মনের মহারাণী পর্ব ২৩+২৪

0
699

গল্প:-#মনের_মহারাণী
লেখিকা:-#Sohani_Simu
পর্ব:-২৩+২৪

সন্ধ্যা হবে হবে ভাব।এমন সময় আমরা রাজশাহীর বাসায় আসলাম।আমাদের দেখেই সবাই ড্রইংরুমে আসলো।নিচের একটা রুম থেকে আম্মু আর মিনিকে বের হতে দেখেই দৌঁড়ে গিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম।অন্যদিকে সবাই উমান আর সাদ ভাইয়াকে নিয়ে ব্যস্ত।আম্মু আমাকে অনেক আদর করল।মিনি আমার কোলে উঠার বাইনা করতেই ওকে কোলে নিলাম।এই কয়দিনে মোটিটা আরও মোটা হয়েছে।অনেক কষ্টে ওকে কোলে নিয়ে বললাম,

‘হয়েছে এখন নামো।’

মিনি আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

‘না আল এটটু।’

মুচকি হেসে আম্মুর দিকে তাকালাম।আম্মু আমাদের নিয়ে ড্রইং রুমে সবার কাছে আসলো।উমান একটা সিঙ্গেল সোফায় বসে আছেন।উনার মুখে মিষ্টি হাসি।ফুপ্পি,বড়াম্মু আর প্রীতি আপু সাদ ভাইয়ার সাথে কথা বলছে।সাদ ভাইয়ার এত কাটা ছেড়া দাগ দেখে সবাই বিচলিত।এরা কেউ জানেনা সাদ ভাইয়ার কি হয়েছিল।আমি ড্রইংরুমে আসতেই সবাই আমার সাথে কুশল বিনিময় করল শুধু দাদি বাদে।দাদি সোফায় ভাব নিয়ে বসে আছেন।প্রীতি আপুও গিয়ে দাদির পাশে বসলো।বড়াম্মু আমার কাছে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।মিনিকে কোল থেকে নামিয়ে আম্মুর পেছনে দাঁড়ালাম।আম্মু আমাকে বলল,

‘দাদির সাথে কথা বল একটু।’

আমি দাদির দিকে তাকালাম।উনি অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন।আমি সালাম দিতেই দাদি উঠে দাঁড়িয়ে সালামের জবাব নিয়ে চলে যেতে লাগলেন।ফুপ্পি আমার কাছে এসে আমার গালে হাত বুলিয়ে বললেন,

‘আমার সোনা মা,কত্ত বড় হয়ে গিয়েছে।’

আমি মাথা নিচু করে মুচকি হাসলাম।এতগুলো মানুষের সামনে লজ্জা লাগছে।আম্মুর শাড়ির আচল ধরে দাঁড়িয়ে আছি।আমার হয়ে আম্মুই সবার সাথে কথা বলছে।এখানে আসার আগে উমান আামাকে বলেছেন বিয়ের কথা যেন এখনই কাউকে না বলি।এখন বললে বাসায় অশান্তি হবে তাই বাবা ফিরে আসলে সবাইকে জানানো হবে।আমি অশান্তির ভয়ে চুপ করে আছি কিন্তু মনে মনে ঠিক করেছি রাতে শোয়ার সময় আম্মুকে সব বলব।প্রায় আধঘন্টা ড্রইং রুমে থেকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য আম্মু আর বড়াম্মুর সাথে নিচেই একটা রুমে আসলাম।এই রুমে আম্মু মিনিকে নিয়ে থাকে।আমি একটা গোলাপি কালার টপস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম।ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখি উর্মি আপু আর প্রীতি আপুও এসেছে।আমাকে বের হতে দেখেই উর্মি আপু আম্মুকে বলল,

‘প্লিজ কাকি প্লিজ,মিতিকে রাতে আমার কাছে রাখবো।’

আমি মুখ মলিন করে আম্মুর দিকে তাকালাম।আম্মু আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল,

‘আজকে আমার কাছে থাকুক কাল থেকে তোমার সাথে থাকবে।’

উর্মি আপু হতাশ হয়ে বলল,

‘ঠিক আছে কিন্তু এখন ওকে নিয়ে যাই?গল্প আড্ডা শেষে ঘুমোনোর সময় এখানেই থাকবে।’

আম্মু আমাকে উর্মি আপুর সাথে যেতে বলল।আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপুর সাথে আসতে লাগলাম।উর্মি আপু আমার এক হাত ধরে হাঁটছে আর প্রীতি আপু ফোন টিপছে আর আমাদের পেছন পেছন আসছে।বাসাটা অনেক বড়।এক রুম থেকে আরেক রুমে যেতে অনেক হাঁটতে হচ্ছে।সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলায় আসতেই উর্মি আপু প্রীতি আপুর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘এই প্রীতি তুই আমার রুমে ওয়েট কর আমি মিতিকে নিয়ে দাদির রুম হয়ে আসছি।’

প্রীতি আপু ওকে বলে ফোন টিপতে টিপতে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা রুমে ঢুকে গেল।উর্মি আপু প্রীতি আপুর রুমে ঢোকা দেখা শেষে আমার হাত ধরে দক্ষিণ দিকের করিডোর দিয়ে হাঁটা দিলেন।কারুকাজ করা বিশাল একটা কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম।উর্মি আপু দরজাটা হালকা ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিয়ে তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

‘তুই ভেতরে যা আমি এখনই আসছি।’

আমি উর্মি আপুর হাত ধরে ব্যস্ত হয়ে বললাম,

‘এই না আপু,তুমিও চলো।দাদির সাথে তো আমার তেমন পরিচয় নেই।একা একা যেতে কেমন যেন লাগছে।’

উর্মি আপু মৃদু হেসে বলল,

‘কিছু লাগছেনা তুই যা তো।’

বলেই আপু আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।ভেতরে এসে দরজার কাছে উমানকে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই হকচকিয়ে লাফিয়ে উঠে উল্টোদিক ঘুরে দরজায় হাত দিতেই উমান আমার হাত ধরে ফেললেন।আমাকে এক সাইডে দাঁড় করিয়ে উনি দরজাটা ভেতর থেকে লক করে আমার দিকে তাকালেন।সাদা টিশার্ট আর কালো থ্রি কোয়াটার প্যান্টে আজকে উনাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে।ভেজা চুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র শাওয়ার নিয়েছেন।উনি আমার গালে ঠান্ডা হাত ছোঁয়াতেই একধাপ পিছিয়ে এসে মাথা নিচু করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলাম।এটা উমানের রুম।আগেও একবার এসেছি কিন্তু এত বড় বাসা শুধু একবার দেখে এর ওলি গলি মনে রাখতে পারিনি।আগে যদি বুঝতে পারতাম এটা উনার রুম তাহলে এখানে কিছুতেই আসতাম না।উমান আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

‘এরকম দূরে দূরে ঘুরছিস কেন?আসার পর থেকে কথায় বলতে পারছিনা।’

উনাকে ঠেলতে ঠেলতে বললাম,

‘ছাড়ুন আম্মুর কাছে যাব।’

উনি আমাকে আরও শক্ত করে ধরে বললেন,

‘সকালে যাস।রাতে এখানেই থাকবি তুই।’

সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে উনাকে ঠেলতে ঠেলতে চেঁচিয়ে বললাম,

‘না থাকবোনা এখানে,ছাড়ুন আমাকে,আমমমমম্মু!!’

উনি আমাকে কোলে নিয়ে সোফায় এসে বসে একহাতে আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।টেবিলে অনেক নাস্তা আছে উনি পায়েসের বাটি থেকে একচামচ পায়েস নিয়ে আমার মুখে ধরে মুচকি হেসে বললেন,

‘হা কর।আম্মু এটা তোর জন্য বানিয়েছে।একমাত্র ছেলের বউ তুই।তোর জন্য কত যত্ন করে বানিয়েছে তোর ধারণা নেই।’

খাবনা বলার জন্য মুখ খুলতেই উমান আমার মুখে পায়েস দিলেন।কড়া চোখে উনার দিকে তাকালাম।উনি নিজে একচামচ খেয়ে বললেন,

‘এক্সিলেন্ট!!’

আমি এখনও মুখের মধ্যে খাবার নিয়ে উনার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছি।উনি আমার কড়া নজরকে পাত্তা না দিয়ে খাওয়া শুরু করলেন।এই কয়দিন উনার সাথে থেকে বুঝেছি জোরজবরদস্তিতে উনি এক্সপার্ট।উনার যেটা করতে মন চায় উনি সেটায় করেন আর অন্যদেরও উনি যেটা চান সেটায় করান।আমাকে জোর করে খাওয়ানো শেষে বিছানায় আসলেন।ঘড়িতে রাত আটটাও বাজেনি আর উনি এখনই ঘুমোবেন।লাইট অফ করে উনি আমাকে কোলবালিশের মতো করে জড়িয়ে ধরে বললেন,

‘গুড নাইট।’

রেগে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম।উনি আমার গলার মধ্যে মুখ গুজে বললেন,

‘লিপ কিস না চাইলে থেমে যা।’

আমি থমথমে মুখ করে বললাম,

‘থাকবোনা এখানে।’

উনি মুখ দিয়ে বিরক্তের শব্দ করে আমাকে নিয়ে অন্যপাশ ফিরে শুয়ে বললেন,

‘আর একবার থাকবোনা বললে ক্লোরোফর্ম দিব।সেন্সলেস হয়ে পরে থাকবি সারা রাত।দিব?’

ভয় পেয়ে মিনমিন করে বললাম,

‘না,দিয়েন না।আমি তো খারাপ কিছু বলছিনা।আম্মুকে মিস করছি।’

উনি আমার গালে গাল ঠেকিয়ে নরম কন্ঠে বললেন,

‘আর আমি তোকে মিস করসি।আচ্ছা আমি ঘুমিয়ে গেলে চলে যাস।এখন আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দে।’

আমি অন্ধকার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,

‘এত অন্ধকারে যাব কি করে?’

উমান অন্ধকারে বেডসাইড টেবিল হাতরে ল্যাম্পশেড অন করে বললেন,

‘লাইট অন করে রাখলাম।আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলে ছুটি পাবি নাহলে নয়।’

তেজি কন্ঠে বললাম,

‘বকবক না করে ঘুমান তাড়াতাড়ি।’

উনি মৃদু হেসে চুপ হয়ে গেলেন।আমিও চুপ হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি।উমানের রুমটা বিশাল।আসবাবপত্র যা আছে সবই অনেক সুন্দর।বিছানাটা এত আরামদায়ক যে উঠতেই ইচ্ছে করছেনা।দরজার পাশেই আবলুসের মতো কালো রঙের কাঠের ক্লোজেটের উপর সিরামিকের একটা হাসের শোপিস রাখা আছে।ড্রিম লাইটের আলোতে সেটা চকচক করছে।মেঝের উপরেই সিলিংয়ে ঝুলানো আছে সুন্দর ঝাড়বাতি।মাথার উপর পাঁচ পাখার ফ্যান ঘুরছে নিঃশব্দে।কিছুক্ষণ ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে ডানপাশ হয়ে শুলাম।উমানের হাত আলগা হয়ে গিয়েছে।ঘুমিয়ে পরেছেন কিনা কে জানে!দেয়ালের শৌখিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সোয়া আটটা বাজে।মনে মনে ঠিক করলাম আর কুঁড়ি মিনিট পর চলে যাব ততক্ষণে উমান নিশ্চিত ঘুমিয়ে যাবেন।এখন ঘুমিয়েছেন কিনা জানার জন্য আস্তে করে উনাকে ডাকতেই উনি নড়েচড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

‘ঘুম পাচ্ছে আর একটু।’

আমি আর কথা বললাম না।কথা বললে উনার ঘুম ভেঙ্গে যাবে সেজন্য।অনড় আর বোবা হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখও লেগে আসলো।উঠবো উঠবো করেও উঠতে পারছিনা।ঘুমের মধ্যেই মস্তিষ্কের নিউরন গুলো বলছে উঠে আম্মুর কাছে যেতে।উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে আমি উঠে চলে যাচ্ছি কিন্তু আমার শরীর বিছানায় শুয়ে আছে।আত্মাটা খট করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো।বাইরে কেউ নেই।সবাই ঘুমিয়ে পরেছে।একা একা আমি কোনদিকে যাব ভেবে না পেয়ে আবার রুমের মধ্যে এসে ধপ করে আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে পরলাম।উমানকে জড়িয়ে ধরে আম্মুর কাছে যাওয়ার জন্য এক নাগাড়ে রিকুয়েস্ট করতেই আছি।রিকুয়েস্টের কোন শেষ নেই।শেষে উমান বিরক্ত হয়ে আমাকে আম্মুর কাছে রেখে গেলেন।আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে শান্তির ঘুম দিলাম।

চলবে…………….

(ছোট হল।দিবনা ভেবেছিলাম তাও দিলাম।পরের পর্ব ঈদের পর দিব।সবাইকে ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা “ঈদ মোবারক”।

আর একটা কথা সামনের দুটো দিন মুসলিমদের জন্য খুবই গুরুত্বপূরর্ণ।আপনারা রোজা রাখুন,সালাত আদায় করুন,বেশি বেশি ইবাদত করুন।ইমানের সাথে আরাফাতের একদিন ইবাদত করলে দশহাজার দিনের সাওয়াব পাবেন।)

গল্প:-#মনের_মহারাণী
লেখিকা:-#Sohani_Simu
পর্ব:-২৪

সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙলো দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে।বিরক্ত হয়ে নড়েচড়ে উঠে বসলাম।উর্মি আপু গিয়ে দরজা খুলে দিল।আম্মু ঘরে ঢুকে বলল,

‘উঠেছো তোমরা?’

আমি ভ্রু কুচকে ওদের দিকে তাকিয়ে আছি আর মনে মনে ভাবছি কাল রাতে তো উমানের রুমে ঘুমিয়েছিলাম আর এখন উর্মি আপুর রুমে কিভাবে আসলাম?আমার ভাবনার মাঝেই উর্মি আপু আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘হুম আমি আরও আগেই উঠেছি, মিতি এই মাত্র উঠলো আর প্রীতি দশটার আগে উঠবেনা।’

উর্মি আপুর কথা শুনে আমার পাশে শুয়ে থাকা প্রীতি আপুর দিকে তাকালাম।প্রীতি আপু কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কিন্তু দুই পা কম্বলের বাইরে রেখেছে।আম্মু বিছানার কাছে এসে আমাকে বলল,

‘তাড়াতাড়ি উঠো মাম,তোমার নানুর বাসায় যাব।’

আমি বিছানার ধারে গিয়ে আম্মুর পেট জড়িয়ে ধরে ঘুম ঘুম কন্ঠে বললাম,

‘কোথায় আমার নানুর বাসা?’

আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

‘চলো,গেলেই দেখতে পাবা।’

আমি ইনোসেন্ট মুখ করে আম্মুর দিকে তাকালাম।আম্মু গোসল করে কালো পাড়ের হালকা নীল শাড়ি পড়েছে।ভেজা চুলগুলো কোমড় পর্যন্ত ছাড়িয়ে আছে।অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছে।এই গন্ধ শুধু আম্মুর গা থেকেই পাই।আম্মু বলে এটা মায়ের গায়ের গন্ধ।সন্তানরা ছাড়া এই গন্ধ কেউ অনুভব করতে পারেনা।আম্মু আমার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,

‘তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো আমি মিনিকে রেডি করিয়ে দিই।’

আমি মাথা নাড়ালাম।আম্মু আমার কপালে চুমু দিয়ে রুম থেকে চলে গেল।উর্মি আপু মোটা একটা ডক্টরি বই হাতে নিয়ে সোফায় বসে আছে।আমি আপুর দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বললাম,

‘আপু?আমি এখানে কখন এসেছি?’

আপু বইয়ের দিকে তাকিয়েই বলল,

‘ভোরে উম রেখে গিয়েছে।’

আমি কিঞ্চিত রেগে বললাম,

‘তুমি আমাকে ওই রুমে কেন রেখে এসেছিলে?তুমি জানো উম ভাইয়া আমাকে জোর করে….’

উর্মি আপু ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিলেন।আমি একটু ভয় পেয়ে আশেপাশে তাকালাম।উর্মি আপু বই রেখে আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে ব্যালকনিতে এসে ফিসফিস করে বলল,

‘বিয়ের কথা এখনই কাউকে বলিসনা,খুব অশান্তি হবে।চাচ্চু ফিরে আসুক তারপর বলিস।এখন এসব জানাজানি হয়ে গেলে দাদি অনেক রেগে যাবে।’

আমি ভ্রু কুচকে বললাম,

‘আমি উম ভাইয়াকে বিয়ে করবনা।’

উর্মি আপু আমার গাল টেনে বলল,

‘বিয়ে হয়ে গেছে পাগলি।’

আমি ঠোঁট উল্টে বললাম,

‘বাবাকে বলে দিব।’

উর্মি আপু মুচকি হেসে বলল,

‘আচ্ছা বলিস।’

আমি থমথমে মুখ করে ধপ ধপ করে পা ফেলে রুমে এসে ফ্রেশ হতে ঢুকলাম।সাদা গাউন আর গোলাপি পায়জামা ওড়না পরে বেড়িয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে উর্মি আপুর রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।উর্মি আপুও আমার সাথে নিচে আসলো।মিনিকে উমানের সাথে ড্রইং রুমের সোফায় বসে থাকতে দেখেই অন্যদিকে হাঁটা দিলাম।উর্মি আপু আমাকে ডেকে বলল,

‘আরে ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?ওদিকে কিচেন।’

উমান সোফাতে বসে থেকেই বললেন,

‘মিতি?শোন।’

আমি নাক মুখ ফুলিয়ে পেছনে ঘুরে উনার দিকে তাকালাম।উনি মুচকি হাসছেন।আমি ভ্রু কুচকে মিনিকে বললাম,

‘মিনি?আম্মু কোথায়?’

মিনি উমানের হাতের আঙুল টানছিল আমার কথা শুনে সোফা থেকে নামতে নামতে বলল,

‘আম্মুল কাছে যাই।’

বলেই মিনি আম্মুর ঘরের দিকে দৌঁড়ে গেল।আমিও মিনিকে অনুসরণ করে সেদিকে যেতে গিয়ে উমান পেছন থেকে খপ করে আমার হাত ধরে ফেলে বললেন,

‘কোথায় যাচ্ছিস?ডাকলাম না তোকে?’

উনার দিকে ঘুরে হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললাম,

‘ছাড়ুন আম্মুর কাছে যাব।’

উমান উর্মি আপুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘আপু নিয়ে যাই ওকে?তুই একটু এদিকটা সামলে নে।’

আপু সেন্টার টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে বলল,

‘না এখন নয়।ছোটআম্মু ওকে নিয়ে ওর নানুর বাসায় যাবে।তাছাড়াও ব্রেকফাস্ট হয়নি এখনও।’

উমান আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

‘আমিও যাব তোদের সাথে।’

তারপর উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দ্রুত উপরে যেতে যেতে বললেন,

‘ওয়েট আমি জাস্ট টু মিনিটে আসছি।’

কিসের ওয়েট?পারবোনা।আমি বড় বড় পা ফেলে আম্মুর কাছে আসলাম।আম্মু বিছানায় বসে লাগেজ গোছাচ্ছে।আমি গিয়ে আম্মুর সামনে বসলাম।আম্মু মিনির ড্রেস গোছাতে গোছাতে বলল,

‘উর্মির রুমে তোমার লাগেজ আছে না।ওখান থেকে দুটো ড্রেস নিয়ে আসো।আজকে আমরা তোমার নানুর বাসায় থাকবো।

আনছি বলে দৌঁড়ে উর্মি আপুর রুমে যেতে লাগলাম।সিঁড়ি দিয়ে দাদিকে নামতে দেখেই আমি একদম নিচের সিঁড়িটায় মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম।উর্মি আপু ড্রইং রুমেই বসে আছে।ইচ্ছে করছে দৌঁড়ে উর্মি আপুর কাছে চলে যাই।পেছন দিকে একধাপ দিতেই দাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘এই মেয়ে দাঁড়া ওখানে।’

আমি অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়ালাম।দাদি আমার চারটে সিঁড়ি উপরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন,

‘তোর বাবার সাথে কথা হয়েছে?’

আমি মিনমিন করে বললাম,

‘না।’

দাদি অন্যদিকে তাকিয়ে আদেশ করার মতো করে বললেন,

‘তোর বাবা ফোন দিলে বলবি আমার সাথে যেন কথা বলে।আর তুই এভাবে ইঁদুরের মতো দৌঁড়াদৌঁড়ি করবিনা।তোর ছোটটাকেও যেন ইঁদুরের মতো দৌঁড়াতে না দেখি।আমি এসব একদম পছন্দ করিনা।বাড়িতে এতগুলো ছেলে মানুষ,চাকর-বাকর আর এত বড় মেয়ে ধেই ধেই করে দৌঁড়াচ্ছে।’

বলেই দাদি নিচে নামতে লাগলেন।আমি মাথা নিচু করে আড় চোখে দাদির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম আমি ইঁদুর?তুই তাহলে ডাইনি বুড়ি।বাবা আসুক একবার,বাবাকে বলে দিব তুই আমাকে ইঁদুর বলেছিস।

দাদি নিচে গেল আমি উপরে উর্মি আপুর রুমে আসলাম।প্রীতি আপু এখনও বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।সারারাত কি চুরি করে নাকি!আমি নিঃশব্দে লাগেজ খুলে দুটো ড্রেস বের করে নিলাম।বেড সাইট টেবিলে প্রীতি আপুর ফোন চার্জে দেওয়া আছে।কয়টা বাজে দেখার জন্য আপুর ফোনের পাওয়ার বাটন অন করতেই উমানের ছবি দেখে ভরকে গেলাম।মুহূর্তেই আমার মুখ কালো হয়ে গেল।প্রীতি আপুর ফোনে উমানের ছবি থাকবে কেন?আমি শুকনো মুখ করে ড্রেস নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।করিডোরে এসে উমানের সাথে দেখা।উনি সাদা শার্ট আর ব্লু জিন্স প্যান্ট পরেছেন।আমাকে এখানে দেখে যেন উনার আনন্দের সীমা নেই।উনাকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই আমি এক দৌঁড়।নিচে এসে দাদিকে দেখেই দৌঁড়ানো থামিয়ে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে লাগলাম।ডাইনি বুড়িটা সোফায় বসে চা খাচ্ছে আর আমার দিকে রাগী চোখে তাকাচ্ছে। মিনিকে দেখলাম ডল কোলে নিয়ে ঘর থেকে লাফাতে লাফাতে বের হয়ে আসছে।এই বুড়িটাতো এবার আরও রেগে যাবে।আমি তাড়াহুড়ো করে ড্রইংরুম ক্রস করে আম্মুর রুমে এসে আম্মুকে ড্রেসগুলো দিলাম।দাদি যা যা বলেছে সব আম্মুকে বললাম,উমান আমাদের সাথে যেতে চেয়েছেন সেটাও বললাম।আম্মু লাগেজের চেইন লাগিয়ে বলল,

‘দাদির কথা শুনতে হয়।দৌঁড়াতে নিষেধ করেছে তাই আর দৌঁড়াবেনা।’

আম্মুর কথা শুনে আমি ঠোঁট উল্টালাম।আম্মু লাগেজ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো।আমিও আম্মুর আঁচল ধরে বেরিয়ে আসলাম।মিনি সেন্টার টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে উমানকে ইংলিশ ছড়া পড়ে শুনাচ্ছে।উমান আর উর্মি আপুকে খুব মনোযোগী শ্রোতা মনে হলেও দাদিকে উল্টোটা মনে হচ্ছে।দাদি রেগে আছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।মিনি টেবিলের উপর উঠেছে এটা দাদির পছন্দ হয়নি।আম্মু মিনিকে ডাকতেই মিনি আম্মুর দিকে তাকালো।দাদি আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘ছোট বউমা?এদিকে আসো।’

আম্মু লাগেজ রেখে দাদির দিকে এগিয়ে গেল।আমিও আম্মুর পেছন পেছন আসলাম।আম্মু নরম কন্ঠে বলল,

‘জ্বী মা বলুন।’

দাদি কড়া কন্ঠে বললেন,

‘তোমার ছোট মেয়ের নাম মিনি কেন?কুকুর বিড়ালের নাম মিনি রাখা হয়।’

আম্মুর মন খারাপ হয়েছে বুঝতে পারলাম।আম্মু মলিন কন্ঠে বলল,

‘আসলে মা ওর নাম মিলি।ছোটবেলা থেকেই মিতি ওকে আদর করে মিনি ডাকে তাই আমরাও ডাকি।’

দাদি আমার দিকে তাকিয়ে রাগী কন্ঠে বললেন,

‘ও ডাকলে তোমাদেরও ডাকতে হবে?এই তুই ওকে কুকুর বিড়ালের নামে ডাকিস কেন?বোন হয়না ও তোর?বোনকে কেউ এসব নাম দেই?’

দাদির কথা শুনে আমার চোখ ছলছল করে উঠলো।কিছুদিন আগেও ল উচ্চারণ করতে পারতাম না।লাল কে বলতাম নাল লিচুকে বলতাম নিচু আর মিনি তো হয়েছে আরও আগে।আমি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম।বাবা শখ করে মিলি নাম রাখলো আমি হাজার চেষ্টা করেও মিলি বলতে পারিনা।বার বার মিনি হয়ে যায়।বাবা বলেছিল আমার মুখে মিনি নামটায় বাবার কাছে বেশি সুন্দর লাগছে।তাই বাবাও মিনি ডাকতে শরু করল আর বাবার দেখে আম্মুও কিন্তু বার্থ সার্টিফিকেটে মিলি নামই দেওয়া আছে।

দাদি আবার আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ওসব মিলি মিনি কিছু নয় বুলবুলের মেয়ের নাম ব তেই হওয়া উচিত।বড়টার নাম হবে বেলিফুল,বেলিফুল আমার শাশুড়ি মার নাম ছিল আর ছোটটার নাম হবে বেলা।আমি আজই আকিকার ব্যবস্থা করছি।’

উমান হো হো করে হেসে দিলেন।আমি তো ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে দিয়েছি।বেলিফুল!কি বিশ্রী নাম।বেলি মানে তো পেট।আমার ফ্রেন্ডরা শুনলে হাসতে হাসতে পেট ফাটিয়ে ফেলবে।আমি কাঁদছি আর মিনি কিছু না বুঝে উমানের সাথে হাসাহাসি করছে।উর্মি আপু একবার আম্মুর দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার দাদির দিকে তাকাচ্ছে।আম্মু আমাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে দাদির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলল,

‘কিন্তু মা ওদের আকিকা হয়ে গিয়েছে।ওদের বাবা নিজে পছন্দ করে এসব নাম দিয়েছে। আর এতবছর পর চেন্জ করলে কেমন দেখাবে।’

দাদি কাঠ গলায় বললেন,

‘তুমি চুপ কর।এখানে আমি যা বলব তাই হবে।’

আম্মু আর কিছু বলল না।আমি নাক টেনে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে লাগলাম।উমান হাসি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘এই টুকুতেই কান্না করা লাগবে?আমি আছি না?’

তারপর উমান দাদির দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘আমি একটা নাইজেরিয়ান কুকুর কিনবো তার নাম রাখবো আনারকলি।’

দাদি ফুসে উঠে বললেন,

‘উমান!!’

উমান সোফা থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখমুখ শক্ত করে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘আন্টি চলো।’

চলবে…………..

(রি-চেইক করা হয়নি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here