও চাইলি না। ”
ব্যাস! আর কি লাগে? আগুনে ঘি ঢালার জন্য রাকিবের এইটুকু কথা যথেষ্ট ছিলো। রাকিব পুরো কথাটা শেষ করার পর, সেকেন্ডের মাথায় তানিশা রাকিবের কলার ধরে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“রাকিব্বার বাচ্চা, তুই হইছোস গিয়ে সুন্দর। বি’লাইর মতো সাদা। তুই শার্ট, টি-শার্ট পড়বি, বাঙ্গি কালার, তরমুজ কালার, লতাপাতা কালার, মাটি কালার, পানি কালার, ছাই কালার। তুই কেন কালা, সাদা, নীল পড়বি? বুঝা আমারে। ”
তানিশার কথায় রাকিব রিয়েকশন দিতে ভুলে গেলো। আর বেলী হাসবে নাকি কাঁদবে ভেবে পাচ্ছে না। এই দুইটা একসাথে হলেই ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। রাকিব তানিশার কথায় ভাবুক স্বরে বলে উঠলো,
“কথা সেটা না। কথা হচ্ছে আমার বাচ্চা আইলো ক্যামনে? আমার তো বিয়া শাদী হয়নাই। তাইলে তুই কেন কইলি রাকিব্বার বাচ্চা? বুঝা আমারে।”
তানিশার রাগ এবার দ্বিগুন বেড়ে গেলো। রাকিবের পায়ের উপর জোরে উঁচু জু’তা দিয়ে লা*থি মে*রে অন্যদিকে হাঁটা শুরু করলো। আর রাকিব ব্যাথায় পা ধরে লাফালাফি করতে লাগলো। বেলী কিছুতেই নিজের হাসি চে’পে রাখতে পারলোনা। শব্দ করে হেসে দিলো। বেলীকে হাসতে দেখে রাকিব ন্যাকা স্বরে বললো,
“আমার কষ্ট দেইখা তোর হাসি পাইতাছে। বেশি কইরা হাসতে থাক। অস’ভ্য, গু’ন্ডা মার্কা একটা বান্ধবী বাজাইছোস। তোগো মাথার মধ্যে ঠা’ডা পড়বো। বাচ্চা ওয়ালা মুর’গীতে দৌঁড়ানি দিব। গ’রুর গুঁতা খাইবি। গোব’রের মধ্যে আছা’ড় খাবি। ড্রেনে পড়বি। নর্দমায় পড়বি। দুনিয়ার সব খারাপ তোগো হইব। মিলাইয়া নিস আমার কথা।”

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here