এক মুঠো প্রণয় (সিজন টু)পর্ব ১

0
45

গ্রামের সবার কাছে সুশিক্ষিত,সভ্য,সুদর্শন, অতিভদ্র খ্যাত মেহেরাজ নামের ছেলেটাই যে চরম অভদ্রের মতো এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পেঁছন থেকে জ্যোতির ওড়না টেনে ধরবে তা যেন জ্যোতির ভাবনার বাইরেই ছিল।মুহুর্তেই রাগে শরীর ঘিনঘিন করে উঠল তার।দাঁতে দাঁত পিষে সঙ্গে সঙ্গেই পেঁছন ফিরে শুধাল,

“ পেছন থেকে মেয়েদের ওড়না টেনে ধরাটা কি অসভ্যতার পরিচয় নয় মেহেরাজ ভাই? ”

মেহেরাজ ভ্রু জোড়া কুঁচকাল মুহুর্তেই।শীতকালীন অবসরে গ্রামে ঘুরতে এসে এত বড় একটা অপবাদ পাওয়া হবে তা যেন মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারল না।রাগে, জেদে, বিস্ময়ে ঠোঁটজোড়া কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে শুধু একটা শব্দই বের হয়ে আসল,

“হোয়াট!”

শব্দটা বলে পরপরই জ্যোতির বলে ফেলা বাক্যটা বার কয়েক মাথায় ঘুরপাক খেয়ে আসতেই বোধ হলো জ্যোতির ওড়নাটা তার পাশেই ঝোপের সাথে আটকে আছে।অবশ্য ততক্ষনে জ্যোতির চোখেও তা দৃশ্যমান হলো। ব্যস্তহাতে ঝোপ থেকে নিজের ওড়নাটা ছাড়ানোর চেষ্টা চালাল সে। মেহেরাজ খেয়াল করল সমস্তটাই।চোয়াল শক্ত করে মিনমিনে চোখে তাকাল জ্যোতির দিকে।ভেতরে ভেতরে তীব্র ইচ্ছে হলো মেয়েটার গালে ঠাটিয়ে কয়েকটা চড় বসাতে।কিন্তু এই মুহুর্তে সম্ভব হলো না তা৷ হাত মুঠো করে রাগ দমানোর চেষ্টা চালিয়েই গম্ভীর অথচ শান্ত কন্ঠে শুধাল শুধু,

“ না জেনেশুনে অন্যের উপর দোষ চাপানোটা বুঝি খুব একটা সভ্যতার পরিচয়?”

কথাটা বলেই জ্যোতিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল মেহেরাজ৷ কন্ঠটা এতবেশি শীতল শোনাল যেন শরীরের লোমকূপ পর্যন্ত টের পেল মেহেরাজের ভেতরকার রাগের আভাস। জ্যোতি হতবিহ্বল চোখে চেয়ে রইল কেবল। সত্যিই না জেনে শুনে এভাবে বলে ফেলাটা উচিত হয়নি। আর যায় হোক যে মানুষটাকে সে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে তাকে এভাবে হুট করেই না বুঝে অপমান করে ফেলাটা অনুচিত। আর এই অনুচিত কাজটা করার জন্যই অস্বস্তিতে এই তীব্র শীতেও তার হাত ঘেমে উঠল। মনে মনে নিজেকেই কিয়ৎক্ষন দোষারোপ করল যাচ্ছেতাই ভাবে। তবুও অবশ্য মন থেকে অস্বস্তির প্রভাবটা মিলিয়ে গেল না।অবশেষে অনেকক্ষন পর নিজের অস্বস্তিভাব আর অনুশোচনাগুলো নির্লিপ্ত করে নিজেকে স্থির করল। ওড়নাটা ভালো করে টেনে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় ঘোমটা টানল৷ তারপরই গ্রামের সরু মাটির রাস্তাটা ধরে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে।

.

শীতকালিন অবসরে বাড়িতে ঘুরতে আসার প্রথম আবদারটা মেহুরই ছিল। কারণটা অবশ্য জ্যোতি। মেহু আর জ্যোতি একই ভার্সিটিতেই পড়ে। মেহু স্নাতক চতুর্থ বর্ষে, আর জ্যোতি স্নাতক প্রথম বর্ষে। এতবড় শহরে জ্যোতিকে একা ছাড়তে প্রথমে রাজি ছিলেন না জ্যোতির দাদী। পরে যখন মেহুর কথা শুনল তখনই রাজি হলেন। তাই মেহুর উপর ভরসা করেই জ্যোতিকে পড়তে পাঠালেন গ্রাম ছেড়ে শহরে৷ ভার্সিটির হলে সিট পাবে না জেনেই মেহু যে গার্ল হোস্টেলে থাকে সেখানেই উঠল জ্যোতি। দুইজন এক রুমে এতগুলো মাস একসাথে থাকাতে দুইজনের মেলামেশা, বোঝাপড়া এই কয়েকমাসেই খুব গভীর হয়েছে।যেন দুইবোন! তাই তো ছুটিতে জ্যোতি গ্রামে চলে আসাতে ব্যাপক মন খারাপ হলো মেহুর। পরমুহুর্তেই মেহেরাজকে রাজি করিয়ে মেহেরাজসহ পাড়ি দিল গ্রামের দিকে। সঙ্গে অবশ্য মেহেরাজের ঐ মেয়েপাগল বন্ধু সাঈদও আসল।এসেই তার কার্য উদ্ধারে দায়িত্ববান ছেলের মতোই লেগে পড়েছে। নাবিলা, নুসাইবা, সামান্তার সাথে মিথ্যে প্রেমালাপের অভিনয়।আর ওরাও কিছুক্ষন পরপর সেই প্রেমালাপ শুনে হেসে উঠছে খিলখিলিয়ে।মেহু বিরক্ত হলো।ওরাও যে বাড়ি এসেছে দুদিন আগেই তা জানলে অবশ্য কখনোই বাড়ি আসার নাম করত না মেহু। কে জানত এসে থেকেই এদের সাথে সাঈদের এই মাখোমাখো প্রেমের বাণী শুনতে হবে? উহ যন্ত্রনা!মেহু উঠে গেল। জ্যোতির দাদী সকাল সকালই পিঠা খাওয়ার জন্য বলে গিয়েছিলেন সবাইকে। সেই বিষয়টা মাথায় নিয়েই সবাইকে তাড়া দিল জ্যোতিদের বাড়িতে যেতে৷ মুহুর্তেই সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠল। কিয়ৎক্ষনের মধ্যে পৌঁছেও গেল জ্যোতিদের বাড়িতে।টিনের ঘরের সামনেই ছোট চালার নিচে মাটির উনুনে পিঠা বানাচ্ছেন জ্যোতির দাদী। বয়স হয়েছে ভদ্রমহিলার, তবুও মুখে চোখে আলাদা তেজ আছে। তাইতো এখনো তার নাতনিরা তাকে যমের মতোই ভয় পায়। তার এক চোখ রাঙ্গানিতেই জ্যোতি, মিথি সব আদেশ মানতে এক পায়ে রাজি। মেহু মনে মনে হাসল বিষয়টা ভেবে।একপলক তাকাল জ্যোতির দিকে। উনুনের ধারে বসে দাদীকে সাহায্য করতে ব্যস্ত।পরনে কোন শাল বা শীতের পোশাক নেই।দৃষ্টি পড়ল অযত্নে পাশে রেখে দেওয়া শালটার দিকে। মেহু অবাক হলো। ঠান্ডায় তার হাত-পা শীতল হয়ে আছে এখনো। অথচ জ্যোতির শীত করছে না?প্রশ্নটা মন থেকে মুখে এনে বলেই ফেলল,

“ তুই শীতের পোশাক পরিস নি কেন?”

জ্যোতি পেঁছন ঘুরে তাকাল সঙ্গে সঙ্গে। মুহুর্তেই ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসল। বেতের মোড়া এগিয়ে দিয়ে সবাইকে বসতে বলল। পেছন থেকে জ্যোতির দাদী ততক্ষনে বলে উঠলেন,

“ একি!রাজ আহে নাই? আইব না ওই?”

সাঈদ হাসল। দু পা বাড়িয়ে উনুনের ধারে একদম দাদীর পাশে গিয়ে বেতের মোড়ায় বসল। অনুমতিবিহীন এক হাতে মুহুর্তেই একটা ভাপা পিঠা এগিয়ে নিয়ে কাঁমড় বসাল। ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলে উঠল,

“ উহ!সে তো এখন প্রেমিকার সাথে প্রেমালাপ করতে গেছে দাদী৷ এখন বোধহয় পাবা না তাকে আর। ”

জ্যোতির দাদী মুখ কুঁচকালেন।সাঈদের রসালো হাসিযুক্ত কথার বিনিময়ে বিরস গলায় বললেন,

“ প্রেম করতে গেলে বাপ মায়ের কবরে ক্যান যাইব কেউ? এই জ্যোতি যা তো রাজকে ডাইকা আন। আমি একটু আগেই ওরে দেইখা আসছি ওর বাপ মায়ের কবরের সামনে।এহন হয়তো রাস্তায়ই আছে।”

জ্যোতির চোখজোড়ার দৃষ্টি মিনমিনে হলো। এতগুলো মানুষ থাকতে তাকেই কেন ডাকতে যেতে হবে?কিশোরী বয়সের পর থেকেই তো এই লোকটাকে সে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। এই লোকটার সামনে যতো কম পড়া যায় ততোই যেন ভালো ওর জন্য৷ নাহলে যদি সে মানুষটার প্রতি তার দুর্বলতা বাড়ে?মানুষটা যদি তার দুর্বলতার কিছুটা হলেও বুঝে যায়?ছিঃ ছিঃ!কি বিচ্ছিরি কান্ড হবে৷ তাই তো আজও বাঁধ সাধল৷ নরম গলায় শুধাল,

“ আমি তো এখানে কাজ করছি দাদী। মিথিকে ঘুম থেকে ডেকে পাঠাই?”

মুহুর্তে দাদীর তীক্ষ্ণ স্বরে কথা আসল,

“ ও এহনো ঘুমায়। উঠব না। তুই ডাইকা আনলে কি হইব?”

জ্যোতি মিইয়ে গেল। দাদীর এই তীক্ষ্ণ স্বরের আদেশ সম্বন্ধে জানে বলেই ফের আর কিছু বলল না। গায়ের ওড়নাটা ভালোভাবে মাথায় টেনে নিয়েই ছোট ছোট পা ফেলে চলে গেল মেহেরাজকে ডাকতে। অবশেষে কুয়াশায় আচ্ছন্ন সকালে গিয়ে মেহেরাজের সম্মুখীন হয়ে দাঁড়াল ও রাস্তার মাঝখানে। দাদী পিঠা খাওয়ার জন্য ডেকেছে বলেও দিল স্পষ্টভাবে। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল ফেরার জন্য উদ্যত হতেই। কে জানত ওড়নাটা ঐ ঝোপের সাথে আটকাবে?

জ্যোতি তপ্তশ্বাস ফেলল।কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই উঠোনে এসে দাঁড়াল। অবশেষে ভাবনার ধ্যান ভাঙ্গল মেহুর ডাকে। মুহুর্তেই সচেতন চোখে মেহুর দিকে তাকাতেই মেহু বলে উঠল,

“ এতোটা সময় কি করছিলি জ্যোতি? ”

জ্যোতি মৃদু স্বরে বলতে নিল,

“মেহেরাজ ভাইকে ডাক…”

বাকিটা বলা হলোনা তার। চোখে পড়ল কিছুটা সামনেই বসা মেহেরাজকে। শান্ত চোখের শীতল দৃষ্টি যেন একপলক তাকেই দেখে নিল। জ্যোতি শুকনো ঢোক গিলল।দৃষ্টিটা এতোটাই শীতল বোধ হলো যেন এই শীতলতার আড়ালে ভয়ানক এক আভা টের পেল সে। আবারও অপরাধবোধে ইতস্থত বোধ করল সে। মেহু তাড়া দেখিয়ে জ্যোতিকে বসতে বলেই বলল,

“ভাইয়াতো আরো কয়েক মিনিট আগেই চলে এসেছে।আমি আরো তোকে খুঁজছিলাম।”

জ্যোতি বসল। বলল,

“ কেন আপু? কোন দরকার? ”

“ উহ তাড়াহুড়োই গায়ের শালটাতো নিয়ে যাসনি। শীত করছে না?তখনও দেখলাম শীতের পোশাক না পরে দিব্যি বসে ছিলি।”

জ্যোতি এবার কিঞ্চিৎ হাসল।উত্তর দিল,

“ তখন উনুনের ধারে থাকার কারণে উনুনের তাপে শীত করেনি আপু।সেজন্য আর শাল পরিনি। তবে এখন অবশ্যই শীত লাগছে।”

সাঈদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে এগিয়ে এল। মেহুর পাশাপাশি বসে বল উঠল,

“ তোমার আপুও শীতল, তুমিও শীতল। দুই শীতলতা একসাথে থাকলে তো শীত করবেই জ্যোতি। তাই উষ্ণতা দিতে স্বয়ং আমি চলেই আসলাম।”

জ্যোতি কিঞ্চিৎ হেসে মেহুর দিকে চাইল।এই দুইজনের সম্পর্কটা তার ভালোই লাগে। এই কয়েকমাসে এইটুকু অন্তত জানে যে এদের দুইজনের মাঝে কিছু একটা আছে। তবে মেহু তা কোনকালেই স্বীকার করে না।কেন যে করে না কে জানে!জ্যোতির হাসিটা দেখে মেহু ততক্ষনে রেগে তাকাল সাঈদের দিকে। ফোঁসফাঁস শ্বাস ছেড়ে বলে উঠল,

“ সাঈদ ভাইয়া, আপনার মতো আগুন হলেও সমস্যা কিন্তু। ”

সাঈদ চোখ টিপল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“ আমি যে আগুন তা স্বীকার করছো তাহলে? তোমার হৃদয় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাঁই করতে পেরেছি তাহলে বলো? ”

মেহু তীক্ষ্ণ চাহনি ফেলল এবারে। দৃঢ় গলায় শুধাল,

“ তা অতো সহজ না সাঈদ ভাইয়া।”

সাঈদ মিটমিটিয়ে হাসল। মেহুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,

“সমস্যা নেই, সহজ করে নিব। শীতলতাকে আগুনের স্পর্ষে এনে উষ্ণ করে তুলব। ”

মেহু এবারে আর কিছু বলতে পারল না। সহসা লজ্জ্বায় লালাভ হয়ে উঠল তার মুখ।কানজোড়া যেন উষ্ণ অনুভব হলো । মুহুর্তেই মুখের সে লজ্জ্বারাঙ্গা রং লুকাতে অন্যপাশে ফিরল মেয়েটা। নম্রভাবে মাথা নুইয়ে রাখল নিচের দিকে। সাঈদ তা দেখে বাঁকা হাসল। কানের কাছে ফের ফিসফিসিয়ে বলল,

“ এত লজ্জ্বা? উহ!”

মেহু জানে এই লোককে সুযোগ দেওয়া মানেই লজ্জ্বার সাগরে এই লোক ডুবিয়ে মারবে। তাই নিজের লজ্জ্বা যথাসম্ভব লুকানোর চেষ্টা চালিয়েই শক্ত গলায় বলল,

“ আপনি একটু বেশিই কথা বলেন সাঈদ ভাইয়া। আপনার মতো কেউ এভাবে বকবক করছে না কিন্তু এখানে। ”

ফের বাঁকা হেসে বলল সাঈদ,

“কিন্তু তুমি তো সেসব বকবক শুনতে ইচ্ছুক। ইচ্ছুক নও বলো? ”

মেহু দাঁতে দাঁত চাপল। ফোঁসফাঁস শ্বাস ছেড়ে বলল,

” ইচ্ছুক নই। ”

.

মিথির ঘুম ভাঙ্গল ঘরের বাইরে কোন ছেলে কন্ঠের গান শুনে।চোখজোড়া বন্ধ রেখেই ভাবার চেষ্টা করল কন্ঠটা কার।মিনার ভাই?কিন্তু মিনার ভাইয়ের গানের গলা নিশ্চয় এমন ভেড়ার মতো হবে না? তাহলে? উহ!গানের গলাটা এই মুহুর্তে সত্যিই তার কাছে ভেড়ার গলাই বোধ হলো। তাই তো বিরক্তে কপাল কুঁচকে একপলক জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল চেনাপরিচিত কিছু মুখ। মুহুর্তেই শোয়া ছেড়ে উঠে বসল। দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বাইরে এসেই ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ কি আশ্চর্য!এভাবে ভেড়ার গলায় গান গাইছে কে? ”

সাঈদের গান থামল সঙ্গে সঙ্গেই।সে গান গাইতে পারে না এটা পুরোনো কথা।তার গলায় গান মানায় এটাও ঠিক। কিন্তু তাই বলে তার গলাকে সোজা ভেড়ার গলার সাথে তুলনা করে দিল? কি আশ্চর্য! কে এই মেয়ে! ঘাড় বাঁকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই চোখে পড়ল মুখ চোখ কুঁচকে রাখা সেই ষোড়শী মেয়েকে। চোখে মুখে কি ভীষণ বিরক্তি তার।মেয়েটা নির্ঘাত তার থেকে নয়-দশ বছরের ছোট হবে। এত ছোট পিচ্চি একটা মেয়ের কাছে এমনভাবে সাংঘাতিক অপমানিত হয়ে মুখ থমথমে হয়ে এল যেন। বিরস গলায় শুধাল,

“ কে তুমি রমণী? গানের গলা সম্বন্ধে তোমার কিই বা ধারণা আছে যে তুমি এই চমৎকার কন্ঠের মানুষটিকে ভেড়ার সাথে তুলনা করলে? ”

মুহুর্তেই হাসির রোল পড়ল আশপাশে। মেহু মিথির পক্ষ নিয়ে শুধাল,

“সত্যিই গলাটা ভেড়ার মতোই। আমি মিথির সাথে একমত!”

আহা!মিথি কথাটা শুনেই মনেপ্রাণে খুশি হয়ে গেল।লোকটাকে সে যদিও চিনে না। তবুও অচেনা মানুষের কাছে ঝগড়ায় হেরে যাওয়াটা অপমানজনক। সে যেভাবেই হোক অপমানিত হতে চায় না কারোর কাছে।দুই পা এগিয়ে লোকটাকে ভালোভাবে খেয়াল করল এবারে। নিঃসন্দেহে লোকটা সুদর্শন। বলা চলে মেহেরাজ, মিনার সবার থেকেই সুদর্শন। কিন্তু গায়ের রংটা যেন একটু বেশিই ফর্সা। মুহুর্তেই মুখ কুঁচকে বলে ফেলল সে,

“ লোকটা তো দেখতেও ভেড়ার মতোই। ভেড়ার মতো দেখতে লোকের ভেড়ার মতো গলা বেমানান নয়। তবে আপনার ভেড়ার মতো গলায় এই মুহুর্তে গান শুনতে বেমানান লাগছে ভেড়াসাহেব!”

সাঈদের মুখটা এবার চুপসে যেতে যেতেও চুপসে গেল না। যে রূপ দেখে সব মেয়ে প্রেমের স্বপ্ন দেখে সেই রূপই ভেড়ার মতো বলে দিল এই মেয়ে? রাগ জমল সাঈদের। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ এই মেয়ে, ভেড়া চেনো তুমি?দেখেছো কখনো?আমার তো সন্দেহ হচ্ছে তুমি ঠিকঠাক চোখে দেখতে পাও কিনা। ”

মিথি ফুঁসে উঠল। বলল,

“ অবশ্যই ঠিকঠাক দেখতে পাই। মেহু আপু তোমরা এই ভেড়াকে কোথায় থেকে আমদানি করেছো?”

মেহু হাসল৷ উত্তরে মৃদু স্বরে বলল,

“ভাইয়ার বন্ধু উনি। ”

মিথির বিশ্বাস হলো না।সন্দিহান গলায় বলে উঠল,

“ মেহেরাজ ভাইয়ের বন্ধু?মেহেরাজ ভাই?তোমার বন্ধু এ?সত্যি?”

শেষের কথাটা মেহেরাজে দিকে তাকিয়ে মেহেরাজকে উদ্দেশ্য করেই বলল। মেহেরাজ এবারে চাপা হাসল। ভরাট গলায় উত্তর দিল,

“ সত্যিই।”

মিথি অবিশ্বাস্য চোখে একবার মেহেরাজ তো একবার সাঈদের দিকে তাকাল।ঠোঁট বাঁকিয়ে শুধাল,

“ অসম্ভব। তুমি কত ভালো। ”

সাঈদ ফোঁড়ন কেঁটে বলে উঠল,

“ আমি কি খারাপ? ”

“ অবশ্যই খারাপ!”

কথাটা বলেই হনহন করেই আবারো ঘরে ডুকে গেল মিথি। সাঈদ ফোঁসফাঁস শ্বাস ফেলল৷ মনে মনে এই মেয়ের প্রতি অদৃশ্য এক রাগ জম্মাল কেন জানি। এইটুকু মেয়ে তাকে এভাবে অপমান করে চলে গেল? মেনে নেওয়া যায়?

.

বিকালের দিকে মেহুর কথাতেই জ্যোতি মেহুদের বাড়িতে এল। পা বাড়িয়ে মেহুর ঘরের দিকে যাবে ঠিক তখনই সামনে এসে উপস্থিত হলো সামান্তা। হাতে ছোট্ট একটা কাগজ।জ্যোতির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

” জ্যোতি? একটা সাহায্য করে দিবে আপুর? ”

জ্যোতি উপরনিচ মাথা দুলিয়ে মুহুর্তেই উত্তর দিল,

“ হ্যাঁ আপু, অবশ্যই।”

সামান্তা হাসল।ব্যস্তহাতে কাগজটা জ্যোতির হাতে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

“মেহেরাজ ভাই ছাদে অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। এই কাগজটা সরাসরি দিলে উনার কি প্রতিক্রিয়া হবে জানা নেই আমার।আমার হয়ে উনকে এই কাগজটা দিয়ে আসতে পারবে?বলে দিও আমি দিয়েছি এটা।”

জ্যোতি তপ্তশ্বাস ফেলল।যে লোকের সম্মুখীন হতে চায় না বারবার সে লোকের সামনেই কেন যেতে হবে তাকে? উহ!পরমুহুর্তেই আবার ভেবে নিল সকালের ঘটনার জন্য স্যরিও বলা হয়ে যাবে। বিষয়টা ভেবে নিয়েই কাগজ নিয়ে মৃদু পায়ে পা বাড়াল। ছাদের এককোণে এসেই দেখা মিলল মেহেরাজের। মৃদুস্বরর প্রথমেই বলে নিল,

“ মেহেরাজ ভাই? সকালের ঘটনার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।না বুঝেই বলে ফেলেছিলাম।”

মেহেরাজ পেঁছন ফিরে তাকাল। একনজর দেখে নিল জ্যোতিকে। পরমুহুর্তেই সকালের ঘটনা মনে করে ত্যাড়াকন্ঠে জবাব দিল,

“ তো তুই কি দুইবছরের বাচ্চা মেয়ে যে না বুঝেই বলে ফেলেছিস?”

জ্যোতি সরু চোখে চাইল। বিষয়টা নিয়ে কথা বাড়ালে কথা বাড়তেই থাকবে বুঝে নিয়ে হাতের কাগজটা মেহেরাজের দিকে এগিয়ে থমথমে স্বরে বলল,

“ আমি সত্যিই দুঃখিত। এবার বাকিটা আপনার বিষয়। আর এই কাগজটা আপনার জন্য দি…”

জ্যোতির বাকিটা বলা হয়ে উঠল না। তার আগেই সম্মুখের মানুষটি ভ্রু উঁচিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“ প্রেমপত্র নাকি?”

জ্যোতির মুখ কালো হলো।সরাসরি মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে স্পষ্টকন্ঠে জানাল,

“ আপনি কাগজটা দেখলেই তো বুঝতে পারবেন। আমি জানি না ঠিক কিসের কাগজ।”

মেহেরাজ ততক্ষনে কাগজটা নিয়ে নিয়েছে। বিনিময়ে উত্তর না দিয়ে কাগজটা মেলে ধরে ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিল। কপালে ভাজ তুলে বিরক্তির সুরে বলল,

“বয়স কত তোর? ”

জ্যোতি ইতস্থত বোধ করল এবারে। হঠাৎ বয়স জিজ্ঞেস করল কেন? উত্তরে বলল,

“ বিশ। কেন? ”

“ তোর বয়সটা প্রেমের বয়স সে নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তোকে তো প্রেমে পিঁছলে পড়া মেয়ে হিসেবে জানতাম না৷ ভালো হিসেবেই জানতাম এতকাল আমি।”

জ্যোতি কিছুই বুঝল না। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“ মানে? ”

মেহেরাজ চোয়াল শক্ত করল। গম্ভীর কন্ঠে অদৃশ্য, অপ্রকাশিত ক্রোধ ঢেলে বলে উঠল,

” এভাবে প্রেমপত্র লিখে ছেলেদের মন জয় করার চেষ্টা করাটা কি সভ্যতার পরিচয়? তোকে এসব সভ্যতা কে শিখিয়েছে? তোর এসব ছ্যাঁছড়ার মতো অসভ্যতার কথা তোর দাদীকে বলব আমি?

জ্যোতি চোখ ছোট ছোট করে চাইল। বিনিময়ে কিছু বলার আগেই মেহেরাজ দ্রুত তাকে এড়িয়ে চলে গেল।উহ! সকালে মেহেরাজকে করা অপমানের থেকেও যেন এই অপমানটা ঢের জঘন্য। কাগজটা যে সে দেয়নি, সামান্তা আপু দিয়েছে তা তো বলা হলো না। এইমাত্র যে মেহেরাজ এতগুলো কথা বলে গেল এগুলো কি সব জেনেবুঝেই বলে গিয়েছে? এখন সে যদি ফের বলে, “আপনি কি দুইবছরের বাচ্চা ছেলে যে না জেনেই কথাগুলো বলে ফেলেছেন? ”

#এক_মুঠো_প্রণয়
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ
#সিজন_টু
#সূচনা_পর্ব

#চলবে…..…?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here