#বিষাদময়_প্রহর
#লাবিবা_ওয়াহিদ
|| পর্ব ১৯ ||
পিটপিট করে চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে আবিষ্কার করলাম।
তাকাতেও কেমন কষ্ট হচ্ছে মাথা ব্যথায়।
ঠোঁট কিঞ্চিৎ নাড়াতেই থুতনিতে জ্বালা অনুভব করলাম।
চারপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম আমার ঠিক কি হয়েছে।
তখনই মনে পরে গেলো আমার মাথায় কেউ ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করেছিলো।
এবার বুঝতে পারলাম মাথা ব্যথার কারণটা।
হঠাৎ মনে পরে গেলো ডায়েরী কথা।
ডায়েরী নিয়ে ভাবার মুহূর্তেই কেবিনে কেউ উপস্থিত হলো।
দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি নিহান ভাইয়া হন্ন হয়ে আমার দিকেই আসছে।
তার চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে আছে।
কপাকে রগগুলো মৃদ্যু দৃশ্যমান।
নিহান ভাইয়ার এই রূপ দেখে মনে হচ্ছে যেন আমাকে গিলেই ফেলবে।
আমি শুকনো একটা ঢোক গিললাম, কিছু বলার সাহস পেলাম না।
যতো যাই হোক, এই মানুষটাকে আমি জমের মতো ভয় পাই।
নিহান ভাইয়া আমার কাছে এসে রাগি চাহনি নিয়েই খুবই শান্ত সুরে বললো,
—“এখন কেমন লাগছে?”
—“ভাভাভালো।” তোতলাতে তোতলাতে বললাম।
তখনই নিহান ভাইয়া আমার গালদুটো জোরে চেপে ধরলো।
ব্যথায় কিছুটা কুঁকড়ে উঠলাম।
উনি একপ্রকার ধমক দিয়ে বলে,
—“পা বেশি লম্বা হয়েছে তোর না?কাউকে না বলে বাসা থেকে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিলি হ্যাঁ? তামাশা পাইসোস? নিজেকে কি ভাবোস কি হ্যাঁ, আমাদের কি মানুষ মনে হয় না? দুশ্চিন্তা হয় না আমাদের? আন্টি কি তোরে লটরপটর করার শিক্ষাই দিসে? কোনো অঘটন ঘটলে কি হতো? ওহ সরি তুই তো অলরেডি একটা অঘটন ঘটায়ই ফেলছোস! তোরে তো মন চাচ্ছে আবারও রাস্তায় গিয়ে আছাড় মারতে! বেয়াদব মেয়ে।”
বলেই ছেড়ে দিলো।
আর আমি ভ্যাঁত করে কেঁদে দিলাম।
আমার কান্না দেখে নিহান ভাইয়া আরও রেগে গেলেন, আরও জোরে চেঁচিয়ে বললেন,
—“চুপ! কিছু হলেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে সাগর বানিয়ে ফেলে। বকাগুলা তুই তোর দোষে খাইছিস! আর একটা ফোঁটা চোখের জল পড়ুক তোরে আমি আবার আঘাত করতেও দ্বিতীয়বার ভাববো না।”
আমি এবার সাথে সাথে চুপ হয়ে গেলাম।
কিছু একটা মনে পরতেই একদম কঠিন হওয়ার চেষ্টা করলাম।
নিহান ভাইয়া তখনই রেগে বের হয়ে যাচ্ছিলো এমন সময়ই আমি বলে উঠি,
—“তাহলে প্রহর কে?”
নিহান ভাইয়া থেমে গেলেন।
আমি উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি।
নিহান ভাইয়া আমার দিকে ফিরে ভ্রু কুচকে বললো,
—“প্রহর মানে? কে প্রহর?”
—“সেটা তো আমার থেকে আপনার বেশি ভালো জানার কথা।”
নিহান ভাইয়া যেন চিন্তায় পরে গেলেন।
ওনার ভাবভঙ্গি দেখে এমন মনে হচ্ছে যেন উনি প্রহরকে চিনেনই না।
এবার আমার রাগ উঠে গেলো নিহান ভাইয়ার এমন ভনিতা দেখে।
খুবই কঠোর গলায় বলে উঠলাম,
—“একদম ন্যাকামি করবেন না! আমি জানি আপনিই প্রহর। আপনিই আমাকে রোজ ভোর ৬টায় চিঠি পাঠাতেন। এমনকি আপনিই ওই লোককে খুন করেছেন, আপনিই আমাকে রোজ ফলো করতেন কালো হুডি পরে। আমাকে এতোটা বোকাও ভাববেন না। আমি যথেষ্ট ম্যাচিউর। আপনার লেখা ওই প্রহরের লেখা একই কোনোরকম তফাৎ নেই। কেন এতদিন ছদ্মনামে আমার আশেপাশে ছিলেন কেন?”
নিহান ভাইয়ার চেহারায় কোনো আগ্রহ বা অন্যকিছু খুঁজে পেলাম না।
তার ভাবভঙ্গি একদমই স্বাভাবিক।
বুঝি না, খারাপ পরিস্থিতিতে উনি এমন স্বাভাবিক থাকেন কি করে?
উনি কয়েকমিনিট নিরবে আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাঁটা ধরলেন দরজার দিকে।
আমি অস্ফুট সুরে বলে উঠলাম,
—“কোথায় যাচ্ছেন?”
—“আমার নাফি জানকে যে আঘাত করেছে তার ব্যবস্থা করতে।”
বলেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে উনি হনহন করে চলে গেলেন।
আমি বিস্ময়ের সাথে নিহান ভাইয়ার যাওয়া দেখছি।
এই প্রথম নিহান ভাইয়ার মুখে “নাফিজান” শুনলাম।
বুকটা হঠাৎ ধুক করে উঠলো।
এর মানে সত্যি সত্যিই উনিই সেই “বিষাদময় প্রহর!”
উনিই সেই যে কি না এতোগুলা মাস আমাকে লুকিয়ে চিঠি পাঠাতো, আমার উপর নজর রাখতো??
কিন্তু কি করে সম্ভব?
কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না সবটা।
আচ্ছা উনি যেহেতু প্রহর হয়ে থাকেন তাহলে কি উনিই আমাকে ওইরকম বিষাদের মতো ভালোবাসেন?
সারা শরীরে যেন কারেন্টের শক খেলাম।
আমার মনপুরুষ কি না, প্রহর!!!
নাহ আর ভাবতে পারছি না সব কেমন গুলিয়ে আসছে।
দম আটকে আসছে যেন আমার!
শান্তিমতো বালিশের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম প্রথম থেকে সবটা।
সেদিন যেই লোকটা গলা চেপে ধরেছিলো তার পরেরদিনই খেয়াল করেছিলাম নিহান ভাইয়া অতি সূক্ষ্ম নজরে আমার গলার দিকে তাকিয়েছিলো কিন্তু আমি তখনো গলায় আঙ্গুলের ছাপের কথা মাথায় রাখিনি।
এরপরের দিনই প্রহরের চিঠিতে জানতে পারলাম উনি সেই লোকটিকে মেরে ফেলেছে।
আর সেই চিঠিটাও অর্ধেক পড়েছিলাম।
এরপরে আসে সেই ভার্সিটির কাহিনী, নিহান ভাইয়াই ওই সিনিয়রদের মারে আর প্রহরও তাকে আদেশ দেয় যেন সে তার চুল বেধে বা হিজাব পরে বের হই, নয়তো অন্যকেউ আমার দিকে নজর দিলেই তাদের মেরে ফেলবে অথবা হসপিটালের পাঠাবে এমন টাইপ।
তারপর ফয়সালের জেলখাটুনি।
পরপর সব হিসাব মিলিয়ে যা বোঝার বুঝে গেলাম।
সব ভাবতেই কেমন থম মেরে গেলাম।
কোনো এক ঘোরে আছি যেন আমি।
এমন সময়ই কেবিনে আদ্রান ভাইয়া প্রবেশ করলেন।
ওনার থেকে জানতে পারলাম নিহান ভাইয়া কোনো এক কাজে আটকা পরে যান।
তাই উনিই আমাকে ড্রপ করে দিবেন বাড়িতে।
ওনার কাজের কথা শুনে আমি কেঁপে উঠলাম।
নিশ্চয়ই যে আমাকে আঘাত করেছে তার খবর করতে গেছে।
আল্লাহ! এ আমি কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম!
উনি আমাকে এতোটা ভালোবাসেন তা আমি জীবনে এক মুহূর্তের জন্যেও কল্পনাই করতে পারিনি।
উনি প্রকাশ্যে সারাজীবন আমাকে ধমকের উপর রাখলো অথচ আমাকে খুটিয়ে খুটিয়ে উনি-ই ভালোবেসেছেন, আগলে রেখেছেন।
যার একমাত্র প্রমাণ চিঠিগুলো!
ধুর! আগে কেন ওনার হ্যান্ডরাইটিং চেক করলাম না।
চেক করলে কি এই বিষাদ থুক্কু নিহান ভাইয়াকে নিয়ে এতো কনফিউশন থাকতো ধ্যাত!
কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা আমি জ্ঞান হারানোর আগে কাঁদছিলাম কেন?
ও হ্যাঁ মনে পরেছে ওনার লেখার সাথে ওই চিঠিগুলার লেখা মেলাতে ছুটেছিলাম।
হায়রে আমি!
কখন কোন সময়ে ইমোশনাল হয়ে যাই নিজেই বুঝি না।
তবে এটা সত্য, নিজের মনপুরুষকে কিছুতেই ওই বিষাদ হিসেবে ভাবতে পারছিলাম না।
সারা রাস্তাতেই আমি এইসব ভেবে ভেবেই বাড়ি ফিরলাম।
আদ্রান ভাইয়া আমাকে গেট অবধি দিয়েই চলে গেলো আর ভেতরে আসলেন না।
আমি ওনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভেতরে চলে আসলাম।
মেইন দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো।
এর মানে দরজা খুলে রেখেছে হিদ।
রাত আনুমানিক ২ টার কাছাকাছি।
ভেতরের নিস্তব্ধতা এবং আবছা আলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবাই ঘুমিয়ে পরেছে।
ভালো করে মেইন দরজা লক করলাম।
কিন্তু নিচে হিদকে দেখলাম না, হয়তো রুমে অপেক্ষা করছে।
আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে হিদের রুমে গেলাম।
হিদের রুমে একটা ডিমলাট জ্বালানো।
ইনু বিছানায় আরাম করে ঘুমাচ্ছে।
সোফায় দিকে নজর যেতেই দেখলাম হিদ সোফার হাতলে হাতের ভার দিয়ে গালে হাত দিয়েই ঘুমিয়ে পরেছে।
আমি হিদের কাছে গিয়ে হিদকে সামান্য ধাক্কা দিতেই জেগে উঠলো।
আমাকে দেখে চটজলদি দাঁড়িয়ে আমার বাহুজোড়া ধরে উত্তেজিত হয়ে বলে,
—“নাফু, তোর কি হয়েছে মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?”
—“তেমন কিছু না চল ঘুমাবো।”
—“না খেয়ে ঘুমাবি?”
—“ওহ খাবারের কথা তো ভুলেই গেছি।”
—“তা তো ভুলবি-ই! বস! আমি খাবার গরম করে আনছি।”
আমি হিদকে আটকে বললাম,
—“আরে শুধু শুধু কষ্ট করবি কেন?”
—“ভাইয়ার আদেশ।”
আমি আর কিছু বলার সাহস পেলাম না।
চুপচাপ বিছানার কোণায় গিয়ে বসলাম।
হিদও কোনোরকম কথা না বলে নিচে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর এক প্লেট বিরিয়ানি এনে হাজির হলো।
বিরিয়ানি পুরো প্লেট না খেলেও অর্ধেক খেলাম।
মাথা যন্ত্রণায় যেন চোখে ঘুম নেমে আসছে।
বেশি কথা না বলে শুয়ে পরলাম।
ডক্টর বলেছে যেন সকালেই ব্যান্ডেজ খুলে ফেলি, সাময়িক ব্যান্ডেজ ছিলো এটা।
নরম বিছানায় শুতেই রাজ্যের ঘুম চোখে ভর করলো।
নিহান ভাইয়ার খবর নেয়ার মতোও অবস্থা হলো না।
শেষরাতে নিহান নাহিদার রুমের সামনে আসলো।
দরজা পর্যবেক্ষণ করে বুঝলো দরজা ভেঁজানো।
কোনোকিছু না ভেবেই ভেতরে ঢুকে পরলো।
ঘুমন্ত নাফিহাকে কিছুক্ষণ পলকহীনভাবে দেখলো।
দেখা শেষ হলে একটা চিরকুট নাফিহার বালিশের পাশে রেখেই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
তারও এখন বড্ড ঘুম পাচ্ছে।
এতো ছুটাছুটির ফলে সেও বেশ ক্লান্ত।
চলবে!!!
বিঃদ্রঃ অসুস্থতার জন্য বেশি বড় করতে পারলাম না, তার জন্য দুঃখিত। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।