এক মুঠো প্রণয় পর্ব ৩

0
76

#এক_মুঠো_প্রণয়
#পর্ব_০৩
লেখনীতেঃএকান্তিকা নাথ

দাদী বলে গেল, কিয়ৎক্ষন পরই নাকি মেহেরাজ ভাইয়ের সাথে বিয়ে হবে।আমি বিপরীতে কিছু বললাম না দাদীকে।আব্বার মতো দাদীর প্রতিও অভিমান আমার গাঢ় হয়ে কঠিনরূপ নিল। স্পষ্ট চাহনীতে কেবল একবার তাকিয়েই ঠাঁই বসে থাকলাম।পরনে আধভোজা নিত্যদিনের জামাটা।জানালা দিয়ে চোখে পড়ল উঠোনের অল্পকয়েক মানুষজনকে।পরমুহুর্তেই আটকে রাখা টিনের দরজায় টোকা পড়ল।আমি উঠে বসলাম।পা বাড়িয়ে দরজা খুলতেই চোখে পড়ল এক বিধ্বস্ত রমণীকে।ধবধবে সাদা মুখে বিষাদের খেলা।চুলগুলো যেন অনেকদিন আঁচড়ানো হয়নি এমনই অগোছাল লাগল।নাকের অগ্রভাগ লালচে হয়ে আছে।চোখজোড়াও লাল হয়ে ফুলে আছে।বুঝলাম যে, সামান্তা আপু অনেকক্ষন কান্না করেছে।আমি স্থির ভাবে চেয়ে বললাম,

” কিছু বলবেন আপু?”

সামান্তা আপু ভেতরে ডুকলেন।আমার ঘরে বসার জন্য আছে বলতে কাঠের পুরোনো চেয়ারটা।তাও এক পায়া নড়বড়ে।আমি সে চেয়ারটাই এগিয়ে দিয়ে বললাম,

” বসুন আপু।”

সামান্তা আপু বসলেন না।স্থিরভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন পরখ করতে লাগলেন।যেন কোন ঘোরের মধ্যে আছেন।সে ঘোর নিয়েই এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন।মুখের উপর আলতো হাত রেখে অস্ফুট গলায় বললেন,

” তুমি কি আমার থেকেও সুন্দর জ্যোতি?এতটাই রূপবতী তুমি?তোমার চোখ,নাক, মুখ কি আমার থেকেও সুন্দর?তোমার চুল কি আমার থেকেও লম্বা? তুমি কি আমার থেকেও ফর্সা জ্যোতি?এতটাই সুন্দরী তুমি? ”

আমি তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসলাম।সামান্তা আপু কি আমায় নিয়ে উপহাস করার জন্যই প্রশ্নগুলো করলেন?বুঝলাম না।ঘরে টাঙ্গানো ছোট আয়নায় একনজর নিজেকে দেখে নিয়েই বললাম,

” আপনার গায়ের রং ধবধবে সাদা।আপনার চোখ, নাক সুন্দর।মুখ মায়াবী।কালো ঘন চুল হাঁটুর উপর অব্ধি লম্বা।উল্টোদিকে আমার গায়ের রং চাপা, মুখচোখের অতোটা ধাঁচ নেই। চেহারায় হাজারটা দাগ, ব্রন!চুলতো ঐ পিঠের মাঝখান পর্যন্তই।তবে? তুলনাগুলো কেমন অযৌক্তিক নয় আপু?”

সামান্তা আপু নিশ্চুপ থাকলেন। তারপর হঠাৎ চেয়ারে ধপ করে বসেই চোখ তুলে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন কিয়ৎক্ষন।অস্ফুট গলায় বললেন,

” আমি জানতাম আমি সুন্দরী!কিশোরী বয়স থেকে প্রেমের প্রস্তাব আর প্রেমের চিঠি পেতে পেতে ধরেই নিয়েছিলাম প্রেম বিষয়টা আমাতে আটকায়।আর যায় হোক, নিজের প্রেমিক পুরুষ আমি বলতে অন্ধ থাকবে এমনটাই বিশ্বাস ছিল চিরকাল।কিন্তু কি হলো এটা?আমার সৌন্দর্য কি প্রেম আটকাতে পারল না জ্যোতি?”

আমি বুঝলাম না কি বলা উচিত।কিংবা কি বলা যায়।কিয়ৎক্ষন চুপ থাকলাম। সামান্তা আপু আবারও বললেন,

” আমি যা চাইলাম, যাকে চাইলাম তা তুমিই কেন পাবে?তোমাকেই কেন পেতে হবে তা?আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সে আমার, কেবলই আমার।কেড়ে নিও না তাকে জ্যোতি।”

আমি আৎকে উঠলাম।আমি কি সত্যিই কেড়ে নিচ্ছি?দুইজন মানুষের মাঝে দেওয়ালের মতো বাঁধা হয়ে যাচ্ছি?আমি কি স্বেচ্ছায় ঘৃণার মানুষটির সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছি?মুহুর্তেই মন বিষিয়ে উঠল তিক্ত অনুভূতিতে।মেহেরাজ ভাই মানেই ঘৃণা!শুধুই ঘৃণা!আমি আর ভাবতে পারলাম না।সামান্তা আপুর দিকে তাকিয়েই বললাম,

” আমি কোনদিন কারো জিনিস কেড়ে নিই না আপু।”

” কেড়ে নিলে তো।আমার থেকে তো তাকে কেড়ে নিলে।কেড়ে যদি নাই নিতে, তবে তোমার সাথে কেন সে তেমন অবস্থাতে থাকত?”

আমি হাসলাম।সামান্তা আপু যথেষ্ট আধুনিক।বয়সও কম।তবুও উনার কথা গ্রামের মুরুব্বিদের মতোই বোধ হলো।এতকিছুর পরও উনি কাল রাতের ঘটনাটাতেই আটকে আছেন।কাল রাতের গুজবকেই সত্যি ভাবছেন।তফাৎ কোথায় উনার আর গ্রামের মুরুব্বিদের মধ্যে?আমি হেসে বললাম,

” ভালোবাসলে তো বিশ্বাস দৃঢ় হয়।বন্ধন মজবুত থাকে।আপনার ভালোবাসার বন্ধন এতোটাই ঠুনকো যে অন্য একটা মেয়ে আপনার থেকে আপনার ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নিবে?এই বিশ্বাস নিয়ে ভালোবাসা যায় আপু?”

সামান্তা আপু এবার আর কিছু বললেন না।কিয়ৎক্ষন অন্যমনস্ক হয়ে বসে থেকে চলে গেলেন।আমি চাইলাম সে যাওয়ার পথে।ভুল কিছু কি বলে ফেলেছি?সামান্তা আপু কি কষ্ট পেলেন আমার কথায়?জানি না।তার কিছুটা সময় পরই ডাক পড়ল আমার।মেহু আপু আর ছোট চাচী নিয়ে গেল আমায়।আর পাঁচটা বিয়ের কনের মতো আমি সময় নিলাম না।ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনেই স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করলাম কবুল!তাও আবার সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটার জন্যই।অল্পমুহুর্তেই বিয়ে সম্পন্ন হলো।মেহেরাজ ভাই আর দাঁড়ালেন না।দ্রুত প্রস্থান করে ত্যাগ করলেন সেই স্থান।আমি অবশ্য তাকালাম না।শুধু যন্ত্রমানবীর মতো সমস্ত ঘটনা মস্তিষ্কে তুলে রাখছিলাম।ধীরে ধীরে নিজের সব অনুভূতি, সব হাসি, সব আনন্দ যেন যন্ত্রাংশের ন্যায় নিশ্চিহ্ন হলো।এই জীবনটা কি আমারই?আমার হলে অবশ্যই আব্বা, দাদী আমার মতামত জানতে চাইত।আব্বার কথা নাহয় বাদ, তাই বলে দাদীও জানতে চাইল না?এই নিষ্প্রাণ জীবন আর কদ্দূর বয়ে নিব আমি?

.

আমার হাতে মিথির হাস্যোজ্জ্বল এক ছবি।ধবধবে ফর্সা মুখে টোলপড়া হাসি।পরনে লালরাঙ্গা জামা।ছোটবেলায় সবাই বলত আমরা দুইবোনই নাকি দাদীর মতোই হয়েছি।স্বভাব চরিত্র হতে চেহারা সবটাই নাকি দাতীর মতোই পেয়েছি।বড়বেলায় এসে বুঝতে পারলাম যে সত্যিই তাই!ছবিতে মিলালেই মিথির সাথে আমার চোখমুখের স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়।শুধু গায়ের রংটাই আলাদা ছিল আমাদের।বাকি সবই এক!রাগ, জেদ, অভিমান, এমনকি হাসিও।আমি মিথির ছবির দিকেই চেয়েই ফিসফিসিয়ে বললাম,

” মিথি?তোর যতি কি কারো জিনিস কেড়ে নিতে পারে?কখনো কি কারো জিনিস কেড়ে নিয়েছি আমি?আমার উপর কারো প্রিয় মানুষ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠল।কিন্তু সত্যি বলতে আমার সে অভিযোগে কিছুই যায় আসল না।শুধু ঘৃণা হচ্ছে।অসহ্য লাগছে সবকিছু।সবথেকে বেশি অসহ্য লাগছে ঐ মানুষটাকে!আমার এই বিয়েটা মানতে খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে মিথি।নিজেকে আত্নসম্মানহীন বোধ হচ্ছে!”

বিনিময়ে মিথির উত্তর আসল না।আমি ছবিটা আগের মতোই তুলে রাখলাম।তারপর পরপরই দাদী ঘরে আসলেন।রুমের নড়বড়ে চেয়ারটায় আরাম করে বসেই বলে উঠলেন,

” বিয়াটাতে যে তোর মত ছিল না এইডা জানা ছিল আমার।কিন্তু বিয়াডা যদি নাই হইত তয় তোরে নিয়াই মানুষ কানাঘেষা করত।কথা চালাইত। রাজরে নিয়া কিন্তু কেউ এক কথাও উঠাইত না জ্যোতি।সমাজ! সমাজের কাঁটাতারে মাইয়ারাই আঘাত পাইতে থাকে।”

আমি কাঁটকাঁট চাহনীতে চাইলাম দাদীর দিকে।স্পষ্ট গলায় বললাম,

” এসব এখন বলে লাভ কি দাদী?হয়ে গেল তো বিয়েটা।সমাজের আগে দিয়ে তোমার আর আব্বার দায়ভারও তো হালকা হলো।আঠারোটা বছর আমাকে না চাইতেও নিজেদের কাছে রেখেছো।বোঝা হয়েই তো ছিলাম আমি এতকাল।অবশেষে স্বস্তি পেলে বলো?”

দাদী রেগে গেলেন।সঙ্গে সঙ্গেই রাগ দেখিয়ে বললেন,

“জ্যোতি, যা জানস না তা কইবি না।তোরে যদি বোঝাই ভাবতাম তাইলে এতকাল তোর বাপের থেকে আগলাইয়া রাখতাম না।তোর বাপের ঘর থেইকা আমার ঘরে আলাদা কইরা এতকাল বড় কইরতাম না।সৎমায়ের হাতেই ছাইড়া দিতাম তাইলে। ”

” এই যে এতকাল আগলে রাখলে, এই কারণে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু সেই তো কালরাতে বুঝিয়ে দিলে তুমি আসলে আমায় ভালোবাসো না দাদী! বিশ্বাস নাহলে এখনো আমার গালে তাকিয়ে দেখো।পাঁচ আঙ্গুলের লালচে ছাপ জ্বলজ্বল করছে। ”

দাদী চুপ থাকলেন।তার শক্তপোক্ত চড়ের জন্য হাত বুলিয়ে আদর করলেন না।অথচ আগে কখনো দাদী মারলে অনুতপ্ত হতো।কাছে টেনে আদর করত। এবার তার কিছুই হলো না।দাদী শুধু এইটুকুই বলল,

” গোঁছগাছ কইরা লও।রাজরা নাকি আজই চইলা যাইব।”

আমি চমকালাম।এবার কি তবে চিরপরিচিত জায়গাটাও ছেড়ে যেতে হবে?কাঠের চৌকি, মাটির স্যাঁতস্যাতে মেঝে আর টিনের ঘর!চিরপরিচিত সবুজে ঘেরা পুকুরপাড়টা, যেখানে প্রায়শই আমি দুঃখযাপন করি।সরুমাঠের ঐ উঁচুনিচু রাস্তাটা, যে পথ মাড়িয়ে আমি কলেজ যাই রোজ।এমনকি, চিরপরিচিত মানুষকেও?ছোট্ট মিথি,দাদী?এতটা কাছের মানুষ, এতটা ভালোবাসার মানুষ।দাদীকেও ছেড়ে যেতে হবে আমায়?সব, সব!সব ছেড়ে যেতে হবে আমায়?আমার নিঃশ্বাস ঘন হলো।বুক ভার হলো।অস্ফুট স্বরে বললাম,

” দাদী? সামনে না আমার পরীক্ষা?বাবা আমায় পড়তে দিবে না বলল, তোমারও কি তবে সেই একই মত দাদী?”

দাদী আমার দিকে চাইলেন একপলক।যেতে যেতেই বললেন,

” রাজরা পড়াইব তো।পড়াইব না কইছে একবারও?পরীক্ষার সময় আইসা পরীক্ষা দিয়া যাইবি।এইহানে পড়ার থেইকা ঐহানে ভালোই পড়তে পারবি।”

আমি হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকলাম।হুট করেই উপলব্ধি করলাম আমার কষ্ট হচ্ছে ভীষণ!দমবন্ধ লাগছে।ছোটবেলা থেকে যে মানুষটার সাথে আমার দিন থেকে রাত পর্যন্ত কাঁটত।যে মানুষটা আমার এইটুকু ব্যাথায়ও ছুটে আসত।যে মানুষটা আমায় শাসন, ভালোবাসা সবকিছু দিয়ে ছোট থেকে বড় করে তুলল।যে মানুষটা আব্বার বলিষ্ঠ হাতের চড় থেকে সৎমায়ের তিক্ত কথার ঝাঁঝ থেকে আগলে রাখত।সেই মানুষটাকেই ছেড়ে কি করে থাকব আমি?কি করে চলবে আমার?দাদী কি তা একবারও বুঝল না?নাকি বুঝেও বুঝল না?আচ্ছা, দাদীর কি কষ্ট হবে না আমার জন্য?আমার কথা মনে পড়বে না একবারের জন্যও? আমি কি এতটাই পর ছিলাম দাদীর কাছে?

.

জামাকাপড় গোছানো শেষ হলো।ছোটখাটো ব্যাগটা ভরে উঠল মুহুর্তেই।আমি হাতে করে ব্যাগটা নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হলাম।অন্যসব নতুন বউদের মতো আমার অতো সাঁজগোজ নেই।নিত্যদিনের সুতি জামা, আর মাথায় ঘোমটা টানা।পিঠের মাঝখান অব্ধি চুলগুলো বেনুনি করা।আমি বের হয়ে ব্যাগটা দরজার দ্বারে রেখে আব্বাকে খুঁজলাম।এই মানুষটাকে জবাব দিয়ে না যেতে পারলে শান্তি লাগবে না আমার।পা বাড়িয়ে বাড়ির উঠোনে যেতেই আব্বাকে দেখলাম। কাছাকাছি গিয়ে সালাম করলাম।শক্ত কন্ঠে বললাম,

” ভালো থাকবেন আব্বা।আপনার এতকালের ভালো থাকা আমি কেড়ে নিয়েছিলাম।আজ এক সমুদ্র ভালো থাকার পথ দিয়ে গেলাম।আপনি মুক্ত আজ থেকে। মিথি তো সেই কবেই আপনারে মুক্তি দিয়ে গেল।থাকার মধ্যে আমি ছিলাম।আজ আমিও মুক্তি দিলাম। আপনার ঘৃণা, রাগ সবকিছু থেকে মুক্তি দিলাম আব্বা।খুব বেশি ভালো থাকবেন আব্বা।যতটুকু ভালো থাকা কেড়ে নিয়েছিলাম সেটুকুও পুষিয়ে নিবেন।”

আব্বা আমার দিকে চাইলেন।বোধহয় কিছু বলতেও চাইলেন।কিন্তু আমি আর ফিরে চাইলাম না।সেই সাহস বোধহয় আমার নেই।দ্রুত পায়ে বাড়ি ছেড়ে বের হয়েই পুকুর পাড়ে দাঁড়ালাম।মনেমনে মিথির থেকে বিদায় নিলাম।আমি জানি না আমার ভাগ্য আমায় কি উপহার দিবে।জানি না,ভবিষ্যৎ এ কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।শুধু জানি, যে মানুষটার জন্য ঘর ছাড়ছি সে মানুষটার প্রতি আমার এক সমুদ্র ঘৃণা!কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই কানে এল গ্রামের এক চাচীর কন্ঠ,

” আরে এই মাইয়ারে দেইখা লাগে এই মাইয়া এমন কইরব?আনোয়ার মাস্টারের মাইয়া বইলা কথা!ভাবতাম কত ভালা।এহন দেখি তলে তলে অন্য কিছু!আর রাজ পোলাডারে তো যে ভদ্র ভাবতাম।”

আমি শুনলাম।শুনেও চুপ থাকলাম।আসলেই সমাজ অদ্ভুত!রটে যাওয়া ঘটনা মিথ্যে কি সত্য তা একবার ও যাচাই করল না অথচ সমালোচনায় একধাপ পিছিয়েও থাকল না।কি চমৎকার সমাজ!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here