কালো হরিণ চোখ পর্ব ৬

0
72

#কালো_হরিণ_চোখ (পর্ব ৬)
নুসরাত জাহান লিজা

প্রিয়ম বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন যাপন করছে। নিজেকে ঠিকঠাক চিনতে পারছে না। এতদিন নিজের কাছে সে ভীষণ স্বচ্ছ ছিল। আজ সব কেমন ঘোলাটে।

সে তো বেশ ছিল এক পলক দেখা এক সুনয়নার সন্ধানে। স্বপ্নের পসরা সাজিয়েছিল বহুদিন ধরে। তাহলে সেদিন প্রকৃতিকে অন্যের পাশে হাস্যোজ্জ্বল দেখে এতদিনের চেনা চোখটা আড়াল হয়ে যেতে চাইছে কেন! তবে কি সে ভালোবাসতে পারেনি? ওর ভালোবাসার ভীত এতটা পলকা ছিল! তবে তো প্রিয়ম ভালোবাসতেই পারে না! প্রায় না দেখা স্বপ্নকন্যার প্রতি তীব্র অপরাধবোধে সে আচ্ছন্ন হলো। একরাশ হীনমন্যতা ওকে ঘিরে ধরলো।

প্রিয়মকে দু’দিন ধরে বাইরে যেতে না দেখে রুবিনা চিন্তিত হলেন। যে ছেলের ক্যামেরা নিয়ে টো টো করে ঘোরা, ঘরে কম থাকা নিয়ে তিনি অভিযোগ তুলতেন, সেই ছেলের এমন আচরণ তাকে খানিকটা ভাবনায় ফেলে দিল।

তিনি আজ খাবার সময় খেয়াল করলেন, প্রিয়ম হাত দিয়ে ভাত নাড়াচাড়া করছে। খাচ্ছে না।

“কী হয়েছে তোর?”

“কিছু না তো মা।”

“তাহলে খাচ্ছিস না কেন?”

“খিদে নেই।” বলে আবারও খেতে চেষ্টা করল।

“কী ঘোঁট পাকিয়েছিস রে?”

“আমি ঘোঁট পাকাই? আমার নামে কোনো কমপ্লেইন পেয়েছ তুমি? টিচারদের কাছ থেকে? ফ্রেন্ডস এর কাছ থেকে?”

“খুব গর্ব না নিজেকে নিয়ে? লায়েক হয়ে গেছিস? শোন, যত বড় হনুই হোস না কেন আমি কিন্তু তোর মা। তোকে পেটে ধরেছি, জন্ম দিয়েছি। আমার কাছে কিন্তু তুই সেই পুঁচকে আছিস। তাই ঝেড়ে কাশ তো।”

প্রিয়ম বলতে পারল না। সে ভীষণ চাপা স্বভাবের ছেলে। নিজেকে সহজে প্রকাশ করতে পারে না। মা ওর সবচাইতে কাছের বন্ধু। তবুও সে হৃদয়টা মেলে ধরতে পারল না। গহীন যাতনা সে নিজেই পুষতে চায়। তাছাড়া প্রকৃতি মা’য়ের অত্যন্ত স্নেহের। মা বিষয়টা কীভাবে নেবেন প্রিয়ম জানে না। প্রকৃতিকে নাকি সেই সুনয়নাকে? এমন কথায় মেয়েটাকে অসম্মান করা হতে পারে বলে মনে হলো। সে কাউকে অসম্মান করতে চায় না।

সে চরম দ্বিধায় ভুগছে। অন্তর্দ্বন্দ্বে সে পুরোপুরি নাচার হয়ে আছে। নিজেকে বোঝার জন্য সময় প্রয়োজন। মনস্তাত্ত্বিক কলহ অসহ্য হয়ে উঠেছে প্রিয়মের কাছে।

“মা, আমি কিছুদিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। আমার প্রথম বড় কাজ। তুমি একা বাসায় কীভাবে থাকবে, তাই টেনশন হচ্ছিল।”

রুবিনা বুঝলেন ছেলে এখন তাকে কিছু বলতে চায় না। ছেলে বড় হয়েছে, তার নিজস্ব কিছু ব্যাপার থাকতে পারে। তাই তিনি আপাতত নিরস্ত হলেন।

“তোকে চিন্তা করতে হবে না। তুই কবে যাচ্ছিস?”

“পরশু। তুমি কিন্তু সাবধানে থাকবে মা।”

“আমি তো বাসায়ই আছি। তুই সাবধানে যাবি। ওইদিকে পানির সমস্যা। তুই মিনারেল ওয়াটার সাথে রাখবি সবসময়। আমি তোর ব্যাগে স্যালাইন দিয়ে দেব। অযত্ন করবি না নিজের।”

প্রিয়ম মৃদু হাসল। সে কাজে যাচ্ছে ঠিকই, তবে এ-ও সে জানে, সে আসলে কিছুদিনের জন্য পালাচ্ছে। সবকিছু থেকে, নিজের কাছ থেকেও। প্রিয়ন জানে না, নিজের কাছ থেকে কখনো পালানো যায় না!

“দোয়া কোরো।”

“দ্রুত ফিরবি কিন্তু।”

“কথা তো হবেই মা। তোমার প্রেসক্রিপশনটা আমাকে দিও। আমি এক সপ্তাহ থাকব না। তোমার ওষুধগুলো কিনে দিয়ে যাব। ফুপুকে আসতে বলব। এই কয়দিন তোমার সাথে এসে থাকুক। ডায়াবেটিস বাড়িয়ে ফেলো না আবার।”

ছেলে তার জন্য চিন্তা করছে রুবিনা বুঝতে পারেন। তাই দ্বিমত করলেন না। নইলে দেখা যাবে তার চিন্তায় ছেলে কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। প্রশান্তির হাসি ফুটল তার মুখে,

“বাপধন আমার, সব মনে থাকবে। তুই নিজে ঠিক থাকিস।”

***
প্রকৃতির এখন নিয়মিত ক্লাসটেস্ট নইলে এ্যাসাইনমেন্ট থাকছে। সময় কাটছে ব্যস্ততার মধ্যে। রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। প্রতি সেমিস্টারে মনে হতো, সামনের সেমিস্টারে পড়া জমাবে না। শুরু থেকেই পড়ে ফাটিয়ে ফেলবে। কিন্তু সেটা কখনো হয়ই না। প্রতিবার পরীক্ষার আগে সেই একই চিত্র। এই শেষ সেমিস্টার ফাইনালের আগেও যা অপরিবর্তিত। শুরু থেকে গায়ে বাতাস লাগিয়ে চলা, আর পরীক্ষার আগে নাকেমুখে পড়াশোনা। ধূর, ভাল্লাগে না।

চায়ে চুমুক দিল, বিস্বাদ লাগছে। অথচ এই ঘণ দুধের চা ওর বড্ড প্রিয়। অনেকটা সময় নিয়ে সে এই চা বানায়। হালকা গা গরম, জ্বর আসি আসি করছে। মা নির্ঘাত বকাঝকা শুরু করবেন। একসাথে এত প্রেসার নিয়ে পড়তে গিয়ে প্রতিবার পরীক্ষার আগে সে জ্বর বাধিয়ে বসে।

একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। রথি পছন্দ করে মৃদুলকে। অনেক আগে থেকে। ওদিকে সেদিন মৃদুল এসে ধরেছে প্রকৃতিকে। যে করেই হোক, রথির মনোভাব জানতে।

সে দুটোর একটাকেও কিছু বলেনি। মৃদুলকে বলেছে, “তুই নিজে বল। নিজে জানার চেষ্টা কর। ভীতু ছেলেদের কিন্তু মেয়েরা দু-চোখে সহ্য করতে পারে না।”

“আচ্ছা প্রকৃতি, রথি কী কী পছন্দ করে জানিস? “রথির প্রিয় লেখক কে?
“প্রিয় ফুল কী?”
“প্রিয় বই কী?”
“কোন পারফিউম পছন্দ করে?”

নানা প্রশ্নে জর্জরিত করেছে। বেচারা যদি জানত, রথি ওর জন্য আগে থেকেই উতলা হয়ে আছে, ওর অভিব্যক্তি কেমন হতো!

প্রকৃতির মজা লাগছে, দু’জনের মনের কথাই সে জানে একমাত্র। ওরাও জানে না। সে চায় ওরা নিজেরাই নিজেদের আবিষ্কার করুক৷ তাতে আনন্দ আছে, সে এর ভেতরে নাক গলাতে চায় না। তাতে হয়তো দ্রুত কাছাকাছি আসবে, কিন্তু ধীরে ধীরে আবিষ্কারের যে আনন্দ তা নষ্ট হতে পারে।

প্রকৃতি আজও আবার এসেছে ছাদে, ঘরে ফেরা দেখতে সূর্যের, পাখিদের, সেই সাথে প্রিয়মের। কিন্তু গত তিনদিনে ছেলেটাকে একবারও দেখতে পায়নি। এটুকুই ওর অজুহাত প্রিয়মকে দেখবার। বহুদিন ধরে সে এখানে বসে থাকে। না হওয়া প্রিয় মানুষকে এক পলক দেখবার জন্য।

কিন্তু নেই, কোথায় ছেলেটা? সেদিনের কথায় কষ্ট পেয়েছে নিশ্চয়ই। স্বাভাবিক, কষ্ট দেবার জন্য সে বলেনি, নিজেকে ঢাকবার প্রয়াসের সে বলেছিল, যেভাবে সবসময় বলত।

বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে, সে নেমে এলো, বাতাসে শীত শীত লাগছে। জ্বরটা বেড়েছে।
………….
(ক্রমশ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here