এক মুঠো প্রণয় (সিজন টু) শেষ পর্ব

0
45

#এক_মুঠো_প্রণয়
#সিজন_টু
#অন্তিম_পর্ব
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ

মেহেরাজ যখন সাঈদকে বিয়েতে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে তাদের বাড়ি পৌঁছাল ঠিক তখনই সম্মুখীন হলো এক কঠিন সত্যের। সাঈদ নির্বিকার ভাবে তার দিকে এগিয়ে দিল কয়েকটা রিপোর্ট। যে রিপোর্ট দেখে সে এটা স্পষ্ট যে সাঈদের ব্রেইন টিউমার। অথচ এতোটা কাছের বন্ধু হয়েও এই সত্যটা সে এতকাল ধরে জানত না।অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে থাকল সাঈদের দিকে৷ সাঈদ সে দৃষ্টি দেখে হাসল। কাঁধে চাপড় মেরে পাশে বসেই বলল,

“বোনকে সুখী দেখতে চাসতো? তো যার জীবনের নিশ্চায়তা নেই তার সাথে বোনের বিয়ে দিলে কি তোর বোন সুখী হবে? হবে না সুখী। আর আমার জীবনের খুব বেশিদিনের নিশ্চায়তাও নেই। এই অল্প সময়ের জন্য মেহুকে আমার জীবনে না জড়ানোটাই বেটার না? তবে মেঘ ছেলেটা কিন্তু সবদিক দিয়েই ভালো। মেহুর বিয়েটা বরং মেঘের সাথেই হোক৷ আমি অন্তত মরার আগে ওর বিয়েটা দেখে যাই দোস্ত? প্লিজ রাজি করা তুই মেহুকে।তোর কথা ও ফেলবে না নিশ্চয়। ”

কথাগুলো সাঈদ হাসি হাসি মুখে বললেও মেহেরাজের বুক ভার হয়ে এল। নিঃশ্বাস যেন আটকে আসতে চাইল। নিজেরই সবচেয়ে কাছের বন্ধুর জীবন সম্পর্কিত এই চরম সত্যটি বিশ্বাস করতে কষ্ট অনুভব করল ভীষণ করে৷ আর সে কষ্ট সমেতই মুহুর্তেই জড়িয়ে ধরল সাঈদকে। অভিযোগের সুরে বলল,

“আমার থেকে এতগুলো দিন এসব লুকিয়ে গেলি কেন? কি হলো বল? কেন লুকিয়ে গেল? ”

সাঈদ বোকা বোকা হাসল। মাথা চুলকে বলল,

“কাউকেই জানাইনি দোস্ত৷ আজ এই প্রথম তোকেই বললাম। আব্বুও জানে না এই বিষয়ে। আমার একটা অনুরোধ রাখবি? ভেবে নে শেষ অনুরোধ প্লিজ। মেহু আর মেঘ ছেলেটার বিয়েটা দেখতে চাই। প্লিজ দোস্ত!”

মেহেরাজ উত্তর দিল না। শুধু হৃদয় ভার হওয়া অনুভূতি নিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে রাখল। একা থাকলে বোধহয় এতক্ষনে কান্নাও ভীড় করত চোখে। এতোটা হাসিখুশি, এতোটা চঞ্চল ছেলেটা।অথচ এই ছেলেটার জন্যই এই কঠিন নিয়তি? ভাবতেই বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। সাঈদ অবশ্য থেমে থাকল না। বারবার বলে গেল কেবল একটি কথাই। মেহুর বিয়ের কথা। মেঘের সাথে যাতে মেহুর বিয়েটায় মেহেরাজ রাজি করায় এই-সেই।অবশেষে মেহেরাজও মানল তা৷ বন্ধুকে বলে এল, সে রাজি করাবে।আর বিয়েটাও শীঘ্রই সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে।

.

সে অনুযায়ী রাতে বাসায় ফিরে মেহুর রুমে গিয়ে কতক্ষন নিস্তব্ধ হয়ে বসে ও থাকল মেহেরাজ। মুখ দিয়ে যেন রাজি করানোর জন্য একটা শব্দও আসতে চাইল না তার। গলা যেন কঠিন! তবুও বহুচেষ্টার পর মেহুর মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝাল,

“মেহু?মেঘ ছেলেটা কি ভালো নয়? তোর কি মনে হয়? সে তোকে কতটুকু ভালোবাসে মেহু? ”

মেহু নিষ্প্রভ চাহনিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শুধাল,

“হয়তো অনেকটুকুই, যা আমার আন্দাজেরও বাইরে। তবে আমি তার ভালোবাসার গভীরতা অনুমান করার চেষ্টা করিনি কখনো ভাইয়া।”

“ একটা সত্য কি জানিস মেহু?আমাদেরকে যে ভালোবাসে তাকে জীবনসঙ্গী করলে আমরা কখনোই ঠকবো না। আমি যতটুকু জানি সে তোকে নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। নিঃসন্দেহে সে তোকে সুখী রাখবে। আর, বাবা মায়েরও ইচ্ছে ছিল মেঘের সাথেই তোর বিয়েটা হোক।”

“তুমি কি চাও ভাইয়া? বিয়েটা হোক বা আমি যাতে এই বিয়েতে যাতে রাজি হই এটাইতো বলতে চাইছো তাইনা ভাইয়া? কিন্তু সত্যটা হলো আমি চাইলেও রাজি হতে পারছি না ভাইয়া। আমার সময় প্রয়োজন। এতোটা তাড়াতাড়ি আমি পারব না সবটা সামলে নিতে।একটু সময় কি দেওয়া যায় না? ”

“সময় দেওয়া যাবে না কেন? আমি তোকে জোর করিনি মেহু।”

মেহু মাথা নাড়াল। প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,

“জ্যোতিকে কবে বিয়ে করছো ভাইয়া?ও তো রাজি হয়েছে বিয়েতে। মুখে না বললেও এর মানেটা হলো ও তোমায় ভালোবাসতে শুরু করেছে! ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে ভীষণ। বাসায় থেকে থেকে বেধহয় আরও একা হয়ে যাচ্ছি ভাইয়া।বিয়ে করে ওকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো প্লিজ!”

মেহেরাজ দিমত করল না অবশ্য। চুপচাপ বেরিয় এল কেবল ঘর ছেড়ে।

.

মেহেরাজ আর জ্যোতির বিয়েটা সম্পন্ন হলো খুবই কম আয়োজনে, কম সময়ে, সাধারণভাবেই। জ্যোতির বুক ধড়ফড় করল। আজ থেকে সে মেহেরাজের বিবাহিত স্ত্রী ভাবতেই কেমন এক অনুভূতি কাজ করল। আর সে অনুভূতি তীক্ষ্ণ হলো যখন তাকে বিছানায় বউ সাঁজে বসিয়ে দিয়ে যাওয়া হলো। তীব্র অস্থিরতায় অস্থির অনুভব হলো।অপেক্ষা করল মেহেরাজের আগমনের। অবশেষে সে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঘরে প্রবেশ করল মেহেরাজ। ঘরে ডুকেই প্রথমে জ্যোতির দিকে তাকাল।লাল শাড়িতে আর বউ সাজে মোহনীয় বোধ হলো তার কাছে এই মেয়েটিকে।মনে হলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণীটি তার সম্মুখেই বসে আছে । দু পা বাড়িয়েই বিছানার কাছে গিয়ে গলা ঝাড়ল সে। গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

“ এতদিন এতো ঘাড়ত্যাড়ামি দেখিয়ে আজ এমন ভদ্রভাবে বসে আছিস? আশ্চর্য!”

জ্যোতি মিনমিনে চাহনিতে মাথা তুলে চাইল। ভদ্রভাবে বসে না থেকে কি তার এখন থইথই করে নাচার কথা?আশ্চর্য!চাপা শ্বাস ফেলে মেহেরাজের দিকে সেভাবে তাকিয়ে থাকতেই মেহেরাজ পাশে বসল। বুকের বা পাশে হাত রেখেই বলে উঠল,

“ উহ ওভাবে তাকবি না জ্যোতি। বুকে কেমন জানি অনুভূত হয় আমার। এমনিতেই তোকে এই সাজে দেখেই বুকের ভেতর কেমন একটা করছে দেখ। ”

কথাটা বলেই জ্যোতির এক হাত নিজের বুকে চেপে ধরল। জ্যোতির দৃষ্টি আগের মতোই থাকল। তা দেখেই মেহেরাজ বলে উঠল,

“ ওভাবে তাকিয়ে আছিসই কেন?আশ্চর্য!”

জ্যোতি কিছু বলল না। তবে হাত ছাড়িয়ে নিল কেবল। মেহেরাজ হাসল কেবল৷ জ্যোতির হাতটা পুনরায় হাতের মাঝে নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল আলতো করে।আর সে স্পর্শেই কেঁপে উঠল জ্যোতি। মেহেরাজ তা খেয়াল করল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“ এমন করছিস যেন অনেক কিছু করে ফেলেছি তোর সাথে। কিছু কি করেছি আমি? ”

জ্যোতির মুখ লালাভ হয়ে উঠল যেন। কৃষ্ণ বর্ণীয় মুখ রক্তিম হলো হঠাৎ। আর সেই রক্তিমতা ডাকতেই প্রসঙ্গ পাল্টানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে ঠোঁট চেপে বলল,

“ আপনি তো রেগে ছিলেন মেহেরাজ ভাই ? হঠাৎ রাগ সব চলে গেল? ”

মেহেরাহ হাসল মৃদু। বলল,

“ বউয়ের সামনে অতো রাগ করা চলে না৷ তাই রাগরাও বোধহয় পালিয়ে গেছে৷ শুধু থেকে গেল কিছু অপ্রকাশিত অনুভূতি। ”

জ্যোতি ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। নিচের ঠোঁট কামড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,

“ হ্ হু?”

মেহেরাজ মোহনীয় নজরে চাইল জ্যোতির পাতলা মিহি ঠোঁটজোড়ার দিকে। কিছুটা এগিয়ে বসে হুট করেই বলল,

“ নিচের ঠোঁট কামড়ে রেখেছিস যে? আশ্চর্য?তুই কি ঠোঁট লুকাতে চাইছিস জ্যোতি? ”

কথাটা শুনেই জ্যোতি মেহেরাজের দিকে নজর রাখতে পারল না। তার আগেই তার ঠোঁটজোড়ার দখল নিল অপরজোড়া পুরু পুরুষালি ঠোঁট। জ্যোতির নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ঘন হলো যেন। হৃদয়ে যেন তোলপাড় অনুভূতি বয়ে গেল।আর সে তোলপাড় অনুভূতিকে স্থগিত রেখে মেহেরাজ তার ঠোঁট ছাড়ল আরো কিয়ৎক্ষন পর।নিঃশব্দে হেসে জ্যোতির মুখের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল জ্যোতির লজ্জ্বায় লাল হওয়া রক্তিম মুখ। লজ্জ্বানত মুখ! মেহেরাজ বাঁকা হাসল। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

“ এইটুকুতে এত লজ্জ্বা? তুই এমনভাবে লজ্জ্বায় লাল হয়ে যাচ্ছিস যেন আমি সাংঘাতিক কিছু করে বসেছি জ্যোতি। ”

জ্যোতি মুখ তুলল না।মেহেরাজ ফের বাঁকা হাসল। ঠোঁট বাঁকিয়ে শুধাল,

“আজ রাতটা তোর জন্য স্মরনীয় হবে জ্যোতি।তুই প্রতি মুহুর্তে শিহরিত হবি যা ভাবলে।তোর শরীর-মন সমস্তটা জুড়েই অনুভূতির বেসামাল প্রবাহ বইবে৷ শিরায় শিরায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভূতির শিহরণ বইবে।সে শিহরনের জন্য হলেও লজ্জ্বাটা তুলে রাখ প্লিজ!”

.

তার পরদিনই বেশ ভোরেই ঘুম ছেড়ে উঠল মিথি।নিজের বাড়িতে না ঘুমিয়ে মিথিদের এই টিনের ঘরে, স্যাঁতস্যাঁতে বিছানায় ঘুমিয়েছিল মেহুও। মিথির উঠে যাওয়া টের পেয়েই বোধহয় ঘুম ভাঙ্গল তারও। ঘুমুঘুমু চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“গুড মর্নিং মিথি। আজ এত সকালে উঠলি?”

মিথি ঠোঁট উল্টে বলে উঠল,

“ ভেঙ্গে গেল ঘুম আপু। আরো কিছুক্ষন ঘুমানো ঠিক ছিল না বলো? যায় হোক, তুমি উঠলে কেন?”

মেহু হাসল অল্প৷ বলল,

“আমারও ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাইরে বের হবি মিথি? ভোরের হাওয়া শরীরের জন্য ভালো জানিস তো?”

চটফট উত্তর এল মিথির,

“আমি তো এক পায়ে রাজি বাইরে বের হতে। বের হবে? ”

মেহু মুহুর্তেই রাজি হলো। তারপর আর দেরি হলো না। দুইজনই বের হলো প্রকৃতির সুন্দর হাওয়া অনুভব করতে। তখন অবশ্যই কেউই ঘুম থেকে উঠেনি।চারপাশ বেশ নিরব, জনমানবশূণ্য। বিয়েবাড়ির ঝামেলায় আগের দুদিন কারোরই ভালো করে ঘুম হয়নি বলেই হয়তো আজ সবাই এত আরামে ঘুমাচ্ছেে।এতে অবশ্য মিথি খুশিই হলো। দাদী উঠে গেলে নিশ্চয় এতক্ষনে তাকে নিষেধ করতো বের হতে? মিথি এই নিয়ে আনন্দিত। হাঁটতে হাঁটতে বললও মেহুকে,

“জানো আপু?দাদী এই সময়ে ঘুম ছেড়ে উঠলে হাজারটা বকাঝকা করত। এরচেয়ে আমরা চুপচুপি চলে এসে ভালো করেছি না বলো? যায়হোক, বাড়ি গিয়ে কিন্তু একেবারে নাক ডেকে ডেকে তিনঘন্টা ঘুমাব। বুঝলে? ”

মেহু হেসে উঠল। কতদিন পর যেন এভাবে হাসল৷ মেয়েটার কথা সত্যিই হাসাতে পারে। হাসতে হাসতে,কথা বলতে বলতেই দুইজনে পা বাড়াল আরে অনেকদূর। তারপর পৌঁছাল গ্রামের নদীটিতে। সকালের এই পরিবেশে নদীটা দেখতে সত্যিই সুন্দর বোধ হলো। কিনারায় দুটো নৌকাও বাঁধা রয়েছে। মেহু পা বাড়িয়ে বলল,

“নৌকার মাঝি কোথায় মিথি? নৌকা চড়বি? ”

মিথি এপাশ ওপাশ তাকাল। কিন্তু মানুষজন নেই। বোধহয় খুব ভোর বলেই কেউই নেই। মন খারাপ হলো যেন তার এই কারণে।ঠোঁট উল্টে শুধাল,

“ নৌকার মাঝি তো দূর আপু, কোন মানুষই নেই এইখানে। এর থেকে বাড়ি চলো তো আপু, আরামে ঘুম দিব আবারও। ”

মেহুরও মুখ চুপসে এল যেন।মৃদু স্বরে বলল,

“উহ মিথি দাঁড়া না। কত সুন্দর পরিবেশ না দেখ? আমি কখনো নৌকায় উঠিনি। একবার নৌকায় উঠি? নৌকায় বসে নদীর পানি ছুঁবো। কত সুন্দর অনুভূতি না?”

মিথির চোখ চকচক করে উঠল। আসলেই সুন্দর অনুভূতি। কিন্তু দাদীর নিষেধাজ্ঞার জন্য কোনকালেই নদীতে আসা হয়নি, নৌকাতে চড়াও হয়ি। কারণ একটাই সে সাঁতার পারে না। দাদী অবশ্য অনেক করে বলেছিলও সাঁতার শিখতে। কিন্তু অলস মিথি কোনকালেই সেই কথা পাত্তা দিলে তো?তাই তো নৌকায় উঠে চড়ার স্বপ্নটাও স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু আজ তো কোন নিষেধ নেই। তাই খুশিমনেই মেহুর কথাতে রাজি হলো নাচতে নাচতে। মেহু হাসল মিথির এমন চঞ্চলতা দেখে। পরমুহুর্তে কিনারায় নৌকা বাঁধা আছে দেখে দুই পা বাড়িয়ে সাবধানে নৌকায় উঠে বসল। পিঁছু পিঁছু গিয়ে বসল মিথিও। দুষ্টুমি করে নৌকার মাঝে থাকা বৈঠা নিয়ে নড়চড় করল অনেকটা সময়। আর মানসিক অবসাদে ভুগা মেহু চোখ বুঝে অনুভব করে গেল প্রকৃতিকে। কি সুন্দর পরিবেশ! শীতল হাওয়া!এক হাতে অনবরত ছুঁয়ে গেল নদীর পানি। আর এই চোখ বুঝে প্রকৃতিকে অনুভব করতে করতে টেরই পেল না যে মাঝির বাঁধা নৌকার অল্প মজবুত বাঁধনটা সেই কবেই আলগা হয়ে খুলে গিয়েছে।নৌকা কিনারা থেকে চলে এসেছে বহুদূর! বলা চলে নদীর মাঝখানে। কিন্তু সেটা সে টের পেল বহুপরে৷ অনেকটা সময় পর বন্ধ রাখা চোখের পাতা খুলে চাইতেই হঠাৎ টের পেল নৌকাটা অনেকদূরে এসে গিয়েছে।অথচ নৌকাটা তো সে বাঁধা ছিল দেখেছিল। মেহু দীর্ঘশ্বাস ফেলল যেন। একনজর মিথির দিকে তাকিয়েই বলল,

“মিথি? নৌকার বাঁধনটা কি করে খুলল?নৌকাটা যে এতদূর এসে গিয়েছে দেখিসনি? এখন পাড়ে কি করে যাব আমরা?”

মিথি আপন মনে নদীতে ভাসা শাপলা নিতে ব্যস্ত ছিল। সেও খেয়াল করেনি বিষয়টা।আর না তো খেয়াল করল মেহুর বলা কথাটার অর্থ! ফুল নিতে ব্যস্ত হয়েই অন্যমনস্ক স্বরে মজা করে বলে উঠল,

“নৌকা তো বাঁধা ছিল আপু। বাঁধন কে খুলবে বলতো? আচ্ছা আপু?নদীতে কি ভূত আছে?”

কথাটা বলেই হেসে কিছুটা ঝুকল অল্প দূরের একটা ফুল নিতে।কিন্তু ফুলটা বেশি দূরেই বলেই দাঁড়িয়ে,নৌকার কিনারায় এক পা রেখে ফের ঝুকে গেল নিচের দিকেই। মেহু ছোটছোট চোখে তা খেয়াল করেই দ্রুত বলল,

“কি করছিস কি মিথি? পরে গে…..”

মেহুর কথাটা সম্পূর্ণ হতে পারল না। তার আগেই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। মিথি হুড়মুড়িয়ে পরে গেল নদীর পানিতে। সাঁতার না পারা মিথি তখন নদীর মাঝখানটায় হাত ঝাপ্টাল বারবার। আকস্মিক এই ঘটনায় মেহুর মস্তিষ্ক ও শূণ্য বোধ হলো যেন। সেই তো নৌকায় আসার ইচ্ছে পোষণ করেছিল। যদি ইচ্ছেটা না প্রকাশ করত তাহলে তো এমন কিছুই হতো না। কথাগুলো ভেবেই মিথির বর্তমান অবস্থা দেখে আর কিছু না ভেবে মুহুর্তেই মিথিকে বাঁচাতে পানিতে ঝাপ দিল সে নিজেও।মাথায় কেবল একটা কথায় ঘুরল যে মিথিকে বাঁচাতে হবে। অথচ মস্তিষ্কে এই কথাটা একবারও এল না যে, সে নিজেও সাঁতার পারে না। অতঃপর বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা চালাতে চালাতেই তলিয়ে গেল দুটো মেয়ের শরীর ! প্রাণোচ্ছল প্রাণ! অথচ আশপাশে কেউই টের পেল না। কেউ জানল না, এই মুহুর্তটাতেই, এই ক্ষনটাতেই, এই জায়গাটাতেই দু-দুটো মেয়ে পানি থেকে উঠতে কতোটা চেষ্টা করেছে, কতোটা লড়াই করেছে।বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চিৎকারও করেছে!কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হলো?শুধু একটা মুহুর্ত পর নদীর মাঝখানে তলিয়ে যেতে যেতেই রেখে গেল পৃথিবীতে তাদেরই শেষ স্মৃতিটুকু!

.

পরিশিষ্ট-

দেখতে নাদুশ-নুদুস দুটো বাচ্চা মেয়ে সোফায় পা দুলিয়ে বসে আছে।বয়স এই ছয় কি সাত বছর হবে।কিয়ৎক্ষন পর পর দুইজনই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে তাদেরই সামনে বসে থাকা তাদের আম্মুর ক্লান্ত চেহারাকে। অবশেষে ঠোঁট ফুলিয়ে তাদের মধ্যেরই একজন জিজ্ঞেস করল,

“ আব্বু আসলে একেবারেই খাব আম্মু।খাবার নিয়ে বসে থেকো না পিজ। ”

জ্যোতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবারে। মেয়ের কথা শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। দশ বছর পূর্বে মেহেরাজ আর তার বিয়ের পরেরদিন যে সংবাদ শুনে এতোটা দুঃখ পেয়েছিল সে দুঃখ বছর সাত পূর্বে জম্মানো এই জমজ কন্যা দুটিই গুঁছিয়ে দিয়েছিল কিছটা।নাটকীয় বোধ হলেও সত্য হলো,এদের মাঝে একজন দেখতে একদম মেহুর মতোই, আর অন্যজন মিথির মতো দেখতে হয়েছে।তাই তো সে এই দুইজনকে মেহু আর মিথিরই অন্যরূপ ভাবে। মেহু আর মিথির মৃত্যুতে যা কিছু হারিয়েছিল জ্যোতি তা না পেলেও কোথাও যেন একটা তৃপ্তি ফিরল এই দুইজনের হাত ধরে। একজনের নাম মিহি, অপরজনের নাম জুহি।কিন্তু সবকিছুর পরেও আশ্চর্যের বিষয় যা তা হলো, মিথির মতো দেখতে যে অর্থ্যাৎ জুহি স্বভাবে একদম শান্ত, বুঝদ্বার একটা বাচ্চা! অন্যদিকে মেহুর মতো দেখতে যে অর্থ্যাৎ মিহি স্বভাবে চঞ্চল,প্রাণবন্ত! যেন মিথিরই অন্য রূপ! জ্যোতি মাঝেমাঝে মিহির উপর বিরক্ত হয় ঠিকই কিন্তু পরমুহুর্তেই যখন আবার মিথির কথা স্মরণ হয় তখন কেন জানি আর রাগ থাকে না। ইচ্ছে করে দুইজনকেই আগলে নিয়ে সর্বক্ষন বসে থাকুক। যেন কেউ আর নতুন করে না হারায়। মেহু আর মিথির মতোই যেন এরাও তাকে আর একা করে রেখে চলে না যায়।জ্যোতির চোখ টলমল করল। ঠোঁট চেপে কান্না আটকাতেই জুহি এগিয়ে এল। নরম স্বরে বলল,

“খাবার খাশ্ ছি না বলে কান্না করছো আম্মু? জুহি স্যরি। অনেক স্যরি। কান্না করো না পিজ। ”

ততক্ষনে এগিয়ে এল মিহিও। জ্যোতির গালে নরম ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে চুমু খেল শব্দ করে। পরমুহুর্তেই মায়ের গলা জড়িয়ে বলল,

“একদম কান্না করে না বাবুর আম্মুটা! এই দেখো চুমু দিয়ে দিলাম। আদর দিয়ে দিলাম তো? কাঁদে না হু?”

জ্যোতি হাসি চেপে চোখ রাঙ্গিয়ে চাইল মিহির দিকে।যখন খুব বেশি মন খারাপ হয় কিংবা কান্না পায় তখন মেহেরাজ এভাবেই তার গালে চুমু খেয়ে কথাগুলো বলে। আর সে কথাগুলোই শুনে শুনে একদম মুখস্ত করে ফেলেছে মিহি। আর যখনই তার কান্না পায় তখনই এভাবেই বাবাকে অনুকরণ করে একিভাবে এসব বলে ফেলে। বহুবার ধমক কিংবা চোখ রাঙ্গিয়ে ও এই কথাগুলো বলা থেকে মিহিকে বিরত করতে পারল না জ্যোতি । এবারেও পারল না। মিহি ঠোঁট উল্টে ফের বলল,

“ কি আচ্ চর্য! আমি কি করেছি? তুমি ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন আম্মু? এই জুহি?আমি খারাপ কিছু বলেছি?”

জুহি বিনিময়ে কিছু বলতেই নিচ্ছিল। ঠিক তখনই কলিংবেলের আওয়াজ আসল কানে। মুহুর্তেই দুইজন ছুটে গেল দরজার সামনে। চঞ্চল গলায় সমস্বরে বলল,

“আব্বু এসে গেছে আম্মু! ”

জ্যোতি মৃদু পায়ে গিয়ে দরজা খুলল। চোখে পড়ল মেহেরাজের ক্লান্ত মুখ। জ্যোতির দিকে চেয়ে হেসে দিয়েই ঝুঁকে আগলে নিল তার দুই কন্যাকে। দুইজনের তুলতুলে গালে চুমু দিয়ে মশগুল হলো তাদের গল্পে।জ্যোতি বাবা মেয়েদের সেসব খুনশুটি দেখে আর দাঁড়াল না। দরজা লাগিয়ে চলে গেল রুমে। বিছানায় মেহেরাজের টিশার্ট, টাউজার, তোয়ালে রেখে গিয়ে দাঁড়াল বেলকনিতে। আকাশের পানে চেয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে পড়ল মেহুর কথা! কতোটা আপন ভাবত সে এই মেয়েটাকে। নিজের বড়বোন না থাকা সত্ত্বেও এই মেয়েটাকে সে বড়বোনের মতোই ভালোবেসেছিল। বড়বোনের মতোই সমীহ করত। আজ যদি মেহু বেঁচে থাকত তাহলে নিশ্চয় খুব সুন্দর হতো সবটা?আর যদি মিথি বেঁচে থাকত? এতদিনে নিশ্চয় মিথির চঞ্চলতায় পরিপক্বতা আসত? কে জানে! জ্যোতির চোখ ফের টলমল করল এসব ভাবতে ভাবতেই। কিন্তু তার মাঝেই হঠাৎ কোমড়ে টের পেল উষ্ণ হাতের স্পর্ষ। স্পর্শটা চেনা বলেই নড়চড় করল না জ্যোতি। স্থির সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল। মেহেরাজ এবারে মুখ গুঁজল জ্যোতির ঘাড়ে। দুইহাতে কোমড় আঁকড়ে ধরে পুরু ঠোঁটে চুমু আঁকল জ্যোতির ঘাড়ে। ফিসফিসিয়ে বলল,

“ কি হলো? আজ মিসেস জ্যোতির চেহারায় এতোটা বিষন্নতা? ভালোবাসা লাগবে নাকি চুমু ?আচ্ছা, তুই কি আমার চুমু পাওয়ার লোভে ইচ্ছে করেই মন খারাপ করে থাকিস জ্যোত?”

জ্যোতি উত্তর দিল না। মেহেরাজ জ্যোতিকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ঘুরাল। দুইহাত দিয়ে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জ্যোতির কোমড়। নিজের মধ্যকার দূরত্ব গুঁছিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল জ্যোতির গালে। বলল,

“এই যে শুনুন আমার কন্যাদের আম্মি?এই যে চুমু দিয়ে দিলাম?আর মন খারাপ করবেন না। হুহ?”

জ্যোতি মৃদু হাসল এবারে। মেহেরাজও হাসল। পরমুহুর্তেই কি ভেবে নিজের হাতের মুঠোটা জ্যোতির সামনে ধরল। ভ্রু নাড়িয়ে বলল,

“ তোর জন্য? ”

জ্যোতি তাকাল একনজর। বলল,

“কি এতে মেহেরাজ ভাই? ”

মেহেরাজ রেগে গেল যেন। গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

“বলব না। ”

পরমুহুর্তেই বিড়বিড় করে বলল,

“আমারই দুই বাচ্চার মা হয়ে আমাকেই ভাই ডাকতেছে! প্লিজ এর চেয়ে আমায় মেরে ফেলো খোদা।আমি এই অপবাদ আর নিতে পারছি না। নয়তো এই মেয়ের মাথায় একটা থাপ্পড় মারো।”

জ্যোতি সরু চাহনিতে কিছুক্ষন তাকিয়েই যেন বুঝতে পারল তার ভুল। এই ভাই ডাকার জন্য বিয়ের পর থেকেই মেহেরাজের কত নিষেধাজ্ঞা, কত বারণ! তবুও কেন জানি ভাই ডাকটা তার মুখে চলেই আসে।হেসে মৃদু আওয়াজে বলল,

“আচ্ছা স্যরি, আর বলব না। এবার বলুন। ”

মেহেরাজ গম্ভীর করল মুখটা। জ্যোতির দিকে চেয়ে ভরাট স্বরে বলল,

“এক মুঠো প্রণয়!তোর জন্যই!”

কথাটা বলেই হাতের মুঠো খুললো। মুঠোটা খালিই। জ্যোতি জানত মুঠোটা খালিই থাকবে। বিয়ের পর থেকে এই কথাটা সে অসংখ্যবার শুনেছে।অসংখ্যবার দেখেছেে।তবুও জেনেবুঝে এই উত্তরটা পেতেও ভালো লাগে। আজ ও লাগল। কোথাও যেন সুপ্ত ভালো লাগারা উড়ে উড়ে গেল। বলে গেল, এক মুঠো প্রণয়!মেহেরাজের হৃদয়ে এক মুঠো প্রণয়! শুধু তারই জন্য!

#সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here