তুমি আমার স্নিগ্ধ ফুল পর্ব ২৮

0
90

#তুমি_আমার_স্নিগ্ধ_ফুল
#নুসাইবা_ইসলাম_হুর
#পর্বঃ২৮

ইয়ানা ইসহাক আহমেদকে ঝাকিয়ে পাগলের মতো কান্না করতে করতে বললো কি হলো বাবা কথা বলছো না কেনো? বলো না আমি তোমার মেয়ে কিনা? বলোনা ও সব মিথ্যা বলছে, আমি শুধু তেমার মেয়ে। আমিতো তেমার মেয়ে শুধু তোমারি মেয়ে কথাগুলো বলে বিলাপ করে কান্না করতে লাগলো ইয়ানা৷

ইয়ানার কান্নায় ইসহাক আহমেদ ভাবনা থেকে বের হলো। তারাতাড়ি করে ইয়ানাকে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে বললো কে বলেছে মামনী তুমি আমার মেয়ে না? তুমি শুধুই আমার মেয়ে। তুমি আমাকে বলো কে তোমাকে কি বলেছে? আমি এখনি তাকে তোমার কাছে এনে জিজ্ঞেস করবো আমাকে মেয়েকে কেনো মিথ্যা বলেছে।

ইয়ানা কিছুক্ষণ ইসহাক আহমেদের বুকে পড়ে কান্না করে হঠাৎ করে ইসহাক আহমেদকে ছেড়ে কিছুটা দূরে যেয়ে কন্নারত গলায় বললো আর মিথ্যে বলো না বাবা, আমাকে তুমি রাস্তা কুড়িয়ে পেয়েছিলে তাইনা? আর এই জন্যই মা আমাকে এতো বছর দূরে ঠেলে দিয়েছিলো?

ইয়ানার কথায় ইতি বেগম ইয়ানার দিকে যেতে যেতে বললো এরকম কিছু না ইয়ানা। তুই আমাদের মেয়ে, কে কি বলেছে সেটা মাথা থেকে ঝেরে ফেল মা। এই যে আমি তোর মা আর এই তোর বাবা।

ইতি বেগমকে নিজের দিকে এগোতে দেখে ইয়ানা সরে যেয়ে কান্না করতে করতে বললো তোমরা সবাই মিথ্যা বলছো, আমার কাছে আসবে না এ বলে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ইয়ানা দৌড়ে ডাইনিং টেবিলের উপর থেকে ছু/রি নিয়ে হাত বরাবর ধরলো।

ইয়ানার কাজে ইসহাক আহমেদ আর ইতি বেগম দুজন ভরকে গেলো। ইসহাক আহমেদ ইয়ানার দিকে যেতে যেতে বললো ইয়ানা মামনী এমন পাগলামো করে না। এই যে আমি, আমি তোমার বাবা হই বিশ্বাস করো মামনী তুমি আমারি মেয়ে।

ইয়ানা ইসহাক আহমেদকে থামিয়ে দিয়ে বললো এদিকে আসবে না বাবা আমি কিন্তু ছু/রি চালিয়ে দিবো। আমি সত্যিটা জানতে চাই, আমাকে আর মিথ্যে বলো না বাবা। আমাকে এই মুহূর্তে সত্যি বলবে আর নাহলে আমি নিজেকে নিজে শেষ করে দিবো এ বলে ইয়ানা হাতে ছু/রি চালাতে যাবে অমনি ইসহাক আহমেদ করুণ স্বরে বললো না মামনী এমন করো না, আমি বলছি, আমি সব বলছি তুমি একটু শান্ত হও মামনী হাত জোর করে বলছি তোমাকে।

ইসহাক আহমেদের কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো ইয়ানা, ছু/রি টা আস্তে করে রেখে ঝাপসা চোখে ইসহাক আহমেদের দিকে তাকিয়ে বললো তার মানে সত্যি আমি তোমার মেয়ে না? বলতে বলতে ইয়ানা মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিলে ইসহাক আহমেদ দৌড়ে যেয়ে ইয়ানাকে আগলে নিলো। ইতি বেগম ও দৌড়ে এসে ইয়ানাকে ধরলো।
——————————————
পারফি দুপুরে আসলো ইয়ানার কলেজের সামনে। মেয়েটা আজ কলেজে একা তাই সময় করে নিজেই আসলো নিতে। অনেক্ষণ যাবত অপেক্ষা করে চলেছে কিন্তু ইয়ানার দেখা মিলছে না। কলেজ ছুটি হয়ে গিয়েছে একে একে সব স্টুডেন্ট চলে গেছে কিন্তু ইয়ানা এখনো আসছে না দেখে পারফি গাড়ি থেকে নেমে কলেজে প্রবেশ করলো। চারপাশে চোখ বুলালো দুই একটা স্টুডেন্ট ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লো না।

কলেজের ভিতর ইয়ানাকে না পেয়ে পারফি মনে মনে ভাবলো বাসায় চলে গেলো নাতো? কিন্তু কলেজ তো মাত্র ছুটি হলো বাসায় গেলেতো আমার সামনে দিয়েই যেতো।
পারফি এবার পকেট থেকে ফোন বের করে ইয়ানার নাম্বারে কল লাগালো।রিং হচ্ছে কিন্তু ফোন রিসিভ হচ্ছে না। আরো কয়েকবার ফোন করলো কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। পারফির কপালে এবার ভাজ পড়লো, ইয়ানাতো এমন করে না। ফোন করলে সাথে সব সময় চেষ্টা করে প্রথম বারে ফোন রিসিভ করতে। আজ হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারছে না। এবার কল করলো পিয়াসা বেগমের কাছে কিন্তু তার ফোন ও রিসিভ হচ্ছে না তা দেখে পারফির এবার টেনশন হতে লাগলো কোনো বিপদ হয় নি তো।
পারফি দ্রুত গাড়িতে উঠে ফুল স্পীডে গাড়ি চালিয়ে ১০ মিনিটের ভিতরে বাসায় পৌঁছে গেলো।
বাসায় প্রবেশ করতে দেখতে পেলো পিয়াসা বেগম রান্না করছে। পারফি পিয়াসা বেগমের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো আম্মু কখন থেকে ফোন করছি ফোন তুলছিলে না কেনো?

পিয়াসা বেগম পারফির দিকে তাকিয়ে বললো কাজ করছিলাম বাবা, ফোন রুমে তাই শুনতে পাই নি, কিছু কি হয়েছে?

ইয়ানা কোথায়? আমাকে না বলে বাসায় চলে এসেছে কেনো?

পিয়াসা বেগম তরকারি নাড়াচাড়া করছিলো পারফির কথায় হাতজোড়া থেমে গেলো। পারফির দিকে তাকিয়ে বললো ইয়ানা চলে এসেছে মানে? ওতো এখনো আসে নি কি বলছিস তুই?

পিয়াসা বেগমের কথায় পারফি চিন্তিত মন আরো চিন্তিত হয়ে পড়লো। পিয়াসা বেগম চিন্তা করবে ভেবে তারাতাড়ি কথা ঘুড়িয়ে বললো ওহ্ আমিতো ভুলেই গিয়েছি ইয়ানা বলেছিলো আজ ওদের বাসায় যাবে, বাবা এসে নিয়ে গিয়েছে হয়তো।

পারফির কথায় পিয়াসা বেগম যেনো জীবন ফিরে পেলো। তখন পারফির মুখে ইয়ানার ওই কথা শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো কোনো বিপদ হয় নাইতো।
পিয়াসা বেগম বললো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি আমাকে। কাজের প্রেশার বেশি নাকি যে সব গুলিয়ে ফেলছিস?

হ..হ্যা ইদানীং একটু বেশি প্রেশার যাচ্ছে। আচ্ছা তুমি রান্না করো আমার একটু কাজ আছে এখন যেতে হবে।

সেকি মাত্র এইতো আসলি, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে যা।

বাহিরে খেয়ে নিবো ইমার্জেন্সি কাজ পড়ে গিয়েছে বলতে বলতে পিয়াসা বেগমকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো।
পারফির ফের গাড়িতে উঠে ফোন লাগালো ইসহাক আহমেদের কাছে। ইসহাক আহমেদের ফোন ও রিসিভ হচ্ছে না। বারবার ফোন করতে লাগলো কিন্তু কোনো ফলাফল পাচ্ছে না। টেনশনে পারফির মনে কু ডাকতে লাগলো। গাড়ি ছুটালো ইয়ানাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
——————————————-
ইয়ানা পাথর হয়ে নির্বিকার ভাবে বসে আছে। জীবনের এতো বড় একটা ধাক্কা মেনে নিতে পারলো না। এ যেনো এক অনুভূতি শূন্য পাথরে রুপ নেওয়া ইয়ানা।

পাশেই ইসহাক আহমেদ বসা, চোখ জোড়া ভিজে আছে। কিছুক্ষণ আগে ইয়ানা সব জানার জন্য অনেক পাগলামো করছিলো, নিজের ক্ষতি করতে চেয়েছিলো, শেষে কোনো উপায় না পেয়ে ইয়ানাকে সব কথা বাধ্য হয়ে খুলে বলতে হলো। জীবনে কোনো দিন ভাবে নি এভাবে সত্য টা সামনে চলে আসবে। তার কলিজার টুকরো মেয়েটা যেনে যাবে সে ওর বাবা না। কষ্ট বুকটা ফেটে যাচ্ছে, মেয়েটার দিকে আজ তাকানো যাচ্ছে না।

ইয়ানার অন্য পাশে ইতি বেগম বসা তার চোখেও পানি। তিনি ইয়ানাকে এক পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলতে লাগলো আমাকে ক্ষমা করে দিস মা, সৎ মা আসলেই কোনো দিন আপন মা হয় না তাই তোকে পর করে রেখেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস কর মা তোকে যখন প্রথম এই দুই হাত দিয়ে কোলে তুলে নিয়েছিলাম তখন অদ্ভুত এক টান অনুভব করেছিলাম তোর প্রতি। তার পর থেকে একটা বারের জন্য ভাবি নাই তুই আমার মেয়ে না। ইমা আর তোকে নিজের সবটা ভালোবাসা দিয়ে বড় করতে লাগলাম।
তুই যখন একটু বড় হয়েছিলি তখন এলাকার বিভিন্ন মানুষ এসে আমাকে বলতো পর কখনো আপন হয় না। এই মেয়েকে এতো আদর দিয়ে বড় করছো এক সময় দেখবে এই মেয়ে তোমাকে পড় করে দিয়ে চলে গেছে। তোমার সব সুখ কেরে নিয়েছে আরো অনেক ধরনের কথা বলতো। আমি তাদের কথা কানে তুলতাম না উল্টো তাদের কথা শুনিয়ে দিতাম। তারপর তুই যখন আরেকটু বড় হয়েছিলি তখন এলাকার মানুষ তোর সামনে বলতো তুই আমাদের আসল মেয়ে না, আমরা তোকে কুড়িয়ে পেয়েছি। তুই তখন ছোট ছিলি তাই ওদের কথার মানে বুঝতি না।
তোর বাবা সারাদিন আতঙ্কে থাকতো তুই বড় হলে এলাকার মানুষের কথার মানে তুই বুঝে যাবি। তিনি চাইতো না কোনো দিন তোর সামনে সত্যিটা আসুক। তিনি চাইতো তুই সারাজীবন তার আপন মেয়ে হয়ে থাকবি তাই তোর বাবা হুট করে সিদ্ধান্ত নিলো এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে অন্য এলাকায় যেখানে আমাদের কেউ যেনো না চিনে আর সত্যিটাও যেনো তোর সামনে কখনো না আসে।

এই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যাওয়া আমার ছিলো ঘোর আপত্তি। কারণ ছোট বেলা থেকে এই এলাকায় আমি থেকে এসেছি। ওই এলাকায় এই ছিলো আমার বাবার বাড়ি তাই ছোট বেলা থেকে ওই এলাকা আমার বেড়ে ওঠা। সেদিন আমি তোর বাবার বিরুদ্ধে বললাম আমি এ এলাকা ছাড়তে রাজি না কিন্তু তোর বাবা আমার কথা শুনে নি, তিনি আমাদের নিয়ে চলে আসলো অন্য এলাকায়।
অন্য এলাকায় আসার পর সেদিন প্রথম বারের মতো আমার মনে হয়েছিলো তুই আমার আপন মেয়ে না। তোর জন্য আমার ছোট বেলা থেকে বেড়ে ওঠা এলাকা ছেড়ে দিতে হয়েছে। সেদিন মনে হলো আসলেই পর কখনো আপন হয় না। তুই পর তাই তুই আমার সুখ কেঁড়ে নিচ্ছিস। সেদিনের পর থেকে আস্তে আস্তে তোর প্রতি আমার বিরক্তবোধ শুরু হলো। তোর বাবা তুই বলতে পাগল ছিলো তখন আমার মনে হতো তুই আমার সব কেঁড়ে নিচ্ছিস, মনে হতো আমার ইমার থেকে ওর বাবাকে তুই কেঁড়ে নিচ্ছিস দিন দিন, তাই তোকে সহ্য করতে পারতাম না। সেই থেকে তোকে নিজের থেকে দূরে রেখে পর করে দিয়েছি।

কথাগুলো বলে থামলো ইতি বেগম। তারপর ডুকরে কেঁদে উঠে ফের বললো কিন্তু বিশ্বাস কর মা আমার এতো দিনের কাজের জন্য আমি অনুতপ্ত। তুই শুধু আমার মেয়ে, আমার মেয়ে হয়ে থাকবি। সেই প্রথম যেদিন তোকে কোলে নিয়ে নিজের বুকে আগলে নিয়েছিলাম ঠিক সেভাবে বাকি জীবন আগলে রাখতে চাই। এসব কথা তুই কখনো মাথায় ও আনবি না। তুই আমার সোনা মেয়ে, আমার মেয়ে হয়েই সারাজীবন থাকবি।

ইতি বেগমের সব কথা নীরবে শুনে গেলো ইয়ানা। এতো কিছু শোনার পর ও ইয়ানার ভিতর কোনো ভাব ভঙ্গি দেখা গেলো না। ঠিক আগের মতো নির্বিকার ভাবে নীরবে বসে আছে।

ইয়ানার অবস্থা দেখে ইসহাক আহমেদ, ইতি বেগম মিলে ইয়ানাকে অনেক কিছু বলে স্বাভাবিক করতে চাইলো কিন্তু ইয়ানার কোনো রেসস্পন্স নেই তা দেখে দুজনের মন হুহু করে কেঁদে উঠলো।

তখন কলিংবেল বেজে উঠলো। ইতি বেগম নিজের চোখের পানি মুছে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে আস্তে ধীরে যেয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতে ভেসে উঠলো পারফিট চিন্তিত মুখশ্রী।

পারফি চিন্তিত গলায় বললো আন্টি ইয়ানা কি এখানে এসেছে? আপনারা কেউ ফোন রিসিভ করছেন না কেনো? কিছু কি হয়েছে? ইয়ানা ঠিক আছে?

পারফির বিচলিত কন্ঠস্বর শুনে ইতি বেগম কি জবাব দিবে খুঁজে পেলো না। কি বলবেন উনি তোমার ইয়ানা ঠিক নেই? কোন মুখে সব খুলে বলবে কিছু বুঝতে পারলো না। ইতি বেগম দরজার সামনে থেকে সরে ভাঙা গলায় বললো ভিতরে এসো।

ইতি বেগমের ভাঙা গলা শুনে পারফি আরো ব্যাকুল হয়ে গেলো। বুঝতে পারছে কিছু হয়েছে। তখন বাসায় প্রবেশ করতে বসার ঘরে সোফায় ইয়ানাকে বসে থাকতে দেখে সেখানে এগিয়ে গেলো। ইয়ানার কাছাকাছি আসতে পারফির বুকের ভিতর কামড় মেরে উঠলো। কেমন বিধ্বস্ত লাগছে ইয়ানাকে, চোখ গুলো ফুলে গেছে, কেমন নির্বিকার ভাবে বসে আছে তা দেখে পারফি কাঁপা কাঁপা পায়ে ইয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ইয়ানার দুই গালে হাত দেখে বিচলিত হয়ে বলতে লাগলো এই ইয়ানা কি হয়েছে তোমার? তোমাকে দেখতে এমন লাগছে কেনো? কেউ কিছু বলেছে তোমায়? বলোনা কি হয়েছে তোমার বিড়াল ছানা?

পারফি এতো কিছু বলার পর ও ইয়ানার কোনো রেসপন্স না পেয়ে পারফি আরো বিচলিত হয়ে পড়লো। বিচলিত হয়ে এটা ওটা জিজ্ঞেস করেই চলেছে কিন্তু ইয়ার ভিতরে কোনো ভাব ভঙ্গি প্রকাশ পেলো না।

পারফিকে এমন বিচলিত হতে দেখে ইসহাক আহমেদ মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বললো ওকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই বাবা। আমার মেয়েটা এখন কথা বলার অবস্থায় নেই।

ইসহাক আহমেদের কথায় পারফি ইসহাক আহমেদের দিকে তাকালো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে আমার বিড়াল ছানার? আমাকে সব খুলে বলুন প্লিজ। ওকে এমন বিধ্বস্ত লাগছে কেনো? কে কি করেছে ওর সাথে আমাকে সব বলুন বাবা।

#চলবে?

ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
হ্যাপি রিডিং….🥰

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here