Tuesday, March 31, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প" "বিরহ শ্রাবণ বিরহ শ্রাবণ (দ্বিতীয় খণ্ড) পর্ব ২৮

বিরহ শ্রাবণ (দ্বিতীয় খণ্ড) পর্ব ২৮

0
986

#বিরহ_শ্রাবণ(দ্বিতীয় খণ্ড)
#পর্ব_২৮
#লেখিকা_সারা মেহেক

অভ্র ভাই হতভম্ব চাহনিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। সন্দেহ নেই, এ মুহূর্তে রুমে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তির চাহনি অভ্র ভাইয়ের ন্যায় বিস্মিত ও হতভম্ব। পাশ হতে প্রোজ্জ্বল ভাই আমায় নিজের দিকে ফিরিয়ে অনেকটা ধমকের সুরে বললেন,
” অভ্রকে থাপ্পড় মা’র’লি কেনো? বিষয়টা আমাদের দুজনের মধ্যে ছিলো। তুই মাঝখানে এসে টপকালি কেনো?”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের কথায় আমি মোটেও ভীত হলাম না। বরং উল্টো জোর গলায় বললাম,
” বিষয়টা মোটেও আপনাদের দুজনের মধ্যে ছিলো না। এ বিয়ের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু আমি। আর অভ্র ভাই শুধু আপনাকে দোষারোপ করছিলো। ”
এই বলে আমি অভ্র ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললাম,
” শুধু দোষারোপই না। মা’রা’মা’রির পর্যায়ে চলে এসেছিলো উনি। কেনো? শান্ত থেকে কথা শোনা যায়নি?
অভ্র ভাই, আপনি যেভাবে প্রোজ্জ্বল ভাইকে দোষ দিয়ে যাচ্ছিলেন তাতে মনে হচ্ছিলো, প্রোজ্জ্বল ভাই ইচ্ছাপূর্বক সবকিছু করেছেন। অথচ এখানে উনার হাত ছিলো না। এটা বলার পরও আপনি মাথা ঠাণ্ডা না রেখে নিজের মত মতামত বানিয়ে যাচ্ছিলেন। আপনি কি জানেন, বিয়ের দিন আপনার ঐ ম্যাসেজ পাওয়ার পর আমার কি অবস্থা হয়েছিলো? হ্যাঁ, জানি, ম্যাসেজ দেওয়ার পিছনে আপনার হাত ছিলো না। কিন্তু আপনার ঐ ম্যাসেজটাই আজ আমাকে আর প্রোজ্জ্বল ভাইকে বিয়ের মতো সম্পর্কে জড়িয়ে ফেলেছে। ”
এই বলে আমি একটা ঢোক গিললাম। গলাটা শুকিয়ে আসছে। তবে এর চেয়ে বেশি গলায় কান্নার দলাগুলো পাকিয়ে আসছে। কারণ আমি ঠিক আমার সামনে আমার অতীতকে দেখতে পাচ্ছি। যে অতীত এখন আমার প্রাক্তন বলে বিবেচিত হচ্ছে। সপ্তাহখানেক পূর্বেও যাকে ঘিরে আমার ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো সুতো বুনতে শুরু করেছিলো সে-ই আজ আমার অতীতের এক ছেঁড়া ডায়েরির পাতার ন্যায় আমার হৃদয় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আজ চাইলেও তাকে আমি ছুঁয়ে দেখতে পারবো না। চাইলেও তার উপর কোনো অধিকারবোধ দেখাতে পারবো না। আমি বহু কষ্টে কান্না চাপিয়ে রেখে মন শক্ত করে অভ্র ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললাম,
” আপনি এসবে না জড়ালে আজ এমন কিছুই হতো না অভ্র ভাই। আপনি কি পারতেন না পুলিশের সাহায্য নিতে? সেটাও না করলে আপনি কি একটাবারের জন্যও প্রোজ্জ্বল ভাইকে বলতে পারতেন না কিছু? অনামিকার ব্যাপারটা আপনি আর কারোর সাথে না হোক অন্ততপক্ষে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে আলোচনা করতেন। আপনি এমনটা করলে আজ হয়তো এ দিন দেখতে হতো না আমাদের। এক্ষেত্রে সব দোষ আপনার, সব দোষ আপনার অভ্র ভাই। সেদিন ঐ মেয়েদের বাঁচাতে আপনি মা’র’পি’ট না করলেও পারতেন। সেদিন আপনি নিজের রাগ দমিয়ে রাখলে ঘটনা এতোদূর এগুতো না। আর হসপিটালের ঘটনার কথা বললাম। এখন এসব বিবেচনা করে আপনিই বলুন, আপনার গরম মেজাজের কারণেই ঘটনা এতদূর এগোয়নি কি?”
বলে আমি খোদেজা মামির উদ্দেশ্যে বললাম,
” মামি? আপনিই বলুন, অভ্র ভাইয়ের অবাধ্য রাগের কারণেই কি এসব হয়নি?”

খোদেজা মামি জবাব দিলেন না। চুপচাপ মাথা নিচু করে মুখে আঁচল গুঁজে কাঁদলেন। আর ওদিকে অনামিকা তো নিঃশব্দে কেঁদেই চলছে। অভ্র ভাই এবার হতবাক অবস্থা হতে বেরিয়ে এলেন যেনো। মুখ দিয়ে সশব্দে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
” আচ্ছা, তাহলে এসব ঘটনার জন্য দোষী আমি? ওকে, মানলাম, দোষী আমিই। সব ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী আমিই৷ কিন্তু তোমার আর প্রোজ্জ্বলের বিয়ে? এ বিয়ের পিছনে তো আমার হাত নেই। আমি তো বলে যাইনি তোমাদের বিয়ে করতে। তাহলে বিয়ে করলে কেনো?
প্রোজ্জ্বল? তুই বল, বিয়েটা করলি কেনো? ”

প্রোজ্জ্বল ভাই বললেন,
” তখনকার সিচুয়েশনটা তুই অনুমান করতে পারছিস না অভ্র। ঐ দিন খুব পরিচিত আত্মীয় ছাড়া এমন কাউকে খুঁজে পাইনি যে তোর আর চন্দ্রিমাকে নিয়ে খারাপ কিছু বলেনি। বিশেষ করে চন্দ্রিমাকে নিয়ে। আমাদের সমাজে তো কিছু মানুষ আছেই যারা পান থেকে চুন খসলেই মেয়েদের দোষ দিয়ে বেড়ায়। আর এতো বড় ঘটনায় চন্দ্রিমাকে কেউ কিছু বলবে না তা হতে পারে নাকি! এসব অবস্থা দেখেই আব্বা আর দাদি আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। আব্বার ভয় ছিলো, তুই বিয়ের আসরে এভাবে ওকে রেখে যাওয়ার পর হয়তো কখনো আর ওর বিয়ে হবে না। তাই আব্বা এ সিদ্ধান্ত নেয়। আর তোর কি মনে হয়? আমি একেবারেই বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম? না, আমি বারবার নিষেধ করেছিলাম আব্বাকে। এ বিয়েতে শুরুর দিকে কিছুতেই আমার মত ছিলো না। কিন্তু আব্বা আর দাদি ঐ মুহূর্তে আমাকে কি প্রেশারে রেখেছিলো তা একমাত্র আমিই জানি। আর চন্দ্রিমাও একেবারে রাজি হয়নি। ওর তো মানসিক অবস্থা তখন স্ট্যাবলও ছিলো না। দাদি আর আপুর বুঝানোয় ও রাজি হয়েছিলো। তাহলে এখানে দোষটা কার অভ্র? আমরা সবাই পরিস্থিতির শিকার। কেউই ইচ্ছাপূর্বক কিছু করেনি। কিন্তু ফল ভুগছি আমরা সবাই। ”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের কথার পিঠেই আমি অভ্র ভাইকে বললাম,
” এই ঘটনা আপনি আগে না শুনে শুধু শুধু প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের গায়ে হাত তুললেন। আর প্রোজ্জ্বল ভাইও না পেরে আপনার উপর পাল্টা হা’ম’লা চালায়।
আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা পরিষ্কার বলে দিয়েছি। এরপরও যদি আপনি না বুঝেন তাহলে আমার কিছুই করার নেই। ”
এই বলে আমি রুম হতে বেরিয়ে এলাম। বাইরে গিয়ে দেখলাম প্রতিবেশী অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই তারা আমাদের এ রঙ্গ তামাশা উপভোগ করছিলো!
আমি অভ্র ভাইদের বাড়ি হতে বেরিয়ে এলাম। পিছে শুনলাম, আমাদের নিয়ে ফিসফিস করে আলোচনা সমালোচনায় মশগুল হয়েছে সবাই। মন মেজাজ কিছুটা শান্ত হলে দু একটা কথা শুনিয়ে দিয়ে আসতাম তাদের। কিন্তু আমি জানি, এ মুহূর্তে মুখ খুললে আমি নিজেকে থামাতে পারবো না। যাচ্ছেতাই বলে ফেলবো হয়তো। এজন্য সব শুনেও না শোনার ভান করে বাড়িতে চলে এলাম। প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের রুমে ঢুকে দরজা আটকিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। নিজেকে এ মুহূর্তে প্রচণ্ড দূর্বল লাগছে। কি অগোছালো হয়ে গেলো আমার জীবনটা! কখনো কি এমনটা চেয়েছিলাম আমি? হয়তো চাইনি বলেই আজ এসব হচ্ছে।
এক মাস আগেও আমি স্বপ্ন দেখতাম অভ্র ভাইকে ঘিরে। মনের কল্পনায় আমাদের দুজনকে নিয়ে ছোট্ট একটা সংসারও কল্পনা করে ফেলেছিলাম আমি। অভ্র ভাইকে মনের মাঝে জায়গা দিয়েছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম অভ্র ভাইয়ের মতোই সীমাহীন ভালোবাসতে। আমি জানতাম উনার মতো ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছিলাম। সবকিছুই তো ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু আমার এ শান্তিপূর্ণ জীবনে এতো বড় ঝড় এলো কেনো? কি হতো যদি জীবনটা মসৃণ হতো? আসলে আমি কি কখনো সুখী হবো না?
অভ্র ভাইয়ের দেওয়ার ক্ষত সারিয়ে নিয়ে জীবনে এগুতে চেয়েছিলাম আমি। ভাগ্যের এ পরিবর্তনকে সঙ্গী করে নিয়েই আমি সারাটা জীবন চলতে চেয়েছিলাম। হাজার কষ্ট হোক, তবুও অনেকটা মনের বিরুদ্ধে গিয়েই প্রোজ্জ্বল ভাইকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছিলাম। তাহলে এমন মুহূর্তে হঠাৎ অভ্র ভাইয়ের এ আগমন কেনো ঘটলো? এখন আমি কি করে পারবো অতীতকে সবসময় সামনে দেখে বর্তমান নিয়ে এগুতে? এ অতীত যে আমাকে বড় একটা ঘা দিয়ে গিয়েছে! আমি আর পারছি না এসব সহ্য করতে। একটা মেয়ের পক্ষে আর কতোটা সহ্য করা সম্ভব!

অভ্র ভাই আসার আগে আমার আর প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছিলো। এই তো সেদিনই আমরা দুজনে জীবনের এ দুঃসহ মোড় ভুলে গিয়ে সারারাত ছাদে বসে গল্পে মশগুল ছিলাম। চাঁদের আলোয় বসে দুজনে সময়টা উপভোগ করেছিলাম। হঠাৎ গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েও পড়েছিলাম আমি। আবার গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে ছোটখাটো একটা যু”দ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলাম আমি। উনার কথা ছিলো, এই কাঠফাটা রোদে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে কিছুতেই আইসক্রিম খাওয়া যাবে না। যদি ঠাণ্ডা লেগে যায় তাহলে? সামনে কার্ড পরীক্ষা দিবো কি করে!
অবশ্য প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের এ যুক্তিকে সেদিন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোরপূর্বক উনার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনে নিয়েছিলাম।
এখন কলেজের সবাই যেহেতু আমাদের বিয়ে সম্পর্কে জানে সেহেতু প্রোজ্জ্বল ভাই আর সবার সামনে আমার সাথে কথা বলতে, গল্প করতে দ্বিধাবোধ করেন না। উনি রোজ অফ পিরিয়ডে ক্যান্টিনে বসে আমার ক্লাস, আইটেমের খোঁজ নেন। আবার বাড়িতে এলে আমাকে নিজের সাধ্যমতো সব পড়া বুঝিয়ে দেন। ক’দিন হলো আমাদের জীবনে সবকিছুই স্বাভাবিক গতিতে চলছিলো। কিন্তু আবারো এক ঝড়ে এসে সব হারিয়ে গেলো। এখন কি আমাদের সম্পর্ক আবারো সেই আগের মতো হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি অভ্র ভাইয়ের সামনাসামনি হবো কি করো! একই হসপিটালে, একই এলাকার দুটো সামনাসামনি বাড়িতে থাকবো আমরা। এমন তো নয় যে আর কখনোও দেখা হবে না আমাদের! দেখা হবে। রোজ না হলেও দু তিনদিনে একবার আমাদের দেখা হবেই। তখন কি একটা অস্বস্তি ভাব বিরাজ করবে আমাদের মাঝে!

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দরজায় কড়াঘাতের আওয়াজ শুনতে পেলাম। মেঝে থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম ক্লান্ত অবস্থায় প্রোজ্জ্বল ভাই দাঁড়িয়ে আছেন রুমের সামনে। আমি দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে উনাকে রুমে ঢোকার জায়গা করে দিলাম। প্রোজ্জ্বল ভাই রুমে ঢুকে বিছানায় গিয়ে বসলেন। আমায় বললেন নিজের পাশে বসতে। জানি, উনি কিছুক্ষণ পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়েই কথা বলবেন। কিন্তু আমি এ মুহূর্তে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে বা শুনতে চাইছি না। তাই উনাকে বাহান দিলাম যে আমাকে মামি ডাকছেন। কিন্তু উনি আমার কথা কানে তুললেন না। বরং অনেকটা জেদি স্বরেই বললেন আমাকে উনার পাশে বসতে। অগত্যা আর উপায় না দেখে উনার পাশে বসতে হলো আমাকে।

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের পাশে বসার সাথে সাথে উনার ডান হাত এবং আমার বাম দুটো একত্র করে দুজনের মাঝে বিছানার উপর চেপে ধরলেন। নিঃশব্দে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। না উনি কথা বললেন, না আমি কথা বললাম। আমাদের মাঝে কেটে গেলো কিছু নীরব মুহূর্ত। হঠাৎ ভগ্ন কণ্ঠে উনি বলে উঠলেন,
” চন্দ্রিমা? আমি তো এসব চাইনি। তাহলে এমন কেনো হচ্ছে আমাদের সাথে?
চন্দ্রিমা, আমার ভয় হচ্ছে। আমার আর অভ্রর এতো বছরের বন্ধুত্ব এবার ভেঙে না যায়!”
এই বলে উনি নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। হঠাৎ উনার এ ধরণের কথায় মনে হলো, এসব কিছুর জন্য দায়ী আমি। আমাকে ঘিরেই সকল ঘটনা ঘটছে। উনাদের বন্ধুত্বের মাঝে আমিই এসেছি।
আমি একটা ঢোক গিলে থেকে থেকে বললাম,
” প্রোজ্জ্বল ভাই? আমাকে মাফ করে দিবেন। আপনাদের বন্ধুত্বের মাঝে আমিই এসেছি। হঠাৎ নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। আজ আমি না এলে হয়তো আপনাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরতো না। আসলে একটা মেয়ে দুজন ছেলের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে যথেষ্ট। আর এ কথাকে আমি হাতেনাতে প্রমাণ করলাম। ”

” তোর কোনো দোষ নেই চন্দ্রিমা। নিজেকে দোষারোপ করিস না। আসলে আমরা তিনজনই পরিস্থিতির শিকার। তিনজনের জীবনই এক দুঃসহ মোড়ে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। জানি না, এ পরিস্থিতি হতে আমরা কি করে বেরিয়ে আসবো। আমি পারবো না আজীবন এ বোঝা নিয়ে চলতে।”
এই বলে উনি পুনরায় নীরবতা পালন করলেন।
কিছুক্ষণ পর বেশ আর্জিপূর্ণ গলায় বললেন,
” চন্দ্রিমা? তোর পায়ে মাথা রেখে কি একটু শুয়ে থাকতে পারি?”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের এমন আরজ এড়িয়ে যেতে পারলাম না আমি। নিচু স্বরে ছোট্ট করে জবাব দিলাম,
” হুম। ”

প্রোজ্জ্বল ভাই আমার হাত ছাড়লেন। অতঃপর ধীরেসুস্থে আমার পায়ের উপর মাথা রাখলেন। ছোট বাচ্চাদের মতো জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে পড়লেন। অতঃপর আমার একহাত নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকের উপর চেপে ধরলেন। আর অপর হাত দিয়ে উনার মাথার চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিতে বললেন। আমি উনার কথামতো উনার মাথার ঘন চুলের মাঝে হাত ডুবিয়ে দিলাম। ধীরেসুস্থে উনার মাথায় হাত বুলাতে লাগলাম। প্রোজ্জ্বল ভাই কোনো কথা বললেন না। তবে খানিক বাদে বাচ্চাদের মতো কাঁদোকাঁদো স্বরে বললেন,
” চন্দ্রিমা? অভ্র কি কখনো আমায় মাফ করবে? তখন আসলে আমার হাত উঠানো উচিত হয়নি। বড় একটা ভুল করে ফেলেছি আমি। ”

উনার কথা আমি নীরবে শুনে গেলাম। কথার পিঠে কোনো কথা বললাম না। উনি পুনরায় বললেন,
” সব কিছু কেমন হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলো, না? আমি ভেবেছিলাম, তোর দায়িত্ব পালন করে সংসার করবো, বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিবো। কিন্তু এখন থেকে রোজ অভ্রকে আমার সামনে দেখলে সবকিছু দুর্বিষহ হয়ে যাবে আমার জন্য। বারবার মনে হবে আমি অভ্রর কাছ থেকে তোকে ছিনিয়ে এনেছি।
সবকিছু এমন হয়ে গেলো কেনো চন্দ্রিমা?”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের এমন অসহায় কণ্ঠস্বর আমার দুচোখ ভিজিয়ে দিলো। উনাকে শান্ত করতে বললাম,
” ভাগ্যের এ লীলাখেলাকে মেনে নিয়েই চলতে হবে প্রোজ্জ্বল ভাই। আমি, আপনি না চাইলেও আমাদের এভাবে চলতে হবে। সমাজের কথা চিন্তা করে হলেও আমাদের এভাবে চলতে হবে। ”
এই বলে আমি চুপ করে বসে রইলাম। ওদিকে প্রোজ্জ্বল ভাইও কোনো জবাব দিলেন না। তবে কিছুক্ষণের মাঝেই খেয়াল করলাম, উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই আর বিরক্ত না করে ওভাবেই বসে রইলাম আমি। আর উনি ওভাবেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলেন।

———–

আজকাল অভ্র ভাই আমার সাথে কথা বলেন না। বলার চেষ্টাও করেন না। আবার আমি কথা বলতে চাইলেও কেমন যেনো এড়িয়ে চলেন আমাকে।
মাঝে মাঝে দেখি, উনি দূর হতে আমাকে দেখছেন। তবে আমার চোখে চোখ পড়লেই উনি দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেন৷ উনার এ ব্যবহারে কষ্ট পেলেও মুখ ফুটে কিছুই বলি না আমি। কারণ, ধরেই নিয়েছি, এটা আমার প্রাপ্য। আফসোস হয় সেদিনটার জন্য যেদিন অভ্র ভাই আমাকে নিজের মনের কথা বলেছিলেন। আফসোস হয় সেদিনটার জন্য যেদিন আমাদের বিয়ে পাকাপোক্ত হয়েছিলো। আফসোস হয় সেদিনটার জন্য যেদিন উনার ঐ ছোট্ট বার্তার কারণে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে সারাজীবনের জন্য বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেতে হয়। তবে আফসোস হলেও আমি তো এ বিয়ে নামক সম্পর্কটা পুরোপুরি মেনে নিয়েছি। তাহলে অভ্র ভাই কেনো অতীত হয়ে সবসময় আমার স্মৃতিতে হানা দেয়? কেনো আমার জীবনের ‘প্রথম ভালোবাসা’র নাম করে আমার সুখগুলোকে পি”ষে দেয়? তাহলে আসলেই কি ‘প্রথম ভালোবাসাকে ভুলে যাওয়া কষ্টকর হয়’ এটা সত্য প্রমাণিত হলো?

————

প্রায় পাঁচদিন পর হঠাৎ অভ্র ভাইয়ের ম্যাসেজ এলো আমার ও প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের ফোনে। উনি আমাদের সাথে দেখা করতে চান। কিছু কথা বলতে চান। তাই কলেজ শেষে হসপিটালের কাছে একটা রেস্টুরেন্টে বসতে বললেন উনি। উনার কথামতো কলেজ শেষে আমি ও প্রোজ্জ্বল ভাই রেস্টুরেন্টে উপস্থিত হলাম। রেস্টুরেন্টে ঢুকে অভ্র ভাই হাসিমুখে আমাকে ও প্রোজ্জ্বল ভাইকে পাশাপাশি বসিয়ে নিজে আমাদের সামনে বসে পড়লেন। ঠোঁটের কোনে বিস্তৃত এক হাসি বজায় রেখে বললেন,
” অনেকদিন পর একসাথে হলাম আমরা।

তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি ভালোই মানাচ্ছে চন্দ্রিমা!”
®সারা মেহেক

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here