চন্দ্রাণী ২৪

0
31

#চন্দ্রাণী (২৪)

চন্দ্র বাড়িতে এসে ফোন খুঁজতে লাগলো। কোথায় রেখেছে ফোনটা?
টগরকে কল দিয়ে সাবধানে থাকতে বলতে হবে।আশ্চর্য, চন্দ্র কোথাও তার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছে না। নেই নেই,কোথাও নেই।
চন্দ্র খুঁজতে খুঁজতে বাবার রুমের দিকে গেলো।বাহিরে থাকতেই শুনতে পেলো বাবার চাপা কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে গভীর আঘাত ফুটে উঠছে।
বাহিরে থেকে চন্দ্র কিছুই স্পষ্ট শুনতে পেলো না।

চন্দ্র গিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো। শর্মী শসা কুচি করছে।অদ্ভুত রকমের শান্ত লাগছে চন্দ্রর কাছে শর্মীকে।গভীর মনোযোগ দিয়ে শর্মী শসা কুচি করছে। চন্দ্র কি দিয়ে কথা জিজ্ঞেস করবে খুঁজে পেলো না।শর্মীর মনের অবস্থা কেমন তা আগে জানা উচিত।

এদিক ওদিক তাকিয়ে শুভ্রকে না দেখে জিজ্ঞেস করলো, “শুভ্র কোথায় রে?”

শর্মী শান্ত স্বরে বললো, “আব্বার রুমে।”

চন্দ্র জিজ্ঞেস করলো, “কি করছে ওখানে?”

চপিং বোর্ড থেকে চোখ না তুলেই শর্মী বললো, “ও তো আব্বার রুমেই ছিলো। মা’র কাছে বসে ছিলো।আব্বা বাহিরে থেকে এলো সবেমাত্র তোর সাথে, তারপর রুমে গেলো।”

চন্দ্র হালকা হেসে বললো, “কি রান্না হয়েছে আজ,খুব ক্ষুধা লেগেছে। ”

শর্মী যন্ত্রের মতো বললো, “মা গরুর মাংস রান্না করেছে।বড় বড় করে আলু দিয়ে লাল লাল গরুর মাংস। আর চিংড়ি মাছ দিয়ে লতি।”

চন্দ্র হেসে বললো, “ইশ,এলার্জিতে এলার্জিতে ধুল পরিমাণ আজ।”

শর্মী কিছু বললো না। শাহজাহান তালুকদারের রুমের দরজা খুলে গেলো।শুভ্র আর রেহানা বের হয়ে এলো। শুভ্রর মুখ থমথমে হয়ে আছে। কোনো সমস্যা হয়েছে শুভ্রর?
নিজের কষ্ট হলেই শুভ্রর মুখটা এমন দেখায়।

চন্দ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শর্মীকে বললো, “ভাইয়ের কি হয়েছে রে,ওর মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেনো?”

চকিতে শর্মী ভাইয়ের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ আগেও তো হাসিমুখে ছিলো। মাকে রান্না করতে দেখে শর্মীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। শর্মী বুঝতে পেরে একটা বাটিতে চার পিস মাংস আর তিন পিস আলু নিয়ে দিয়েছে ভাইকে।তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে মায়ের কাছে গিয়েছিলো। হঠাৎ কি হলো?

শর্মী চিন্তিত হয়ে বললো, “ঠিকই তো ছিলো আপা।আম্মাদের রুমে কি হয়েছে যার জন্য ও এমন করে আছে?আব্বা আম্মা কোনো কথা বললে তা তো ও বুঝবে না যে কোনো কথাতে কষ্ট পাবে।তাহলে? ওনারা তো আর মারামারি করবে না যে ও তার জন্য এভাবে মন খারাপ করে থাকবে।”

চন্দ্রর দুই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। পরমুহূর্তে মনে পড়তেই শর্মীকে জিজ্ঞেস করে, “আমার ফোনটা দেখেছিস?”

শর্মী মাথা নাড়িয়ে না বলে। চন্দ্র আবারও জিজ্ঞেস করে, “তোর কাছে টগরের ফোন নাম্বার আছে?”

শর্মী মাথা নাড়ায়।চন্দ্র আবারও অস্থির হয়ে যায় টগরের চিন্তায়।শর্মী চন্দ্রর এই অস্থিরতা দেখে জিজ্ঞেস করে, “কোনো সমস্যা হইছে আপা?”

চন্দ্র অস্থিরচিত্তে বললো, “আমার মন কেমন করছে।টগরের নিশ্চয় কোনো বিপদ সামনে। ”

শর্মী কিছুক্ষণ চন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বললো, “তুই কি টগরকে নিয়ে একটু বেশি ভাবছিস না আপা?যতটা না ভাবলেও চলে, তার চাইতে ও একটু বেশি চিন্তা করছিস মনে হয়। ”

চন্দ্র থতমত খেয়ে গেলো শর্মীর কথা শুনে।শর্মী ভুল কিছু বলে নি।সে নিজেও বুঝতে পারছে। সে তো টগরকে অপছন্দ করতো, শত্রু ভাবতো।কিন্তু সেই মনোভাব কিভাবে এতো দ্রুত বদলে গেলো!
কেনো মন টগরের উপর মুগ্ধ হচ্ছে?
টগর কে?একজন মাতাল,একজন ড্রাগ সেলার,একজন খারাপ লোক।
অথচ মন কি-না তার জন্য কাঁদছে।

সেই প্রথম যেদিন টগর চন্দ্রকে তার বাড়িতে সাথে করে নিয়ে গিয়ে একা বাসায় চন্দ্রর টগরের সাথে আনইজি লাগতে পেরে একটা মেয়েকে ডেকে এনেছে যাতে চন্দ্র বিব্রত না হয়।তখনই কেনো জানি মনে হয়েছে যে মানুষ একটা মেয়ের একা পেয়ে সুযোগ না নিয়ে তার সম্মান, তার স্বস্তির কথা চিন্তা করে আরেকটা মেয়েকে ডেকে আনে সে খারাপ মানুষ হতে পারে না।

সেই প্রথম চন্দ্র মুগ্ধ হলো টগরের প্রতি।

একটা মানুষ মায়ের পেট থেকে খারাপ হয়ে আসে নি।পরিস্থিতি তাকে খারাপ হতে বাধ্য করেছে।হয়তো সৎসঙ্গে গেলে আবারও ভুল পথ থেকে ফিরে আসবে।
চন্দ্র চায় টগর ভালো হয়ে যাক।কেনো চায়?
তার উত্তর চন্দ্র জানে না।

শর্মীর দিকে তাকিয়ে বিষন্ন স্বরে বললো, “আমি জানি আমাকে এরকম কাজে মানায় না।কিন্তু আমি কি করবো শর্মী।আমি মনকে মানাতে পারছি না।টগর ভীষণ একা একজন মানুষ। একটু ভালোবাসা, একটু যত্ন পেলে আমার মনে হয় সে সেরে উঠবে।সব অন্যায় ছেড়ে দিবে।আমার কোনো দায় নেই ওকে ভালো করার,তবুও আমার মন ওকে ভালো বানাতে চায়।আমার মনটা এমন কেনো আমি জানি না।”

শর্মী মনে মনে হাসলো। মনে মনে বললো, “আপা,তুই তো আজীবন এমনই ছিলি।কারো কষ্ট সহ্য করতে পারতি না।একবার রমজান ঈদের আগের দিন কিছু লোক এলো আমাদের গ্রামে।নদীতে ঘর ভেঙে গেছে।বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সাহায্য চাইতে এসেছিলো।টাকা পয়সা,খাবার,পুরনো কাপড় সব কিছুই নেয় ওনারা।সেই ঈদে অনেক দোকান ঘুরে তুই গোলাপি রঙের একটা জামা নিয়েছিলি।
সাহায্য চাইতে আসা লোকদের কথা শুনে, তোর বয়সী একটা মেয়েকে দেখে মা’র দেওয়া পুরনো জামা কাপড়ের সাথে নিজের ঈদের জামা জুতা দিয়ে দিলি।মা যত নিষেধ করলো শুনলি না।আব্বার থথেকে সেই ঈদের সালামি অগ্রিম নিয়ে ওদের দিয়েছিলি।
বাসায় ভিক্ষা করতে মহিলারা এলে এখনও জিজ্ঞেস করে মা’কে আপনার বড় মেয়ে আসে নাই বাড়িতে।
ওনারা চালের জন্য এলে এক মুঠো চাল দেওয়ার পরিবর্তে তুই এক পট করে চাল দিতি।
দাদী বলতো তোর মতো পাঁচ ঘর থেকে চাল দিলি মানুষের আর ভিক্ষা চাইতে হবে না সেদিন।তুই যে টগরের দুঃখে এভাবে জড়াবি না তা তো হবে না।”

দুপুরের খাবারের পর সবাই নিজের রুমে শুয়ে ছিলো। চন্দ্র ফোন খুঁজতে খুঁজতে কাচারি ঘরে গেলো।সকালে নিয়াজের মৃ//ত্যু সংবাদ দিতে আব্বার কাছে কাচারি ঘরে গিয়েছিলো তারপর আর ফোন আনে নি ওখান থেকে হঠাৎ করে মনে পড়েছে চন্দ্রর।
কাচারি ঘরে গিয়ে দেখে ঘর খালি।শাহজাহান তালুকদার ঘরে আছেন।বাবুল দাশ নেই কাচারি ঘরে। চন্দ্র অনেকক্ষণ খুঁজে চাবি পেলো।

আলমারি খুলে চন্দ্র ভেতরের ড্রয়ার টান দিলো।ড্রয়ারে তালা দেওয়া। চাবি এখানে নেই আলমারির চাবির সাথে।
চন্দ্র খুঁজতে লাগলো চাবি।সকালে আব্বা চাবি এখানেই কোথাও রেখে গেছেন।খুঁজতে খুঁজতে চাবি পেলো শাহজাহান তালুকদারের চশমার বক্সের মধ্যে।

ড্রয়ারে অনেকগুলো ব্যাগ ভর্তি কাগজপত্র। সব ব্যাগের উপর নাম লিখে রাখা আছে।
চন্দ্র ফোন খুঁজতে খুঁজতে একটা ব্যাগ পেলো চন্দ্র লিখা।
ব্যাগটা খুলতেই কিছু কাগজপত্র পেলো।মেয়ের নামে দেওয়া কিছু জায়গা জমি,দোকানের দলিল পত্র সব এখানে রাখা।
আপনমনে খুঁজতে খুঁজতে চন্দ্র কিছু ছবি খুঁজে পেলো।
ছবির দিকে এক নজর তাকিয়ে বুক কেঁপে উঠলো চন্দ্রর।এগুলো কার ছবি!
এই ছেলেটা কে বর সেজে?
মেয়েটা সে?
কিন্তু তার তো মনে নেই এরকম কিছু, কখনো কেউ বললো না তো এরকম কিছুর কথা।
চন্দ্র জানে না তার জন্য এরকম কতো চমক অপেক্ষা করছে।

চলবে…
রাজিয়া রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here