তুমি আমার স্নিগ্ধ ফুল পর্ব ২৩

0
110

#তুমি_আমার_স্নিগ্ধ_ফুল
#নুসাইবা_ইসলাম_হুর
#পর্বঃ২৩

এইযে মিস্টার খাটাশ তখন এর জন্য সরি। ভেবো না আমি নিজ থেকে বলছি সরি। মায়ের কথায় বাধ্য হয়ে বলছি তাই এখন ভাব নিয়ে লাভ নেই মুখ ভেঙচি কেটে শাফিনকে বললো প্রীতি।

শাফিন বসে বসে ফোন টিপছিলো তখন প্রীতির এই কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো প্রীতির দিকে। প্রীতির কথার আগা মাথা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো। কথার মানে বুঝতে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বললো তোর সরি এক্সেপ্ট করি নাই আমি।

সরি বলেছি এই অনেক এখন এক্সেপ্ট করবা কিনা সেটা তোমার ব্যপার।

শাফিন ভ্রু কুঁচকে বললো জানি তুই সরি বলার মেয়ে না। আন্টি বলতে বলেছে তাই বলেছিস এখন আমি আন্টির কাছে যেয়ে বললো তুই আমাকে সরি বলিস নি উল্টো বেয়াদবি করেছিস তখন আন্টি তোর কি হাল করবে? উফফ ভাবতেই ভালো লাগছে। তাহলে তুই থাক আমি যাই কেমন? আন্টিকে খবরটা দিয়ে আসি এ বলে উঠে যেতে নিলে প্রীতি তারাতড়ি সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো এই না না।

শাফিন ভ্রু নাচিয়ে বললো কি না?

প্রীতি দাঁতে দাঁত চেপে বললো আম্মুর কাছে বিচার দিবে না। আমি কিন্তু সরি বলেছি এখম আম্মুর কাছে মিথ্যাে কেনো বলবা?

তোর সরি আমার পছন্দ হয় নাই তাই এক্সেপ্ট করি নাই আমি, তাই বিচার দিবো এবার সর সামনে থেকে আমাকে যেতে দে।

প্রীতি পড়ে গেলো এবার বিপাকে। মন চাচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হনুমানের মাথা ফাটিয়ে দিতে কিন্তু আপাতত তা করতে পারবে না। মায়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য হলেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে তাই শাফিনের দিকে তাকিয়ে বোকা হাসি দিয়ে বললো এখন কি করলে সরি এক্সেপ্ট হবে শুনি?

শাফিন বাকা হেঁসে বললো এবার এসেছিস লাইনে। কিন্তু আমি যা করতে বলবো তুই এখন তা করবি না আমি জানি তাই বাদ দে আমি বরং আন্টির কাছে যাই এ বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আবার ও প্রীতি সামনে এসে দাঁত কটমট করে বললো কি করতে হবে?

বেশি কিছু না এখন কান ধরে ১০ বার ওঠবস করবি এবং সাথে বলবি তখন এর বেয়াদবির জন্য সরি।

প্রীতি ছিটকে দূরে যেয়ে বললো মরে গেলেও করবো না এহ্ আসছে কান ধরে ওঠবস করাতে। তোকে কান ধরে ওঠবস করাবো, আবার বলে আমি বেয়াদবি করেছি। তুই তাহলে দাঁত কেলিয়ে হাসছিলি কেনো তার দোষ নাই?

শাফিন দাঁত কটমট করে প্রীতির হাত শক্ত করে ধরে বললো আর একবার তুই তোকারি করলে খুব খারাপ হবে বলে দিলাম প্রীতি।

শাফিনকে এমন রেগে যেতে দেখে প্রীতি কিছুটা ভড়কে গেলো। আমতা আমতা করে বললো হাত ছাড়ো লাগছে আমার।

শাফিন দাঁতে দাঁত চেপে বললো তোর শাস্তি দিগুণ হলো এবার শাস্তির জন্য প্রস্তুত হ।

প্রীতি কাঁপা কন্ঠে বললো ক..কিসের শাস্তি? আ.. আমি কিন্তু আন্টিকে ড…ডাক দিবো বলে দিলাম।

শাফিন ভ্রু কুঁচকে বললো আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস? ভয় দেখাতে হলেও মাথায় বুদ্ধি লাগে সেটা তোর মতো গাধার মাথায় নাই। ডাক মাকে, সারা রাত বসে ডাকলেও শুনবে না কারণ একটু আগে তুই নিজেই আব্বু আম্মুকে তোদের বাসায় পাঠিয়েছিস।

প্রীতি এবার গেলো ফেঁসে এখন এখান থেকে কিভাবে ছাড়া পাবে তাই ভাবতে লাগলো। ঠিক করলো সেদিনের মতো কামড় দিয়ে দৌড়ে দিবে কিন্তু সেই আশায় ও পানি ঢেলে শাফিন বলে উঠলো কামড় দেওয়ার কথা ভুলে যা। এখন কামড় দিলে তোর দাঁত একটাও আস্তো রাখবো না।

প্রীতি এবার কাঁদো কাঁদো ফেস করে বললো ছেড়ে দেওনা।

শাফিন বাঁকা হেসে আচমকা প্রীতির ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দিলো।

শাফিনের এমন আচমকা আক্রমণে প্রীতি আর্তনাদ করে উঠলো।

প্রীতির আর্তনাদে শাফিন সরে যেয়ে তাকালো প্রীতির দিকে। ফর্সা ঘাড়ে কামড়ের লালচে দাগ পড়ে গেছে তা দেখে বাঁকা হেসে বললো এটাই তোর শাস্তি এ বলে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো।

এদিকে প্রীতি যেনো কিছু বলার ভাষা এই হারিয়ে ফেললো। শাফিনের এমন আচমকা আক্রমণে যেনো জমে বরফ হয়ে গেলো। কি হয়েছে ভালো করে মাথায় ঢুকতেই বুকের ভিতর ধুকপুক করতে লাগলো। শাফিনের এমন আচরণটা ঠিক হজম করতে পারলো না। এটা কি আসলেই শাস্তি ছিলো?
——————–
সবাই এক সাথে খাচ্ছে আর প্রীতি ইয়ানার রান্নার খুব প্রশংসা করছে। প্রথমবার রান্না হিসেবে অনেক ভালো রান্না করেছে।

শাফিন খাওয়ার মাঝে আরচোখে প্রীতির দিকে তাকাচ্ছে। প্রীতি ওর্না দিয়ে ভালো করে মাথা পেচিয়ে আছে। মূলত ঘাড়ের দাগ লুকানোর চেষ্টা। প্রীতির এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো শাফিন তা দেখে প্রীতি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। রাগী চোখে বার বার শাফিনের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু সবাই আছে তাই কিছু বলতেও পারছে না দাঁতে দাঁত চেপে খাবার গিলতে লাগলো।

খাওয়া শেষ হলে বড়রা কিছু নিয়ে আলোচনা করতে বসলো তাই প্রীতি আর ইয়ানা উপরে চলে গেলো। এখন এখানে ওদের থেকে কোনো লাভ নেই।

সিঁড়ী দিয়ে উপরো উঠতে উঠতে ইয়ানা প্রীতির উদ্দেশ্যে বললো তুই এমন মাথা পেঁচিয়ে আছিস কেনো?

ইয়ানার প্রশ্নে প্রীতি কি জবাব দিবে খুঁজে পেলো না। তাই একটু সময় নিয়ে কথা সাজিয়ে বললো তেমন কিছু না রাতে গোসল করার জন্য গলা ব্যথা করছে।

ইয়ানা বিষয়টা নিয়ে বেশি ঘাটলো না রুমে যেয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো, রাতে গোসল করার জন্য এখন প্রচন্ড মাথা ধরেছে, শরীর টাও ম্যাজ ম্যাজ করছে।

কিছুক্ষণ পর পারফি আসলো রুমে। ইয়ানাকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে বললো কোনো সমস্যা?

ইয়ানা মাথা থেকে হাত সরিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে বললো না কোনো সমস্যা না।

পারফি ইয়ানার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সোফার কাছে যেতে যেতে বললো কোনো সমস্যা হলে বলতে পারো।

ইয়ানা আমতা আমতা করে বললো তেমন কিছু না, আপনি কি এখন কোনো কাজ করবেন?

পারফি ভ্রু কুঁচকে বললো কেনো?

আ..আসলে রুমের লাইটটা নিভিয়ে দিলে ভালো হতো ঘুম পাচ্ছে খুব।

পারফি তাকালো ইয়ানার দিকে। কেনো যেনো ইয়ানাকে ঠিক লাগছে না কিন্তু কিছু বললো না। উঠে যেয়ে রুমের লাইটটা বন্ধ করে ড্রিমলাইট জ্বালানি দিয়ে ফের সোফায় যেয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো।

রুমের লাইট বন্ধ করতে ইয়ানা পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। প্রচন্ড শীত লাগছে তাই ব্লাংকেট মুড়ি দিয়ে শুলো। একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।

পারফি ল্যাপটপে কাজ করছিলো তখন হঠাৎ কারো গোঙানির শব্দ শুনে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরালো। গোঙানির উৎস খুঁজতে চারপাশে চোখ বুলাতে চোখে পড়লো বেড থেকে শব্দটা আসছে। পারফি ল্যাপটপ বন্ধ করে বেডের কাছে এগিয়ে গেলো। বেডের কাছে যেতে দেখলো ইয়ানা থরথর করে কাঁপছে আর বিরবির করে কিছু বলছে।

পারফি দ্রুত ইয়ানার পাশে বসে কপালে হাত রাখতে চমকে গেলো। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে, সব কিছু যে এই শীতের ভিতর রাতে গোসল করার জন্য হয়েছে তা ঢের বুঝতে পারছে। এই জন্য তখন ঠিক লাগছিলো না আর এই মেয়ে বলেছে কিছু না। মন চাচ্ছে এখন ঠাটিয়ে একটা চর মারতে তখন সত্যি না বলার জন্য। তখন সত্যি বললে মেডিসিন খাইয়ে দিলে এখন এই অবস্থা হতো?

শরীরের তাপমাত্রা অধিক হওয়ার জন্য পারফি পানি এনে রুমাল ভিজিয়ে কপালে দিতে লাগলো। এভাবে অনেক সময় জলপট্টি দেওয়াতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসলো। তাপমাত্রা একটু কমতে পারফি ইয়ানার গালে হালকা করে চাপর মেরে ডাক দিলো। কয়েকবার ডাকার পর ইয়ানা হালকা করে সারা দিলো।

পারফি ঔষধ আর পানির গ্লাস পাশে রেখে ইয়ানার হাত ধরে উঠিয়ে বাসাতে বসাতে বললো একটু উঠে বসে ঔষধ টা খেয়ে নেও তাহলে ভালো লাগবে।

ইয়ানা ঢুলুমুলু হয়ে বসে পারফির হাত আকরে ধরে ধীর গলায় বললো খুব খারাপ লাগছে একটু ঘুমাতে দেন না পরে খাবো।

ইয়ানাকে এমন হাত আকরে ধরতে দেখে পারফি বুঝলো যে ইয়ানা হুঁশে নেই। তাই জোর করে ইয়ানাকে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে শুইয়ে দিলো। তারপর শরীরে ব্লাংকেট জড়িয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। একসময় ইয়ানা ঘুমিয়ে পড়লো তা দেখে পারফি বেড থেকে উঠতে যাবে অমনি হাতে টান পড়লো। পিছু ঘুরে তাকিয়ে দেখে ইয়ানা এখনো ওর এক হাত জড়িয়ে ধরে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে আছে।

পারফি এবার দ্বিধায় পরে গেলো এখনে থাকবে নাকি সোফায় চলে যাবে। কিন্তু এখন হাত ছাড়াবে কিভাবে যদি ঘুম ভেঙে যায় হাত ছাড়ালে? আবার রাতে যদি জ্বর আসে তখন কি হবে তাই সব ভেবে চিন্তে ইয়ানার পাশে শুয়ে পড়লো। তারপর আলতো করে ইয়ানাকে বুকের মাঝে আগলে নিলো। স্নিগ্ধ ফুলের একটু কষ্টেই যেনো নিজের বুকের ভিতর হাহাকার শুরু হয়ে যায়। এখন কিছুটা শান্তি লাগছে আদুরে বিড়াল ছানাকে নিজের বুকে আগলে নিতে।

পারফির মনে পড়ে গেলো সেদিন রাতের কথা যেদিন ইয়ানাদের বাসায় ছিলো। মেয়েটা সেদিন রাতে ঘুমের মাঝে ওর কাছে চলে এসেছিলো। বুকের মাঝে গুটিশুটি হয়ে বিড়াল ছানার মতো সারারাত ঘুমিয়ে ছিলো। সকাল সকাল পারফি আবার ইয়ানাকে ওর জায়গায় শুইয়ে দিয়েছিলো আর নাহলে এই মেয়ে যেই লজ্জাবতী, ঘুৃম ভেঙে ওভাবে নিজেকে দেখলে লজ্জায় স্ট্রোক না করে বসতো। সেদিনের কথা মনে করে মুচকি হাসলো পারফি।
———————————————
সকালে ঘুম ভাঙতে কারো বাহুডোরে নিজেকে আবধ্য দেখে চমকে গেলো ইয়ানা। চমকে উপরে তাকাতে পারফির ঘুমন্ত মুখশ্রী চোখের সামনে ভেসে উঠলো। পারফি এখানে কিভাবে আসলো ভাবতেই মাথা শূন্য হয়ে গেলো। তখন মনে পড়লো কাল রাতের আবছা আবছা কিছু ঘটনা। জ্বরের ঘোরে পারফির হাত আকরে ধরা, পারফির ঔষধ খাইয়ে দেও, মাথায় জলপট্টি দেওয়া তারপর আর কিছুই মনে নেই। ইয়ানা ফের তাকালো পারফির দিকে লোকটা নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ ইয়ানার একরাশ লজ্জায় ঘিরে ধরলো কারণ বুঝতে পারছে ওর জন্যই পারফি এখানে এসেছে কারণ পারফি ওমন ছেলে না যে ওর অনুমতি ব্যতীত ওর কাছে আসবে।

ইয়ানা লজ্জায় হাসফাস করতে লাগলো কিভাবে এখান থেকে ছাড়া পাবে সেটা নিয়ে ভাবতে লাগলো। পারফির বাহুডোর থেকে ছোটার জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো৷

ইয়ানার মোচড়ামুচড়িতে পারফির ঘুম ছুটে গেলো। পিটপিট করে তাকাতে চোখে পড়লো ইয়ানার লজ্জামাখা মুখশ্রী। ঘুম থেকে উঠেই এমন মুখশ্রী দেখে থমকে গেলো পারফি।

পারফিকে কোনো কথা বলতে না দেখে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইয়ানা আরো অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। ছোটার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বললো ছাড়ুন উঠবো আমি।

ইয়ানার কথায় ঘোর থেকে বের হলো পারফি। ইয়ানার অস্বস্তি বুঝতে পেরে ছেড়ে দিতে যেয়েও কিছু একটা মনে করে ছাড়লো না। হাত এগিয়ে নিয়ে আলতো করে ইয়ানার কপালে হাত রাখলো সাথে সাথে কেঁপে উঠলো ইয়ানা।

পারফি একবার ইয়ানার দিকে তাকিয়ে তারপর বললো ত্যাড়ামো করে রাতে জ্বর উঠিয়ে জ্বালিয়ে মেরেছো। যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম কি হয়েছে তখন সত্যিটা বললে এমন হতো?

ইয়ানা কি বলবে খুঁজে পেলো না। একেতে পারফি এতো কাছে যেনো জমে বরফ হয়ে যাবে আরেকটু হলে। এখন কি করা উচিত বা কি করবে কিছুই মাথায় আসলো না।

ইয়ানাকে কোনো কথা না বলে থম মেরে থাকতে দেখে পারফি উঠতে উঠতে বললো নেক্সট টাইম কোনো সমস্যা হলে আমার থেকে লুকাতে যেনো না দেখি।

পারফি উঠে যাওয়াতে ইয়ানা বড় করে নিঃশ্বাস নিলো তারপর আস্তে ধীরে উঠে বসে পারফির কথায় মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলো যে আর লুকাবে না।

#চলবে?

কাল গল্প না দেওয়ার জন্য দুঃখিত।
ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
হ্যাপি রিডিং….🥰

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here