ভালোবাসি_প্রিয় পর্ব_২৩

0
2044

ভালোবাসি_প্রিয়
পর্ব_২৩
#সুলতানা_সিমা

শাড়ী পরিহিতা সে অরিনের দিকে নাইফটি ছুঁড়ে মারল। অরিন তৎক্ষনাৎ সরে গেল নাইফ গিয়ে দেয়ালে লাগল। নাইফ টা এত ধারালো যে দেয়ালে গেথে গেছে। অরিন ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। জানালা দিয়ে আসা চাঁদের মৃদু আলোতে দেখল সেই মাক্স পরা নারীকে। যে তাকে এই পর্যন্ত্য নিয়ে এসেছে। অরিন বুঝতে পারছে না কী করেছে সে কেন হঠাৎ তাকে এভাবে মারতে এসেছে। অরিন ভয়ে পা পিছাতে পিছাতে কাঁপা গলায় বলল”

_ক্ক ক্ক কি ক হ হ হয়েছে।” দেয়াল থেকে নাইফ তুলে অরিনের বুক বরাবর মারতে আসলো। অরিন সরে গেল খুপটা গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর পড়ল। একটুর জন্য অরিনের লেগেই যেত। আবার সে অরিনের দিকে তেড়ে গেল। অরিন দৌড়ে দরজার সামনে যায় ছিটকিনি খুলে ফেলে দরজা খুলার আগেই অরিনের চুলের মুঠি ধরে অরিনকে ঘুরিয়ে অরিনের পেট বরাবর মারে অরিন দু হাত দিয়ে ওর হাত ধরে আটকে ফেলে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অরিন তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যাবে তখনই অরিনের দিকে নাইফ ছুঁড়ে মারল। নাইফ অরিনের হাতে লেগে গিয়ে ছিটকে পড়ে ফ্লোরে। অরিন আহহহহহ বলে আর্তনাদ করে ওঠে। ও এসে অরিনের গলা টিপে ধরে অরিন গলা ছাড়াতে ছটফট করতে লাগে। অরিনের চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরল। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে এমন সময় দরজা খুলে এসে লারা ঢুকে। লারাকে দেখে মাক্স পড়া মানুষটি অরিনকে ছেড়ে দৌড়ে পালাতে চায় লারা খপ করে হাত ধরে ফেলে। অরিন সাহস পেয়ে মাক্স খুলতে যায়। কিন্তু ওই মাক্স পড়া সে তাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। ধাক্কা খেয়ে অরিন গিয়ে খাটের সাথে বাড়ি খায়। লারা ছিটকে পড়ে ফ্লোরে। লারা ওঠে দৌড় দেয় ওর পিছু দরজার ছিটকিনির সাথে শাড়ির আঁচল লেগে যায়। লারা দুইতিন টান দেয় কিন্তু খুলেনা পড়ে প্যাচ ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে মাক্স পরিহিতা উধাও হয়ে যায়। লারা পরিবারের সবাইকে খুঁজতে লাগে। সবাই যে যার রুমে আছে সবার রুমের দরজা বন্ধ লারা অরিনের রুমে দৌড়ে আসে। অরিন এখনো ফ্লোরে পড়ে আছে চোখ মুখ খিঁচে নিজেকে শক্ত করতে চেষ্টা করছে। লারা অরিনকে তুলে এনে খাটে বসাল। তারপর নিজের রুমে এসে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে অরিনের রুমে গেল তারপর তার মাথায় হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল। অরিন চুপচাপ বসে আছে লারাকে সে এতটা ভালো বলে মনে করেনি আসলে লারা অনেক ভালো একটি মেয়ে নাহলে কী এভাবে তাকে হেল্প করত?

দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। নিরবতা ভেঙে লারা বলে ওঠল”
_তাহলে তুমিও তার শিকার?” অরিন অবাক হয়ে তাকালো। লারা কিঞ্চিৎ হেসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল”
_যখন প্রথম তোমাদের বিয়ের কথা শুনলাম তখনই বুঝে গেছিলাম। যে শিকারী আমাকে শিকার করেছে সে তোমাকেও শিকার করেছে। নয়তো তোমার মতো একটা সহজ সরল বোকা মেয়ে কেন কাউকে এভাবে বিয়ে করবে? সবাই ভাবছে তুমি তাদের সম্পত্তি দেখে লোভ সামলাতে পারনি তাই এভাবে বিয়ে করেছ। কেন জানি আমি এটা ভাবতে পারিনি আমার বার বার মনে হয়েছিল তুমিও এই মাক্স পরিহিতার শিকার।

_আপনিও?
_হুম। আমার বাবা আমার জীবন আমার সব কিছু ওই ব্ল্যাকমেইলারের হাতে। তাইতো অর্ধনগ্ন অবস্থায় একটা পর পুরুষের সামনে শুয়ে থাকতেও দ্বিধা হয়নি আমার। [এইটুকু বলে গলা ধরে আসে লারার] খুব হাসি খুশিতে জীবন চলছিল আমার। হঠাৎ করে একদিন আমার নাম্বারে একটা কল আসে আমাকে বলে আমি যদি তার কথা মতো কাজ করি আমাকে অনেক টাকা দিবে আমি না বলে দেই। কিন্তু ও থামেনি এভাবে কল আসতেই থাকে। একদিন বলে আমার বাবা নাকি তার কাছে আছে আমি বললাম বাবা তার ঘরেই আছে সে বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বলে আগে তো দেখে নে কোথায় তর বাবা? আমি দেখি গিয়ে সত্যি আমার বাবা নেই। আমি চিৎকার দিয়ে কাঁদি আমার বাবাকে ডেকে কিন্তু আমার বাবা আসেনা। আমি মামলা করতে চাই ও বলে মামলা করলে নাকি আমার বাবাকে মেরে দিবে। আমাকে এতিম করে দিবে।” বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে লারা। অরিনের খুব কষ্ট হচ্ছে। সে জানে এই কষ্ট টা কেমন একই কষ্ট তো তাকেও খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। লারা চোখের পানি মুছে বলল”

_তুমি কেন এসব সয্য করছো?” অরিন তাচ্ছিল্য হেসে বলল”
_হয়তো খুব বোকা তাই।” লারা অরিনের হাতের উপর হাত রেখে বলল”
_আমি তোমার মতোই অসহায়। আমরা দুজন একি পথের সাথী। একজনের শিকার আমরা। লড়তে হলে আমাদের দুজনকে এক হয়ে লড়তে হবে। তাই বন্ধু ভেবে আমায় সব কিছু বল প্লিজ।
_বললাম না বোকা আমি।
_উঁহু তুমি বোকা নও। তুমি অনেক বুদ্ধিমতী। [একটু থেমে] আচ্ছা তোমাকে সে মারতে চায় কেন?
_প্রথমে শুধু বলছিল বিয়ে করতে। এতকিছু করতে হবে আমি জানতাম না নয়তো নিজেকেই বলি দিয়ে দিতাম। তারপর বলল আমি যেন বউয়ের দাবী নিয়ে আসি। না বলেছিলাম বলে আমাকে অনেক টর্চার করে আমি সয্য করে নেই। কিন্তু সে আমায় হুমকি দেয় আমি না আসলে সে নাকি দিহানকে মেরে দিবে। দিহান মানুষটাকে মনের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছি। উনাকে নিজের স্বামী বলে মানি। হোক না সে ক্ষনিকের জন্য তবুও তো স্বামী সে তাই চাইনি উনার ক্ষতি হোক। কাজ ছিল শুধু এই বাড়িতে এসে আমি এই বাড়ির লোকদের অপমান করাব তারপর চলে যাব। কিন্তু আমি চলে যাইনি। তাই আমাকে মারতে চায় কেন চায় তা জানিনা।
_তুমি কখনো দেখেছো তাকে?
_উঁহু সব সময় মাক্স পড়ে বা বোরকা পড়ে এসেছে আমার সামনে। কখনো মুখে কিছু বলেনি যা বলেছে সব কাগজে লেখে বা মেসেজ দিয়ে।
_আমার মনে হয় এইসব কিছু যে করছে এবং করাচ্ছে সে এবাড়ির ও কেউ।
_হুম আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু কে সে? আর কেনই বা এমন করাচ্ছে? আমার কাউকেই সন্দেহ হয়না।
_আমার তো অনেকজন কে সন্দেহ হচ্ছে। আপাতত আমি কালপ্রিটকে নয়। জানতে চাই মিহান কার সন্তান ছিল।
_মিহান?
_হুম মিহান। এই বাড়ির ছেলে ছিল সে। তার সাথে আমার দু বছরের সম্পর্ক ছিল। সে নাকি তার মায়ের হাতে খুন হয়েছিল।
_একটা মা কেন তার সন্তান কে মারবে?
_জানিনা আমি জানতে চাইও না। এই বাড়িতে এসেছিলাম আমি এ বাড়ির সম্মান নষ্ট করতে কিন্তু যাব আমি একটা খুন করে। আর সেই খুনটা হবে মিহানের মায়ের।” লারার কথায় অরিন আঁতকে উঠল। লারাকে এখন ভয়ানক লাগছে দেখতে। চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে। অরিন বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে এসব মাঝে মাঝে অরিনের মনে হয় সে পাগল হয়ে যাবে। এদিকে সে আছে কে এসব করছে সেই চিন্তায় আর লারা কিনা কাউকে খুন করার চিন্তা করছে? চোখটা মুছে লারা তার ঘরে চলে গেল। অরিনের কানে শুধু বাজতেছে “এই বাড়িতে এসেছিলাম আমি এ বাড়ির সম্মান নষ্ট করতে কিন্তু যাব আমি একটা খুন করে। আর সেই খুনটা হবে মিহানের মায়ের।” অরিনের ভয় হচ্ছে কী হবে আগামীতে সেটা ভেবে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

___________________

দিহান রাত ১০টায় বাসায় আসল। সন্ধ্যার দিকে তন্দ্রার মা ফোন দিয়ে বলেন তন্দ্রা নাকি সুইসাইড করতে যাচ্ছিল। শুনে দিহানের হসপিটাল যায়। সেখানে যাওয়ার পরে তন্দ্রার মা দিহানের হাত ধরে বিলাপ করে কান্না করে বলেন। সে যেন তন্দ্রাকে বাঁচায়। তন্দ্রা নাকি দিহানকে ছাড়া মরে যাবে। তন্দ্রার প্রতি দিহানের কোনো কালেই কোনো টান ছিল না। যেটুকু ছিল সেটা শেষ হয়ে গেছে অরিনের সাথে মা মেয়ের এমন ব্যবহার দেখে। দিহান উনাকে কিছু বলেনি শুধু শান্তনা দিয়ে বলেছে কাঁদবেন না সব ঠিক হয়ে যাবে। উনি বার বার দিহানকে মিনতি করে বলেছেন উনার মেয়েকে যেন দিহান ছেড়ে না দেয়। দিহান কী করবে বুঝতে পারছেনা অরিন মেয়েটা যে অনেক অসহায় এটা তার জানা হয়ে গেছে। আর তাছাড়া অরিনের প্রতি তার আলাদা একটা টান আছে অরিনকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেনা সে। অরিনের জন্য তাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হয়েছে জেনেও সে অরিনকে অপরাধী ভাবতে পারেনা। নীল হয়তো ঠিকই বলেছে সে অরিনকে ভালোবাসে।

দিহান ফ্রেশ হয়ে আগে অরিনের রুমের দিকে যায়। দরজা নক করে অরিন এসে দরজা খুলে দেয়। অরিনের মাথা হাতে ব্যান্ডেজ দেখে দিহান হন্তদন্ত হয়ে বলল”

_অরিন কী হয়েছে তোমার? তোমার মাথায় হাতে ব্যান্ডেজ কেন? তুমি ঠিক আছো তো?” দিহানের এসব দেখে অরিন কিঞ্চিৎ হেসে উঠে তারপর বলে”
_আমি ঠিক আছি।” দিহান কিঞ্চিৎ ধমকের স্বরে বলে”
_কতটা ঠিক আছো সেটা তো দেখতে পাচ্ছি। বল কীভাবে হল এগুলা?
_আসলে পড়ে গিয়েছিলাম।” দিহান অরিনের দিকে তাকালো। অরিন যে মিথ্যে বলছে সেটা দিহানের বিশ্বাস। দিহান অরিনের দুগাল তার দুহাতের মুঠোয় ভরে নিল। অরিনের মুখটা তুলে একদম তার কাছাকাছি গিয়ে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল”

_কী লুকাচ্ছ অরিন? কেন লুকাচ্ছ? তুমি ভালো নেই অরিন আমি জানি। বল কী হয়েছে? কেন চুপ করে থাকো বল?
_যদি বলি আপনাকে ভালোবাসি তাই?” দিহান অরিনকে ছেড়ে ছিটকে সরে গেল। অরিনের মুখে এই কথাটা শুনলে তার অন্য রকম ফিল হয়। কেমন যেন বুকে ধুকধুক শব্দ করে। দিহান গলাটা একটু ঝেড়ে বলল”

_উহুম,,,দেখ অরিন কথা ঘুরাবা না আমি যা বলছি তার উত্তর দাও।
_কিছু হয়নি বললাম তো পড়ে গেছিলাম।” দিহান কপাল কুঁচকে কী যেন ভাবল তারপর বলল”
_খাইছো?
_হুম। লারা আপু ভাত দিয়ে গেছিল।
_ওকে।” দিহান চলে গেল। ইচ্ছে করেই অরিনকে একা ছেড়ে দিচ্ছে। যদিও ভয় লাগছে অরিনের ক্ষতি হয়ে যায় কিনা এটা ভেবে তবুও একা ছাড়তে হচ্ছে। খেয়েদেয়ে রুমে চলে গেল দিহান। আজ ঘুমাবে না আজ জেগে থাকবে অরিনের রুমে কে যায় সেটাই সে দেখবে। রাত তিনটা পর্যন্ত দিহান জেগে থাকে। অরিনের রুম থেকে একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে সে। রাত ৩:৩০ তখন একটা ছায়া এগিয়ে আসতে দেখল। দিহান চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকল। আজ সে ধরবেই কে এই কালপ্রিট সেটা সে জানতে চায়। দিহান আগ্রহী চোখে তাকিয়ে তাকলো। কিন্তু যখন সে ছায়ার মানুষটি দেখল তখন সে ৪৪০ ভোল্টের শকড খেল। এ কাকে দেখছে সে? এ তো,,,,

চলবে,,,।

মন ভালো নেই কী লেখছি নিজেই জানিনা। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন প্লিজ।

গঠনমূলক মন্তব্য আসা করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here