অতঃপর গল্পটা তোমার আমার পর্ব ১৮

0
91

#অতঃপর_গল্পটা_তোমার_আমার
#পর্ব-১৮
#হুমায়রা_আঞ্জুম (লেখনীতে)

সানাত বসে আছে ওহীর রুমে। ওহী রেডি হচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করলো,

ভাইয়া কিছু বলেছে আমাকে নিয়ে?

না। তুই ভাবিস না কিছু।

কি বলছিস ভাববো না মানে? ভাইয়া আমার সাথে এক সপ্তাহ হলো কোনো কথা বলেনি। আমি ভেবেছিলাম সেদিন হয়তো ভাইয়া আমাকে প্রচুর বকবে কিন্তু তাঁর কিছুই করেনি ভাইয়া।

বকলে কি তুই খুশি হতি? বরং এখন তো তোর খুশি হওয়ার কথা তোর আর রাদিফ ভাইয়ার আকদ হচ্ছে। তুই কি খুশি না?

আমি খুশি কিন্তু আমি শান্তি পাচ্ছিনা সানাত। ভাইয়া যদি আমায় মারতো বকতো তাহলে আমি বোধয় শান্তি পেতাম কিন্তু ভাইয়া আমার সাথে কোনো কথাই বলছেনা। সেদিন ওখান থেকে আসার পরে আমি কখনোই ভাবিনি ভাইয়া এসে আব্বু আম্মুকে বলে রাদিফের ফ্যামিলির সাথে পাকা কথা বলে ফেলবে। ভাইয়া কোনো বাঁধাও দিলোনা।

ওহী তুই মন খারাপ করিস না। আচ্ছা যা আমি আজকে এটা নিয়ে কথা বলবো ওনার সাথে। আর তুই এখন রেডি হ একটু পরই তোর ঘরোয়া বিয়ের শপিংয়ে যাবো।

রেডি হচ্ছি। তুই প্লিজ ভাইয়াকে বুঝিয়ে বল। আমার সত্যিই খারাপ লাগছে।

আচ্ছা মন খারাপ করিসনা আমি কথা বলবো। বলেই সানাত বেরিয়ে গেলো।
.
.

অন্তিম রেডি হচ্ছে। এমন সময় ঘরে সানাতের আগমন ঘটলো। সানাতকে দেখে অন্তিম কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলে উঠলো,

সানাত তুমি এসেছো?

হ্যাঁ, কোনো দরকার?

হ্যাঁ আমার ঘড়িটা কোথায় রেখেছো খুঁজে পাচ্ছিনা।

দেখছি দাঁড়ান। বলেই ঘড়িটা খুঁজে বের করে অন্তিমের হাতে দিয়ে বললো,

এতো অগোছালো হয়েছেন কেনো আপনি কোনো জিনিসের ঠিক ঠিকানা নেই!

তুমি আছো না গোছানোর জন্য।

এটা কি আমার চাকরী? বেতন দেন আপনি আমায়?

চাকরী কেনো হবে এটা তোমার রেসপনসিবিলিটি।

থামুন। আপনি কি আমাদের সাথে বের হবেন?

হ্যাঁ মা অনেক রিকোয়েস্ট করেছে। তাই আর না করতে পারিনি।

ওহ্।

তুমি কি কিছু বলবে?

সানাত কিছুক্ষণ কাচুমাচু করে তারপর বললো,

আসলে একটা বিষয় কথা বলার ছিলো।

কি বলো। এতো হেজিটেড ফিল করছো কেনো?

আসলে ওহী খুব কষ্ট পাচ্ছে।

অন্তিম ঘুরে সানাতের দিকে তাকালো। তারপর বললো,

কেনো? ওর কি বিয়েতে আপত্তি আছে?

না না তেমন কিছু নয়।

তাহলে?

আপনি ওর সাথে কথা বলছেন না ও খুব কষ্ট পাচ্ছে এই বিষয়টা নিয়ে। সেদিন ওখান থেকে আসার পর আপনি ওকে কিছুই বলেননি। উল্টো আকদ করিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছেন। আপনি কি ওর ওপর রেগে আছেন? মেয়েটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। আপনি প্লিজ রেগে থাকবেননা। আচ্ছা আপনি কি কোনোভাবে রাদিফ ভাইয়ার জন্য মানতে পারছেননা?

সানাত আমি কেনো রেগে থাকবো? ওহী তো কোনো অন্যায় করেনি। একজনকে ভালোবেসেছে। আর ভালোবাসা অন্যায়ের কিছুই না। ওহী এখন মোটেও বাচ্চা নয়। নিজের লাইফের ডিসিশন নিজেই নিতে পারে। আর রাদিফকে নিয়ে আমার কোনো প্রবলেম নেই। আর রাদিফকে নিয়ে কোনো প্রবলেম থাকার প্রশ্নই আসেনা। কারণ আমি জানি রাদিফ খুব ভালো একটা ছেলে। আমার বন্ধু বলে বলছিনা। সত্যিই খুব ভালো ছেলে। আমি নিজেও হয়তো ওহীর জন্য এতো বেস্ট কোনো পাত্র খুঁজে পেতামনা। ওহী একদম পারফেক্ট একজনকেই চুজ করেছে। আর রাদিফ এস্টাবলিসড একটা ছেলে। ওকে নিয়ে কোনো প্রব্লেম আমার নেই।

তাহলে কেনো কথা বলছেননা ওহীর সাথে?

আমি আসলে কিছুদিন পরে ওহীর বিয়ে হয়ে গেলে কেমন সব শূন্য হয়ে যাবে এটা ভেবে একটু চুপচাপ আছি। ওকে দেখলেই আমার মনে হয় ছোট্ট বোনটা আমার কতো বড় হয়ে গেছে। আমার ভাবতেই খুব কষ্ট হয় সানাত।

এই ব্যাপার! আর আপনি জানেন আপনার এই এমন আচরণে মেয়েটা কতো কষ্ট পাচ্ছে! রীতিমত কাদঁছিলো ওহী।

কি ওই বোকা মেয়ে কেঁদেছে?

হ্যাঁ। আপনি এখনি যান গিয়ে বোনের মান ভাঙ্গান।
.
.
সানাত বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে অন্তিম আর ওহীর দিকে। তারপর বললো,

আপনাদের ভাই বোনের মান অভিমান শেষ হলে চলুন আমরা যাই। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।

হ্যাঁ এবার বের হওয়া উচিত। বললো অন্তিম।

তাহলে দাড়িয়ে কেনো আছেন চলুন। আর এই ওহী তোর এই ন্যাকা কান্না বন্ধ কর। প্রেম করার সময় মনে ছিলনা যে একদিন তো ভাইকে ছেড়ে প্রেমিকের সাথে যেতে হবে।

এই তুই থামবি! তোর কি লজ্জা লাগেনা এসব বলতে?

তোর প্রেম করতে লজ্জা না লাগলে আমার বলতে কেনো লজ্জা লাগবে শুনি?

থাম সানাতের বাচ্চা।

আমার কোনো বাচ্চা নেই।

তাহলে নিয়ে নে। আমিও ফুপি হতে চাই।

ব্যাসস সানাত সঙ্গে সঙ্গে নুইয়ে পড়লো। অন্তিম সামনে থাকায় লজ্জা যেনো আকাশ ছুঁলো। এই মুহূর্তে তার এই ওহীকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করছে। রাগে লজ্জায় সানাত কোনো কথা না বলে চুপচাপ গাড়ীতে উঠে অন্তিমের মা অর্পিতা আঞ্জুমের পাশে বসলো। তারপর অন্তিম ওহীও উঠে বসলো। সারা রাস্তা সানাত একটা কথাও বলেনি। আর অন্তিমের দিকে তো ভুলেও তাকায়নি।
.
.

মার্কেটের মাঝেই ঘোরাঘুরি করছে সানাতরা। ওহীর শ্বশুর বাড়ি থেকেও মানুষ এসেছে। সবাই মিলেই বিয়ের শপিং করছে। সবাই বেশ হাসিখুশি ভাবেই ঘুরছে। কিন্তু সানাতের কেনো যেনো খুব অস্থির লাগছে। কেনো যেনো মনটা খুব অস্থির করছে। অন্তিম সানাতের পাশে এসে দাঁড়ালো। তারপর বলে উঠলো,

সানাত তুমি ঠিক আছো? তোমাকে আমার ঠিক লাগছেনা?

না আমি ঠিক আছি।

শিওর?

হ্যাঁ। একদম ঠিক আছি আমি। আপনি চিন্তা করবেননা।

আচ্ছা। বাট কোনো প্রব্লেম হলে বলবে কিন্তু।

হ্যাঁ একদম।
.
.
সানাতদের সব শপিং করা শেষ। এখন মূলত তারা শপিংমল থেকে বের হচ্ছে একটা রেসটুরেন্টে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে সেখানেই যেনো আজ এক চরম বিপত্তি ঘটে গেলো। যা একটা সদ্য সাজানো সুখের সংসার ভেঙ্গে দিতে সক্ষম। হঠাৎ করেই অন্তিমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো এক আগন্তুক মেয়ে। পুরো ঘটনায় হতবিহ্বল উপস্থিত সকলে। অন্তিম কোনরকমে সামলে দাড়ালো। হঠাৎ এমন কিছুর জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া মেয়েটিকে দেখা মাত্রই সানাতের সমস্ত দুনিয়া মুহূর্তেই কেঁপে উঠলো। কারণ মেয়েটি আর কেউ নয় ছোঁয়া। সানাত যেনো পাথর হয়ে গেছে। যেই ভয় সে এতদিন ধরে পেয়ে আসছিলো আজ তা সত্যি হয়ে গেলো। তার সংসারটা বোধয় আর তাঁর থাকবেনা। ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে যাবে। সকলের দৃষ্টি উপেক্ষা করে ছোঁয়া বলে উঠলো,

অন্তিম! আমি এসে গেছি। তুমি আমার ওপর খুব রাগ করে আছো তাইনা?

অন্তিম নিজেকে ছোঁয়ার থেকে ছাড়িয়ে নিলো। মুহূর্তেই অন্তিমের মা অর্পিতা আঞ্জুম বলে উঠলেন,

এতদিন পর কোথথেকে এসেছো তুমি? আর এসব পাবলিক জায়গায় কোন ধরনের অসভ্যতামো।

ছোঁয়া অন্তিমের মায়ের কথা উপেক্ষা করে অন্তিমের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

অন্তিম আই নো তুমি অভিমান করে আছো আমার ওপর। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি অন্তিম।

ভুল বুঝতে পেরেছিস মানে? আমাদের সাথে বেইমানি করে আমাদের সম্মানহানি করে এতোদিন পর এখন হুট করে এসে ফাজলামি করছিস তুই ! বললো ওহী।

ওহী তুইও এভাবে বলছিস! আই নো আমি ভুল করেছি। আমি স্বীকার করছি তো নিজের ভুলটা।আমি অন্তিমের সাথে কথা বলে সবটা স্বাভাবিক করে নেবো।

স্বাভাবিক করবি মানে? কি স্বাভাবিক করবি তুই? তুই কেনো এসেছিস? আর ভাইয়া তোর সাথে কোনো কথা বলবে না। ভাইয়া এখন ম্যারিড সেটা ভুলে যাসনা।

কিসের ম্যারিড?

বিয়ে হয়েছে সানাতের সাথে ভাইয়ার।

ওটাকে কোনো বিয়ে বলে নাকি! অন্তিম পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিয়ে করেছে সানাতকে । আর সানাতও তো অন্তিমকে ভালোবাসে না। এটা জাস্ট একটা এক্সিডেন্ট।

এই মেয়ে একদম চুপ করো তুমি। বেয়াদব কোথাকার! তুমি বললেই ওদের বিয়ে মিথ্যে হয়ে যাবে নাকি? তুমি কে এসব বলার? আমার ছেলের জীবনের এতো বড় সর্বনাশ করে আবার যখন আমার ছেলেটা সুখে শান্তিতে বাঁচতে চাইছে তখন তুমি আবার কেনো এসেছো? কোন অশান্তি সৃষ্টি করতে এসেছো তুমি?

আন্টি আপনি ভুল বুঝছেন। আমি আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক করতে চাইছি।

কিসের সম্পর্ক? আর কি স্বাভাবিক করবে তুমি? তোমার ইচ্ছা মতো সবকিছু হবে নাকি? আর বারবার ভুলে কেনো যাচ্ছো অন্তিম বিবাহিত। সানাত ওর স্ত্রী।

আমি মানিনা। আর আমি জানি অন্তিমও মানেনা এই সম্পর্ক। অন্তিম তুমিই বলো তুমি তো আমাকে ভালোবাসো। আমার জন্য পাগল ছিলে তুমি। আমি জানি আমি ভুল করেছি। তাই এখন নিজের ভুলটা সংশোধন করতে চাই। আর এই সংশোধনের উপায় তুমি সানাতকে ডিভোর্স দিয়ে দেও। তারপর চলো না আমরা আবার সবটা নতুন করে শুরু করি।

অন্তিম নিশ্চুপ। কোনো কথা সে বলছেনা।
আর সানাত সে শুধু অন্তিমের কিছু বলার অপেক্ষায় তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। তার ভেতরে যে ঝড় বইছে তা সে কিছুতেই সামলাতে পারছেনা। ছোঁয়া আবারও বলে উঠলো,

অন্তিম আমি তোমার সাথে আলাদা করে কথা বলতে চাই। প্লিজ আমাকে একটু সময় দেও। আমি সবটা খুলে বলবো।

না অন্তিম কোথাও যাবে না। এই মেয়ে আমার ছেলের থেকে দূরে থাকো বলছি। অন্তিম তুই চল এখান থেকে।

অন্তিম প্লিজ তুমি আমাকে একটু টাইম দেও। আমার সাথে প্লিজ চলো।

অন্তিম একবার সানাতের চোখের দিকে তাকালো। সানাত শুধু তাকিয়ে আছে। তার চোখের ভাষা আজ বড্ডো বেদনাদায়ক। অন্তিম দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সবার আকাঙ্খা মাটিতে মিলিয়ে দিয়ে বললো,

তোমরা বাড়ি যাও মা। আমি ছোঁয়ার সাথে যাবো।
কথাটা বলেই সানাতের দিকে আরেকবার তাকালো অন্তিম। সানাত তার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। তার বুকটা আজ ফেটে যাচ্ছে। কেনো সুখ সয়না তার? উপরওয়ালা কেনো এতো নিষ্ঠুর তার বেলায়? আজ চিৎকার করে কাঁদতে পারলে বোধয় একটু হলেও শান্তি লাগতো! তার ভাবতেই কলিজাটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় যে এটা সেই ছোঁয়া যে একসময় তার বেস্টফ্রেন্ড ছিলো!
#চলবে

( রি চেইক দেইনি তাই বানানের ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্প দেরিতে দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here