Friday, April 3, 2026
Home নতুন সব গল্প (২০২৩)" কোন কাননে ফুটিবে ফুল কোন কাননে ফুটিবে ফুল পর্ব ২২

কোন কাননে ফুটিবে ফুল পর্ব ২২

0
511

#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_22
#Writer_NOVA

‘কইতরির মা। ঐ কইতরির মা রেএ!’

শুভর গলা ফাটানো চিৎকারে কিঞ্চিত বিরক্ত হলো ফুল। ললাট কুচকে গেছে। চোখ মুখে বিরক্তির আভাস। অকারণে শুভর ডাকাডাকি মাঝে মধ্যে ফুলের মেজাজ খারাপ করে দেয়৷ শুভ জানে এভাবে ডাকলে দাদী, মায়ের তোপের মুখে পরবে ফুল। এখন আবার যুক্ত হয়েছে অভি। তবুও সবকিছুতে গা ঝাড়া ভাব। যেনো কিছুই হবে না।

‘কইতরির মা, এদিকে আহিস।’

শুভর চেঁচানো গলা আবারো শোনা গেলো। সোহেলী বেগম রসুইঘর থেকে বেরিয়ে ফুলের দিকে রক্তিম চাহনি নিক্ষেপ করলেন। ফুল সেদিকে এক পলক তাকিয়ে ছাই দিয়ে পাতিলে নিচের কালি পরিষ্কার করতে লাগলো। ফুল পাত্তা না দেওয়ায় সোহেলী বেগম বিরবির করতে করতে রসুইঘরের ভেতরে চলে গেলো৷ ঝুমুর ওড়না কোমড়ে বাঁধতে বাঁধতে ফুলের সামনে এসে দাঁড়ালো।

‘পাতিল কি এই কয়ডাই ফুল?’

‘হ্যাঁ, এই বেলার জন্য এই কয়টাই।’

‘তাইলে আমারে দেও। আমি করি। তুমি গিয়া দেইখা আহো ছোট ভাইজান কেন ডাকে।’

‘হুদাই!’

‘হুদাহুদি ডাকবো না। তোমারে লাগবো দেইখাই ডাকতাছে।’

ফুল পিড়ি থেকে উঠে বালতির পানিতে হাতের কালি ধুতে ধুতে বললো,

‘এর যন্ত্রণায় বাচি না।’

ঝুমুর ফিক করে হেসে উঠলো। ফুল মুখ ঝামটা মেরে বললো,

‘হেসো না। আমার কপালটাই ফুটা।’

‘হইছে বাড়তি কথা বাদ দিয়া ভাইজানের কাছে যাও। গিয়া জিগাও কি লাগবো। নইলে আবার চিল্লান দিয়া উঠবো। জানোই তো কেমন করে।’

ফুল ধুপধাপ পায়ে উঠোন পেরিয়ে কামরার দিকে রওনা করলো। সিঁড়িতে অভির মুখোমুখি পরলো। অভি কিছু বলার আগে নিজের ওড়নাটাকে ওর সামনে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বেশ ভাব নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। অভি ঘটনার আকস্মিকতায় আহাম্মক বনে গেলো। মিনমিনিয়ে বললো,

‘কি হলো? এমনটা করলো কেনো?’

শুভকে দেখা গেলো বিছানায় উপুড় হয়ে পরে আছে। খালি গায়ে কোমড় অব্দি কাঁথা টেনে দেওয়া। উন্মুক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো ফুল। মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘কি জন্য ডেকেছিলে?’

‘হপায় (এখন) তোর আহনের সময় হইছে। কহন থিকা ডাকতাছি।’

‘আমার তো কাজকর্ম নেই। সব ফেলে তোমার সামনে সং সেজে বসে থাকবো।’

‘ফুলের কন্ঠ ঝাঁঝালো শুনালো। শুভ বালিশ থেকে মাথা উঠিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ফুলকে দেখলো। ফুলের মনমেজাজ ভালো না বুঝে গেছে। থেমে থেমে নাকের পাটা ফুলাচ্ছে মেয়েটা। যা দেখে শুভ নিঃশব্দে হাসলো। অতঃপর বালিশে মুখ গুঁজে জড়ানো গলায় বললো,

‘মেরুদণ্ডডা অনেক ব্যাথা করতাছে। একটু বানায় দিবি।’

‘পারবো না।’

চট করে চোখ তুলে তাকালো শুভ। মুখটা পাংশুটে বর্ণ করে জিজ্ঞেস করলো,

‘কেন?’

‘আগে শার্ট পরো।’

শুভর মুখে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেলো। ফুলকে জ্বালানোর মোক্ষম সুযোগ সে পেয়েছে। এটাকে হাত ছাড়া করবে না।

‘এমনেই দে না। এহন আর শার্ট পরতে পারমু না। তোর এমনি দিতে হইবো।’

ফুল দাত কিড়মিড় করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। সে ঢেঢ় বুঝতে পারছে শুভ ইচ্ছে করে এমনটা করছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো এখান থেকে দৌড়ে পালাবে। তবুও শুভর খালি গায়ে হাত দিবে না। এই ছেলের মাথা মাঝে মাঝে সত্যি খারাপ হয়ে যায়। নয়তো এমন অসভ্য আবদার কেউ করতে পারে? ফুল ধীর পায়ে দরজার সামনে গেলো। এরপর এক ছুটে নিচে। ফুলের পায়ের ধুপধাপ শব্দ শুনতে পেয়ে শুভর চিৎকার আবারো শোনা গেলো।

‘কইতরির মা! তোরে শুধু কাছে পাইয়া নেই। সুদে আসলে সব ফেরত নিমু। আমার কথার অবাধ্য হইয়া ভালো করলি না।’

কন্ঠে রাগ মিশ্রিত থাকলেও শুভ মিটমিট করে হাসছিলো। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ফুলকে অকারণে জ্বালাতে তার বেশ ভালো লাগে। ভালোবাসার মানুষকে কারণ ছাড়া জ্বালানোর মাঝেও অন্য রকম প্রশান্তি আছে।

গোধুলির লগ্নে লালচে আলোর ছাপ। আকাশে পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। নীড়ে ফেরার সময় যে হয়ে এসেছে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত কৃষকরা নিজেদের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তাই অবলোকন করছে ফুল। প্রকৃতি দেখতে এতোই বিভোর যে সন্ধ্যা বাতি জ্বালানোর কোন হুশ নেই। ধ্যান ফিরলো সুফিয়া বিবির চেচামেচিতে।

‘বাড়িতে কি কেউ আছে? সন্ধ্যা পইরা গেলো। এহন বাতি জ্বালানের নাম নাই। আর কারেন্টডাও বহুত জ্বালায়। সন্ধ্যা হইলেই দৌড়ায় যায় গা। ও বড় বউ, ঐ ঝুমুর কই গেলি তোরা? মুখপুড়িডারেও দেহি না। সব কি মরছোতনি রে?’

টেবিলের ওপর ঠাস করে হারিকেনটা রাখলো ঝুমুর। মুখে বিরক্তি। দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সলতের আগুন ধরিয়ে দিলো। ফুল তখন জানালার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে।

‘অভি ভাইয়ের ঘরের বাতিডা একটু ধরায় দিবা? আমার আবার নাগ বারান্দায় হারিকেন দিতে হইবো। নইলে বুড়ি চিল্লায় উডবো। এমনি হারাদিন চিল্লাইয়া মাথা ধরায় হালায়। আমার আর ভাল্লাগে না। মনে চায় এক মিহি (দিকে) হাইটা যাইগা। যত্তসব অশান্তি!’

ফুল নিষ্পলক দৃষ্টিতে একবার ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে জানালার কপাট বন্ধ করলো। কিছুটা অসন্তোষের গলায় বললো,

‘তুমি জানো না, আমি অভি ভাইয়ের কামরায় যাই না।’

ঝুমুর ফের অনুনয়ের সুরে বললো,
‘একবার যাও। অভি ভাই ঘরে নাই। বিকালবেলা কই জানি গেছে। আইতে বহুত দেরী। তার সামনে তুমি পরবা না। আমার কতগুলি কাম বাকি আছে। এহনো হাঁস-মুরগির খোয়ার আটকাইন্না বাকি। পুকুর থিকা কলস ভইরা পানি আনতে হইবো।’

ফুল এবার আর মানা করতে পারলো না। ঝুমুরের থেকে দিয়াশলাই নিয়ে ওর আগেই হারিকেন নিয়ে অভির রুমের দিকে পা বাড়ালো ফুল।

আজান হয়েছে বেশ কিছু সময় ধরে। সোহেলী বেগম নামাজ সেরে জায়নামাজে বসে তবজি জপছেন। ফুল তার কামরার সামনে দিয়ে যেতে নিলে হাঁক ছাড়লেন।

‘কেডায় যায়?’

ফুল দাঁড়িয়ে গেলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করে উত্তর দিলো,

‘আমি চাচী।’

‘আমি কেডা? নাম নাই?’

‘ফুল।’

‘ওহ, হোন।’

‘জ্বি বলেন।’

‘একটা লাঠি গুলুপ (কয়েল) জ্বালায় দিস তো। কি কাম করছোত আল্লাহ জানে। সন্ধ্যার আগে দরজা-জানালা আটকাস নাই। সারা ঘর মশা দিয়া ভইরা গেছে। কতবার কইছি আগে দরজা জানলা আটকাবি। এরপর বাকি কাম। আমার কথা গ্রেহ্যই করে না। তাগো মন মতো কাম করে।’

‘একটু পরই দিয়ে যাচ্ছি।’

ফুল দাঁড়ালো না। তার মিশন এখন অভির আসার আগে সেই কামরায় হারিকেন জ্বালানো। কামরায় ঢুকে কোনদিকে না তাকিয়ে বেতের মোড়াটার ওপর হারিকেন রাখলো। জানলা আটকে খাটের নিচ থেকে কুপিটা বের করলো। হারিকেন খুঁজেও পেলো না। দিয়াশলাই জ্বালিয়ে কুপিতে আগুন দিলো। কুপি নিয়ে নিচ থেকে উঠে দাঁড়াতেই চমকে গেলো। আচানক কাউকে খাটের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুক কেঁপে উঠেছে। অভি উচ্চস্বরে হেসে বললো,

‘ভয় পেয়েছো?’

‘মূর্তির মতো হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে থাকলে কে না ভয় পায়। কখন আসলেন আপনি?’

‘আমি তো রুমেই ছিলাম।’

ফুল দ্বিগুণ চমকে অভির দিকে তাকালো। কুপিটা উচিয়ে অভির মুখের সামনে ধরলো।

‘আরে আরে কি করছো?’

‘দেখলাম আপনি মানুষ নাকি ভূত।’

‘আজব কথাবার্তা। তা কি দেখতে পেলে?’

‘আপনি মানুষ। ভুত হলে আমার হাতে আগুন দেখে ভয় পেতেন।’

অভি হো হো করে হেসে উঠলো। ফুল কপাল কুঁচকে ঠোঁট উল্টে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। অভির হাসির দমকা কমতেই সে বললো,

‘ভারী মজা করতে পারো তো তুমি।’

ফুল উত্তর দিলো না। ভেংচি কেটে অভির হাতে কুপি ধরিয়ে দিয়ে বললো,

‘এরপর থেকে হুটহাট করে কামরায় ঢুকবেন না। আমি সাহসী মেয়ে দেখে এখনও ঠিক আছি। ঝুমুর আপা হলে ফিট খেতো।’

অভি কিছু বলার আগে সোহেলী বেগমের উচ্চস্বর শোনা গেলো।

‘কহন কইলাম গুলুপ ধরায় দিতে। এহন দিয়া গেলো না। একটা কাম যদি ঠিকমতো করে।’

‘আসতেছি চাচী।’

ফুল হারিকেন নিয়ে দৌড় দিলো নিচের দিকে। অভি কুপি হাতে নিয়ে ফুলের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। আজ ফুল খোশমেজাজে ছিলো৷ নয়তো অভিকে কতকি শুনিয়ে দিতো।

সিগারেটের ধোঁয়া উপরের দিকে উড়িয়ে আশেপাশে নজর বুলালো শুভ। বট গাছের নিচে পা ছড়িয়ে বসে আছে। শুভর মতিগতি কেউ বুঝতে পারছে না। হাসান, হাফিজ, পলক এক দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকিয়ে চিন্তায় পরে গেছে। নীরবতা ভাঙলো শুভ নিজেই।

‘খেলার কি অবস্থা পলক।’

‘তুই ক্লাবে না গেলে যেই অবস্থা হয় হেই অবস্থাই।’

‘কেন সবসময় আমার যাইতে হইবো কেন?’

শুভর কথার পিঠে জবাব দিলো হাফিজ।
‘প্রেমিকা নিয়া না পইরা থাইকা খেলার দিকেও একটু নজর দে। নইলে এবার কাপ পাওনের আশা ছাইড়া দে।’

শুভ তীক্ষ্ণ নজরে তাকালো হাফিজের দিকে। হাফিজ ইতস্তত হয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। হাসান খোঁচা মেরে বললো,

‘এমন ভাব করতাছোত জীবনে মাইয়া দেহস নাই। কি পাইছোত ঐ মাইয়ার মধ্যে? দুই ভাই একটার পিছনে পইরা রইছোত। হুনছিলাম ঐ মাইয়ার বাপ-মায় তোগো বংশের নাক কাটছে৷ এর লিগা এতো পিরিতি কেন? বুঝায় যায় নষ্ট মাইয়া। মার মতো তগো দুই ভাইয়ের কাউরে নিয়া ভাগবো।এসব মাইয়ারে চেনা আছে আমার।’

শুভর চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠলো। চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। হাসানের খোচা মারা কথায় মাথায় রাগ চেপে ধরেছে। জলন্ত সিগারেটটা দুমড়েমুচড়ে দূরে ছুঁড়ে মারলো। মুখের বলিরেখা ফুটে উঠেছে। রাগে তার সারা শরীর থরথর করে কাপছে। সেটা দেখে পলক ভয় পেয়ে গেলো। আজ হাসানের খবর আছে। কেউ তাকে শুভর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। হলোও তাই। শুভ, হাসামের শার্টের কলার ধরে নাক বরাবর সর্বশক্তি দিয়ে দুটো ঘুষি মারলো। চেচিয়ে বললো,

‘বাঙ্গির পোলা! চোপার দাঁত ছুটায় ফালামু। চিনোস আমারে? আমার ফুলরে নিয়া এসব কথা কওনের সাহস তোরে কে দিছে? তোর ভাবী হয় ও। কথাবার্তায় লাগাম দে। নয়তো জ্যন্ত কবর দিমু।’

পলক, হাফিজ দুজনে হাসানকে ছাড়াবে কি! নিজেরাই তো শুভর ভিন্ন রূপ দেখে ভয়ে কাঁপছে।

[লিখতেও ইচ্ছে করে না। আবার শেষ করতেও মন চায় না। কি একটা অবস্থা 🤦‍♀️! যাইহোক, বড় বড় করে দুই লাইন গল্পের আলোকে মন্তব্য করেন। নয়তো ফুল, শুভর বিয়ে দিবো না। সেড এন্ডিং দিয়ে দিবো🥱।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here