কোথাও হারিয়ে যাব পর্ব ৭

0
32

কোথাওহারিয়ে_যাব
#রূবাইবা_মেহউইশ
পর্ব-৭

দিনর আলো তখন নিভে গেছে। বসার ঘরটা হিম শীতল হয়ে আছে অনেকটা সময় ধরে। মাগরিবের আগ মুহূর্তে বাড়ি ছেড়েছে শিবলীরা। রায়না বেগম আদর আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি রাখেননি শেষ পর্যন্ত। শিবলীর দাদী তাই মহাখুশি হয়ে নিজের গলার চেইনটা পরিয়ে দিয়েছিলেন অর্নিকে৷ এক কথায় বলা যায় হবু নাতবউয়ের স্বীকৃতি দিয়েছেন। আকস্মিক এ বাগদানে অর্নি ছাড়া কেউই চমকালো না। সকলেই যেন প্রস্তুত ছিল আজকের এই বাগদানের জন্য। অর্নিরও কি প্রস্তুত থাকার কথা না! অবশ্যই। অবশ্যই তার প্রস্তুত থাকার কথা ছিলো সর্বোচ্চ পর্যায়ে কিন্তু তার মুখভঙ্গি বলছে অন্যকথা। সে মানসিক দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে আছে অনেকগুলো দিন ধরে। শিবলী ভাই মানুষ ভাল, দেখতে সুদর্শন, প্রতিষ্ঠিত। বয়সটা বেশি তাতেও সমস্যা নেই আমাদের দেশে দশ থেকে পনেরো বছরের পার্থক্যের সম্পর্কটাকেও স্বাভাবিক ভাবেই নেই আমাদের পরিবারগুলো৷ অর্নি ভেবে দেখলো তার মেজো খালামনি আর খালুর বয়সের পার্থক্যও অনকটা এমন তাই শিবলী ভাইয়ের জন্য তারটাও বাড়িতে নিশ্চয়ই স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে। কিন্তু কোথাও তবুও একটা বাঁধা রয়ে গেছে। তার মন ঠিকঠাক উপভোগ করছে না এই আয়োজন। বসার ঘরে সোফায় একা বসে এসবই ভাবছে অর্নি। আনমনেই তার হাত চলে গেল গলায় থাকা চেইনটাতে। আলতো হাতে সেটা ধরে ভাবছে এতোটা তাড়া না থাকলে কি হতো না! অর্নির ভাবনার মাঝেই মূল দরজায় পা রাখলো রিদওয়ান। সেই যে দুপুরে বেরিয়েছিল ভেবেছিল ক’টা দিন সে আর ঘরমুখোই হবে না৷ অথচ যাওয়ার সময় হাতে ফোনটা ছাড়া কিছু না নেওয়ায় এখন আবার বাড়ি ফিরতে হলো তাকে। বাড়ি ছাড়তে গেলেও কিছু টাকার দরকার তাই ফিরে আসা। দরজায় ঢুকতেই সে দেখতে পেয়েছে সোফায় পিঠ হেলিয়ে বসে আছে অর্নি। পরক্ষণেই চোখে পড়লো তার হাতে থাকা সোনালি রঙের চকচকে বড় চেইনটা।বুকের ভেতর ধ্ক করে উঠলো মুহূর্তেই। গলায় চেইন পরেছে অর্নি! সে কি আগেও চেইন পরত নাকি আজকে তার হবু বর দিয়ে গেল! ছিহ কি লেইম ভাবনা ভাবছে সে! নিজের মনেই নিজেকে বকলো রিদওয়ান। এগিয়ে এসে সোফায় বসতেই অর্নির হুঁশ এলো। সে ফিরে তাকালো রিদওয়ানের দিকে।

-এক গ্লাস পানি দে তো অর্নি

-আচ্ছা

বসা থেকে উঠে অর্নি চলে গেল পানি আনতে৷ রিদওয়ান এক পলক দেখেছিল অর্নির মুখটা। সেজেছে মেয়েটা আজ তাই চোখের ওপর নিচ গাঢ় কাল হয়ে আছে৷ অর্নি পানির গ্লাস হাতে ফিরতেই রিদওয়ান প্রশ্ন করলো, ‘খালামনিরা চলে গেছে?’

-জ্বী

-বিয়ের তারিখ ফিক্সড হলো?

কথাটা জিজ্ঞেস করার সময় রিদওয়ান ভালো করে তাকালো অর্নির মুখে। জবাবটার সাথে অর্নির প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? অর্নি তার চোখে না তাকিয়ে জবাব দিল, না।

-ওহ!

অধৈর্য্য হলো রিদওয়ান এবার আরও কিছু জানতে। কিন্তু সামনের মানুষটার জবাবভঙ্গি পছন্দ হচ্ছে না বলে আর কিছু জানতে না চেয়ে বলল, আম্মু কোথায়, বলতো খাবার দিতে।

সন্ধ্যা মুহূর্ত ; রায়না বেগম নামাজে ছিলেন। দোয়া কালাম শেষে ঘর থেকে মাত্রই বেরিয়েছিলেন। দোতলার সিঁড়ি গোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখলন ছেলেকে। দুপুরে না খেয়ে কোথায় গিয়েছে রিদওয়ান তা তিনি জানেন না। কিন্তু কেন গেছে তা অজানা নয় একদমই৷ এ বাড়িতে রিমন আর রায়না বেগম রিদওয়ানের মনের অবস্থা পাই টু পাই সব জানেন৷ জেনে বুঝেও মুখের ওপর আঠার প্রলেপ লাগিয়ে রেখেছেন সুন্দর সংসারটার খাতিরে। রিদওয়ানের বাবা মানুষটা দুনিয়ার সামনে একজন মহৎপ্রাণ পুরুষ যার দুনিয়া কাজ আর সন্তানের মাঝেই সীমাবদ্ধ। অথচ রায়না বেগম জানেন এই মানুষটাই আবার স্বামী হিসেবে, সংসারের কর্তা হিসেবে ঠিক কতোটা রূঢ়। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিচে নামলেন রায়না। অর্নি তাকে দেখে কিছু বলার আগে তিনিই বললন, অর্নি তুই ঘরে যা আমি খাবার দিচ্ছি রিদওয়ানকে।

অর্নি চলে যেতেই রিদওয়ানও সোফা ছেড়ে ডাইনিংয়ে গেল। রায়না বেগম খাবার সাজিয়ে চেয়ার টেনে বসে গেলেন ছেলের পাশে। রিদওয়ান মায়ের দিকে একদমই না তাকিয়ে খাওয়া শুরু করল।

-বিদেশে চলে যা না কোন এক কাজের বাহানায়।

-কত দিনের জন্য?

– যতদিন ইচ্ছা।

-বিয়ের তারিখ কবে?

-আপাতত হচ্ছে না।

মায়ের মুখে, আপাতত হচ্ছে না শুনে রিদয়ানের হাত থেমে গেল। চমক লাগল ক্ষণিকের জন্য আবার তা মিলিয়েও গেল মায়ের পরবর্তী কথায়, ‘ অর্নির শখ মেডিকেলে পড়ার৷ অর্ণব তাই এডমিশন পর্যন্ত সময় চেয়েছে।’

-যদি মেডিকেল চান্স পায়?

-চান্স পাওয়া বা না পাওয়া পরের বিষয়। তার আগে যেন চেষ্টায় ত্রুটি না আসে তাই আপাতত বিয়ে হবে না।

-ওহ!

পেটের খিদে মরে গেছে রিদয়ানের তবুও জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাতের খাবার শেষ করার। মাও পাশে বসে অসহায়ের মত দেখছে তাকে। এ দৃষ্টি থেকে পালাতে হবে তাকে খুব শিগ্রই। ক’টা দিন দূরে খুব দূরে থাকতে হবে তাকে যেন কেউ না বোঝে তার হৃদয়ের মরণদশা।

______________

রাঙা গৌধূলির রঙিন আলোয় শাড়ি জড়িয়ে ছবি তোলার ইচ্ছে হয়েছিল আজ। বিকেল নামতেই নুপুর শাড়ি পরে ছাদে উঠেছিল। বাড়ির সামনে পেছনে কোথাও একটু সুন্দর জায়গা নেই যেখানটায় বসে দুটো ছবি তোলা যায়। নতুন নতুন ফেসবুক একাউন্টে বিভিন্ন সব ছবি পোস্ট করতে তার দারুণ লাগে। কখনো তার নিজের কোন ছবি লাগায়নি তাই আজ শখ হয়েছে নিজের একটা ভাল ছবি তুলবে। সে ছবিতে চমৎকার কোন ক্যাপশন দিয়ে প্রোফাইল লাগাবে। শখটুকু পূরণ করতেই ছোট ভাইকে দিয়েই তুলিয়ে নিলো ছবি কয়েকটা। আজান পড়তেই সে ঘরে ঢুকে নামাজ আদায় করে রান্নাঘরে ঢুকলো। নুপুরদের বাড়িতে রোজ রোজ চা হয় না কিন্তু আজ ভীষণ চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে নুপুরের। ছোট মা বোধহয় নিজের ঘরেই বসে কিছু করছে তাই সে আর কিছু না ভেবে চা বানালো সাথে নিলো দুটো টোস্ট। এ বাড়িতে সবচেয়ে বড় বারান্দাটা ছোট মায়ের কব্জায় তাই ছোট বারান্দাটা নুপুরের ভাগ্যে। বসার ঘরের সাথে লাগোয়া যে বাড়তি ঘরটা সভ্য ভাষায় গেস্টরুম সেটার বারান্দাটাও অনেক বড় কিন্তু ছোট মা তাকে দেননি সে ঘর। বাবা বলার পরও ছোট মা বলেছিলেন, ‘একা মাইয়া এক ঘরে থাকব তাও আবার বারিন্দার লগেই দেয়ালের পরে রাস্তা। বয়স হইতাছে পোলারা খোঁজ পাইলে মাইয়া খারাপ করব।’

মন খারাপ করতে নেই এমনটাই ভাবে নুপুর। প্রিয় বান্ধবী অর্নিকে সে লক্ষ্য করে সবসময়৷ ছোট বেলায় পাওয়া কিছু আঘাত তাকে বাকরুদ্ধই করে দিয়েছে প্রায়। মেয়েটা হাসে না, প্রয়োজনের বাইরে কথা বলে না৷ জীবন এত তিক্ত তার কাছে নুপুরের মাঝেমধ্যে মনে হয় অর্নির বোধহয় বেঁচে থাকতেই ইচ্ছে হয় না। আর তার ভাই…… ভাবনায় লাগাম টানা দরকার নুপুরের। সে চা আর বিস্কিটের বাটি নিয়ে চলে এলো নিজের ঘরে। নিজেরই ছোট্ট বারান্দায় বসে গরম চায়ে চুমুক দিলো। এ সপ্তাহে পড়া আছে অনেকগুলো যা আগে থেকে না পড়লে ভাল রেজাল্ট হবে না৷ অর্নি ডাক্তারি পড়তে চায় তাই তার পড়াশোনার হিসব আলাদা। নুপুর তো ভাবছে কোনমতে অনার্স করে একটা চাকরি পেলেই হলো। আর সাথে চমৎকার জীবনসঙ্গী স্বচ্ছল হলেই হলো প্রয়োজনে সে লক্ষী মন্ত বউটি হয়ে সংসার করবে।

___________

সারাদিনের কাজকর্ম আর খালার বাড়িতে যাওয়ার দরুণ অর্ণবের আজ গোসল হয়নি৷ রাতে বাইক নিয়ে বাড়ি ফিরতেই হঠাৎ কেউ একজন তার পিছু নিয়েছে। প্রথমটায় সে বুঝতে পারেনি পেছনে একজন বাইকার তার সাথেই পথ বদলাচ্ছে। ব্যাপারটা চোখে পড়েছে গলির মোড়ে বাইকারের গায়ের রঙচটা শার্টটা দেখে। বাড়ি ফেরার আগ মুহূর্তে অর্ণব ঔষধের দোকানে ঢুকেছিল জ্বরের ঔষধের জন্য তখন লোকটা ঠিক রাস্তার কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল বাইকের পাশে। রঙচটা শার্ট বলেই হয়ত তখন রাস্তার আলোয় চোখে লেগেছিল আর এখনও ঠক তাই। মনের ভেতর খচখচানি লেগে রইলো বাড়ির ভেতর ঢোকার পরও। কে নিলো পিছু আর কেনইবা! তবে পেছনে যেই থাকুক না কেন তাকে আঘাত করতে নয় শুধুই নজরে রাখতে নিয়েছে। নইলে মোড় পেরিয়ে বাড়ির রাস্তায় শুনশান ছিল জায়গাটা। বাইকের গতিও ছিল শ্লথ সে অবস্থায় চাইলেই তাকে আঘাত করা সহজ হতো।

– দাদাভাই ভাত খাবি না?

নিচ থেকে দাদীর গলা ভেসে এলো। ভবনাগুলোকে পাশ কাটিয়ে প্রস্তুতি নিলো রাতের খাবার খাওয়ার। সেই সাথে ভাবছে দাদীকে কিভাবে কি বলবে। আজ সকালে খুব করে ধরেছিলো দাদী তাকে অর্নির বিয়েটা যেন ক্যান্সেল করে। কেন যেন দাদী তার শিবলী ভাইকে একদমই পছন্দ করেন না। এ নিয়েও আলাদা এক চিন্তা আছে মনের ভেতর। রাতের খাবার খাওয়া হলো দাদীর ঘরে বসে। টুকটাক গল্প জুড়লো দাদী নাতি মিলে সঙ্গী তাদের রুজিনা খালাও ছিল। এ বাড়িতে মূল সদস্য তারা তিনজনই৷ মাসে দু চারদিনের জন্য শুধু দেখা মিলে অর্নির আবার কখনো কখনো দু মাসেও আসা হয় না তার। দাদী অবশ্য অনেকবার বলছেন অর্নিকে বাড়িতে থাকতে বল। সোমত্ত মাইয়া বড় বড় পোলা আছে ওই বাড়ি রাখা খারাপ দেখায়।
অর্ণব কানে তোলেনি সে কথা। তার ধারণা এখানে এলে সে একাকীত্বে ভুগব। এমনিতেই সে আত্মকেন্দ্রিক তাই ও বাড়ি বৃষ্টি আর খালামনির সঙ্গ তার জন্য বেশি প্রয়োজন৷ আর তাছাড়া সেই কতটুকু বয়স থেকে খালার ছত্রছায়ায় আছে মা না হয়েও তার মায়ের জায়গাটা ওখানেই। খাওয়ার পাট চুকিয়ে দাদীকে ঘুমুতে বলে অর্ণব চলে গেল নিজের ঘরে৷ মাথায় জটলা বেঁধে আছে হাজারো চিন্তা এখন ঘুম চোখে কিছুতেই ধরা দেবে না। পকেট হাতড়ে সিগারেট আর লাইটার বের করল৷ তার ঘরের বারান্দাটা অনেক বড়, সামনে অনেকটা খোলা জায়গা হওয়ায় আলো-বাতাসের কমতি খুব একটা হয় না বললেই চলে। সিগারেট একটা জ্বালিয়ে নিয়ে মুখে পুরতেই একটা মেসেজ এলো৷ ফোন তুলে মেসেজ দেখতেই কুঁচকে এলো ভ্রুর মধ্যভাগ।

‘ রাত গাঢ় হলে অন্তরের হাওয়ায় রিমঝিম এক ছন্দ বাজে৷ এমন ছন্দ আগে কখনো বাজতো না৷ যেদিন দেখলো এক জল্লাদ মুখশ্রী সেদিনই হলো সর্বনাশটা আ….’

শেষের শব্দটা অসম্পূর্ণ রেখেই সমাপ্ত হলো মেসেজটা। নম্বরটা চেনা বলে বুঝতে সমস্যা হলো না কে পাঠিয়েছে এই শব্দতরঙ্গ। কয়েক মুহূর্ত অর্ণব ডুবে রইলো এই শব্দমালার অর্থ খুঁজতে। তাতেই যেন স্বস্তি মিলল বৈষয়িক, আর্থিক সকল টানাপোড়েনের অসুস্থতা থেকে।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here