আমি আমার শেষ পর্ব

0
1057

#আমি_আমার
পর্ব -২( শেষ পর্ব)
#tani_tass_ritt

অপলা হতভম্ব হয়ে গেলো চর খেয়ে। সে এক গালে হাত দিয়ে বোকার মতো দাড়িয়ে রইলো। ঘটনাটা এতো জলদি ঘটলো যে সুপ্ত ও কিছু বুঝে উঠতে পারলোনা। অপলা কিছু বলতে যেয়েও চুপ করে গেলো। কেনো সে এই মার ডিসার্ভ করে। হয়তোবা আজ সুপ্ত আর রিদিতার এই অবস্থার জন্য সে নিজেও দায়ি। রিদিতা সুপ্তর দিকে ফিরে বললো,
” বলেছিলে না অপলাকে দিয়ে মার খাওয়াবে আমাকে তোমার বাসার নিচে আসলে? তোমার সাথে দেখা করতে আসলে?আমি বলেছিলাম না তোমার এই অপলাকে আমি থাপ্পর মারবো একদিন। নাও আজ মেরে দিলাম। রিদিতা নিজের কথা রাখতে জানে ব্রো। তোমাদের মতো ঠকবাজ না। ”

বলেই রিদিতা অপলার দিকে তাকালো।মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,” শুনলাম তোমার বয়ফ্রেন্ড নাকি তোমার বেস্টফ্রেন্ড কে বিয়ে করেছে। কেমন লাগছে এখন? ঠিক তোমাদের মতো মেয়েদের জন্য না অনেক সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। আমি তোমার কি ক্ষতি করেছিলাম? তোমার নিজের বয়ফ্রেন্ড দিয়ে মন ভরতো না যে তোমার আমারটাকেও লাগতো। যাইহোক তোমাকে দোষ দিয়েই কি বা হবে যার নিজের মানুষ ই ঠিক নেই সেখানে অন্য কাউকে দিয়ে আর কি ই বা আশা করবো!” বলেই রিদিতা সেখান থেকে চলে গেলো।

সুপ্ত অপলার পাশে এসে দাড়ালো। অপলা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

“রিদিতা কোনোদিন ও তোর আর আমার ফ্রেন্ডশিপ টা বুঝতে পারেনি রে। বুঝবেই বা কিভাবে! আমি তোর জন্য ওর গায়ে হাত তুলেছি। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছি। ”

অপলা চোখ মুছতে মুছতে বললো,” দোস্ত আমাকে মাফ করে দিস রে। আমি ইচ্ছা করে রিদিতার সামনে তোর সাথে বাড়াবাড়ি করতাম। তোর মাথায় উলটাপালটা কথা ঢুকাতাম। মেয়েটা তোকে অনেক ভালোবেসেছিলো। কিন্তু কেনো যেনো তখন এগুলো করতে ভালো লাগতো। তুই যখন ওকে রেখে আমার সাথে ঘুরতি আমাকে সময় দিতি আমার অনেক ভালো লাগতো। তাই ইচ্ছে করে এমন করতাম। মেয়েটা আমার জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছে রে। তাই হয়তো আজ আমার এই অবস্থা। সিহাব আমাকে এভাবে ঠকালো। ঐ যে কথায় আছে না ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।”

সুপ্ত আর কোনো কথা বললো। স্টেইজের দিকে এগোতে লাগলো। সবাই রেডি বিয়ে পড়ানোর জন্য। কাজি এসে গেছে। শুধু কবুল বলা বাকি।

মিতুর কবুল বলা শেষ। এখন সুপ্তর বলা বাকি। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই দুজন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। চারিদিকে কোলাহল। সবাই সাক্ষী হতে চলেছে। শুপ্তর চোখ পড়লো দূরে দাঁড়ানো রিদিতার দিকে। রিদিতা এক ধ্যানে সুপ্তের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে অয়ন। অয়ন রিদিতাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে আছে। সুপ্ত এবং রিদিতা চোখে চোখে কিছু একটা বললো। হয়তো তাদের যাত্রার সমাপ্তি টা এভাবেই। সুপ্ত চোখ বন্ধ করলো। আশ্চর্য মুখ দিয়ে তার কথা বেরোচ্ছেনা। শব্দ কেমন যেনো আটকে যাচ্ছে। সে নিজেকে স্থির করলো। এবং কবুল বললো। চারিদিকে হৈচৈ পরে গেলো। রিদিতার শরীর টা কেমন যেনো হালকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেক বড় একটা পাহাড় তার উপর থেকে নেমে গিয়েছে।

★★★★★★★★
“রিদিতা আপুকে কেনো এতো কষ্ট দিয়েছিলে সুপ্ত?”
সুপ্ত সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার খুজছিলো। মিতুর এমন প্রশ্ন শুনে সে মোটেও বিচলিত হলোনা। সে প্রস্তুত ছিলো। সিগারেট টা ধরিয়ে বেলকনিতে থাকা দোলনাটায় বসলো। মিতু ও পিছু পিছু গেলো। সুপ্ত মিতুকে ইশারা করলো তার পাশে বসতে। মিতু ও বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়লো। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ ছিলো। হাতে থাকা সিগারেট টায় দুটো টান দিয়ে সিগারেট টা ফেলে দিলো সুপ্ত। তারপর মিতুকে নিজের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো।

“জানোতো রিদিতার সাথে যখন আমার রিলেশন হয় তখন ওকে না আমার খুব ভালো লাগতো। যেহেতু আত্নীয় তাই আগে থেকেই চেনাজানা ছিলো। মেয়েটার মধ্যে অদ্ভুত এক ইনোসেন্টনেস ছিলো। আমি ভেবে পেতাম না একটা মেয়ে এতো ভালো কিভাবে হয়। ওর সব কিছুই আমার খুব ভালো লাগতো। ফুল টাইম আমি ওর কথাই ভাবতাম। ও আমাকে কোনোদিন কিছু বলতো না। আমি যখন ই ফোন দিতাম ও তখনি কথা বলতো। কখনো বলতোনা যে আগে কেনো দাওনি বা কিছু। সম্পর্ক টা বেশ ভালোই যাচ্ছিলো। কিন্তু দিন যত যাচ্ছিলো আমার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পাই। মেয়েটা আমাকে অনেক ভালোবাসত। কিন্তু ওর এই ভালোবাসাই যেনো আমার আর পছন্দ হচ্ছিলোনা। মানে একটা মানুষ এতো কিভাবে ভালোবাসতে পারে। দিন দিন আমি ওকে টেকেনফর গ্রান্টেড নেওয়া শুরু করি। মেয়েটা কষ্ট পেতো। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতো না। কেনোনা ওর মধ্যে ছিলো আমাকে হারানোর ভয়। কিন্তু বলো একটা মানুষ আর কত সহ্য করবে। ধীরে ধীরে ও বলা শুরু করলো। আমাকে নিয়ে ওর অনেক অভিযোগ। অবশ্য অভিযোগ করার মতো যথেষ্ট কাজ আমি করেছি। কিন্তু জানো তো তখন বুঝিনি। ওর এই অভিযোগ গুলো আমার কাছে বিষের মতো মনে হলো। প্রচন্ড প্যারা লাগতো। দেখা যেতো ও ১০০ টা ফোন দিতো কিন্তু আমি রিসিভ করতাম না। এতোটাই বিরক্ত লাগতো যে আমি ওকে তুইতুকারি শুরু করলাম। একটা সময় ওর উপর হাত ও তুলে ফেললাম। মেয়েটা তবুও চুপচাপ ছিলো। এরপর তো আমি ওকে পেয়ে বসেছিলাম। কথায় কথায় গালগালাজ করতাম। সময় দিতাম না। ওর প্রাপ্য সম্মান তো দূরে থাক ও যে একটা মানুষ তাই মনে করতাম না। কারো উপর রাগ হতো ঐটা ওর উপর বের করতাম। মেয়েটাও না মুখ বুজে সহ্য করছিলো। তখন বুঝিনি যে মেয়েটা কতটা কষ্ট পেতো।
এরপর তো আরো ভয়াবহ পপরিস্থিতি তৈরি হলো। আমার পরিচয় হলো শাফায়েত এর সাথে। ওর মাধ্যমে ওর গ্রুপের সাথে। বেশ ভালো একটা বন্ডিং। ঐ গ্রুপে একটা মেয়ে ছিলো। যার নাম অপলা। ”

এবার মিতু সুপ্ত কে থামালো।
“অপলা আপু। ও তো আজ আমার বিয়েতে এসেছিলো।”

সুপ্ত আবার বলতে শুরু করলো।
” হ্যা অপলা। রিদিতার সাথে অপলাকে দেখা করানোর পর রিদিতা অপলাকে এক্সেপ্ট করতে পারেনি। ওর মনে হচ্ছিলো ওদের জন্য আমি ওকে সময় দিচ্ছিনা। ওর সাথে এমন করছি। ব্যাপারটা আমার মোটেও পছন্দ হলো না। এবার রিদিতাকে আমার চরম পর্যায়ে বিরক্ত লাগা শুরু হলো। অপলাদের সাথে থাকতে আমার ভালো লাগতো। ইচ্ছে করে ওর সাথে ছবি দিতাম। ঘুরতে যেতাম।কেনো যেনো রিদিতার কথা ভাবতাম না। ওর কষ্ট পাওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথাও ছিলোনা। এবং অপলাও এটা বুঝতে পারছিলো। ও ইচ্ছে করে রিদিতার সামনে আমার সাথে ক্লোজ হতো। এগুলোতে আমি বেশ মজা পেতাম। কিন্তু কোনো দিন বুঝতে চেষ্টা করিনি এইসবে রিদিতা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। তারপর ও মেয়েটা চেষ্টা করেছে আমার সাথে থাকতে। কিন্তু আমি এতোটাই সার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম যে নিজেকে ছাড়া ওকে আর দেখতাম না। এভাবেই দিন চলতে থাকলো। অপলার সাথে আমার ফ্রেন্ডশিপ ভালো হলো আরো। ওর ও কিন্তু বিএফ ছিলো। ওরা বলতো রিদিতা ইম্যাচিউর। কিছু বুঝেনা। এগুলা শুনতে শুনতে রিদিতার উপর থেকে যেনো সব ফিলিংস আমার নাই হতে লাগলো। একটা সময় আমি ওর বাবা মা কে নিয়ে গালিগালাজ শুরু করি। একদিন দুদিন তিনদিন। মেয়েটা না তবুও সব সহ্য করে আমার সাথে ছিলো। কিন্তু বলো একটা মানুষ আর কতো পারে। এভাবেই দু বছর পার হলো। আমার মনে হতো রিদিতা তো থাকবেই। ও আমাকে এতো ভালোবাসে যে আমাকে কোনো দিনও ছেড়ে যাবেনা। কিন্তু না রিদিতা আমাকে ভুল প্রমাণিত করলো। ও একদিন বিনা নোটিশে আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। ওকে যে অবহেলা অসম্মানের সাগরে আমি ডুবিয়েছিলাম হয়তো ওখানে সাতার কেটে হাপিয়ে উঠেছিলো সে। জানো মেয়েটা আমাকে শেষ অব্দি আর কিছু বলেনি। কোনো অভিযোগ করেনি।

এতোটুকু বলেই থেমে গেলো সুপ্ত। সুপ্ত খেয়াল করলো মিতু ঘুমিয়ে পড়েছে। সুপ্ত মনে মনে বললো, ” যাক ভালো হয়েছে।”

এইদিকে মিতু ঘুমের ভান ধরে আছে। কেনোনা সে চাচ্ছেনা সুপ্তকে ফেইস করতে। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। সে চায়না তার সাথে কখনো এমন হোক। রিদিতার সাথে যা হয়েছে তা সে নিজের সাথে কোনো দিন ও হতে দিবেনা।

সুপ্ত মিতুকে কোলে তুলে বিছানায় শুয়ে দিলো। সে আবার বেলকনিতে চলে এলো। আরেকটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটে টান দিতে দিতে আকাশের দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ করে বিরবির করে বললো,” রিদিতা তুমি বলতে না যে তুমি না থাকলে আমি তোমার কদর বুঝবো। বুঝেছি তো আমি। হারে হারে টের পেয়েছি। তুমি সবসময় বলতে না শুধু তুমি দেখে আমার এগুলো মেনে নিয়েছো। এটা না এখন আমিও বিশ্বাস করি। তাইতো আমি মিতুকে কখনো কষ্ট দিবোনা। কিন্তু আফসোস আমি যদি আগে বুঝতাম তাহলে তোমাকে এতো কষ্ট পেতে হতো না। ”

★★★★★
রিদিতা অয়নের বুকে শুয়ে আছে। অয়ন রিদিতার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। দুজনেই চুপ। নিরবতা ভেঙে অয়ন বললো,”আচ্ছা রিদিতা তুমি কখনোই বলোনি সুপ্ত এবং তোমার মাঝে কি এমন হয়েছিলো? সুপ্তকে দেখে তো যথেষ্ট ভালো ছেলে মনে হয়েছে।”

রিদিতা এক গাল হেসে বললো,” ঐ যে আমি টক্সিক ছিলাম।”

অয়ন যদিও আগা মাথা বুঝলো না কিছুই। সে রিদিতাকে আরো জোরে বুকে জড়িয়ে ধরলো। রিদিতা মনে মনে বললো,” আমি জানি তোমার মনে হয় আমি তোমাকে ভালোবাসিনা অয়ন। কিন্তু সত্যি বলতে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু প্রকাশ করতে ভয় লাগে। মনে হয় আমার ভালোবাসা বুঝে গেলে তুমি ও আমাকে অবহেলা করবে। আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসবেনা। আমি যে সেই মৃত্যু যন্ত্রনা আর নিতে পারবোনা অয়ন। #আমি_আমার হয়ে থাকতে চাই অয়ন। আমি চাইনা আবার আগের মতো হতে। নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দিতে। এবং কাউকে ঐ অধিকারটুকুও দিতে চাইনা যে আমাকে দুমরে মুচরে শেষ করে দিবে। #আমি শুধুমাত্র #আমার ই অয়ন। আমি কারো হতে চাইনা।”

হঠাৎ ই রিদিতার ফোনে ম্যাসেজের রিংটোন বেজে উঠলো। রিদিতা ফোনটা নিয়ে দেখলো অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে ম্যাসেজ এসেছে।

” আপি আমি ঐ শাকচুন্যি অপলাকে ব্লক করে দিয়েছি। আমি কোনোদিন ও আমাকে এভাবে উজার করে দিবোনা যেটা তুমি দিয়েছিলে। #আমি_আমার ই থাকবো। তোমার মতো ভালোবাসতে আমি চাইলেও পারবোনা আপি। তুমি তুমি ই। সুপ্ত ঠিক ই বলেছিলো তুমি অন্যরকম।”

রিদিতা জোরে হেসে দিলো। সে হয়তো কোনো দিনো সুপ্ত কে মাফ করবেনা। সত্যি বলতে কি কিছু যন্ত্রনা ভুলার মতোনা। চাইলেও আমরা পারিনা কিছু মানুষকে ভুলতে।

রিদিতার হাসি দেখে অয়ন ভরকে গেলো।
” কি ব্যাপার এভাবে হাসছো কেনো?”
” মিতু মেয়েটা কিন্তু বেশ কিউট তাইনা বলো।”
অয়ন ভেবে পাচ্ছেনা কি বলবে।কারো কাছে নিজের এক্সের বউ কে আবার কিউট লাগে কেম্নে!

শেষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here