#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব-২৯
বসন্তের উৎসবের আমেজ একদিন শেষ হওয়ারই ছিল। হঠাৎ এক বৈশাখের ঝড় আসার অপেক্ষায় ছিল না কেউ। ঝড় এলো, সবকিছু লন্ডভন্ড করে দম ছাড়ল। হঠাৎ দমকা আবহাওয়ার ন্যায় ছড়িয়ে গেল ঊষা এবং ইব্রাহিমের ভালোবাসার কথা। ঊষার বাড়ির পরিবার ক্ষেপে গেছে ভীষন। ঊষার বাবার বন্ধুর কানেও গেল সে খবর। ঊষাদের পরিবারকে ছেলেপক্ষ যা নয় তাই বলে অপমান করল। মাথা হেঁট হয়ে এলো ঊষার বাবার। সেই অপমান লাঞ্ছনার প্রভাব পরল স্বয়ং ঊষা এবং কুসুমের মায়ের উপর। ঊষাকে রাতারাতি ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া হল। ঊষা যাবার আগে পাথর বনে গিয়েছে। না পারছে ইয়াহিয়ার বুকে নিজের বুকে চেপে থাকা কান্না উপচে দিতে আর নাইবা পারছে এত সাধের পরিবারকে এভাবে ভেঙে পরতে দেখতে। ঊষা যেদিন বাড়ি যাবে, সেদিন কুসুম দ্রুত নিজের বাপের বাড়ি এলো। ঊষার অবস্থা ভীষন নাজেহাল। এভাবে অপদস্ত হতে হয়েছে ইয়াহিয়াকে, সেটা ভাবলে ঊষার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। ভালোবাসে যাকে, তার অপমান কিভাবে সহ্য হয়?
কুসুম ঊষার ঘরে এলো। ঊষা তখন বই ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। কুসুম দ্রুত ঊষাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। ঊষা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুসুম ঊষার কাধে মুখ গুঁজে প্রায় কেঁদেই দিয়েছে। কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল,
‘ যেও না আপা। আমরা আছি তো। ভাইয়াও আছে। প্লিজ যেও না। ফুপাকে বোঝাব আমরা, সত্যি। ভাইয়া কোথায়? ও কথা বলেছে ফুপার সঙ্গে? আপা? ‘
কুসুম ঊষার গা ধরে ঝাঁকায়। ঊষা নিরবে চোখের জল ফেলে সঙ্গেসঙ্গে মুছে ফেলে। তারপর বেশ শান্ত কণ্ঠে বললে,
‘ আমার যেতে হবে, কুসুম। এভাবে তোদের পরিবারকে অপমানিত করতে পারিনা আমি। আমার সেই অধিকার নেই।’
কুসুম বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, ‘ এই পরিবার শুধু আমাদের না আপা, তোমারও। চার বছর থেকে কিভাবে আগলে রেখেছ এই পরিবারকে আমি নিজে দেখেছি। পরিস্থিতির চাপে পরে ভাইয়াকে ছেড়ে দিও না আপা। ভাইয়াকে কল করো এক্ষুনি। আমরা তোমার বাড়ি যাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তুমি যেও না আজ। ‘
কুসুম ফোন নিয়ে কল করতে উদ্যত হয় ইয়াহিয়াকে। তবে তাকে আটকে দেয় ঊষা। কুসুম প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো ঊষা ভাঙা স্বরে বলে,
‘ তোর ভাইয়ার সামনে আমাকে আর নিচু করে দিস না কুসুম। ও এমনিতেই অনেক কিছু সয়েছে। ওর আর এক ফোঁটা অপমান হলে, আমার বেচে থাকতে ইচ্ছে করবে না। যেই মানুষকে আমি এতটা সম্মান করি, সেই মানুষের এতটা অপমান হতে দেখে আজ আমি কিচ্ছু করতে পারছি না, কিচ্ছু না। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি। বিশ্বাস কর কুসুম, আমার হাতেও কিছু নেই। বাবাকে আমি ভয় পাই। কাল বাবার ওই রক্ত গরম করা চোখ দেখে আমার গলা দিয়ে এক ফোঁটা কথা বের হয়নি। বাবা রেগে আমাকে খুন কর ফেললেও আমি আশ্চর্য্য হব না কুসুম। বাবা এমনি। আমি তাকে ছোট বেলা থেকে এমনি দেখে এসেছি। আমি এসব অভ্যস্ত হলেও, ও অভ্যস্ত নয়। আমি দেখেছি বাবা যখন ওর মুখের সামনে আঙুল তুলে কথা বলেছিল, ওর চোখ লাল হয়ে গেছিল। তবুও সে আমার জন্যে বাবা মুখের উপর চুপ করে ছিল। কিন্তু আর না! আমার জন্যে এই পরিবারের এতটা অশান্তি আমি সত্যি আর নিতে পারব না। আমাকে আটকাবি না আর। আর না তোর ভাইয়াকে ঐ বাড়ি পাঠাবি। যেতে চাইলে তুই আটকে রাখবি। ঐ বাড়ি গেলে বাবা তোর ভাইয়াকে মেরে ফেলবে রে। প্লিজ বোন আমার! কথাটা রাখিস। ‘
কুসুমের চোখ ভর্তি জল টলমল করেছে। ঊষা আপার এই কথা সে একদমই রাখতে পারবে না, আর ভাইয়াও ওর কথা শুনবে না। ছোট থেকে দেখে এসেছে ইয়াহিয়া শান্ত অথচ কি ভীষন জেদী ছেলে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে এতটা সহজে ছেড়ে দেবার মানুষ দে কখনোই ছিল না। কুসুমের নিজের ভাইয়ের প্রতি পুরো বিশ্বাস আছে। কুসুম আটকাল না আর ঊষাকে। ঊষাকে নিতে তার হবু স্বামী এলো। যখন ইয়াহিয়ার সামনে ঊষার হবু স্বামী ঊষার হাত চেপে ধরে রেখেছিল, ইয়াহিয়া শুধু হাত মুঠো করে চেয়ে দেখেছে। ঊষার অসহায় চাওনি দেখে আর কিছুই করতে পারেনি সে। নাহলে আজ এক ছেলের মুখের নকশা বদলে দিতে এটুকু সময়ও নিত না সে। ঊষা চলে গেল। ঊষা চলে যেতেই ইয়াহিয়া ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। সাহেদা পেছন ডাকেন। ইয়াহিয়া শুনে না। সেই যে বেড়িয়ে যায়,রাত হয়ে গেছে এখনো বাড়ি ফেরে নি।
সাহেদা নিজের রুমে বসে কোরআন পড়ছেন। কুসুম এসে পাশে বসল। নির্বাক হয়ে মায়ের কোরআন পড়া শুনছে। সাহেদা কোরআন পড়ার সময় কাদছেন। কান্নার জল গড়িয়ে পরছে কোরআন শরীফের উপর। ঘন্টা লাগিয়ে কোরআন পড়া শেষ করে সাহেদা কোরআন জায়গায় রাখেন। বিছানার এক পাশে বসে থাকেন চুপচাপ। কুসুম কিছু সময় পর এসে মায়ের গা ছুঁয়ে বসে। সাহেদা একপল মেয়েকে দেখে আবার সামনে তাকান। কুসুম খানিক পর ভাঙা স্বরে বলে,
‘ আম্মা, আপা কি আর কখনোই আমাদের বাড়ি আসবে না? আব.. বৌ হয়ে? ‘
কুসুম ভেবেছিল শেষের কথা শুনে সাহেদা রাগ করবেন। অথচ সাহেদা কিছুই বললেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও চুপচাপ বসে রইলেন। কুসুম আবার বলল,
‘ আম্মা চলো না, আমরা আপার বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাই? আপা খুব কষ্টে আছে। ‘
সাহেদা উত্তর দিলেন না। কিন্তু কিছু সময় পর ক্লেশপূর্ন কণ্ঠে বললেন,
‘ সবকিছু ঠিক থাকলে, আমি যেতাম ওদের বাড়ি ঊষার হাত চাইতে। কিন্তু এখন….সব উলোটপালোট হয়ে গেছে। সবকিছু আমাদের হাতের বাইরে। কিচ্ছু করার নেই এখন। কিচ্ছু না। ‘
কুসুমের খুব করে কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কান্না ভেতর ভেতর চেপে রেখে কুসুম প্রশ্ন করল,
‘ ভাইয়াকে এভাবে মরে যেতে দিবে আম্মা? ঊষা আপাকে ভাইয়া প্রচন্ড ভালোবাসে। আপা ছাড়া ভাইয়া পাগল হয়ে যাবে আম্মা। ‘
সাহেদা ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে বললেন,
‘ আমার ছেলে খুব শক্ত রে কুসুম। সে নিজেকে সামলে নিবে নয়ত পরিস্থিতি ঠিক করে নিবে। ঊষার পরিবারকে কিভাবে মানাবে সেটা ও জানে। আমি মায়ের দায়িত্ত্ব পালন করার অপেক্ষায়। ভীষন অপেক্ষায়। ‘
কুসুম সব শুনে। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকে আর কিছুক্ষণ। চোখের দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে কুসুমের চোখ থেকে। কুসুম সঙ্গেসঙ্গে চোখ মুছে উঠে যায় বিছানা ছেড়ে। দৌড়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে ফেলে। বিছানায় বসে এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলে। এতক্ষণ খুব কষ্ট করে কান্না চেপে রাখার দরুন এখন এত কেঁদেও মন হালকা হচ্ছে না। কুসুমের ফোন বেজে উঠে এবার। কুসুম ফোন হাতে নিয়ে দেখে উচ্ছ্বাস কল করেছে। কুসুম সঙ্গেসঙ্গে কল রিসিভ করে কেঁদে উঠে আবার। উচ্ছ্বাস ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘ কুসুম? কি হয়েছে? ওখানের সব ঠিকাছে? এভাবে কাদছ কেন? এই কুসুম? ‘
কুসুম কান্না করতে করতে বলল, ‘ সব শেষ হয়ে গেছে উচ্ছ্বাস, সব শেষ। আপা চলে গেছে। আর আসবে না। জানেন, আপাকে নিতে এসেছে আপার ওই জঘন্য ফিওন্সি। ভাইয়ার সামনে ও ছেলে আপার হাত ধরেছে, জড়িয়ে রেখেছে আপাকে। ভাইয়ার খুব কষ্ট হয়েছে জানেন তখন? আমি আর নিতে পারছি না এসব। আমার খুব খারাপ লাগছে। ভাইয়া…ভাইয়া কিভাবে এসব সহ্য করছে? ‘
উচ্ছ্বাস সব শুনে কিছুটা বিস্মিত হয়েছে। এমনটা হবে সে আগেই কুসুমের কথা শুনে ভেবেছিল। তবে এতটা জটিল হয়ে যাবে পরিস্তিতি সেটা সে আন্দাজ করতে পারেনি। তবুও কুসুম কাদঁছে দেখে উচ্ছ্বাস বলল,
‘ শান্ত হও, কুসুম! কান্না থামাও। আমার কথা শুনো। কান্না থানাও বলছি। ‘
কুসুম নাক টেনে কান্না আটকাল। উচ্ছ্বাস বলল,
‘ শুনো কুসুম, ইয়াহিয়া যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে। তোমার চেয়ে ওর মাথায় বুদ্ধি বেশি যতটুকু বুঝলাম। ও ঠিক কোনো না কোনো রাস্তা বের করে ফেলবে। এখন আমরা শুধু অপেক্ষা করতে পারি, আর কিছুই না। ‘
‘ এতোটা সহজ মনে হচ্ছে সবকিছু আপনার কাছে? ‘
‘ সহজ ভাবলে সহজ, কঠিন ভাবলে কঠিন। আচ্ছা ধরো, আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা। তোমার বয়স বিয়ের সময় খুবই কম ছিল। আমি ঘুর্ণক্ষরে ভাবিনি এই ছোট্ট মেয়ের প্রেমে পরব আমি, পাগল হয়ে যাব। হয়েছি তো। এটাই নিয়ম। পরিস্থিতি নিজেকে যতটা জটিল দেখানোর ট্রাই করে, আসলে সে ততটা জটিল থাকে না। আমরাই তাকে জটিল বানাই। সহজ ভাবে সবকিছু সলিউশন করতে শিখে ফেললে পরিস্থিতির এসব কারচুপির ফাঁদে পা দেয়া লাগে না। তাই আমি বলব, তুমি শান্ত থাকো। ইয়াহিয়ার আশেপাশে থাকো। ওর অবস্থা বোঝার ট্রাই কর। ওকে সময় দাও। আর হ্যাঁ, ওর সামনে কান্নাকাটি করো না। সামনের কদিন পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া অব্দি তুমি চাইলে বাপের বাড়ি থাকতে পারো। আমি আম্মাকে বুঝিয়ে বলব। সমস্যা আছে তোমার? ‘
কুসুম ভেবে শেষপর্যন্ত উচ্ছ্বাসের কথাতেই সম্মতি দিল। উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথা বলে এখন মনটা হালকা লাগছে খুব। কুসুম নিরবে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল।
#চলবে
#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব – ৩০
‘আম্মা, দ্রুত তৈরি হও। ঊষাদের বাড়ি যাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’
সাহেদা চোখ চড়কগাছ করে চেয়ে আছেন ইয়াহিয়ার দিকে। ইয়াহিয়ার চোখ ভীষন লাল। শান্ত অথচ রাগে যেমন ভোসভোস করছে। কুসুম এগিয়ে এল। মাকে ছুঁয়ে বলল,
‘আম্মা?’
সাহেদা নিজেকে স্বাভাবিক করলেন। বললেন,
‘ওরা যদি আবার তোকে অপমান করে? তোর বাবা নেই। আমাদের মূল্য ওদের কাছে এখন আগের ন্যায় নেই। আর এই কান্ড পর ওরা আমাদেরকে এখন চোখেই দেখবে না।’
‘না দেখুক। মেয়ে না দিলে, ছিনিয়ে আনব। তোমার কোনো আইডিয়া আছে, ওরা ঊষার সঙ্গে কি করছে? জানোয়ারও এর চেয়ে ভালো। টাকার গরমে ফুপা অন্ধ হয়ে গেছেন। উনার অন্ধগিরি আমি ছুটাচ্ছি আমি। তুমি আগে তৈরি হও। কুসুম, যা তৈরি হয়ে আয়। আমি যা যা গিফট লাগে, কিনে আনছি।’
কুসুম মায়ের দিকে তাকাল। সাহেদা বুঝতে পারছেন, ঊষার হয়ত কিছু হয়েছে। নাহলে তার শান্ত ছেলে এমন ভয়ংকর রণমূর্তি হয়ে যাবার কথা না। সাহেদা রাগান্বিত ছেলের দিকে একপল চেয়েই নিজের রুমে ছুটলেন।
____________________________
‘বাবা? প্লিজ! দয়া করো আমার উপর। এই বিয়ে করতে পারব না আমি। বেচে থাকতে জিন্দা লাশ বানিয়ে দিও না আমাকে। প্লিজ!’
ঊষার বাবা মিষ্টির প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে রক্তচোখে তাকালেন মেয়ের দিকে। ঊষা বাবার এমন চাওনি দেখে ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল। ছলছল চোখে চেয়ে দেখল পাশে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে। মায়েরও যে কিছু করার নেই। বাবার উপর এই বাড়িতে কেউই কথা বলতে পারে না। ঊষা পাথরের ন্যায় হেলেদুলে নিজের রুমে গেল। দরজা বন্ধ কর মেঝেয় বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সব শেষ, সব কেমন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এক নিমিষে। ঊষা আরেক পুরুষের ঘরে যাবে, তার সাথে শুবে, তার ছোঁয়া সমগ্র দেহে নিয়ে ঘুরবে! এসব কিছু ভাবতেই ঊষার পেট বিতৃষ্ণায় গুলিয়ে আসছে। অন্য পুরুষের ছোয়া দেহে লাগার আগেই ঊষা ছেড়ে দেবে এই দুনিয়া। ইয়াহিয়া…. ওর ইয়াহিয়া এখন কেমন অবস্থায় আছে কে জানে? ঊষা দ্রুত মেঝে থেকে উঠল। লাগেজ বের করে বহু আকাঙ্ক্ষিত একটা কাগজ বের করে। কাগজটা ওর কাছে বড্ড অদ্ভুত!
শক্ত কাগজের চতুর্দিকে ঊষার লিপস্টিকের দাগ। মাঝখান কালো ছোপছোপ দাগ। সেখানে ইয়াহিয়ার সবসময় ব্যবহৃত পারফিউম স্প্রে করা। ঊষা কাগজটা নাকের কাছে নিয়ে পারফিউমের ঘ্রাণ শুঁকল। সেদিনের কথা মনে আছে তার। ঊষার সঙ্গে বাড়ির বাইরে তৃতীয় দেখা হয় ইয়াহিয়ার।
ঊষাকে অনেকবার চুমু খাওয়ার রিকোয়েস্ট করলে, ঊষা বারবার ফিরিয়ে দিয়েছিল ইয়াহিয়াকে। ইয়াহিয়া এতে মুখে কিছু না বললেও মনেমনে মনক্ষুন্ন ছিল। ঊষা তা বুঝতে পেরে সান্তনাস্বরূপ একটা শক্ত কাগজে তার ঠোঁটের ছাপ বসিয়ে গিফট হিসেবে কাগজ ইয়াহিয়াকে দেয়। কাগজের এক পাশে গ্লিটার পেন দিয়ে লেখা,
‘শখের তোলা আশি টাকা। আমাদের সকল শখ বিয়েতেই পূর্ণতা নেবে! আমি অপেক্ষায় সেদিনের। ঠোঁটচুমু না খাও, কাগজচুমু দিলাম প্রাণ ভরে। গ্রহন করো এবং আমার অসংখ্য চুমুর ভালোবাসা নিও। ভালোবাসি! জানি তুমিও বাসো! তাই জিজ্ঞেস করলাম না।’
ঊষা হাত বাড়িয়ে গ্লিটার পেনে লেখাগুলো ছুঁয়ে দিল। চোখ উপচে জল গড়িয়ে কাগজে পরছে। ঊষার মনে আছে, সেদিন ইয়াহিয়া ঊষার এই ব্যাপারে খুব হেসেছিল। ঊষা তো লজ্জায় প্রায় আধমরা। ইয়াহিয়া হেসে তার সবচেয়ে পছন্দের পারফিউম কাগজে স্প্রে করে বলেছিল,
‘আমি যেমন তোমার ঠোঁটচুমুর পাগল, তেমন তুমিও আমার এই পারফিউমের দেওয়ানা। লুকিয়ে লুকিয়ে পারফিউমের গন্ধ শুকবে না। যখন ইচ্ছে করবে এই কাগজের ঘ্রাণ শুকে নিবে। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে হাসব না আর। ভালোবাসি! জানি তুমিও বাসো। তাই আর জিজ্ঞেস করলাম না।’
ঊষা ইয়াহিয়া হাতের লেখা ছুঁয়ে দিল। কান্নাভেজা কণ্ঠে আউড়াল,
‘বাস্তবে তোমার বুকের সঙ্গে মিশে বোধহয় আর কখনো তোমার পারফিউমের গন্ধ নেওয়া হবে না। আমাকে মাফ করে দিও। আমি আমাদের বিয়ের ওয়াদা রাখতে পারিনি।’
____________________________
ঊষাকে পাত্রপক্ষের সামনে বসান হল। সকল নিয়ম পূরণ করে কাজি ঊষাকে কবুল বলতে বললেন, ঊষা বলছে না। বেশ সময় পেরিয়ে গেলেও ঊষার মুখে একটা শব্দও বের হচ্ছে না। ঊষার বাবা লজ্জিত চোখে ছেলেপক্ষের দিকে চেয়ে আবারও গরম চোখে ঊষার দিকে তাকালেন। ঊষা বাবার চাওনি দেখে দমে গেল। কিন্তু এখনও কবুল বলছে না। তার চোখ লেগে আছে সদর দরজার দিকে। প্রিয় মানুষটা আসার অপেক্ষায় এখনো সে বসে, প্রহর গুনছে। ছেলের বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন,
‘মেয়ের প্রথম প্রেমিক ভুলে নাই এখনো? এমন হলে বিয়ের এই নাটক কেন সাজিয়েছিস? আমাদের বোকা বানাতে?’
ঊষার বাবার এবার রক্ত গরম হয়ে গেল। সোফা ছেড়ে উঠে চপাট করে মেয়ের গালে থাপ্পড় বসাবেন উদ্যত হলেন, তার আগেই ঊষা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অস্ফুট স্বরে বলল,
‘ইয়হিয়া?’
ইয়াহিয়ার অতৃপ্ত চোখ নিবদ্ধ ঊষার দিকে। ঊষার চোখে অবিশ্বাস। এতক্ষণ আটকে রাখা চোখের জল বাঁধ ভেঙে টুপ করে গড়িয়ে পরল। ঊষার বুকটা মুচড়ে উঠল যেমন। ইয়াহিয়া এগিয়ে আসল। সাহেদা সকল উপহার ঊষার মায়ের কাছে তুলে দিলেন। অনেক আশা নিয়ে সুধালেন,
‘আমরা ইয়াহিয়ার জন্যে ঊষার হাত চাইতে এসেছি আপা।’
ঊষার মা সাহেদার দিকে ছলছল চোখে চেয়ে পুনরায় স্বামীর দিকে তাকান। ঊষা এখনো চেয়ে আছে ইয়াহিয়ার দিকে। ইয়াহিয়ার তীক্ষ্ম নজর ঊষার পাশে বাঁকা হেসে বসে থাকা ঊষার হবু স্বামী উল্লাসের দিকে। ঊষা আড়চোখে বাবার দিকে তাকাল। ঊষার বাবা ইয়াহিয়াকে দেখে তেতে উঠলেন। তেড়ে আসলেন,
‘তুমি কি করো এখানে? খবরদার আমার মেয়ের বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করলে তোমাকে আমি পুলিশে দেব। এটুকু ক্ষমতা আছে আমার।’
ইয়াহিয়ার চোখ এবার সোজা নিক্ষেপ হল ঊষার বাবার দিকে। সে শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
‘আমরা এখানে কি জন্যে এসেছি আম্মা বলেছেন আপনাদের। এবার আপনাদের সিদ্ধান্ত জানান। আমরা অপেক্ষা করছি।’
ঊষার বাবা দায়ছাড়া ভাবে উত্তর দিলেন,
‘আমি আমার মেয়ে তোমার কাছে নিয়ে দেব না। চাকরি করে ক টাকা পাও? হাজার কয়েক? এতেই আমার মেয়ের হবে? পোষাবে ওর? আমি যার কাছে আমার মেয়ে বিয়ে দেব সে লাখপতি হতে হবে আমার মত। নাকি তোমার মত পথেঘাটে থাকা কোনো ছেলে?’
ইয়াহিয়া হাসল খানিক। হেসে বলল,
‘এই পথেঘাটে থাকা পরিবার থেকেই আপনি নিজের জন্যে বৌ এনেছেন ফুপা। তখন এসব মাথায় আসেনি?’
ঊষার বাবা দমলেন খানিক। আড়চোখে স্ত্রীর দিকে চেয়ে পুনরায় তেজ নিয়ে বললেন,
‘হ্যাঁ এনেছি। কারণ আমি পুরুষ মানুষ। আমার ইনকামে ঘর চলে নাকি তোমার ফুপুর ইনকামে? আমার মেয়েও তার স্বামীর ইনকামে চলবে। তাই তার যেখানে বিয়ে হবে সেও আমার মত টাকা পয়সার দিক থেকে অন্যতম থাকবে। এটাই নিয়ম।’
ইয়াহিয়া উত্তর দিল,
‘আমার ক্ষেত্রে নিয়মটা আলাদা ফুপা। ঊষা মেধাবী ছাত্রী। আমি তাকে ঘরে বন্দি রেখে তার এতদিনের মেধার পরিচয় আটকে রাখব না। আমি তাকে সাবলম্বী বানাব। যেন ভবিষ্যতে তার উপর কেউ আঙুল তুলে না বলে, তার স্বামীর ইনকামে তার ঘর চলে, তার নিজের ইনকামে না। এবং আমি তার পাশে থাকবে, সর্বদা, সবসময়।’
ঊষার বাবা বুঝতে পারলেন, ইয়াহিয়া তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলেছে। নিজের স্ত্রী মেয়েকে ছোট করে দেখার বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ঊষার বাবা আর উপায় না পেয়ে বললেন,
‘যাই হোক। বড়বড় বাণী না ছেড়ে আমার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও। আমি তোমার কাছে যেকোনো মূল্যে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।’
ইয়াহিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘শিউর? আপনি সত্যি রাজি হবেন না?’
ঊষার বাবা রাগ নিয়ে তাকালেন। ইয়াহিয়া যা বোঝার বুঝে গেল। সে মৃদু হাসল। ঊষার বাবার সামনে থেকে চলে গেল। এগিয়ে গেল স্বয়ং ঊষার দিকে। ঊষা এতক্ষণ ওদের ঝগড়া দেখছিল। ইয়াহিয়া ঊষার সামনে এসে দাড়াল। ঊষার হাত আলগোছে নিজের হাতে নিয়ে বলল,
‘আমাকে চাও তুমি? হ্যাঁ বা না উত্তর দিবে!’
ঊষা উত্তর দিল, ‘চাই,অনেক চাই।’
‘বিয়ে করবে আমাকে?’
ঊষা আড়চোখে বাবার দিকে তাকাল। ঊষার বাবা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চেয়ে। ঊষা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, ‘বিয়ে করব।’
‘ সংসার করার জন্যে আমি এবং আমার পরিবার যথেষ্ট তোমার জন্যে? বাবাকে ছেড়ে আমার কাছে একেবারে চলে আসতে পারবে? ভয়ে ভয়ে নয়, আমি চাই তুমি নিজের উপর বিশ্বাস রেখে চারপাশ পরোয়া না করে উত্তর দিবে! তোমার উত্তরকে আমি সম্মান করব।’
ঊষা বাবার দিকে ছলছল চোখে তাকাল। কি উত্তর দিবে সে? ঊষার বাবা চুপ করে মেয়ের দিকে চেয়ে আছেন। মেয়ের উত্তর শোনার জন্যে তিনি মুখিয়ে। ঊষা চুপ করে চেয়ে আছে বাবার দিকে। একসময় বলল,
‘আমার তোমাকে চাই, তোমার পরিবার চাই, সঙ্গে চাই আমার নিজের পরিবারও। এটা কি আদৌ কখনো সম্ভব হবে? আমি দোষ করিনি কিছু, তাহলে কোন দোষের এতবড় শাস্তি পাচ্ছি বলতে পারো?’
ইয়াহিয়া শুনে। ঊষার হাতে হাত রেখে বসে থাকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। ঊষা কেঁদে উঠে। ইয়াহিয়া ঊষার কান্না চুপ করে চেয়ে দেখে। ঊষা ইয়াহিয়া হাত নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। এগিয়ে যায় বাবার দিকে। কিছুক্ষণ বাবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়।তারপর হঠাৎ আচমকা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। কাদতে কাদতে বলে,
‘বাবা, আমাকে এতবড় শাস্তি দিও না প্লিজ। আমি তোমাদের ছাড়া বেচে থাকতে পারব না। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি বাবা। ওকেও ঠিক তোমার মত করেই ভালোবাসি আমি। আমি কোথায় যাব বাবা, কার কাছে যাব? কার কাছে আমার দুঃখ বলব? বাবা, আমার দুঃখ শুষে নাও তুমি। আমাকে পর করে দিও না। আমি বেচে থাকতে পারব না বাবা, পারব না।’
ঊষার বাবার চোখে জল জমেছে। মেয়ে তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন। নাহলে মেয়ের উপর এ কদিন যে পরিমাণ অত্যাচার তিনি করেছেন, তাতে ইয়াহিয়ার এক ডাকে ঊষার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার কথা। সেখানে মেয়ে এখনো লেগে আছে তাকে মানানোর পেছনে। ছোটবেলায় যেমন বায়না করলে পাঞ্জাবি চেপে ধরে ঝুলে থাকত, তেমন বড় হয়েও আজকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বায়না ধরেছে। আর আগের মতোই ঝুলে আছে তার বুকের সঙ্গে। ঊষার বাবা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পরলেন। একপর্যায়ে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে মেয়ের কথা ভেবে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
‘আমার পছন্দ করা ছেলে থেকে ইয়াহিয়া তোকে বেশি সুখী রাখবে বোধহয়। আমার আর কিছু বলার নেই। তুই সুখি থাকলেই আমি সুখি। এটুকুই আমার চাওয়া শুধু।’
#চলবে