অটবী সুখ পর্ব ২৯

0
49

অটবী সুখ

২৯.
দূর থেকে পাখির কুহুকুহু ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘরে ফ্যান চালানো নেই। বাহির থেকে মৃদুমন্দ বাতাসে ফ্যানের কথা মনেই আসছে না। জঙ্গল তো! আশপাশে প্রচুর গাছ। রোদের আলো ঠিকঠাক আসে না। গাছেরা সারাদিন দুলতে থাকে আনন্দে। গরম লাগবে কোত্থেকে? কোলে মাথা এলিয়ে শুয়ে থাকা ত্রিস্তানের চুলে অল্প হাত বুলালো অটবী। লোকটার চোখের পাতা বন্ধ। একটু আগে সেগুলো পিটপিট করলেও এখন সেটাও নিস্তেজ হয়ে গেছে। নড়ছে না। ঘনঘন নিশ্বাস একেকটা। তাকে এ রাজ্যের রাণী বানিয়ে ত্রিস্তান কি ঘুমিয়ে গেছে? এত তাড়াতাড়ি? অথচ একটু আগেও তাকে ধরে বেঁধে বিছানায় বসিয়ে বিরাট হাই তুলে বলেছিল, “হামি দিচ্ছি বলে ভেব না, ঘুমাবো। শুধু একটু কোলে মাথা রাখতে চাচ্ছি। বউয়ের কোলে নাকি মায়ের মতো আরাম আছে! আছে নাকি? তুমি কিছু জানো?”

বলতে বলতে অটবীর কোলে মাথা রাখলো ত্রিস্তান। পরপরই চোখ-মুখ কুঁচকে নিজেই আবার আশ্চর্য হয়ে বললো, “আরেহ্! তুমি জানবে কিভাবে? তোমার তো আবার বউ নেই।”
অল্প হেসে উঠলো অটবী। তার সত্যিই কোনো বউ নেই। কিন্তু একটা গম্ভীর প্রকৃতির ফাজিল বর আছে। যে আর কিছু পারুক আর না পারুক, অটবীকে জ্বালাতে খুব পারে!

—“ত্রিস্তান? উঠবেন না?”
মিহি কণ্ঠের ডাক। ত্রিস্তান নিশ্চুপ, স্থির। নিশ্বাসের গতি আস্তে আস্তে গভীর হচ্ছে। চোখে-মুখে অকৃত্রিম বিষাদ, তবু কোথাও যেন ক্ষণিকের প্রশান্তির ছায়া। একটু কি শুকিয়েছে লোকটা? হ্যাঁ, আগের চেয়ে স্বাস্থ্য কম কম লাগছে। ঠোঁট শুষ্ক, চুল রুক্ষ, চোখের নিচে বিশ্রী কালো কালির ছড়াছড়ি। বড়োবড়ো ঘন পাঁপড়ির আড়ালে থাকা কালো দাগটুকু আলতো আঙুলে স্পর্শ করলো অটবী। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো লোকটার সারা মুখ। কপাল থেকে নাক, নাক থেকে ঠোঁট, ঠোঁট থেকে আবার কপাল! ত্রিস্তান যেন একটু বিরক্তই হলো এতে। এতক্ষণ পর সামান্য নড়েচড়ে উঠলো। ভীষণ বিরক্তি নিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আওড়ালো, “জ্বালিও না, অরণ্য। আমি একটা তুমি তুমি স্বপ্ন দেখছি।”

চোখের সামনে খুলে রাখা জানালা। গাছের পাতার দুলোদুলি ক্ষীণ কমেছে। সময় গড়াচ্ছে। নিস্তব্ধ পরিবেশে ঘড়ির টিকটক শব্দের যে কি তীব্রতা! অটবী একপলক ত্রিস্তানকে দেখলো। লোকটা তার কোমড় জড়িয়ে মুখ লুকিয়ে আছে। সরবার কিংবা নড়বার জোটুকুও নেই। পাশের টেবিলে কিছু কেক আর বিস্কুট পরে আছে। একটু আগে যদিও ত্রিস্তানের হাতে সে ভাত খেয়েছিল। কিন্তু এখন আবার ক্ষুধারা ঝগড়ায় মেতেছে। কিছু না খেলে চলবে না। অল্প ঝুঁকে কেক নিতে গিয়ে অটবীর হঠাৎ খেয়াল হলো, টেবিলের একদম শেষ প্রান্তে তিনটে বই সোজাসোজি করে রাখা। অটবী কেক মুখে পুরলো। খেতে খেতে বইগুলো হাতে নিলো। তিনটের মধ্যে দুটো বাংলা বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শরৎচন্দ্রের। তৃতীয় নম্বরটা কোনো বই না, ডায়েরী। কাঠের কভারে খাঁদ কেটে ইংরেজীতে লিখা ‘Shukhneel Tristan’।
মনে মনে কৌতূহলের দানা জট পাকালো। ডায়েরীর ভেতরের রহস্য জানতে বড় সাধ জাগলো অটবীর। দ্বিধাদ্বন্দে ডায়েরী খুললোও। পৃষ্ঠা উল্টালো। পৃষ্ঠাগুলোও কেমন যেন। কুঁচকানো, ভাঁজ ফেলা। কিছু কিছু লেখা ঝাপসা। যেন পানি লেগে কুঁচকে গেছে, লেখা মুছে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় আবার রক্তের ফোঁটা ফোঁটা দাগ। অটবীর বুঝতে অসুবিধে হলো না, রক্তগুলো ত্রিস্তানের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে লেখাগুলোয় চোখ বুলালো,

‘আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কিছু ভুলে যাচ্ছি। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। নিজের নামটাও আজকাল মনে থাকে না। ভুলে যাই। রাতে ঘুমাতেও খুব অসুবিধে হয়। বিশ্রী বিশ্রী স্বপ্ন আসে। মাকে নিয়ে, বাবাকে নিয়ে, তনয়াকে নিয়ে! বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকেই এমন হচ্ছে। আমার মনে হয়, আমি খুব খারাপ কিছু করেছি। নয়তো তারা মারা যাওয়ার পরই এমন বাজে স্বপ্ন দেখছি কেন?
স্বপ্নের ওই সুখনীল ত্রিস্তান আমি নই। আমি ওরকম খারাপ হতেই পারি না। আমি তো আমার মায়ের রাজপুত্র, বাবার গর্ব, বোনের ভরসা। তাহলে স্বপ্নে ওমন দেখায় কেন? ডাক্তারও আজেবাজে কথা বলছেন। আমি নাকি নাটক করছি! আশ্চর্য! আমি কি অভিনেতা? আমি কেন নাটক করবো? আমার সত্যি কিছু মনে নেই। মাঝে মাঝে যা মনে আসে, সব ঝাপসা, ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখটা দেখতে পাই। মা-টা আমার এত হাহাকার করে কাঁদছিল!

মাথা ব্যথাটাও আজকাল বেড়েছে। কিচ্ছু সহ্য করতে পারিনা। তনয়া আশেপাশে সারাদিন ঘুরঘুর করে, বিরক্ত করে। আমার তখন ইচ্ছে করে ওকে…..’

অটবী থামলো। এরপরের লাইন দুটোয় অনেক কাটাছেঁড়া। চেষ্টা করেও পড়া যাচ্ছে না। হাতের তিনটে আঙুল ফাঁক রেখে গুটিগুটি অক্ষরে ত্রিস্তান আবার লেখেছে,

“আমার নাক দিয়ে সময়ে অসময়ে রক্ত ঝরা শুরু হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, এটা কোনো ব্যাপার না। আমার অতিরিক্ত চিন্তা আর অসুস্থতার কারণেই এমন হচ্ছে। চিকিৎসা করালে ঠিক হয়ে যাবে। ভুলে যাওয়া অতীতগুলো হয়তো ফিরে আসবে একে একে। কিন্তু আমি সেটা চাই না। আমি জানি, আমি খুব খারাপ কিছু করেছি। এই জানাজানিটা এটুকুতেই থাক। আমি এতেই ভালো আছি। সারাজীবন এই রোগ বয়ে বেড়াতেও আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু ভালো থাকতে চাই। একটুখানি শান্তি চাই। আমার কেন যেন মনে হয়, অতীত জেনে গেলে আমার আর ভালো থাকা হয়ে উঠবে না। আমি মরে যাবো। শেষ হয়ে যবো।”

সম্পূর্ণ ডায়েরীটা ফাঁকা। আর কিছু লেখা নেই। স্তব্ধ অটবী ডায়েরী রেখে দিলো। আগে যেমনটা রাখা ছিল? তেমন ভাবেই। সদর দরজায় কারাঘাত শোনা যাচ্ছে। অটবীর মনে পরলো, সে আসবে বলে সরোজ আর তনয়াকে আগেই বাহিরে পাঠিয়ে দিয়েছিল ত্রিস্তান। তারা বোধহয় এসে গেছে। ঘড়িতে একবার সময় দেখে নিলো সে। রোধ হওয়া কণ্ঠে জোড় লাগালো, “ত্রিস্তান? উঠুন। আমাকে এখন চলে যেতে হবে।”

বাসায় আসা মাত্রই রেবা বেগমের মুখোমুখি হলো অটবী। থমকালো। ভেবেছিল, তিনি আরও একবার চিৎকার চেঁচামেচি করবেন, মারবেন! কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তিনি কিছুই বললেন না। চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেলেন। ক্লান্ত অটবী নিজেও বাম পাশের রুমটায় চলে গেল। পৃথা তখন ওঘরেই ছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোনে ভিডিও দেখছিল আর খিলখিল করে হাসছিল। অটবীকে দেখা মাত্রই হাসি থেমে গেল। মুখটা এমন ভাবে বিকৃত করলো যেন অটবীকে নয়, ভীষণ বিরক্তিকর কিছু দেখে ফেলেছে সে। তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে যেতে নিলেই অটবী ডেকে উঠলো, “পৃথা, দাঁড়া।”

পৃথা দাঁড়ালো। প্রচন্ড অনিচ্ছায়। অটবী আবার বললো, “এদিকে ফির। তোর সাথে কথা আছে।”
—“কি বলবা এভাবে বলো। আমি শুনছি।”

পৃথার হাতে দামি অ্যান্ড্রয়েড ফোন। আলমারিতে সামলে রাখা মুশফিকের সেই ফোনটা! যেটা অটবী কয়েকদিন আগেও খুঁজে পাচ্ছিল না। এটা তবে পৃথার কাছে ছিল!

—“তুই আমাকে না বলে ফোনটা নিয়েছিস কেন, পৃথা?”
পৃথার দায়সারা উত্তর, “আমার লাগবে এজন্য নিয়েছি। এখন কি তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি?”
—“অবশ্যই দিতে হবে। জিনিসটা আমার, পৃথা। যেখানে আমি ফোনটা কখনো ধরে দেখেনি সেখানে তুই ধরেছিস কোন সাহসে?”
—“প্রেম করার জন্য নিয়েছি। হয়েছে তোমার?”

অটবীর ইচ্ছে হলো, খুব করে পৃথার গালে একটা চড় লাগিয়ে দিতে। ইচ্ছেটা বহুকষ্টে দমিয়ে নমনীয় হতে চাইলো, “দেখ পৃথা, বোঝার চেষ্টা কর। কাদিন ছেলেটা ভালো না।”
—“সেটা তোমার চিন্তা না করলেও চলবে। নিজের চরকায় গিয়ে তেল দাও।”

পৃথা ধুপধাপ পায়ে চলে গেল। সম্ভবত মায়ের ঘরে। নলী কটমট দৃষ্টে তা দেখলো মাত্র। এ মেয়ে অনেক বাড় বেড়েছে। আগে সরোজের জন্য তাকে কত কিছু বলতো। আর এখন দেখ! নিজে হয়েছে হার বেয়াদব! অসভ্য!
পড়ার টেবিল থেকে উঠে অটবীকে জড়িয়ে ধরলো নলী। কোমল গলায় বললো, “তুমি ওর কথায় কষ্ট পেও না, আপা। ও বখে গেছে। শিক্ষা পেলেই ঠিক হয়ে যাবে। দেখ না, আমি ওর সাথে কথা বলছি না? তুমিও বলো না।”

অটবী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বুকে চাপা তীব্র বেদনার দীর্ঘশ্বাস! ঢিমানো কণ্ঠে বললো, “তোরা কেউই তো আমার কথা শুনিস না, নলী।”
নলী যেন বুঝলো না। অবুঝ গলায় শুধালো, “আমি আবার কোন কথা শুনিনি?”
—“সরোজ থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম। শুনেছিস?”

হাতের বাঁধন ঢিলে হলো। এক কদম সরে দাঁড়ালো নলী। অবাক হলো, “তুমি জানতে?”

অটবী জবাব দিলো না। চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। আশপাশে এত রহস্য! উদাসীনতা! মন খারাপ! কোথাও অল্প সুখের রেশ নেই।

_____________

চলবে~
ঈশানুর তাসমিয়া মীরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here