তুমি ছিলে বলেই পর্ব ৩

0
193

#তুমি_ছিলে_বলেই
#পর্বঃ৩
#দিশা_মনি

স্নেহা রওনা দিয়েছে তার ভার্সিটির উদ্দ্যেশ্যে। সে ভেবে নিয়েছে আজ প্রজ্ঞার সাথে হোস্টেলে থাকার ব্যাপারেও কথা বলবে। কাঙ্খিত বাস স্টপেজে পৌঁছে বাস থেকে নামল স্নেহা৷ অতঃপর এদিক ওদিক তাকালো৷ কিছু সময়ের মধ্যেই এক সুদর্শন যুবক তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
“তাহলে আমি একদম সঠিক সময়েই পৌঁছেছি।”

যুবকটিকে দেখেই স্নেহার মুখে হাসি ফুটে ওঠে৷ স্নেহা হাস্যজ্বল মুখে বলে,
“অনুপম তুমি!”

“জ্বি, আমি তোমাকে নিতেই এসেছি। তোমার বান্ধবী প্রজ্ঞার কাছে শুনলাম তুমি নাকি হোস্টেলে থাকতে চাইছ।”

“হ্যাঁ, আসলে সামনে এক্সাম তো তাই এত দূর জার্নি করা সম্ভব নয়। এজন্যই ভাবছি হোস্টেলে এসে উঠব।”

“আমাকে বলতে পারতে৷ আমি আমার ফ্ল্যাটে তোমার থাকার ব্যবস্থা করে দিতাম। এই শহরে তো আমার ফ্ল্যাটের অভাব নেই।”

“কি যে বলো না তুমি। আমি কিভাবে তোমার ফ্ল্যাটে থাকতে পারি?”

“কেন পারোনা? তুমি কি আমায় ভালোবাসো না স্নেহা?”

স্নেহা ত্বরিত উত্তর দিল,
“অনেক বেশিই ভালোবাসি৷”

“তাহলে অসুবিধা কোথায়? আমরা তো একসাথে ফ্ল্যাটে থাকব না৷”

“সেসব তুমি বুঝবে না। যাইহোক, তুমি চট্টগ্রাম থেকে কবে ফিরলে?”

“একটু আগেই।”

এরপর তাদের মাঝে আরো কিছু কথাবার্তা চলতে লাগল। একসময় অনুপম স্নেহাকে বলল,
“আজ তোমাকে আর ভার্সিটি যেতে হবে না। আজ অনেকদিন পর আমি রাজশাহীতে এলাম। চলো আজ ঘুরতে যাব।”

“না অনুপম। সামনে এক্সাম…”

“আমি কোন অযুহাত শুনব না। তুমি চলো তো আমার সাথে।”

অনুপম স্নেহার কোন বারণ শুনল না। একপ্রকার জোর করেই স্নেহাকে নিজের সাথে নিয়ে গেল।

★★★
নিপুণ সবেমাত্র কোর্ট থেকে বাড়িতে ফিরল। আজ সে অনেক খুশি৷ কারণ সে আজ একটা কেস জিতে গেছে৷ একজন অপরাধীকে সে শাস্তি দিতে পেরেছে। নিপুণের মনে এখন অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে৷ এটা নতুন কিছু নয় তার কাছে। যতবারই সে অপরাধীদের শাস্তি পাইয়ে দিতে সক্ষম হয় ততবারই এমন খুশি হয়। বাসায় এসেই সর্বপ্রথম নিজের বাবার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। নিপুণ বাবা প্রয়াত এডভোকেট নজরুল খান। যিনি তার সততা এবং ন্যায়বিচারের জন্য আজো সমাদৃত। জীবনকালে যিনি কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি৷ সমাজের অত্যাচারিত, নিপিড়ীত মানুষের পাশে থেকেছেন সর্বদা৷ প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের যিনি পরোয়া করেন নি৷ আজ তার আদর্শেই বেড়ে উঠেছে নিপুণ। সেও তার বাবার মতো অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে। নিপুণ তার বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বলে,
“আজ আবারো আমি তোমার মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি আব্বু। একজন নিপীড়িত নারীকে আজ আমি ন্যায়বিচার পাইয়ে দিয়েছি। আমি জানি তুমি যেখানেই থাক না কেন আমার এই সাফল্যে তুমি আজ অনেক খুশি হয়েছ৷”

এমন সময় কেউ নিপুণের কাধে স্পর্শ করে। নিপুণ পিছন ফিরে হালকা হেসে বলে,
“মা, তুমি!”

“বাবাকে কি বলছিস হ্যাঁ? আমার নাম্র বিচার দিচ্ছিস?”

“কি যে বলো না তুমি। বাবার কাছে তোমার নামে বিচার দেব কেন? বাবাকে আমার সাফল্যের কথা বলছিলাম। জানো মা কেসটা আমি জিতে গেছি।”

“আচ্ছা।”

নিপুণ খেয়াল করে তার মায়ের চেহারার উদ্বিগ্নতা। তাই সে তার মাকে শুধায়,
“তোমার মুখটা হঠাৎ এমন শুকিয়ে গেল কেন মা? তুমি কি আমার সাফল্যে খুশি হওনি?”

“না তেমনটা নয়৷ সব মায়েরাই তাদের মেয়ের সাফল্যে খুশি হয়। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। কিন্তু আমার যে অনেক চিন্তা হয় তোকে নিয়ে।”

“আমাকে নিয়ে চিন্তা হয় কেন?”

“এই যে তুই প্রতিদিন এই প্রভাবশালী মানুষের বিরুদ্ধে কেস লড়িস তারা যদি তোর কোন ক্ষতি করে দেয়?”

“ক্ষতি করে দেবে বললেই হলো? এত সোজা না। তুমি আমাকে নিয়ে একদম চিন্তা করো না।”

“মায়ের মন তুই বুঝবি না৷ তোর বাবাকে হারানোর পর থেকে আমার মনে ভয় জেকে বসেছে। আমার আজো মনে হয় তোর বাবার মৃত্যু কোন এক্সিডেন্ট ছিল না। তোর বাবাকে হয়তো কেউ পরিকল্পনা করেই…এখন তো তুই আমার সব নিপুণ। সামনে তোর বিয়ে। আমি বলি কি, বিয়ের পর তুই এসব ওকালতি ছেড়ে দিয়ে সংসারে মন দে৷ সেটাই হয়তো ভালো হবে।”

“এটা সম্ভব নয় মা। আমি বাবার আদর্শে বড় হয়েছি। বাবা আমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে শিখেছে। ভয় পিছিয়ে আসতে নয়।”

কথাটুকু বলেই নিপুণ নিজের রুমের দিকে চলে যায়। নিপুণের মা শাহিনা খাতুন সেদিকে সেদিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

★★★
নিপুণ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখতে পায় তার ফোন বাজছে৷ সে ফোনটা রিসিভ করার আগেই কে’টে যায়। ফোনটা হাতে নিয়ে নিপুণ দেখতে পায় দীপ্র অনেকবার তাকে ফোন করেছে। তাই সে আর দেরি না করে কলব্যাক করে। দীপ্র ফোন রিসিভ করেই অভিমানী স্বরে বলে,
“আমায় এভাবে পর করে দিলেন মহারাণী নিপুণ? এতবার কল করলাম আর এতক্ষণ পর আপনি কলব্যাক করলেন?”

নিপুণ হেসে ফেলে দীপ্রর কথা শুনে। অতঃপর জবাব দেয়,
“আপনি ভুল ভাবছেন মহারাজ দীপ৷ আমি আপনাকে পর করে দেইনি। ওয়াশরুমে ছিলাম৷ এসেই দেখি আপনি কল দিয়েছেন।”

“আচ্ছা৷ ঠিক আছে, তাহলে তুমি দশ মিনিটে তৈরি হয়ে নাও৷ আমি বিশ মিনিটের মধ্যে তোমার বাসার সামনে যাচ্ছি।”

“আমার বাসায় হঠাৎ কেন আসছ তুমি?”

“কেন? নিজের হবু শ্বশুর বাড়িতে যেতে পারিনা?”

“অবশ্যই পারো। তবে তুমি তো সচরাচর খুব একটা আসো না। তাই আরকি প্রশ্নটা করা।”

“তোমাকে আজ ঘুরতে নিয়ে যাব।”

“সত্যি?”

“কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?”

“আসলে তুমি যা বিজি মানুষ। সারাদিন নিজের বিজনেস নিয়েই পড়ে থাকো। ঘুরতে যাওয়ার সময় আছে নাকি তোমার?”

“আর তুমি বোধহয় খুব ফ্রি মানুষ? তুমিও তো নিজের কাজে ব্যস্ত। জানো, আমি আমাদের কলেজ লাইফকে খুব মিস করি। সেইসময় আমরা একসাথে কত ঘোরাঘুরি করতাম। মনে আছে তোমার?”

নিপুণ অতীতের কিছু মিষ্টি স্মৃতি মনে করে। কলেজ জীবন থেকেই তারা একে অপরকে চেনে৷ কলেজে থাকাকালীন অবশ্য তাদের মধ্যে প্রথমে বন্ধুত্বের মাধ্যমে সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। তবে এরপর পরিস্থিতি বদলায়। একসময় তারা একে অপরের প্রতি নিজেদের অনুভূতি বুঝতে পারে। তবে তাদের মধ্যে কখনোই সেরকম লুতুপুতু টাইপ সম্পর্ক ছিল না৷ সম্পর্কের কারণে নিজেদের ক্যারিয়ারেও ক্ষতি হতে দেয়নি তারা। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দিয়েই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

নিপুণকে চুপ থাকতে দেখে দীপ্র অধৈর্য্য হয়ে বলে,
“কি হলো নিপুণ? কোন উত্তর দিচ্ছ না যে?”

“কিছু না। তা তুমি কোথায় নিয়ে যাবে আমায়?”

“তুমি যেখানে যেতে চাও সেখানেই নিয়ে যাব।”

“আচ্ছা। তাহলে তুমি আসো। আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি।”

★★
গাড়িতে পাশাপাশি বসে আছে নিপুণ ও দীপ্র। দীপ্র গাড়ি ড্রাইভ করছে আর নিপুণ তার পাশের সিটে বসে তাকে বলছে কোন দিকে যেতে হবে। হঠাৎ করেই দীপ্রর কি হলো সে রেডিওতে একটা রোম্যান্টিক গান বাজিয়ে দিল। রেডিওতে বাজতে লাগল, “Hasi ban haye” গানটা। নিপুণ মুচকি হেসে বললো,
“বাহ, আজ তো মনে হচ্ছে সাহেব বেশ রোম্যান্টিক মুডে আছে!”

“আসলেই। সেজন্যই তো সাহেবাকে ডাকা। যাতে মুহুর্তটাকে রোম্যান্টিক করে তুলতে পারি।”

“এখানে গাড়ি থামাও।”

“এখানে?”

“হ্যাঁ।”

“এখানে কোথায় ঘুরব আমরা? আশেপাশে তো কিছুই দেখছি না।”

“ঐ তো ঐদিকে দেখো।”

“ঐটা তো একটা অনাশ আশ্রম। এখন আবার তুমি বলো না অনাথ আশ্রমে যাবে।”

“ওখানেই তো যাবো।”

বলেই গাড়ি থেকে নেমে যায় নিপুণ৷ তারপর পেছনের ছিট থেকে বাচ্চাদের জন্য আনা চকলেট, খেলনার প্যাকেট তুলে নেয়।

দীপ্র বলে ওঠে,
“ওহ, তাহলে এইজন্যই এগুলো সাথে এনেছিলে। কাজটা কি ভালো করলে?”

“নিঃসন্দেহে। আর তুমি এতো রাগ করছ কেন? তুমিই তো বলেছিলে যে আমি যেখানে চাই সেখানে নিয়ে যাবে।”

“তাই বলে এখানে?”

দীপ্র রেগে নিজের মুখ ফুলিয়ে নেয়৷ নিপুণ দীপ্রর রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে,
“থাক দীপ। তোমাকে আর ছোট বাচ্চাদের নতো রাগ করতে হবে না। আমি জাস্ট এখানে বাচ্চাদের সাথে দেখা করে তাদের গিফটগুলো দেব৷ তারপর আমরা ঘুরতে যাব। এবার খুশি তো?”

দীপ্রর মুখেই এবার হাসির দেখা মেলে।

চলবে ইনশাআল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here