বৌপ্রিয়া পর্ব ৩১+ ৩২

0
726

#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব – ৩১

ঝমকালো বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে কুসুমদের বাড়িতে। চারপাশে এত শোরগোল, কোলাহলে কান ঝিম ধরার উপক্রম। এত আয়োজনের ভিড়ে ইয়াহিয়ার নিজের বিশ্বাস হচ্ছে না, সে ঊষাকে পেয়ে যাচ্ছে! অবিশ্বাস্য চোখে যখন বাড়িতে বিয়ের তুলকালাম কান্ড সরজমিনে দেখে ঠোঁটে মৃদু হাসি ছড়িয়ে যায়। নিজেকে নিজেই প্রবোধ দেয়,’ধুর ব্যাটা, সত্যি সত্যি বিয়ে হচ্ছে তোর।’
ভাইয়ের বিয়েতে স্বাভাবিকভাবে কুসুম মহা ব্যস্ত সময় পাড় করছে। এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরে ফিরতেই দিন শেষ তার। সময় তার লাগাম ছুটে পালিয়েছে। একমাত্র ভাইয়ের বিয়েতে উচ্ছ্বাসকে সময়টুকু দেওয়া হচ্ছে না তার। তবে উচ্ছ্বাসের এ নিয়ে আফসোস নেই। সে জানে, বুঝে! সময়টাই এখন এমন।

আগামীকাল হলুদের সমস্ত আয়োজন করে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে কুসুম। রুমে এসে দেখে উচ্ছ্বাস ল্যাপটপে কাজ করছে। কুসুমকে দেখে উচ্ছ্বাস কুসুমের দিকে চায়। মৃদু হেসে বলে,

‘কেমন কাটল দিন, মিস বৌপ্রিয়া?’

কুসুম ক্লান্ত নজরে চাইল। ক্লান্তিতে কুসুমের দু চোখ ভেঙে আসছে। উচ্ছ্বাসের আশকারা পেয়ে কুসুম হেঁটে এসে উচ্ছ্বাসের পাশে সোফায় বসে তার কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে। কুসুমের শান্তি দরকার এই মুহূর্তে। আর তা দিতে পারবে শুধুমাত্র উচ্ছ্বাস। কুসুম এসে কোলে শুলে, উচ্ছ্বাস বুঝতে পেরে ল্যাপটপ সরিয়ে ফেলল। আলতো হাতে কুসুমের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

‘ভেজা চুল আবারও বেঁধে রেখেছিলে? বিকেলে গোসল করেছ, এখনো চুল ভেজা। চুলের যত্ন নাও, কুসুম। তোমার এই চুল আমার ভীষন প্রিয়।’

কুসুম উচ্ছ্বাসের কোলে মাথা রেখে চোখ খুলে ঠিক উচ্ছ্বাসের চোখে চোখ রাখল। মিষ্টি হেসে বলল,

‘ক্লান্ত ছিলাম সারাটাক্ষণ। আপনাকে দেখে সকল ক্লান্তি মুছে গেছে।’

উচ্ছ্বাস মৃদু হাসল। কুসুম দু চোখ জুড়িয়ে শুধু চেয়েই রইল উচ্ছ্বাসের পানে। উচ্ছ্বাস হাত বাড়িয়ে কুসুমের খোঁপা খুলে দিয়ে চুল মেলে দিল। কুসুমের চুলে উচ্ছ্বাসের হাঁটু ঢেকে পা অব্দি ছড়িয়ে গেল চুল। কুসুমের এত লম্বা চুল যে উচ্ছ্বাস মাঝেমধ্যে কিছু ব্যাপারে এই চুল নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পরে। এই যেমন, সারা রাত ভালোবাসায় কাটানোর পর সকালে গোসলের পর কুসুম প্রায় কেদেই ফেলে চুলের ঝামেলায়। লম্বা চুল শুকাতে চায় না, হেয়ার ড্রায়ার উচ্ছ্বাস ব্যবহার করতে দেয়না। তারপর বিকেল অব্দি এই ভেজা চুল নিয়ে ঘরময় হেঁটে বেড়াও। কেমন বিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি হয় ভেবেই কুসুমের গলা শুকিয়ে যায়। উচ্ছ্বাস কুসুমের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘কালকে আবার যাবে?’
‘হ্যাঁ, ভোরের দিকে যাব।’
ক্লান্তিতে অবসন্ন কুসুম উত্তর দেয়। উচ্ছ্বাস বলল,
‘রাতের দিকে ফ্রি থাকবে? হলুদের অনুষ্ঠান তো বিকেলের দিকে।’
‘তা থাকব। কিন্তু কেন বলেন তো?’
‘ডেইটে যাব, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। যাবে?’

কুসুম উচ্ছ্বাসের কথা শুনে চমকে তার দিকে তাকাল। পরপরই হেসে বলল, ‘এত শখ?’

উচ্ছ্বাস মুখ এগিয়ে এনে কুসুমের কপালে গাঢ় চুমু বসাল। ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বুড়ো হলেও তোমাকে নিয়ে আমার শখ মিটবে না, বৌপ্রিয়া!’

কুসুম খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। এমন হৃদয় চুরমার করা হাসিতে উচ্ছ্বাসের হৃদয় ছিন্নভিন্ন হল। ঘোরলাগা দৃষ্টি ছেয়ে গেল উচ্ছ্বাসের চোখে। কুসুমের চোখ পরল উচ্ছ্বাসের চোখে। চোখে চোখ আটকে গেল। কুসুম উচ্ছ্বাসের চোখের দৃষ্টি বুঝল। কুসুমের নিজের মধ্যেও অনুভূতি কাজ করছে। কুসুম ভাঙা স্বরে বলল,

‘গো-স-ল করে আসি? ঘা-মে ভি-জে আছি।’

উচ্ছ্বাস মিষ্টি হাসল। কুসুমকে পাঁজাকোলা তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগুতে এগুতে বলল, ‘সকালের একসঙ্গে ফ্রেশ হওয়াটা তুমিও ভালোবাসো কুসুম, শুধু স্বীকার করতে কৃপণতা করো।’
কুসুম লুকিয়ে হাসল। লজ্জায় জমে নিজেকে গুটিয়ে নেয় উচ্ছ্বাসের প্রশস্ত বুকে।
—-

হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ইয়াহিয়াকে জোরপূর্বক লুঙ্গি-সেন্ডো গেঞ্জি পরিয়ে রাখা হয়েছে। ইয়াহিয়া নিজের রুমে বসে ঊষার সঙ্গে কথা বলছে। ঊষার কণ্ঠে খুশি উপচে পরছে যেমন। মেয়ে খুশি আটকে রাখতে পারছে না। দম বন্ধ করে বিয়ের পরে নিজে পরিকল্পনা একে একে বলছে ইয়াহিয়াকে। ইয়াহিয়া খুব ধৈর্য্য নিয়ে শুনছে এসব। মাঝেমধ্যে হেসে তাল মেলাচ্ছে। ঊষাকে ডেকে নেওয়া হল বাইরে। ঊষা কল রাখলে ইয়াহিয়া বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে। হলুদ ছোঁয়ানো হয় তাকে। কুসুম ইয়াহিয়ার হলুদ মাখা মুখের ছবি তুলে ঝটপট ঊষাকে পাঠিয়ে দেয়। ঊষা উত্তর দেয় ছবির,

‘বিশ্রী লাগছে তোর ভাইকে।’

কুসুম হেসে উঠে। ফিরতি উত্তর দেয়, ‘কি আর করার,এই বিশ্রী ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে আপা।’

ঊষা বারবার ইয়াহিয়া হলুদে মাখা ছবি দেখে যাচ্ছে। চোখের পাতা কাপছে তার। মানুষটা এত সুন্দর কেন? ঊষার বুকের ভেতরটা তাকে দেখে বারবার ছটফট করছে। ঊষা আলগোছে চুমু খায় ইয়াহিয়ার ছবিতে। ফিসফিস করে আওড়ায়,

‘আমাদের প্রথম ঠোঁট চুমুর খুব করে অপেক্ষায় আমি, ইয়াহিয়া। কবে কাছাকছি আসব আমরা? কবে এত অপেক্ষার অবসান ঘটবে? আমার সময় যাচ্ছে না যে আর।’

হলুদের অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বাসকে দেখা যায় ভীষন ব্যস্ত রুপে। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে মেহমানদের খাতিরদারি সকল বিষয়ে তার কড়া নজরদারি। কুসুম একবার এসে উচ্ছ্বাসকে মিষ্টি খাইয়ে দিয়ে গেছে। ক্ষুধার্ত উচ্ছ্বাসের তখন এই জিনিসটা সবচেয়ে দরকার ছিল। বহু সময় পর কুসুম যখন উচ্ছ্বাসের কাছে এলো, উচ্ছ্বাস ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের কথা ভুলে যেও না। বিকেলটা তোমার, কিন্তু আজকের রাত আমাকে দিবে। মনে থাকে যেন।’
কুসুম উচ্ছ্বাসের দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসল। ওখানেই কুপোকাত হলেন ডাক্তারসাহেব।
—-

রাত অনেক হয়েছে। অথচ এখন অব্দি উচ্ছ্বাস বাড়ি ফিরেনি। না কোনো কল, নাইবা ছোট্ট মুঠোবার্তা। না জানিয়ে উচ্ছ্বাস কোথায় গেছে কুসুম জানে না। আজকে তাদের ডেইটে যাবার কথা ছিল। অথচ সে হারিয়েছে কোন অজানায়! কুসুম বারবার কল করছে উচ্ছ্বাসকে। উচ্ছ্বাসের ফোন বন্ধ আসছে এবার। কুসুম রাগে ফোন ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। শরীরের সকল সাজসজ্জা খুলে, মাথার চুল খামচে ধরে বসে থাকল বিছানায়। রাগ হচ্ছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে। কোথায় গেল সে? বলে যায়নি যে কুসুমকে।

উচ্ছ্বাস যখন ফিরেছে তখন ভোর চারটা বাজে। কলিং বেল বাজায় নি সে। কুসুমকে কল করে বলেছে দরজা খোলার কথা। উচ্ছ্বাসের কল পেয়েও একপ্রকার ছুটে নিচে গিয়ে দরজা খুলে কুসুম। দরজার ওপাশে আহত অবস্থায় উচ্ছ্বাসকে দেখে পিলে চমকে যায় কুসুমের। হেলে পরতে গিয়েও নিজেকে সামলায় কুসুম। দ্রুত এগিয়ে এসে উচ্ছ্বাসকে ধরে। এ কি অবস্থা হয়ে গেছে তার? কপালে ব্যান্ডেজ, ব্যান্ডেজের উপরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ! শার্টের হাতাতেও তেমন করেই রক্তের দাগ ভেসে আছে। কুসুমের চোখ জল ছলছল করছে। উচ্ছ্বাসকে কোনরকম ধরে উপরে রুমে নিয়ে আসল। দৌড়ে গিয়ে শরবত করে এনে উচ্ছ্বাসের হাতে ধরাল। উচ্ছ্বাস শরবত খেল না। বরং হাত বাড়িয়ে কুসুমের হাত চেপে দুর্বল কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

‘অ-পে-ক্ষা;য় ছিলে? আ-মি খুব স-রি! ঠি-কসময় আসতে পা-রিনি।’

কুসুম উত্তর দিল না। চুপ করে ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্স এনে বসল উচ্ছ্বাসের পাশে। উচ্ছ্বাসের ডান ভ্রুয়ের ঠিক উপরে একটা লম্বা কা/টার দাগ। কুসুম ক্ষ/ত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে। চোখ-মুখ অশ্রুতে টুইটুম্বর। উচ্ছাস শান্ত চোখে কুসুমের কান্না দেখে যাচ্ছে। আসার পর থেকে কুসুম এখন অব্দি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কোনরূপ কথা-বার্তা বলে নি। সেটা ঠিক হজম হচ্ছে না উচ্ছাসের। উচ্ছ্বাসের ক্ষতে ব্যান্ডেজ করা শেষ করে কুসুম ফার্স্ট এইড বক্স ড্রয়ারে রেখে উঠে দাঁড়ায়। চলে যেতে উদ্যত হলে পেছন থেকে উচ্ছ্বাস কুসুমের হাত টেনে ধরে। কুসুম থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফেরে না তাকিয়েই বলে, ‘হাত ছাড়ুন, নিচে যাব।’
উচ্ছ্বাস হাত ছাড়ে না। বরং হাতের বাঁধন আরো শক্ত করে টেনে বলে, ‘এদিকে তাকাও, কথা আছে।’

কুসুম তাকায়। কুসুমের কান্নায় ভেসে যাওয়া মুখ দেখে উচ্ছ্বাস হতভম্ব হয়ে যায়। কণ্ঠে অশ্রুর জলছাপ এঁকে কুসুম বলে, ‘কার কথা শুনব আমি? যার অপেক্ষার এই মাঝরাত্রি অব্দি দরজা খুলে বসে ছিলাম, সে ভোর সকালে এসেছে আমার কাছে। তাও সুস্থ হয়ে নয়। ক্ষ/তের দাগ নিয়ে। এমন মানুষের সঙ্গে আমার কোনো কথা থাকতে পারে না। ছাড়ুন আমায়।’
উচ্ছ্বাস শান্ত ভঙ্গিতে সব শুনে বলে, ‘ পাঁচ মিনিট শান্ত হয়ে আমার কথা শুনো। তারপর অভিযোগ করবে, কুসুম। আমি বাঁধা দেব না। জাস্ট ফাইভ মিনিট’স! ‘

কুসুম থামে। চুপ করে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে উচ্ছ্বাসের থেকে কিছুটা দূরে বিছানায় বসে।

#চলবে

#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব – ৩২

উচ্ছ্বাস শান্ত ভঙ্গিতে সব শুনে বলে, ‘পাঁচ মিনিট শান্ত হয়ে আমার কথা শুনো। তারপর অভিযোগ করবে, কুসুম। আমি বাঁধা দেব না। জাস্ট ফাইভ মিনিট’স! ‘

কুসুম থামে। চুপ করে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে উচ্ছ্বাসের থেকে কিছুটা দূরে বিছানায় বসে। তা দেখে উচ্ছ্বাস ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘দূরে বসেছ কেন? কাছে এসো।’

কুসুম উপলব্ধি করল, উচ্ছ্বাসের গলায় কাতরতা। উচ্ছ্বাসের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস নেই উপলব্ধিতে বুক কেপে উঠল কুসুমের। না চাইতেও, উদভ্রান্তের ন্যায় এগিয়ে গিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশে এসে বসল। কিছুক্ষণ নিরবতা। অতঃপর হাত বাড়িয়ে উচ্ছ্বাস কুসুমের হাত নিজের হাতে আলতো করে চেপে ধরল।
কুসুমের চোখের দিকে চেয়ে কিছু বুঝার চেষ্টা করল। অভিমানে অভিমানিনি দিগ্বিদিকশূন্য। উচ্ছ্বাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকে,

‘বিদেশ থেকে আসার পর, আমি চেম্বার খুলি। সেই সঙ্গে প্ল্যান করি, নিজের একটা হসপিটাল খোলার। হসপিটাল খোলা চাট্টিখানি কথা না জানোই তো। অনেক টাকার ব্যাপার। আমরা অনেকজন ডাক্তার ব্যাচমেট মিলে আমরা টাকা জমিয়ে শেয়ার কিনি। হসপিটালের জন্যে সবাই কিছু টাকা জমাই। বাকি টাকা ব্যাংক থেকে লোন নেই। হসপিটালের কাজ শুরু হয়েছে কদিন হয়েছে। কিন্তু জমি নিয়ে এখন ঝামেলা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের খপ্পরে পরেছে জমি। ভালো এবং দামি জমি হওয়ায় তাদের নজরে জমির লোভ। আজকে এসেছিল সাইটে ওরা। আমি কয়েকটা কটু কথা বলে দিয়েছিলাম। আসলে রাগে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। তখন সাইটে ওরা কিছু না বললেও, আজকে বাড়ি আসার পথে কজন মুখ বাঁধা লোক হঠাৎ করে আক্রমন করে উঠে। হঠাৎ সবকিছু হওয়ায় ঠাল সামলাতে পারিনি। নিভে গেছিলাম। তার ফল এসব আঘাত, এই চোট!’

কুসুম হতভম্ব চোখে উচ্ছ্বাসের দিকে চেয়ে রইল। টালমাটাল জলে দু চোখ ভিজে। গড়িয়ে পরল জলের বিন্দু। এমন আঘাতে ক্ষতবিক্ষত উচ্ছ্বাসকে আগে দেখেনি কুসুম, এবং এখনও দেখার সাহস নেই। কুসুম কিছুক্ষণ হাত বাড়িয়ে উচ্ছ্বাসের কপালে থাকা ব্যান্ডেজ ছুঁয়ে দিল। উচ্ছ্বাস চোখ বন্ধ করে অনুভব করল কুসুমের হাতের ছোঁয়া। কি নরম করে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাকে কুসুম। যেন সামান্য ছোঁয়ায় ব্যথায় মরণ হবে উচ্ছ্বাসের। উচ্ছ্বাস মৃদু হেসে কুসুমের চোখের পানি আঙুল দিয়ে মুছে দিল। বাচ্চাদের মত করে বোঝানোর ভঙ্গি করে বলল,

‘সামান্য চোট। ঠিক হয়ে যাবে। কেঁদো না।’

কুসুম কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। নাক টেনে টেনে বলল,

‘আপনার জীবন কি এখন ঝুঁকিতে? কিছু কি করে ফেলবে ওরা আপনার? সত্যি করে বলেন।’

উচ্ছ্বাস কুসুমকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করে বলল,

‘আমি আসার পথে মামলা করে এসেছি। অবশ্য মামলায় কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই আমি উপর মহলের কিছুজনকে ধরেছি। এসব পাতি নেতাদের তারাই দেখে নিবে। চিন্তা করো না।’

কুসুম আশ্বস্ত হল। আনমনে চেয়ে রইল উচ্ছ্বাসের বুকের দিকে। খানিক পর উচ্ছ্বাসের বুকে আলতো করে হাত রেখে ভেজা কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

‘আমি যদি আপনার বুকে একটু মাথা রাখি, আপনি কি খুব বেশি ব্যথা পাবেন?’

কি নিদারুণ আবদার! যে কেউ শুনে গলে যেতে বাধ্য। আর এ তো স্বয়ং উচ্ছ্বাস। কুসুমের একটুখানি আবদারে সকল ব্যথা যার সুখ হয়ে যায়! উচ্ছ্বাস দুহাত বাড়িয়ে দিল। চোখের ইশারা করে বলল,

‘আসো, ঝাঁপিয়ে পরো এই বুকে।’

কুসুমের চোখ ঝলমল করে উঠল। যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে সে। কুসুম ঝাঁপিয়ে পরল না। বরং আলতো করে মাথা রাখল তার বুকে। উচ্ছ্বাসের ঠোঁটের সর্বত্র হাসি ছড়িয়ে। মেয়েটা বুকে মাথা যতবার রাখে, সুখে কেমন কুকড়ে যায় উচ্ছ্বাস। কখনও ভাবেনি, এই ছোট্ট মেয়ের মধ্যেই তার জীবনের সব সুখ লুকিয়ে থাকবে! কখনও ভাবেনি, বিয়ে নামক বন্ধনে এতোটা মায়া, এতটা মহব্বত লুকিয়ে আছে! বিয়ে করেছে সে। এখন যদি একটা বাচ্চা থাকত তাদের? কেমন হত? কোমরে আঁচল গুঁজে রান্না করা বউকে দেখে যেমন নিজেকে পৃথিবীর সেরা সুখী মনে হয়, তেমন করে বাচ্চাকে শাসন করা মা হিসেবে কুসুমকে দেখতে কি অস্বাভাবিক সুন্দরই না লাগবে! উচ্ছ্বাস মনেমনে সেসব কল্পনা করে ক্ষণেক্ষণে রোমাঞ্চিত হতে থাকে। পরপরই নিজের ভাবনায় লাগাম টানে। বাচ্চা তার চাই, অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না তার। কিন্তু সে কথা দিয়েছে তার পরিবারকে। কুসুমের পড়াশোনা শেষ হলেই বেবি প্ল্যান করবে তারা। তবে এতোটা বছর ধৈর্য্য ধরা আদৌ সম্ভব হবে উচ্ছ্বাসের জন্যে? অপেক্ষায় ক্লান্ত উচ্ছ্বাস কি মরে যাবে না? তবে কিছুই করার নেই। বিয়ে করেছে অবেলায়। তাই বেলা হবার আগে নিজের ইচ্ছে আপাতত ধামাচাপা দিতে হবে।
______
রাত যত বেড়েছে, উচ্ছ্বাসের জ্বর হুহু করে বেড়েই চলেছে। কুসুম শেষবারের মত থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপে,১০৩° জ্বর। কুসুমের কান্না পেয়ে যাচ্ছে। একা একা সব সামলাতে পারছে না, সবাইকে ডাকতে চাইছে সে। কিন্তু উচ্ছ্বাস মানা করছে। খামোকা সবাই ক্ষতবিক্ষত উচ্ছ্বাসকে দেখলে চিন্তায় সেখানেই মূর্ছা যাবে। কুসুম একহাতে চোখের জল মুছে মুছে উচ্ছ্বাসের শরীর মুছে দিল। উচ্ছ্বাসের সারা গা গরম হয়ে আছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কুসুম স্যুপ খাওয়ানোর চেষ্টা করল তাকে। কিছুটা খেয়েই পুরোটাই বমি করে ফেলে দিল। কুসুম পরল মহা বিপাকে। ফল কেটে এনে খাওয়ানোর চেষ্টা করল। কিছুটা খেয়েই হাত দিয়ে মানা করল উচ্ছ্বাস। কুসুম জোর করল না। বাটি রেখে দিয়ে আরো একবার নরম হাত রাখল উচ্ছ্বাসের উত্তপ্ত কপালে। ইশ, পুড়ে যাচ্ছে যে হাত। কুসুম ভেজা ভেজা কণ্ঠে বলল,

‘এতোটা জ্বর। কি করব আমি? কমছে না কেন এই জ্বর। আপনার কথামত ঔষধ তো দিলাম। তাও কমছে না। আমি কি খালা.. আম্মাকে ডেকে আনব, প্লিজ!’

উচ্ছ্বাস হাত বাড়িয়ে মানা করল। গায়ের কম্বলটা নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেবার চেষ্টা করে বলল, ‘ খু–ব ঠা–ন্ডা লা-গ-ছে।’

কুসুম কি করব ভেবে পাচ্ছে না। হাত দিয়ে পায়ের পাতা মালিশ করে দিল, হাত মালিশ করে দিল। হিটার এনে পাশে রাখল। কুসুম যখন এত ব্যস্ত তখন হাত বাড়িয়ে উচ্ছ্বাস জ্বরের ঘোরে কুসুমকে নিজের দিকে টেনে নিল। কুসুমের গলায় মুখ রাখলে কুসুম উপলব্ধি করে তার গলায় কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কুসুম ছোট্ট করে উচ্চারণ করল, ‘জ্বরে পুড়ে যাচ্ছেন। ঔষধ দেই আরেকটা?’

উচ্ছ্বাস শুনল না। বরং স্ত্রীকে নিজের সঙ্গে বেধে ফেলল আরেকবারের মত। কুসুমও হার মানল চরম উত্তাপের কাছে। আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল উচ্ছ্বাসকে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here