এক মুঠো প্রণয় (সিজন টু)পর্ব ১৫

0
39

#এক_মুঠো_প্রণয়
#সিজন_টু
#পর্ব_১৫
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ

জ্যোতি বাড়ি ছেড়ে শহরে এল দুদিন হলো৷ গত দুদিন ভার্সিটিতে না গেলেও আজ বের হলো ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। রাস্তার পাশে রিক্সার জন্য অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ও লাভ হলো না। খালি রিক্সা চোখে পড়ল না তার।তবে হঠাৎই দেখতে পেল রিক্সায় চড়ে আসা মেহেরাজকে। রিক্সাটা এদিকেই আসছে। জ্যোতি সরু চাহনিতে তাকিয়ে দেখল কেবল। মেহেরাজের এখন এইসময়ে আসার কারণও ভাবতে লাগল মনে মনে। ঠিক তখনই রিক্সাটা এসে থামল তার সামনে। দেখতে পেল মেহেরাজকে রিক্সা থেকে নামতে। জ্যোতি দু পা সরে অন্য জায়গায় দাঁড়াল তখন। মুহুর্তেই শুনতে পেল মেহেরাজের গম্ভীর গলা,

“ সরে দাঁড়ানোর কি আছে? তোর উপর হামলে পড়তাম আমি? ”

জ্যোতি চোখ বুঝে তপ্তশ্বাস ফেলল। মনে মনে সে চেয়েছিল মেহেরাজের সাথে এই যাত্রায় তার কথা না হোক। কিন্তু কথা হতেই হলো। এখন জবাব না দিলে নিশ্চয় বেয়াদব সম্বোধনটা খুব সুন্দর ভাবেই তার নামের আগে বসিয়ে দিবে? তাই তো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে উত্তর দিল,

“যাওয়ার জন্য জায়গা না পেলে তখন আবার বলতেন বেহায়ার মতো একটা ছেলের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছি।তাই না মেহেরাজ ভাই? ”

মেহেরাজ ভ্রু কুঁটি করে তাকাল। ঠোঁট চেপে সন্দেহী গলায় বলে উঠল,

“ সত্যি সত্যিই তুই ছেলেদের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকিস নাকি? ”

জ্যোতি মিনমিনে চোখে তাকাল এবারে। দুনিয়ায় এত কাজ থাকতে সে ছেলেদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকার মতো বিচ্ছিরি কাজটাই বা কেন করবে? এটা আধৌ কোন প্রশ্ন করা হলো? তবুও সেই প্রশ্নের উত্তর দিল জ্যোতি। স্পষ্টস্বরে বলল,

“দুনিয়ায় এত কাজ থাকতে আমি ছেলেদের রাস্তা আটকেই দাঁড়িয়ে থাকব কেন মেহেরাজ ভাই?”

“ করতেই পারিস। ”

“একদমই না। ”

মেহেরাজ হাসল কিঞ্চিৎ। জ্যোতির পাশে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,

“গুড!এবার বল মেহু কোথায়? কাল রাত থেকে কল দিয়েছি,ফোন সুইচডঅফ বলছে কেন ওর? ”

জ্যোতি এতক্ষনে বুঝতে পারল মেহেরাজের এই সময়ে এখানে আসার কারণ। মৃদু আওয়াজে উত্তর দিল,

“ মেহু আপু তো এখনো ঘুমাচ্ছে। বোধহয় ভার্সিটিতে যাবে না আজ৷ ”

প্রশ্ন এল,

“ কেন যাবে না? ”

“ বললাম তো ঘুমাচ্ছে।ঘুমে থেকে কি করে যাবে? ”

মেহেরাজ মাথা নাড়াল। পরমুহুর্তে কিয়ৎক্ষন চুপ থেকেই বলে উঠল,

“ ঠিকাছে,তাহলে তুই দুই মিনিটের মধ্যে মেহুকে গিয়ে বলে আসবি যে আমায় যাতে ঘুম থেকে উঠে কল করে। ওকে?”

জ্যোতি চোখজোড়া সরু করে তাকাল। ঠোঁট চেপে প্রশ্ন শুধাল,

”ঘুমাচ্ছে আপু। আমি কি আপুর ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলে আসব? ”

মেহেরাজ শ্বাস টানল। ঘুম ভাঙ্গালে ছোটবোনের ঘুম হবে না এই ভেবেই দ্রুত বলল,

“ না না,ঘুম ভাঙ্গাতে হবে না। ও ঘুমাক বরং। তুই ওর পাশে একটা কাগজে লিখে দিয়ে আসবি। ওকে? ”

জ্যোতি আলতো হাসল। ছোট বাচ্চাদের ঘুম ভাঙ্গানোতে যেমন তাদের বাবা মা নারাজ থাকে ঠিক তেমনই যেন ছোটবোনের ঘুম ভেঙ্গে গেলে মেহেরাজেরও অনেকটা খারাপ লাগবে এমন একটা ভাবই স্পষ্ট হলো মেহেরাজের চাহনিতে। সত্যিই কতোটা যত্নশীল! জ্যোতি মুগ্ধ হয় এই যত্নে কিন্তু প্রকাশ করে না। শান্তা গলায় বলল,

“ আচ্ছা।”

কথাটা বলেই পিঁছু ঘুরে চলে গেল। কাজ সেরে আসল আরো কিয়ৎক্ষন পর। ঠিক তখনই মেজেরাজ হাতের ঘড়িটায় তাকাল। সময় দেখে বিরক্ত স্বরে বলল,

“এতোটা দেরি হলো কেন তোর? ”

“দেরি তো আমার হলো ভার্সিটিতে যেতে। আপনি বিরক্ত হচ্ছেন কেন? তাছাড়া অতো বেশি দেরি কোথায় হলো? যায় হোক লিখে দিয়ে এসেছি, আপনি এবার চলে যান মেহেরাজ ভাই। ”

মেহেরাজ শীতল দৃষ্টিতে চাইল। বলল,

“ তোর থেকে অনুমতি নিয়ে যাব নাকি? তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠ, তোর না তেরি হচ্ছে? ”

“হচ্ছে, কিন্তু এই রিক্সায় তো আপনিই এলেন তাই না? ”

ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন শুধাল মেহেরাজ,

“তো?”

“কিছ নয়। ”

কথাটা বলেই ধীর গতিতে রিক্সায় উঠে বসল জ্যোতি। পরক্ষনেই আবারও মেহেরাজও উঠে বসল সে একই রিক্সাতেই। জ্যোতি ভ্রু কুঁচকাল। দ্রুত দূরত্ব নিয়ে সরে বসে জিজ্ঞেস করল

“আপনিও যাবেন মেহেরাজ ভাই? ”

“যাচ্ছিই তো। দেখছিস না? ”

“ হু। ”

মৃদু স্বরে কথাটা বলেই জ্যোতি আরো কিছুটা সরে একদম কিনারায় বসল যেন। আর সেই দৃশ্য দেখেই মেহেরাজ ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। শান্ত অথছ দৃঢ় গলায় শুধাল,

“ পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গার প্ল্যান করছিস নাকি? আজব!তোর কি আমায় গা ঘেষাঘেষি করা টাইপ ছেলে মনে হয় নাকি বুঝলাম না? ”

.

তখন সন্ধ্যা। আঁধার আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। জানালার এইপাশে বসে সেই চাঁদকেই দেখে গেল মেহু৷ অন্যমনস্ক হয়ে জ্যোতিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

“জীবনে কার দিকে যাওয়া উচিত আমার? কার সাথে আমার জীবন জড়ানো উচিত জ্যোতি? আমি ক্লান্ত! প্রচুর ক্লান্ত!”

জ্যোতি বই ঘাটাঘাটি করছিল। হঠাৎ প্রশ্নে হাত থেমে গেল যেন। কিয়ৎক্ষন চুপ থেকে উত্তর দিল,

“ যার কাছে তুমি সবচেয়ে সুখী হবে তার দিকে। হতে পারে সেটা সাঈদ ভাই, আবার হতে পারে সেটা ঐ ডক্টর। ”

মেহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,

“ সাঈদ ভাইয়া আমায় ভালোবাসে না জ্যোতি। ”

জ্যোতির দুঃখ হলো। কিন্তু দুঃখ প্রকাশ করল না। শান্ত গলায় বলল,

“শেষবার একবার কথা বলে দেখতে কি ক্ষতি আপু? বলে দেখো না কথা একটিবার। প্লিজ! ”

“কথা বললেই কি সমাধাণ মিলবে? ”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যোতিও। শূণ্য আকাশে তাকিয়ে জবাব দিল,

“জানা নেই, তবে এটা চেষ্টা মাত্র।চেষ্টা করতে তো নিষেধ নেই বলো? ”

মেহু মেনে নিল এবারে। সহমত পোষণ করে বলল,

“হু! ”

কথাটা বলেই মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিল সাঈদকে। একবার, দুইবার, তিনবার অনেকবার কল দিল। অন্যদিকে অপরপাশের সাঈদ ইচ্ছে করেই কলগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাল। যদি ফের কথা বললে মেহুর প্রতি দুর্বল হয়ে যায়? ফের যদি প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তার অনুভূতির? তাই তো যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাল। কিন্তু শেষ রক্ষে হলো কি? সেই তো কল তুলতেই হলো। আর তখন ওপাশ থেকে মেহুর গলা ভেসে আসল,

এতবার কল দিয়েছি। কল তুলছিলেন না কেন? ”

সাঈদ চোখ বুঝল সঙ্গে সঙ্গে। মিথ্যে ব্যস্তা দেখিয়ে মুহুর্তেই একটা মিথ্যে বলে বসল,

“আমি ব্যস্ত আছি মেহু। কিছু বলবে? ”

মেহু উত্তর দিল,

“হ্যাঁ কিছু কথা আছে আপনার সাথে সাঈদ ভাইয়া। ”

“ বলে ফেলো তাড়াতাড়ি, আমার কাজ আছে। ”

মেহু এবারে চুপ হয়ে গেল। ঠোঁট চেপে কিয়ৎক্ষন নিরবতার পর বলে উঠল,

“আমার সাথে কি দেখা করতে পারবেন একটু? একবার। ”

সাঈদ চোখ মেলে চাইল এবারে। ইচ্ছে করেই দেখা করার প্রস্তাবটা নাকোচ করতেই বলে উঠল,

“স্যরি মেহু, কাজ আছে বললাম তো। দেখা করাটা হয়ে উঠবে না বোধহয়। ”

মেহু ফের বেহায়ার মতো বলল,

“একবার! প্লিজ একবার সাঈদ ভাইয়া। আপনি অফিস থেকে ফেরার সময় দেখা করলেও হবে। প্লিজ! ”

সাঈদ চাপা শ্বাস ফেলল। মনে মনে কষ্ট চেপে গলায় খুশ ভাব আনার চেষ্টা করেই শুধাল,

“হঠাৎ এত দরকার? কি ব্যাপার বলো তো মেহু? ”

“কিছুই না, আপনি আসবেন না?”

সাঈদ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,

“আসব। ”

“সত্যিই আসবেন তো? আপনি সময় বলেন। আমি হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াব। ”

সাঈদ হাসার চেষ্টা করল। কৌতুক স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“ বিয়ের দাওয়াত দিবে নাকি মেহু? ”

“না, এমনিই কথা আছে তাই। ”

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here