Tuesday, March 17, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প" সবটা অন্যরকম♥ সবটা অন্যরকম♥ পর্ব_২৭

সবটা অন্যরকম♥ পর্ব_২৭

0
1478

সবটা অন্যরকম♥
পর্ব_২৭
Writer-Afnan Lara
.
কথা কাটাবেন না একদম,,আমাকে সত্যিইটা বলুন নয়তো আমি গিয়ে খালামণিকে সবটা বলে দেবো
.
আমি মোটেও কথা ঘুরাচ্ছি না,,মাকে যা বলার বলতে পারো তুমি
মা তোমার কথা বিশ্বাস করবে না একটুও,এখন নামো
.
কেন?
.
কারণ আমরা সাদাত স্যারের বাসার সামনে এসে গেছি
.
ওমা,এত বড় এই দালানটা?কত তলায় থাকে স্যার?
.
আজ্ঞে না,,তার পিছনের সাইডে যে এক তলা বাড়িটা আছে সেটাতে স্যার থাকে,তার নিজের বাসা সেটা
.
ওহ!
.
দিবা বাইক থেকে নেমে ওড়না মাথায় দিয়ে চললো,,আহনাফ বাইক এক পাশে করে রেখে সেও চললো সেদিকে,,একটু হেঁটেই তারা স্যারের বাসাটা দেখতে পেলো
সবুজ রঙ করা একটা এক তলা বাড়ি,সামনে থাই গ্লাস করা জানালা দুটো,,আর দরজা খোলা,ওদের আগেই বাকি স্টুডেন্টরা এসে পড়েছে মনে হয়
দিবা তো বাড়িটা দেখে এক্কেবারে মুগ্ধ হয়ে গেছে,এত মুগ্ধ হয়েছে যে তার পা থেমে গেছে
বাড়িটার চারপাশে সব ফুল গাছ,এত সুন্দর ও কারও বাসা হতে পারে,,স্যারকে দেখে কেউ বলবে না যে স্যার এত বড় গাছপ্রেমিক
হরেক রকমের ফুল গাছ,,কি ভাবে প্রকাশ করবো এই মুগ্ধতা, গোলাপ,বেলি,জুঁই,রক্তজবা,গন্ধরাজ,আরও কত কি
.
আহনাফ দরজা পর্যন্ত এসে পিছনে তাকিয়ে দেখলো দিবা ইয়া বড় হা করে ফুলগাছ সব দেখছে
.
স্যারকে দেখতে আসছো নাকি স্যারের বাগান দেখতে আসছো?সব এক নৌকার মাঝি,গাছ ছাড়া কিছু বুঝে না
.
কথাটা বলে আহনাফ ভেতরে চলে গেলো
দিবা মুচকি হেসে গাছগুলো দেখতে দেখতে সেও ভেতরে চলে আসলো,মন চাচ্ছিলো আরও কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে ওখানে
গাছগাছালির সৌন্দর্য নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিবা বাসার ভেতর পা রাখলো,,শুরুতেই ওর চোখে পড়লো সোফার রুম,,সোফার রুমে কিছু স্টুডেন্ট বসে কথা বলছে বাকিরা মনে হয় স্যারের রুমে
দিবা ওদের দিকে এক নজর তাকিয়ে স্যারের রুম খুঁজতে ভেতরের রুমগুলোর দিকে গেলো,,সোফার রুম পার হলেই বামে একটা রুম আছে সেটা রান্নাঘর,,আর ডানে দুটো রুম,দুটোই বেড রুম,,সোফার রুমে দিয়ে ডাইনিংয়ে একটা রুমে যাওয়ার দরজা দেখেছিলো দিবা
যাই হোক এক রুমে কোলাহল শুনা যাচ্ছে তার মানে ওখানে সাদাত স্যার
দিবা সোজা সেদিকেই গেলো,রুমে এসে সে দেখলো স্যার বিছানায় শুয়ে আছেন গায়ে কাঁথা দিয়ে,,তার পাশেই একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন,চোখে চশমা আর হাতে তফসি,তিনি গম্ভীর হয়ে বসে সাদাত স্যারকে দেখছেন,,দেখে মনে হয় স্যারের আম্মু
পরনে সাদা শাড়ী তার,,সাদাত স্যার ক্লান্ত চোখে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন
দিবা এগোতে যেতেই আহনাফ ওর হাতের কব্জি ধরে আটকে ধরলো ওকে,দিবা প্রশ্নসূচক চোখে তাকিয়ে থাকলো আহনাফের দিকে
আহনাফ ফিসফিস করে বললো”স্যারের ছোঁয়াছে রোগ হয়েছে আমাদের কাছে আসতে মানা করলো,যেও না”
.
কি রোগ??
.
জিজ্ঞেস করলাম তো,কিন্তু ঐ দাদির চাহনি দেখে আমার প্রশ্ন মাঝপথেই আটকে গেছে
.
স্যারের মা মনে হয়
.
হুম,চলো চাই
.
যাই মানে,সবেই তো এলাম,স্যারের সাথে তো কথাই হলো না,আবার স্যারের আম্মু ও আছেন,উনার সাথেও তো কথা বলতে হবে
.
পাগল হইছো?ছোঁয়াছে রোগ নিজের করে এবার আমার আর মিনির গায়েও দিবা তুমি
তোমার তো খালি দেওয়ার শখ তাই খালামণি তোমার নাম দিবা রাখছে
.
এই সময়েও আপনার আমাকে খোঁচা মেরে কথা বলতে হবে?
.
স্যারের পাশে বসে থাকা বয়স্ক মহিলা যিনি ছিলেন তিনি তফসি রেখে ঘাঁড় ঘুরিয়ে বললেন”মেয়েরা তো কজন এলে,,কেউ একটু রঙ চা বানাবে?আমার অন্তিক সেই কখন চা খেতে চাইলো,আমি তো বানাতে পারবো না হাঁটুর ব্যাথার কারণে,,ঠিকমত হাঁটতেও পারি না,রান্নাঘরে সব আছে
এই এক জ্বালা,,কাজের বুয়া রাখে না ব্যাটা!অসুখে মরতাছে!এবার কাজের বুয়া কই পাবো?আমি এসেছি বিশ মিনিট হলো
বানালে সবার জন্য বানাইও
.
দিবা আহনাফের দিকে তাকিয়ে বললো”আমি বানাই?বানালে তো আর রোগে ধরবে না”
.
আহনাফ জ্যাকেটটা টেনে একটু সামনের দিকে এনে বললো”জলদি করে বানাও,বাসায় ফিরতে হবে,আমার আবার ডিউটি আছে”
.
কথাটা বলে আহনাফ চলে গেলো সোফার রুমের দিকে,,দিবা গেছে রান্নাঘরের দিকে,,যে চার পাঁচজন মেয়ে ছিলো ওরা আগ বাড়িয়ে বানাতে বলেনি,দিবাই রাজি হলো বানানোর জন্য
রান্নাঘরে এসে দিবার মাথা তো ব্যাকা হওয়ার উপক্রম,,ছেলেদের বাসাও এত গুছালো হতে পারে?
স্যার তো শুনলাম একা থাকে,,বাগান সামলিয়ে আবার রান্নাঘর ও গুছাতো?এই জন্যই বুঝি স্যার নিজের খেয়াল রাখার সময় পেতেন না,,তার দাঁড়ির তাই এই অবস্থা”
.
চা বসিয়ে দিবা জানালা দিয়ে একবার বাহিরের দিকে তাকালো,,এপাশের দিকে সব ফল গাছ,আম কাঁঠাল জাম গাছ,পেয়ারা সব,,পেয়ারা গাছ দেখে দিবার মাথায় বুদ্ধি আসলো,সে ছুটে গেলো সেদিকে
আহনাফ জিসান আর পিয়াসের সাথে কথা বলছিলো দিবাকে এরকম ছুটতে দেখে সে ভয় পেয়ে সেও গেলো দেখতে
দেখতে এসে দেখলো দিবা লাফিয়ে লাফিয়ে পেয়ারা গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ছে
.
এই মেয়েটা আস্ত একটা পাগল!
.
আহনাফ মুক বাঁকিয়ে আবার চলে আসলো,
দিবা কিছু কচি পাতা নিয়ে ফিরে আসলো রান্নাঘরে,সবার কাপে রঙ চা ঢেলে তার উপর লেবু এক পিসের রস দিয়ে দিলো সে,,বাকি মেয়েরা এসে কাপগুলো নিয়ে সার্ভ করতে গেলো
দিবা সাদাত স্যারের জন্য রাখা কাপের উপর পেয়ারা পাতা ধুয়ে ছোট ছোট করে কুচি করে দিয়ে দিলো,,সে মাঝে মাঝে রঙ চা বানালে এমনটা করে,তার ভাল্লাগে খেতে
সবে পাতাটার রঙ পালটে গেলে চামচ দিয়ে ফেলে দেয় সে,,রসটাই জরুরি
কাপ দুটো নিয়ে সে স্যারের রুমে ঢুকে হাত বাড়িয়ে স্যারের পাশে দুটো কাপ রেখে আবার দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো
স্যারের মা খুশি হয়ে পিছনে তাকালেন ধন্যবাদ দিবেন বলে
কিন্তু দিবার মুখ দেখে তার মুখের কথাই হাওয়া হয়ে গেছে
এটা কি করে হতে পারে,মনে হচ্ছে মেয়ের বেশে সাদাত দাঁড়িয়ে আছে আলমারির সামনে
স্যারের মা চশমা ঠিক করে স্যারের দিকে এক নজর তাকিয়ে আবারও দিবার দিকে তাকালেন
কিছুতেই মানতে পারছেন না এমনটা,,চেহারায় এত মিল তো বাপে মেয়ের হয়,কিংবা ভাই বোনের হয়,তবে???
.
দিদুমণি চা খান,,ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ভাল্লাগবে না
.
দিবা?এদিকে আসো জলদি!!
.
দিবা আহনাফের কথা শুনে ছুটে চলে গেলো,,সাদাত স্যার তার মায়ের হাত ধরে অনেক কষ্টে শোয়া থেকে উঠে বসলেন,শরীরটা ম্যাচম্যাচ করছে,হাত পা প্রচণ্ড ব্যাথা করে,,
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে স্যার তার চশমাটা খুঁজে চোখে দিলেন,,মা এখনও ঘোরের মধ্যে আছেন
স্যার চায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছেন,,মুখ দিয়ে আম্মা কথাটা বের হলো তার
মা ঘোর থেকে বেরিয়ে স্যারের কাঁধে হাত রেখে বললেন”কিরে?শরীর খারাপ লাগে?”
.
আম্মা এই চা কে বানিয়েছে?
.
ঐ তো তোর ভার্সিটির একটা স্টুডেন্ট,সবেমাত্র দিয়েই তো চলে গেলো
.
নাম কি ওর?
.
একটা ছেলে মনে হয় দিবা বলে ডাকলো ওকে
.
দিবা?
.
কেন?কি হয়েছে?
.
নাহ,কিছু না,এমনি জানার ইচ্ছা হলো
(এটা কি করে হয়,,এরকম করে চা বানায় তো মৌসুমী,,রঙ চায়ের উপর পেয়ারা পাতা দেওয়া ওর স্বভাব,ওর হাতের এমন চা আমি কতবার খেয়েছি তাহলে কি এমনটা অন্য কেউ করতে পারে??কি করে পারে,,
হয়ত কো-ইন্সিডেন্ট হতে পারে,,মানুষের স্বভাব তো আর এক্সট্রা অর্ডিনারি না যে আর কারোর হতে পারবে না
কিন্তু হুট করে এত বছর পর এরকম চা দেখে সবার আগে ওর কথা মাথায় আসলো,এমন একজন মানুষ ছিল আমার জীবনে যাকে আজও ভুলার ক্ষমতা খোদা আমায় দেয়নি,ছোট ছোট জিনিস পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে মনে আছে আমার)
.
চা খা, কি এত ভাবিস তুই??
.
নাহ,কিছু না,চা কেমন?
.
বেশ ভালো,তবে তোর চায়ের উপর ওসব কি?
.
সাদাত স্যার হাসলো,,হেসে চামচ দিয়ে পাতা সরাতে সরাতে বললেন”এরকম বাচ্চামো মৌসুমী ছাড়া কেউ করতো না মা,,আর আজ আরেকজন করলো”
.
মৌসুমীর নাম শুনে মা চায়ের কাপটা রেখে দিলেন,খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলে গেলেন রুম থেকে
সাদাত স্যার তৃপ্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফিল করে চা শেষ করলেন,এত ভালো লাগলো মনে হলো চা মৌসুমী বানিয়েছে,নিজের অজান্তেই হেসে ফেললেন তিনি

ডাকলেন কেন?স্যারকে চা দিতে গেছিলাম আমি
.
পাতা ছিঁড়ছিলা কেন?
.
আমার বাসায় গরু আছে তারে খাওয়াবো বলে
.
আহনাফ মুখ বাঁকিয়ে বললো”বাই দ্যা ওয়ে চা ভালো হয়েছে,স্যার তোমাকে পরীক্ষার খাতায় নাম্বার ভালো দেবে দেখো”
.
দিবা আহনাফের পাশে বসে টেবিলের উপর থেকে এক কাপ চা নিয়ে বললো”আমার বারতি মার্ক্স লাগবে না আমার এমনিতেই নাম্বার বেশি আসে,হুহ”
.
ভালো!এখন চলো যাই,অলরেডি আড়াইটা বেজে গেছে,স্যারকে বাই বলে চলে যাব আমরা
.
দিবা আর আহনাফ উঠে গেলো স্যারকে বাই বলবে বলে সেদিকে যেতেই স্যারের মায়ের সামনে পড়লো দুজন
স্যারের মা দিবাকে দেখে আবারও থমকে গেলেন,,দিবার দিকে তাকালেই মনে হয় সাদাত দাঁড়িয়ে আছে
দিবা মুচকি হেসে বললো”দিদুমণি আমরা আজ আসি,,স্যারকে বলে আসছি”
.
স্যারের মা তাকিয়ে থাকলেন এক দৃষ্টিতে,,আহনাফ দিবাকে সাথে নিয়ে স্যারের রুমে ঢুকলো,স্যার চায়ের কাপটা সবেমাত্র বিছানার উপর রাখলেন,,দিবাকে দেখে মুচকি হেসে বললেন”এরকম করে চা বানানো কে শেখালো তোমায়?”
.
দিবা মাথা চুলকিয়ে বললো”আসলে এরকম করে আমার মা মাঝে মাঝে চা বানাতো,,তার থেকেই শেখা,,ভালো লেগেছে আপনার?”
.
সাদাত স্যার মুখটা ফ্যাকাসে করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন তারপর বড় করে নিশ্বাস ফেলে বললেন”ওহ,,আসলে আমার খুব কাছের একজন মানুষ এমন করে চা বানাতো,,তুমি আজ তার কথাই মনে করিয়ে দিলে,ধন্যবাদ এত মিষ্টি একটা অনুভূতি আবারও মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য”
.
ওয়েলকাম,স্যার আজ আসি তাহলে আমরা
.
ঠিক আছে,সাবধানে যেও
.
আহনাফ চলে গেলো,দিবা পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে বললো”স্যার আপনার বাগানে কালো রঙের গোলাপ দেখলাম কয়েকটা টব সমেত আছে,আমি একটা নিয়ে যাই?প্লিস স্যার,আমার অনেক শখ ফুল গাছের বাগান করার
.
স্যার মুচকি হেসে বললেন”আচ্ছা নাও”
.
দিবা ছুটে গেলো আহনাফের আগেই,বাগানে ঢুকে পাগলের মতন কালো গোলাপ গাছটা খুঁজতেছে সে
আহনাফ বাইকে বসে ভ্রু কুঁচকে বললো”এমন করে দেখো যেন স্যার তোমাকে এই বাগানটা উঠিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দিছে?”
.
আরেহ না, চা খাওয়ানোর বদলে স্যার আমাকে একটা ফুলের টব ফ্রিতে দিলো
.
কিহ!
.
আহনাফ তব্দা খেয়ে দিবার টব নেওয়া দেখছে,,স্যার এত সহজে মেনে গেলো?তাও কালো গোলাপ গাছ,এটার তো অনেক দাম হবে,স্যার মানলো কেন,তাই বুঝি নিজ থেকে চা বানাতে গেলো এই মেয়েটা
মাঝে মাঝে এমন কাজ করে আমি একসের বোকা বনে যাই
.
দিবা টবটা নিয়ে বাইকে উঠে বসে বললো”নিন চলুন”
.
মানুষকে পটানো কেউ তোমার থেকে শিখুক
.
আমার তারিফ করলেন,আচ্ছা আপনার বিয়েতে আমি আমার ফুল গাছের একটা ফুল দিবো গিফট হিসেবে,বাসর রাতে বউকে দিয়ে বলবেন”গিফট ফ্রম মাই বোন”
.
আমার বউরে দিলে লাল গোলাপই দিবো,কালো গোলাপ দিয়ে তার মন খারাপ করতে চাই না আমি
.
অবশ্য তাও ঠিক,,সবাই তো আর কালো গোলাপের মর্ম বোঝে না,আমি তো আমার হাসবেন্ডকে বলবো আমায় কালো গোলাপ দিতে
.
আহনাফ ঘাঁড় ঘুরিয়ে বললো”তোমার আবার বিয়ে করার ও শখ আছে??বাট আমি তো জানতাম তুমি বিয়ে করবে না বলে খুলনা ছেড়ে আসছো”
.
একদিন না একদিন তো বিয়ে করতেই হবে
চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here