এক মুঠো প্রণয় (সিজন টু)পর্ব ১৬

0
39

#এক_মুঠো_প্রণয়
#সিজন_টু
#পর্ব_১৬
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ

তখন প্রায় রাত দশটা। সাঈদ বলেছিল আটটার সময়ই আসবে। অথচ এল না। মেহু এই দুই ঘন্টা যাবৎই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকল সাঈদ আসবে এই ভেবে৷বারবার হাত ঘড়িতে সময় দেখে অপেক্ষা করে গেল। বার কয়েক কল ও করেছে সাঈদকে। কিন্তু সাঈদ কল তোলা তো দূর উল্টো দুই চারবার কল দেওয়ার পর থেকে তার ফোন সুইচডঅফ শোনাচ্ছে৷ মেহু হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবারে। কনকনে শীতে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতেই সাঈদের বদলে সেখানে উপস্থিত হলো মেঘ৷ ক্লান্ত চেহারা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,

“ এই শীতে এত রাতে এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন মেহু? ”

মেহু চমকাল পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে৷ চোখ তুলে চেয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল মুহুর্তেই,

“ আপনি? আপনি এখানে কেন? ”

মেঘ মৃদু হাসল। নেমে আসা রিক্সাটিকে ইঙ্গিত করেই বলল,

“হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরছিলাম।রিক্সা দিয়ে যাওয়ার সময় হুট করেই তোমার দেখা পেলাম তাই ভাবলাম কথা বলে যাই। ”

“ ওহ। ”

“দাঁড়িয়ে আছো কেন বললে না তো?”

মেহু চাপা শ্বাস ফেলে এদিক ওদিক তাকাল।রাস্তার দিকে একবার চেয়ে ভাবল এবারে হয়তো সাঈদ আসবে৷ কিন্তু এল না সে৷ পুনরায় হতাশ হয়ে মেহু উত্তর দিল,

“ উনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আসবেন বলেছিলেন উনি। তাই। ”

মেঘ ভ্রু জুড়ে কুঁচকে প্রশ্ন শুধাল,।

“উনি মানে? ”

পরক্ষণেই আবার কিছু মনে পড়েছে এমন ভাব ধরে তৎক্ষনাৎ বলল,

“ওহ ওহ, তোমার ভালোবাসার মানুষ।স্যরি স্যরি।”

“স্যরি বলার মতো কিছু নেই তো।”

মেঘ অল্প হাসল। চোখের সামনে তারই ভালোবাসার মানুষ অন্য কারোর জন্য অপেক্ষা করছে।বুকের ভেতর যেন ভার অনুভব করল৷ নিঃশ্বাসও বোধহয় আটকে আসল। কিন্তু বাস্তবতা তো কঠিন! যাকে আমরা চাই তাকে আমরা পাই না। যা কিছু আমরা ভালোবাসি তা কিছু আমাদের থাকে না। এই নির্মম বাস্তবতা মনে করেই নিষ্প্রভ চাহনিতে তাকাল মেহুর মুখে। মুহুর্তেই চোখে পড়ল শীতের দাপটে কাঁপতে থাকা মেহুর কম্পমান ঠোঁট ! মেঘ মোহময় দৃষ্টিতে ক্ষানিক সময় তাকিয়ে থাকল সেই ঠোঁটজোড়ার দিকে। পরিস্থিতি অন্যরকম হলে সে এই ঠোঁট ছোঁয়ার আশাও রাখত হয়তো হৃদয়ে। কিন্তু আজ সে আশা নেই। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে সে কথা মনে করেই নজর সরাল দ্রুত! ঠান্ডার প্রকোপে মেহু হাতে হাত ঘষছে দেখেই বলল,

“ ঠান্ডায় কাঁপছো তো তুমি। এত শীতে বাইরে দাঁড়ানো তো ঠিক নয়। তুমি বরং উনি এখানে আসলে তখনই নিচে নামতে। ”

বিনিময়ে মেহু বলল,

“না, না। ঠিক আছে। ঠান্ডা তো তেমন লাগছে না।”

মেঘ ভ্রু উঁচাল। জিজ্ঞেস করল,

“সত্যিই লাগছে না? আমি তো স্পষ্ট দেখছি তুমি ঠান্ডায় কাঁপছো, হাতে হাত ঘষছো, এমনকি তোমার ঠোঁটজোড়াও কম্পমান!”

মেহু উত্তর দিল না। সত্যিই ঠান্ডা লাগছে। সাঈদ কল করার পর কম্বলের নিচ থেকেই অনেকটা হুড়মুড় করে নেমে এসেছিল সে। তাই আসার সময় শালটাও নিয়ে আসা হয়নি। রুমে তখন জ্যোতি আর রিতুও ছিল না। নয়তো ঠিকই মনে করিয়ে শালটা দিয়ে দিত হয়তো। মনে মনে শালটা না আনার জন্য আপসোস করতেই মেঘ ফের বলল,

“ পরনে শীতের পোষাকও নেই?এভাবে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আসা বোধহয় ভালোবাসার মানুষের জন্যই সম্ভব হয় তাই না মেহু? তোমার ভালোবাসাটা সত্যিই সুখের হোক। আমি মন থেকে দোয়া করি। ”

মেহুর মনের ভেতর থাকা আপসোসটা হঠাৎই নিভে গেল। তৈরি হলো অপরাধবোধ! একটা মানুষ এতোটা ভালোবাসার পরও তাকে ভালো না বাসাটা অপরাধ না? অপরাধই তো! কিন্তু তার উপায় আছে?নেই তো। চাপা শ্বাস ফেলতেই মেঘ নিজের পরনের জ্যাকেটটা খুলে তার দিকে এগিয়ে বলল,

“ আচ্ছা উনি আসা পর্যন্ত তো এই শীতের মধ্যে অপেক্ষা করবে তাই না? কিছু মনে না করলে আমার জ্যাকেটটা পরে নিতে পারো মেহু। এইভাবে শীতে কাঁপতে হবে না তাহলে। ”

মেহু মুহুর্তেই উত্তর ছুড়ল,

“ না না, আমার শীত করছে না তেমন। ”

“ জ্যাকেটটা আমার বলেই কি পরে নিতে অসুবিধা হবে? ”

মেহুর অপরাধবোধ, অস্বস্তি ফের বাড়ল। মৃদু স্বরে বলল,

“একদমই না ! আপনার শীত করবে না? তাছাড়া সত্যিই আমার শীত লাগ্ে..”

বাকিটা বলা হয়ে উঠল না। তার আগেই মেঘ বলে উঠল,

“ আমরা যাদের ভালোবাসি তাদেরকে আমরা ততোটাই বোঝার চেষ্টা করি যতোটা হয়তো আমরা আমাদের নিজেদেরকেও বুঝি না মেহু। তাই সেক্ষেত্রে এতকাল ধরে একটু হলেও তোমায় বুঝতে পারিনি এটা বলো না৷ অন্তত শীত লাগছে না বলে সে ধারণাটা মিথ্যে প্রমাণ করো না প্লিজ! ”

মেহু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেঘের প্রতিটা কথায় যন্ত্রনার আভাস যেন সে স্পষ্টই টের পেল। তবুও সহানুভূতি দেখাতে ইচ্ছে হলো না। ইচ্ছে হলো না বিনিময়ে কোন সান্ত্বনা দিতে। শুধু নিষ্প্রভ গলায় বলল,

“আমায় ভুলে যান প্লিজ। আমি চাই না যে যন্ত্রনায় আমি ভুগছি সে যন্ত্রনাটাই আমার কারণে কেউ পেয়ে থাকুক!”

মেঘ হাসল আলতো। নিজের হাতে থাকা জ্যাকেটটা এবারে মেহুর উপরে জড়িয়ে দিয়ে কিছুটা ঝুঁকে বলল,

“আরেহ বোকা মেয়ে,ভুলা সম্ভব হলে কেউ যেচে গিয়ে বিষাদ যন্ত্রনা বহন করে থাকে নাকি ? ”

.

জ্যোতি চেয়ারে বসে। তার মনোযোগ সম্পূর্ণটা বইয়ের মাঝেই পড়ে আছে। ঠিক তখনই তার ফোনটা বেঁজে উঠল। একনজর চেয়ে দেখল মেহেরাজের কল। কেন জানি না কল তুলল না সে ইচ্ছে করেই। এরপরও অবশ্য কল এল। একবার, দুইবার, তিনবার বেশ অনেকবার। অবশেষে না পেরে জ্যোতি কল তুললই। বলল,

“আপনি? ”

ওপাশে মেহেরাজ বোধহয় চরম বিরক্ত হলো। কিংবা হয়তো রেগেও হেল। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,

“হু, আমিই। কেন তোকে কি অন্য কেউও কল করে জ্যোতি? ”

“ অন্য কেউ মানে? মিথি, দাদী, মিনার ভাই উনারা তো কল করেই থাকেন। কেন?”

মেহেরাজ ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। উত্তরে বলল,

“গুড!এখন থেকে আমিও কল করব। আজকের মতো যদি কল না তুলে থাকিস তাহলে কিন্তু খারাপ হবে!”

জ্যোতি প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনি কেন কল দিবেন? ”

“ মন চায় তাই। মনের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয় বল?”

“কিন্তু আপনি.. ”

মেহেরাজ ফের বিরক্ত হলো৷ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গ টেনে বলে উঠল,

“ উহ!কিসের কিন্তু? বিয়েতে রাজি হচ্ছিস না কেন? কতকাল অপেক্ষা করব আমি তোর মতামতের জন্য?”

আকস্মিক কথাটায় জ্যোতি থমকাল। ফের বিয়ের কথাটা মনে উঠতেই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজাল। অস্ফুট স্বরে বলল,

“ হ্ হু?”

মেহেরাজ গম্ভীর গলায় শুধাল,

“ কানে শুনিস না নাকি? আশ্চর্য! ”

জ্যোতি চোখ বুঝল। শান্ত গলায় বলে উঠল,

“আপনি কল রাখুন মেহেরাজ ভাই৷ ”

“ পুড়ে যাওয়া হাত নিয়ে কল করেছি৷ তুই সেই কলই মুখের উপর রেখে দেওয়ার কথা বলছিস?কি বেয়াদব মেয়ে! ”

ফের চোখ মেলে তাকাল জ্যোতি। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল মুহুর্তে,

“ হাত পুড়ল কি করে আপনার? ”

মেহেরাজ তপ্তশ্বাস ফেলল। ভরাট গলায় জিজ্ঞরস করল,

“জেনে কি করবি? হাতে এসে ঔষুধ লাগিয়ে দিয়ে যাবি? ”

“ উহ, জানতে চাইলাম শুধু মেহেরাজ ভাই। ”

ফের ভরাট গলায় প্রশ্ন এল,

“তো তোরই বা জানার এত আগ্রহ কেন হচ্ছে? ”

জ্যোতি দাঁতে দাঁত চাপল। বসা ছেড়ে উঠে স্পষ্ট স্বরে বলে উঠল,

“ ভদ্রতা দেখিয়ে জানতে চাইছি, হয়েছে? এবার বলুন কি করে পুড়ল হাত? ”

“ আমার কাছে তোর এই মিথ্যে ভদ্রতা পছন্দ হলো না। তাই উত্তর টাও দিলাম না। ”

কথাটা বলেই মেহেরাজ কল রাখল দ্রুত। অপরপ্রান্তে জ্যোতি তখন আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে। অদ্ভুত! লোকটা সত্যিই অদ্ভুত!এতকালের চেনা মেহেরাজ ভাই আর এখনকার মেহেরাজ ভাই যেন পুরোপুরিই ভিন্ন! কি আশ্চর্য!

.

মেহু ফিরে এসেই শরীর এলিয়ে দিল বিছানায়। বিষাদের ভরা মনটা নিয়েই জ্যোতির উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

“ জ্যোতি? সাঈদ ভাইয়া আসল না। এতোটা সময় আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম, কিন্তু এল না। আরো একটা কথা কি জানিস?ঐ যে ডক্টর মেঘের সাথেই দেখা হলো মাত্র।”

জ্যোতি অবাক হলো। সে ভেবেছিল এতোটা সময় মেহু সাঈদের সাথেই ছিল। হয়তো নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়া গুলো বুঝে নিচ্ছে নিজেদের মতো করে৷ কিন্তু সাঈদ আসেনি শুনেই অবাক হলো যেন।বলল,

“সত্যিই আসে নি?

“না, জ্যোতি জানিস?ভাইয়ার ডান হাতের দুটো আঙ্গুলে গরম তেল লেগে পুড়ে গিয়ে ফোসকা হয়ে গেছে৷ আমি হয়তো কাল বাসায় চলে যাব।ভাইয়াই বা ঐ হাত দিয়ে রান্নাবান্না কি করে করবে বল? জানিস জ্যোতি?আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভাবছি একেবারেই হোস্টেল ছেড়ে বাসায় চলে যাব। আজকাল আর কিছুই ভালো লাগে না আমার।একা একা লাগে ভীষণ, অথচ আমার চারপাশে কিন্তু মানুষের অভাব নেই জ্যোতি। অদ্ভুত না? ”

জ্যোতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শান্ত স্বরে বলে উঠল,

“ না, অদ্ভুত না আপু। নির্দিষ্ট কোন মানুষের শূণ্যতায় ভুগলে চারপাশে শত সহস্র মানুষ থাকলেও তোমার শূণ্যতা সে মানুষটা ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারে না। এটাই হয়তো স্বাভাবিক! কিন্তু আজকের কাজটা বোধহয় সাঈদ ভাই সত্যিই উচিত করেননি। এইভাবে ঠান্ডার মধ্যে দুইদুই ঘন্টা অপেক্ষা করালেন শুধু শুধু?না আসার হলে বলেই দিতে পারতেন। ”

“ আচ্ছা যদি কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়িস যে তুই একজনকে ভালোবাসিস, আর অন্য একজন তোকে ভালোবাসে। কাকে চয়েজ করবি জ্যোতি? ”

জ্যোতি চোখ বুঝল। উত্তরে বলল,

“দাদী সবসময় বলেন, ‘যে তোকে ভালোবাসে তাকেই সবসময় জীবনসঙ্গী করবি। যাকে তুই ভালোবাসবি তাকে না বিয়ে করে যে তোকে ভালোবাসে তাকে বিয়ে করলেই দেখবি সুখী হবি। ’আর দাদীর এই কথাটাই বোধহয় সত্যিই মেহু আপু। ”

মেহু সবটাই চুপচাপ শুনল। ঠিক তখনই মনে পড়ল মেঘের কথাটা। লোকটা সত্যিই তাকে এতোটা ভালোবাসে? বিষয়টা ভেবেই তপ্তশ্বাস ফেলতেই জ্যোতি বলল,

“সাঈদ ভাইকে কল দিয়েছিলে আপু? একবার কল দিয়ে দেখবে?”

“অনেকবার দিয়েছি জ্যোতি। কল তুলেননি উনি! উনি আসবেন বলেও আসলেন না কেন জ্যোতি? আরেকবার কি কল দিয়ে দেখব? ”

কথাটা বলেই ফের কল দিল মেহু। অদ্ভুত ভাবে এতক্ষনে সাঈদ কল তুলল। কিন্তু কোন কথা বলল না।তাই মেহুই প্রশ্ন ছুড়ল প্রথমে,

“এতক্ষন কল তুলছিলেন না যে?আপনি এমনটা কেন করলেন সাঈদ ভাইয়া? আসবেন বলে এতোটা সময় আমায় দাঁড় করিয়ে রাখলেন কেন শুধু শুধু? ”

মেহুর প্রশ্ন গুলো শুনেই ওপাশে সাঈদ চাপা শ্বাস ফেলল। সে ইচ্ছে করেই আসেনি মেহুর সামনে।মেহু কেন দেখা করতে চেয়েছে তা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পেরেই সে আসে নি। আসার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত আসেনি। বোধহয় নিজের ইচ্ছেতেই আসেনি। তাইতো ঠোঁটে ঠোঁটে চেপে মুহুর্তেই একটা মিথ্যে বলল সে,

“ একটা জরুরী কাজ পড়ে গেছিল। স্যরি, বলতে একদমই ভুলে গেছিলাম তোমায়। ”

মেহুর মুখটা চুপসে গেল। তীব্র মন খারাপ নেমে এল সঙ্গে সঙ্গেই। মৃদু আওয়াজে শুধাল,

“ ওহ। ”

সাঈদ ব্যস্ততা দেখিয়ে শোনাল,

“রাখছি তাহলে? আর কখনো কল করো না মেহু। ”

মেহু বেহায়ার মতো তবুও বলে উঠল,

“একটা কথা জানতে চাই সাঈদ ভাইয়া। ফোন রাখবেন না।সত্যিই কি ভালোবাসতেন না আমায়? ”

সাঈদ এবারে চোখ বুঝল।কিছুটা বিরক্তির স্বরেই বলল সে,

“না বাসতাম না।এক কথা কয়বার বলা লাগে মেহু?”

ফের প্রত্যাখিত হয়ে নিচের ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকাল মেহু। জিজ্ঞেস করল,

“কেন বাসেন না ভালো? আপনি কি অন্য কাউকে ভালোবাসেন সাঈদ ভাইয়া? আপনার প্রেমিকা আছে?”

সাঈদ হাসল মৃদু।মেহেরাজের সাথে তার কলেজজীবন থেকে বন্ধুত্ব।মেহুকে তখন অতোটা খেয়ালই করেনি সে। তারপর কলেজ জীবন শেষে পাড়ি দিয়েছিল অন্য দেশে। সেখানে অবশ্য কলড রিলেশনশীপে জড়িয়েছিল একটা মেয়ের সাথে। বলা চলে মেয়েটা সে ভার্সিটির সেরা সুন্দরী মেয়ে ছিল। আর সেই সৌন্দর্যের মৌহেই বোধহয় সাঈদ মেয়েটাে সাথে রিলেশনে জড়িয়েছিল। কিন্তু সম্পর্কটা বড়জোর ছয়মাস নিতেও যেন দমবন্ধ লাগল সাঈদের। সে সৌন্দর্যের মোহ যেন কেঁটে গেল মাস কয়েকেই।তবে সম্পর্কটা ভেঙ্গেছিল মেয়েটারই প্রতারণার কারণে৷ ঠিক তার মায়েরই মতো করে মেয়েটাও তাকে ঠকিয়ে অন্য এক সম্পর্কে জড়িয়েছিল। এতে অবশ্য সাঈদ তার বাবার মতো অতোটাও কষ্ট পায়নি। হয়তো মন থেকে ভালোবাসেনি বলেই সে প্রতারণা তাকে খুব একটা পীড়া দেয়নি। তবে এটা ঠিক যে, সে নারীর প্রতি বিশ্বাসটা সেই ঘটনার পর থেকে আরো বেশি করে হারিয়েছে।তারপর অবশ্য কেন জানি দেশে ফেরার পর থেকে এই মেয়েটার প্রতি তার আকর্ষন জম্মাল। কেন জানি একটা অদৃশ্য বিশ্বাসও তৈরি হলো। কিন্তু কে জানে, বিশ্বাস ভাঙ্গতে কতক্ষন?বাবাও তো তার মাকে অনেকটা বিশ্বাস করত৷ বিশ্বাস কি শেষে ভাঙ্গেনি? ভেঙ্গেছে!খুবই মর্মান্তিক ভাবে তার বাবা বিশ্বাস হারিয়েছে। সাঈদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সে চায় না নিজেরই বাবার মতো করে কাউকে পাহাড়সম ভালোবেসে সমুদ্রসমান কষ্ট পেতে। তাই তো ঠোঁট চেপে উত্তর দিল,

“হ্যাঁ অন্য কাউকেই ভালোবাসি।আর কিছু বলবে? ”

“সত্যিই?”

“হ্যাঁ, সত্যি! রাখছি কল তবে? প্লিজ আর বিরক্ত করো না আমায়। ”

“আমি তাকে দেখতে চাই প্লিজ!”

“বিশ্বাস করছো না? ওকে। ছবি পাঠাচ্ছি। তুমি চাইলে মেহেরাজকে জিজ্ঞেস করতে পারো।রাখছি। ”

কথাটা বলেই কল রাখল সাঈদ। কিয়ৎক্ষন পরই দুটো ছবি এল। নিঃসন্দেহেই মেয়েটি সুন্দরী!মেহু কিয়ৎক্ষন আধুনিক পোশাক পরিহিত সেই মেয়েটির ছবির দিকে তাকিয়ে থাকল। পরক্ষনেই মেহেরাজকে একটা ছবি পাঠিয়ে কল করিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ ভাইয়া?তোমায় যে একটা ছবি পাঠালাম?তাকে কি চেনো তুমি?কে সে ভাইয়া?”

ওপাশে মেহেরাজ বোধহয় কিছুতে ব্যস্ত ছিল। এমন প্রশ্ন শুনে বোনের পাঠানো ছবিটা দেখতেই মনে পড়ল সাঈদ এই মেয়েটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অনেককাল আগে। সাঈদের প্রেমিকা ছিল! তাই অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল,

“ সাঈদের প্রেমিকা হয়। কেন? ”

মুহুর্তেই বুকের ভেতর যন্ত্রনা অনুভব করল মেহু। কল রেখে জোরে জোরে শ্বাস ফেলল বার কয়েক।নিজেকে এক মুহুর্তের জন্য ব্যাপক বেহায়া ও বোধ হলো অবশ্য। সাঈদ অন্য কাউকে ভালোবাসে এটা জানার পরও তার পেঁছনে পড়ে থাকাটাকে নিঃসন্দেহে বেহায়ার মতো কান্ডকারখানা বলে না?বলে!তবুও বোধহয় কষ্টের পরিমাণ কমল না।ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর শত চেষ্টা করেও পারল না। জ্যোতি পাশ থেকে জড়িয়ে ধরলেও কান্না থামল না তার৷নিঃশব্দে কেঁদে গেল কেবল সে। ঠিক তখনই কানে এল,

“হ্যালো? ”

মেহু চমকাল।এটা মেঘেরই গলা। ঠিকভাবে খেয়াল করে দেখল ফোন হাতে নিয়েই কাঁদতে কাঁদতে ভুলে মেঘের কাছেই কল চলে গিয়েছে। সে কলটাই রিসিভড করে ওপাশ থেকে মেঘের কন্ঠের আওয়াজ আসল। ফের মেঘ বলল,

“কলটা কি ভুলেই এসে গিয়েছে? ”

মেহু তীব্র যন্ত্রনায় ছটফট করল। এই মুহুর্তে কথা বলার মতো অবস্থা নেই জেনেই কল রাখতে নিতেই হঠাৎ মনে হলো কয়েকদিন আগে বোধহয় মেঘও এই যন্ত্রনাটাই ভোগ করেছিল। বলেছিল ও,“ভালোবাসার মানুষ ভালো না বাসলেও,ভালোবাসার মানুষ অন্য কাউকে ভালোবাসে এটা শোনার কষ্টটা ঢের বেশি!”আসলেই যে যন্ত্রনাটা খুব বেশি তা টের পেল মেহু। কিন্তু কিছুই বলল। মেঘ আবারও বলল,

“শুনতে পাচ্ছো মেহু?”

মেহু নিষ্প্রভ স্বরে উত্তর দিল,

“পাচ্ছি।”

মেঘ চমকাল। মেহু কান্নারত স্বর শুনেই যেন বুঝে ফেলল মেহু যে কেঁদেছে।মুহুর্তেই প্রশ্ন ছুড়ল আকুল স্বরে,

“কাঁদছো তুমি? এই মেহু? কাঁদছো কেন তুমি? কিছু হয়েছে কি তোমার?কি হয়েছে মেহু? ”

মেহু কান্না থামানোর চেষ্টা করল কেবল। বলল,

“হ্হু? না, কাঁদছি না তো৷ ”

“আমি জানি তুমি কাঁদছো। মিথ্যে বলো না! ”

মেহু এবারে কান্না থামানোর চেষ্টা করল না। বরং কান্নার গতি বাড়ল খুব করে৷ কাঁপা স্বরে কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল সে,

“ আমার অনুভূতির বয়স খুব একটা দীর্ঘ নয় মেঘ, তবে আপনার অনুভূতিটা বোধহয় সত্যিই অনেক দীর্ঘ সময়ের৷ এই দীর্ঘ সময়ের অনুভূতির পরও যখন জানলেন আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি তখন কি খুব বেশি যন্ত্রনা হয়েছিল? মনে হয়েছিল কি নিঃশ্বাস বন্ধ আসছে?জীবন থেমে আসছে বোধ হচ্ছিল? ”

“হঠাৎ এসব? ”

মেহু ফের কান্নারত গলায় কোনভাবে বলল,

“ একটা কথা আছে জানেন মেঘ? কেউ একজন বলেছিল যে পৃথিবীতে আমরা যাকে যতটুকু কষ্টই দিয়ে থাকি সেটা ঘুরেফিরে কোন না কোন ভাবে আমরা ফেরত পাবই! আমি এতোগুলো দিনেও আপনার যন্ত্রনাটা অনুভব করতে না পারলেও এখন পারছি! আপনার জন্য বোধহয় মায়াও হচ্ছে আমার! আমায় ক্ষমা করে দিবেন, এতোটা কষ্ট দেওয়ার জন্য সত্যিই আমি ক্ষমা চাই। প্লিজ ক্ষমা করে দেন আমায়। ”

কথাগুলো বলেই কল কাঁটল মেহু। কাঁদতে কাঁদতে ফের জড়িয়ে ধরল জ্যোতিকে। উহ!কতোটা যন্ত্রনা, কতোটা কষ্ট তার হৃদয়ে। কেউ কি টের পাচ্ছে এই যন্ত্রনা, এই বিষাদ?পাচ্ছে?

.

মিথি রাতে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিল। তার আগেই মনে হলো আজ তার আব্বার খোঁজ নেওয়া হয়নি। তাইতো ছুটে ঘর ছেড়ে বের হয়ে আব্বার ঘরে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল৷তার ছোট আম্মায় দরজা খুলে দিতে পা টিপে টিপে তার আব্বার রুমের সামনেই দাঁড়াল। অস্ফুট স্বরে বলল,

“কেমন আছেন আব্বা? ”

মিথির আব্বা তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,

“ তুই? ভেতরে আয় মিথি। ”

মিথি ভেতরে এল না।ওখান থেকেই চঞ্চল স্বরে বলল,

“ আপনার এত কিসের চিন্তা আব্বা? কেনই বা চিন্তা করেন? চিন্তা করে শরীর তো আপনারই অসুস্থ হলো। ”

“ ভেতরে না এসে ওখান থেকেই কথা বলছিস কেন? আমি কি বারণ করেছি ভেতরে আসতে? ”

মিথি ভেতরে আসল। ছোটবেলা থেকে আব্বাকে সে যে ভয়টা পেত তা এই কয়দিনেই বেশ কেঁটে গেছে।তাই তো এতোটা স্বাভাবিক চঞ্চল স্বরে কথা বলছে সে। বলল,

“ উহ নাহ!তবে এই ঘরে আসা হয়না বলেই আসতে চাই নি। ভালো আছেন এখন আব্বা?”

“ ভালো না থেকে উপায় কি? ”

মিথি মিষ্টি হাসল। আব্বার পাশে বসে শুধাল,

“ আপনি আর চিন্তা করবেন না কিন্তু আব্বা। আমি আর জ্যোতি মাকে কখনো তেমন ভাবে পাই-ইনি। এমন না যে আপনাকেও পেয়েছি৷ তবুও আব্বা ডাকটা অন্তত হারাতে চাই না বুঝলেন? সবসময় সুস্থ থাকবেন আব্বা নাহয় আপনার সাথে কথা বলব না। ”

তার আব্বা হাসল এইবারে। মিথির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ মিথি? তুই যে অনেকটা বোকা মেয়ে এটা কি জানিস তুই? ”

মিথি ঠোঁট উল্টাল। আব্বার দিকে চেয়ে বলে উঠল,

“ বোকার মতো কি করেছি আব্বা?আপনি আমায় এভাবে বোকা সম্বোধন করতে পারেন না। আমি কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধিমতী!”

তার আব্বা ফের হাসল। প্রসঙ্গ পাল্টে গম্ভীর স্বরে বলল,

“ জানিস মিথি?মাঝে মাঝে আমারও একদম আদর্শ বাবা হতে মন চায়। ইচ্ছে করে তোর আর জ্যোতির ভালো বাবা হতে। কিন্তু যখনই এসব ভাবি তখনই আমার মনে পড়ে তোদের মায়ের মুখ! আমি পারিনা তার প্রতি ঘৃণা মুঁছতে!”

মিথির চঞ্চলতা হঠাৎ মিইয়ে গেল। বাবার দিকে চেয়ে জবাব দিল,

“আব্বা? আমারে বোকা বললেন না আপনি
আসলে আপনিই বোকা।আম্মার প্রতি আপনার ঘৃণা আছে মানলাম আমি, কিন্তু আম্মার দোষটা আপনি শুধু শুধুই আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন না আব্বা? আমরা কি কোন ভুল করেছিলাম আব্বা?কেন আম্মার পর আব্বার স্নেহও হারালাম আমরা বলুন?”

তার আব্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবারে। উপরের দিকে চেয়ে বলল,

“ আমি সত্যিই বোধহয় বোকারে মিথি! বহুদিন নিঃসঙ্গতায় ভুগতে ভুগতে আমার মনে হয়েছিল আমি একা!পুরো বিশ্বে আমি একা কেবল!আমাকে আমার মেয়েরাও চায় না এর চেয়ে কষ্টের কিছু হয়?কতোটা দূরত্ব সবার সাথে আমার!”

মিথি উঠে দাঁড়াল। ফের বলল,

“ধুররর!ভুল ভাবছেন আপনি আব্বা।জানেন আব্বা? আমি ছোট থেকেই আপনাকে ভয় পেতাম আব্বা৷ আপনার ধমক খাওয়ার ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পালাতাম সবসময়। কিন্তু সত্যটা হলো আমি আপনাকে মন থেকে ভালোওবাসতাম! মাঝেমাঝে আপসোস করতাম আমার আব্বা এমন কেন। কখনো বিরক্ত হয়ে আপনাকে আপন মনে কথাও শুনিয়েছি।আপনি গ্রামের হাইস্কুলরর গণিতের শিক্ষক! আমি সে জেনে যখন হাইস্কুলে ভর্তি হলাম? তখন থেকেই গণিত বইটা নিয়ে পরে থাকতাম খুব করে। ধারণা হতো যে আমি ক্লাসে সব অংক ফটাফট করে দিলেই বুঝি আব্বা সুন্দর করে আমার প্রশংসা করবে।সুন্দর ভাবে কথা বলবে আমার সাথে।কিন্তু সেসব কিছুই হতো না।মাঝেমাঝে আপনার এই রাগভ তবে আপনার মেয়েরা যে আপনাকে চায় না এটা ডাহা মিথ্যে! এই যে আজ নরম গলায় কথা বললেন, আমি কত সহজে আপনার সাথে মিশে গেলাম দেখলেন?সবসময় এমন ভাবেই কথা বলবেন আব্বা?”

#চলবে…..

[ আমার আর গল্প লেখায় আগ্রহ আসে না। কেন আসে না জানি না। তবুও গল্পটা শেষ করতে হবে। না চাইতেও জোর করে লিখছি যেন মনে হচ্ছেে।যায় হোক ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here