চল তবে শূন্যতা ধরে হাঁটি পর্ব-৫

1
2044

#চল তবে শূন্যতা ধরে হাঁটি
Zannatul ferdaous zannat
part:5

আরশান মাথা নিচুকরে ওর বাবার সামনে বসে আছে।মাতলামোটা এখন ছেড়ে গেছে। মি.রহমান আরশানের এই অবনতিতে বেশ চটে আছেন। কর্কশ গলায় মি.রহমান বললেন,
-তোমাকে আমার ছেলে পরিচয় দিতেও লজ্জা হচ্ছে আরশান। তুমি শুধু মাতালই হও নি। মাতাল হয়ে একটা মেয়েকে হ্যারেস করেছো। ছি!

আরশান এখনো মাথা নিচু করে আছে।

মি.রহমান আবার বললেন,
-এসব কথা আমার সৃজার মুখে শুনতে হয়, যে মেয়েটার সাথে আর কিছুদিন পর তোমার বিয়ে সেই মেয়ে আমাকে ফোনে জানায় তুমি নেশার ঘোরে অন্য মেয়েকে। ছি ছি ছি আরশান।
-বাবা ও অন্তি(আরশান মাথা নিচু করেই বললো)
-কে অন্তি? (মি.রহমান প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন আরশানের দিকে)

নুন বললো
-বাবা ভাইয়া যে মেয়ের সাথে মানে ( একটু কাচুমাচু করে বললো) ওই মেয়েটা অন্তি আপু ছিলো।

মি.রহমান রাগান্বিত চোখে আরশানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-ছি ছি! আরশান তোমার ছোট বোনও এসব জানে।ছি!লাজ লজ্জা সব শেষ করে ফেলেছো নাকি? কিন্তু অন্তি টা কে, কোন অন্তি?

কড়া গলায় বললেন
-অয়ন্তি নয়তো? যার জন্য তোমার এতো অবনতি।ওই মেয়েটা নয়তো? কি চায় ও? চলে তো গেছেই এই ছেলেটাকে নোংরা বনিয়ে গেছে। আরশান জবাব দাও ওই মেয়েটাই তো?

আরশান কিছু না বললেও নুন অন্তির নামে যেনো কোনো কথা সহ্য করতে পারছিলো না।

নুন বললো,
-বাবা অন্তি আপু মোটেও অমন মেয়ে না। ও তো ভইয়াকে এভোয়েডই করছিলো।

মি.রহমান নুনের কথায় আরো যেনো রেগে যেয়ে বললেন,
-নুন আমি চাইনা তুমি এর মাঝে কথা বলো। চুপচাপ নিজের রুমে যাও। আর ভবিষ্যতেও তুমি এই কথার মাঝে নিজেকে জড়াবে না।

নুন তার বাবার এমন আচরনে কিছুটা ঘাবরে যেয়ে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো।

আরশানের চোখটা খুব জ্বালা করছে। আজ ওর বাড়াবাড়ির জন্যই অন্তিকে ওর বাবা এতোগুলো কথা শুনাতে পারলো। এটা ভাবতেই আরশানের আরও বেশি খারাপ লাগছে। আজ অন্তির তো কোনো দোষ ছিলো না। অন্তিতো নতুন করে আরশানের দিকে হাত বাড়াই নি। পাগলামি যা করার আরশান করেছে।

মি.রহমান আরশানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
-আরশান কিছু জিনিস পেয়ে গেলে জীবনের উত্থান পতনটা অনুভব করা যায় না। বরং না পাওয়া জিনিস গুলো জীবনকে পরিবর্তন করে, কিছু উইশ রেখে যায়। ভালো অথবা খারাপ দুটোর একটি গ্রহন করতে হয় তখন। আশাকরি তুমি ভালোটাই গ্রহন করবে।

আরশান চোখ বন্ধকরে মনে মনে বললো
-আমাকে ও কোনো উইশ দিয়ে যায় নি, তবে একা ছেড়ে গেছে বাবা।

অনেক রাত হলেও ঠিক ভাবে অন্তির ঘুম আসছে না। প্রিয়া অনেক বার নুন এর বেপারে কথা বলতে চাইলেও অন্তির আগ্রহ না পেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছে।

অন্তি বারান্দায় তাকিয়ে আছে। কাল রাতেও এই পথে একজন লোক পাগলের মতো পায়চারি করেছে। অথচ আজ লোকটা নেই। পরপারে চলে গেছে। অন্তি কিছুক্ষন শূন্যে তাকিয়ে থাকলো। পৃথিবীটা কতো অদ্ভুদ।

আরশানের পাগলামিগুলাও অন্তির ভেতর তুলপার করছে। আরশান এভাবে পাগলামি করলে অন্তি নিজেকে কিভাবে ধরে রাখবে। অন্তি যে কিছুতেই আরশানকে বোঝাতে পারছে না। কতোদিন পর ছেলেটার স্পর্শ পেলো অন্তি, ভাবতেই অন্তির খুব জোড় কান্না পাচ্ছে।

একটা সময় এমন হতো যে আরশান ক্লাশে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে একেরপর এক মেসেজ করে যেতো অন্তিকে। আর ক্লাশ শেষ হলে একছুটে বাসা আর বাসায় এসে জামা কাপর না পালটেই অন্তির সাথে কথা বলতে শুরু করতো। তখন অন্তির দিনগুলো ছিলো “শানময়” আর শানের দিনগুলো অন্তিতে মত্ত। দেখা হলেই আরশান অন্তির হাতটা নিজের বুকে ঠেকিয়ে হাসি মুখে বলতো এইখানটায় তুমি থাকো, খুব দামী জায়গায়।

এখন সবই অতীত।
অন্তি মনে মনে প্রতিঞ্জা করলো “ওর আর আরশানের জন্য পিছুটান রাখলে চলবে না। যা কোনোদিন হবার নয় তার জন্য অন্তি আর ভাববে না। ওকে এগিয়ে যেতে হবে। আর আরশানের সামনে নিজেকে অনেক স্ট্রং রাখতে হবে। নিজের জন্য না হোক আরশানের ভালোর জন্য এটা খুব জরুরি”।

অন্তির এতো ভাবনার মাঝে কখন যে ওর মা ওর পাশে এসে দাড়িয়েছে অন্তির সে খেয়ালই নেই। আর হঠাৎ ই অন্তির মা ওর কাধে হাত রাখতেই অন্তি চমকে উঠে ওর মার দিকে তাকালো।

অন্তির মা বললেন
-কিছু ভাবছো?
-না আম্মু। আব্বু কি চট্টগ্রাম পৌঁছেছে?
-না এতো তারাতারি কি আর পৌছাবে, যেতে যেতে সকাল হবে।
-ওহ।
-অন্তি তোমার সাথে কিছু কথা আছে।

অন্তি ওর মার কথায় কিছুটা বিচলিতো হয়ে গেলো। মা কোনো ভাবে আরশানের আজকের ঘটনাটা যেনো গেলো নাতো? আর মিসেস হাসনাতের চেহারাও কিছুটা সিরিয়াস হয়ে আছে। অন্তি তবুও মুখে একটা হাসি ধরে রেখেই বললো,
-জ্বী মা বলো।
-অন্তি তুমি ইন্টারে একটা বছর নষ্ট করেছো অসুস্থ থেকে। আর এর পর এডমিশন এও কোনো ভার্সিটিতে চান্স হলো না। তারমানে দুইটা বছর নষ্ট হলো তোমার জীবন থেকে। অন্তি তোমার বাবা বা আমি আমরা কেউই চাইনা তুমি আরও সময় নষ্ট করো। এখন যদি সেকেন্ড টাইম এডমিশনের আশায় থাকো আর পরের বছরও কিছু না হয় তখন আরও একটা বছর নষ্ট হবে। তাই তোমার বাবা আর আমি ডিসিশন নিয়েছি তোমাকে প্রিয়ার সাথে একই প্রাইভেট ভার্সিটিতে এডমিট করে দিবো। প্রিয়াও এই মাসেই ভর্তি হবে

-আম্মু তোমরা যা ভালো মনে করো তাই হবে। (অন্তি খুব নরম গলায় কথাটা বললো)

মিসেস হাসনাত অন্তি হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন।
-অন্তি পড়ালেখা জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ন জিনিস।এইটা ছাড়া জীবনে কিছুই করতে পারবে না। আমি চাই তুমি নিজ পায়ে দাড়াও। নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যাও। অন্তি তুমি যে ভুলটা করছো তা নাহয় ছোট বয়সের ভুল বলেই আমি আর তোমার বাবা ক্ষমা করে দিয়েছি। আশা করি এখন এসব আর মনে রাখো নি। ভুল যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। এখন নতুন করে সব শুরু করো। আমরা আবার ঢাকা শিফট করছি। তোমার আর রুশ্যর পরালেখার জন্য।
আর একটা কথা অন্তি, এভাবে ঘরকুনো হয়ে থেকো না। বি নরমাল। আমাদের প্রথম সন্তান তুমি। তোমাকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন।

অন্তি এখনও চুপচাপ ওর মার কথা গুলো শুনছে। অনেকদিন পর মিসেস হাসনাত মন খুলে মেয়ের সাথে দুটো কথা বললেন।
মিসেস হাসনাত আবার বললেন,
-অন্তি তুমি কেমন যেনো পেনপেনে হয়ে গেছো। চুলগুলো ঠিক একদম শেইপ ছাড়া হয়ে গেছে। বিয়ের ঝামেলা শেষ হলেই তোমাকে নিয়ে পার্লারে যাবো। আর হ্যা তোমার বাবা বলেছেন তোমায় মেডিটেশন ক্লাসে এডমিট করাতে। আর এতো কিছুর মাঝেও যদি তোমার রুটিনে একটু সময় থাকে তবে জিম এ ভর্তি হবে। তোমার নিজেকে গড়ে তুলতে হবে সবদিক থেকে, আরও চতুর হতে হবে অন্তি।

অন্তি ওর মার দিকে তাকিয়ে বললো
-আম্মু আমি কি সব পেরে উঠবো?
-তোমাকে পারতে হবে অন্তি। পড়ালেখার পাশাপাশি সবকিছুতেই পারদর্শী না হও কিন্তু অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আমি আর তোমার বাবার অবর্তমানেও যেনো তুমি তোমার ঢাল হতে পারো অন্তি। এভাবে মনমরা হয়ে ঘরে বসে থাকলে কিচ্ছু হবে না জীবনে। নতুন নতুন চেলেন্জ নিতে হবে তোমাকে।

অন্তি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওর মায়ের কথা গুলো শুনছে
মিসেস আহসান আবার বললেন
-রুশ্য যেমন আমাদের ছেলে তুমিও আমাদের মেয়ে। আমাদের দুটো আস্থা, ভরসা, স্বপ্ন। ভুল পথে যেও না মা।

মিসেস হাসনাত অন্তিকে কিছুক্ষন জড়িয়ে ধরে রেখে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন।

অন্তি এবার আরও দৃঢ় মনে প্রতিঞ্জা করলো যে, নিজের জন্য না হোক বাবা মার জন্য হলেও সব পিছুটান ও ছাড়িয়ে যাবে।
পিহুকে পাশে নিয়ে অন্তি ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লো

ঘরে মোটামোটি লাউডে মিক্সটেপের গান চলছে

“পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা
একসাথে নয় আসলে যে একা
তোমার আমার ফারাকের নয়া ফন্দি
আহা-হা-হা আহা আহা-হা-হা
আহা আহা-হা-হা………..
(Na Jaane Koi Kaisi Hai Yeh Zindagaani Zindgaani Hamari Adhuri Kahani)… (2) ”

চোখ বন্ধকরে বিছানার এককোনায় জড়সর হয়ে বসে আছে আরসান। মস্তিষ্কের মাঝে গানের লিরিক গুলো আনাগোনা করছে। একটা টু-কুয়াটার প্যান্ট পরে খালিগায়ে বসে আছে। চুলগুলো পুরো এলো মেলো।

এর মাঝেই কড়া পারফিউমের স্মেলই আরশানকে জানান দিলো ঘরে অন্যকেউ প্রবেশ করেছে।
আরশান চোখ খুলে বিরক্তি নিয়ে বললো,
-কি চাই?
-সৃজার এখন তোমাকে চাই।
-তোকে বলেছিনা আমার রুমে অনুমতি ছাড়া আসবি না।
-ওহ শান। কয়েকদিন পর আমাদের বিয়ে। এখনও অনুমতি নিতে হবে?
-জাস্ট সাট আপ। তোকে আগেও বলেছি ভুলেও আমায় শান ডাকবি না। আমার নাম আরশান।
-অন্য কারো মুখে শুনতে বুঝি ভালো লাগে?
-ইউ নো হুয়াট, তোর সাথে কথা বলাই বেকার।

এটুকু বলেই শান বিছানা থেকে উঠে লেপটপের সুইচ অফ করে কাধে টাওয়েল নিতেই সৃজা শানের হাত ধরলো।
শান রাগি চোখে তাকিয়ে বললো
-কি চাই তোর?
-আপাদত গুড মর্নিং কিস্সি।
-হুয়াট?

সৃজা আরশানের অনুমতির অপেক্ষা না করেই আরশানের গলা জড়িয়ে ধরে পা উচু করে আরশানের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যেতেই আরশান নিজেই নিজের দু ঠোট চেপে মাথাটা একটু পিছিয়ে নিয়ে সৃজাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো।
এখন যেনো আরশানের চোখে মুখে রাগ ভেসে উঠছে। রাগি গলায় বললো,
-তোকে কতোবার বলছি আমার কাছে ঘেসবি না। কিস তো অনেক দূরের চিন্তা, আমাকে টাচও করবি না।

সৃজা মুখ বাকিয়ে বললো,
-আমার কিস কেনো ভালো লাগবে, কাল রাতে তো অন্য মেয়েকে ঠিকিই
-সৃজা জাস্ট সাট আপ। ওর সাথে কখনও নিজেকে তুলনা করবি না। আর তোর সাহস হলো কি করে এসব বাবাকে বলতে?
-বলবো না? আমার বর অন্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরবে আমি বলবো না?
-না। কজ আমি তোর বর না। আর হ্যা তোকে একটা সাজেশন দেই তুই কোনো এক ছেলেকে পচ্ছন্দ কর। আমি নিজে তোদের বিয়ে দিবে। আমার লাইফ থেকে সর। আর চোখের সামনে থেকেও।

সৃজা একটা হাসি দিয়ে বললো
-তোমাকে জালাতে আমার ভালো লাগে। আমার থাকাটাতো জরুরি বলো? আর কাউকে পচ্ছন্দ হলেই কি তোমার লাইফ থেকে সরে যাওয়া এতো সহজ?

স্টুপিড।
বলেই আরশান রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

বিয়ে বাড়িতে অনেক মানুষের সমাগম। একই বাড়িতে বর বউ। এই জন্য অবশ্য দুই পক্ষের মানুষ এ পুরো সাজানো মাঠটা গিজ গিজ করছে।

আরশান খুব স্বাভাবিক ভাবেই স্টেজের কাছে দাড়িয়ে আছে। আর তার হাত ধরে আছে সৃজা। যে কেউ দেখলেই বলবে খুব সুইট কাপল এরা। ব্লাক ব্লেজার, হোয়াইট টিশার্ট, হোয়াইট স্নিকার্স আর চুল গুলো জেলদিয়ে সেট করা একদম হিরোর মতো লাগছে আরশানকে। যদিও আরশানের বিন্দু মাত্র ইচ্ছা ছিলো না। তবুও নিজের চাচাতো ভাইয়ের বিয়েতে না আসলে বিষয়টা খুবই বাজে দেখায়।

আশেপাশের সবার চোখ আটকে আছে বর বউ এর দিকেই। আর এর পরই সবাই আরশান আর সৃজার দিকে এটেনশন দিচ্ছে। তবে আরশান সানগ্লাসের আরালে তাকিয়ে আছে অন্তির দিকে।

খুব একটা সাজেনি মেয়েটা। রেড প্লেন শাড়ির সাথে ডিজাইনার নেট ব্লাউজ পরেছে আর ঠোটে গাঢ় লিপস্টিক। কোলে একটা ছোট্ট বিড়াল বাচ্চা। আরশান আর অন্তির দিকে মনোজোগ দিলো না। কখনও চোখাচোখি হচ্ছে তো কখনও সামনাসামনি দেখা হচ্ছে।
না কেউ কারোদিকে তাকাচ্ছে না কেউ কাউকে ইম্পর্টেন্ট দিচ্ছে। বরং দুজনই এমন একটা ভাব করছে যেনো কেউ কাওকে চিনেই না।

নুন দুজনকেই দেখছে তখন থেকে। ওর চোখে আজ যেনো মনে হচ্ছে একদম একজন আরেকজনের এক্স। কাল বা পরশুও দুজনের মাঝে যে আবেগটা দেখেছিলো তা যেনো আজ একদম নেই।

চলবে…..

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here