বিরহ শ্রাবণ পর্ব ১৫

0
856

#বিরহ_শ্রাবণ
#পর্ব_১৫
#লেখিকা:সারা মেহেক

গত তিনদিন পূর্বে যে ঘটনা ঘটেছে তার রেশ এখনও আমার মন মস্তিষ্ক হতে মিটেনি। মাঝে মাঝেই সে ঘটনাটি আমার দৃষ্টির প্রান্তে ভেসে বেড়ায়। মনে হয়, এই বুঝি আমি পুনরায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হবো! তবে ভাইয়ার মা’র্ডা’রের ঘটনা সচক্ষে দেখার পর এ ধরণের ছোট ঘটনা আমার উপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না। প্রভাব ফেললেও তা খুবই সামান্য পরিমাণে। এখন আমি নিজেকে পূর্বের চেয়েও দ্রুত সামলাতে পারি। উপরন্তু আমাকে সামলানোর জন্য এখন নানু, মামি, প্রোজ্জ্বল ভাই ও অভ্র ভাই আছেন। এর মধ্যে এ ঘটনা শুনে একবার প্রত্যাশা আপুও বাড়ি এসেছিলো। প্রথম পর্যায়ে একটু আধটু শাসন করে পর মুহূর্তেই বড় বোনের ন্যায় আমাকে সুবুদ্ধি দান করেছিলো।

এ তিনদিন আমার কলেজে যাওয়া বন্ধ ছিলো। বলা যায় প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের তরফ হতে এ ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিলো। উনি চাইছিলেন আমি যেনো এ তিনদিন বিশ্রাম নিয়ে নাহিদের ঘটনাটি ভুলে যেতে পারি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেনো না হয় সেজন্য নিজেকে নিজে বুঝাতে পারি। অবশ্য এই তিনদিন যে আমার জন্য খুব সুখকর ছিলো বা আরামে কেটেছে এমনটা নয়। ঘটনার দিনের বিকেল হতে পরেরদিনের রাত পর্যন্ত মামি ও নানু ঠিকঠাক কথা বলেনি আমার সাথে। পরে এ নিয়ে ভীষণ আক্ষেপ প্রকাশ করে কাঁদোকাঁদো চাহনি নিয়ে উনাদের দিকে চাইলেই উনারা মোমের ন্যায় গলে পড়েন। ব্যস তৎক্ষনাৎ উনাদের সকল রাগ উধাও হয়ে যায়। কিন্তু হি’ট’লা’র প্রোজ্জ্বল ভাই শুধুমাত্র ধ’ম’কা’নো এবং ব’কু’নি ব্যতিত এই তিনদিনে আমার সাথে স্বাভাবিক হয়ে কথা বলেছে বলে আমার মনে পড়ে না৷ আমিও অবশ্য আগ বাড়িয়ে উনার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে যায়নি। দেখতে চেয়েছিলাম, উনি কতদিন এভাবে ধ’ম’কে’র উপর রাখতে পারেন আমায়। ভেবেছিলাম, দ্বিতীয় দিনেই হয়তো উনি স্বাভাবিক হয়ে কথা বলবেন আমার সাথে। কিন্তু উনি যে আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিবেন তা কে জানতো!

তিনদিন ছুটি কাটানোর পর আজ হতে আবারো ক্লাস শুরু করবো। সেজন্য সকাল সকাল উঠে নামাজ শেষে নাস্তা করে রেডি হলাম। কিন্তু ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার পূর্বে প্রোজ্জ্বল ভাই আমার পথ আগলে দাঁড়ালো। কোমড়ে হাত ঠেকিয়ে রুষ্ট চাহনিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” তোর না একা একা কোথাও যাওয়া নিষেধ? তাহলে কোথায় যাচ্ছিলি এখন?”

কয়েক মুহূর্তের জন্য বেমালুম ভুলে বসেছিলাম, এখন হতে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথেই আমার আসা যাওয়া করতে হবে৷ তবে ভুলোমনা হওয়ার ব্যাপারটি আমি সদর্পে নাকচ করে বললাম,
” আমি একা কলেজে যাচ্ছি নাকি! এই তো বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিলাম। ভাবলাম, আপনি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। ”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে মনে হলো না উনি আমার কথায় বিশ্বাস করেছেন। তবুও আমার পথ ছেড়ে দিয়ে বললেন,
” যা। গেটের ভেতরেই দাঁড়িয়ে থাক। আজ মোটরসাইকেল নিয়ে যাবো। আমি অফিস ব্যাগ নিয়ে আসছি। তুই যেতে থাক। ”

আমি আর কথা না বাড়িয়ে৷ সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রোজ্জ্বল ভাই নিচে নেমে এলেন। মোটরসাইকেল নিয়ে গেটের কাছে আসতেই পিছন হতে মামি আমায় ডাক দিলেন। উনার কাছে যেতেই উনি নানাপ্রকারের সুবুদ্ধি দিয়ে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে কলেজে পাঠিয়ে দিলেন আমাকে।

—–

আজ প্রথম পিরিয়ডেই প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের এনাটমি ক্লাস ছিলো৷ দীর্ঘ দুটো ঘণ্টা লাংসের উপর ক্লাস নিয়ে তারপর ছুটি দিলেন উনি। এ দুটো ঘণ্টা একটানে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়ার কথা হলেও আমি তা পারলাম না। নিঃসন্দেহে তিনদিন ছুটি কাটানোর ফল এটা। ফলস্বরূপ ক্লাসের অর্ধেক পড়া বুঝলাম এবং বাকি অর্ধেক পড়া মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। কিন্তু পড়া না বুঝে বসে থাকলেও অলস হয়ে বসে ছিলাম না। ক্লাসের বাকি এই অর্ধেক সময় পার্ট টাইম জব হিসেবে গোয়েন্দা সংস্থায় রীতিমতো চাকরি নিয়ে বসেছিলাম! ভাবা যায়! আমার কাজ ছিলো, প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের ক্লাস নেওয়ার সময় ক্লাসের শ’কু’নি চাহনির মেয়েগুলোর উপর দৃষ্টি রাখা। দেখছিলাম, কোন মেয়ে কতবার উনাকে দেখছে, কতবার উনাকে চোখ দিয়ে গিলছে। এসবের রিপোর্ট আবার অভ্র ভাইকে দিয়ে আমি আর উনি মিলে প্রোজ্জ্বল ভাইকে জ্বালাবো। আর প্রোজ্জ্বল ভাইকে জ্বালানোর মধ্যে যে আত্মিক শান্তি আছে তা আর কাউকে জ্বালানোর মধ্যে নেই।

ক্লাস শেষে রোল কল করে প্রোজ্জ্বল ভাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ক্লাসরুম ছাড়ার আগে গম্ভীর কণ্ঠে বলে গেলেন,
” চন্দ্রিমা, লেকচার ক্লাসে যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করে যেও। ”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের এ আদেশ আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েদের কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না। কিছু কিছু মেয়ে তো আমার দিকে রীতিমতো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো। কারণ তারা কেউই জানে না তাদের প্রোজ্জ্বল স্যার সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই হয়। এর অবশ্য কারণও আছে। প্রোজ্জ্বল ভাই চান না যে, আইটেম টেবিলে বসে বেশি নাম্বার পেলে যেনো কথা না উঠে, উনি আমার মামাতো ভাই হয় বলেই আমাকে বেশি নম্বর দিয়েছেন। উপরন্তু ক্লাসে ভুলেও উনাকে ভাই বলা যাবে না। কারণ ক্লাসের মতো পরিবেশে স্যারকে ভাই বলে সম্বোধন করাটা নিতান্তই বেখাপ্পা এবং পরিবেশের সাথে অনুপোযোগী দেখায়।

ক্লাস শেষে সবাই বেরিয়ে গেলে সবশেষে আমিও বেরিয়ে আসলাম। আজ রিমা কলেজে আসেনি বলে একাই শেষ পর্যন্ত থাকতে হলো।
ক্লাসরুম হতে বেরিয়ে আমি লেকচারারদের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে অন্য স্যাররাও ছিলো। আমাকে দেখে অন্য ব্যাচের এক স্যার জিজ্ঞেস করলো,
” কিছু বলবে?”

” জি, প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে কথা ছিলো। ”
মনের ভুলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রোজ্জ্বল ভাইকে স্যার না বলে ভাই বলে ফেলায় তৎক্ষনাৎ জিব কেটে নিজেকে শুধরে নিলাম। বললাম,
” মানে, প্রোজ্জ্বল স্যারের সাথে একটু কথা ছিলো।”

আমার কণ্ঠ শুনে প্রোজ্জ্বল ভাই ততক্ষণে এদিকে ঘুরে তাকিয়েছেন। আমাকে ইশারা করে বললেন ক্লাসরুমে যেতে। আমি উনার ইশারা মোতাবেক ক্লাসে এসে উপস্থিত হলাম। টিচার ডেস্কের সামনে চেয়ার নিয়ে বসতে বসতেই প্রোজ্জ্বল ভাই এসে হাজির হলেন। উনি ক্লাসে ঢুকেই সর্বপ্রথম আমার মাথায় ঠাস করে একটা গাট্টা মারলেন। অতঃপর রাগত স্বরে বললেন,
” ক্লাসে মনোযোগ কোথায় থাকে তোর? অর্ধেক সময় তো দেখলাম এদিক ওদিক চোখ যাচ্ছে।”

প্রোজ্জ্বল ভাই যে বিস্তার ক্লাস নেওয়ার ফাঁকেও আমার উপর কড়া নজর রেখেছে তা জানতেই বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে এলাম। বৃহৎ চাহনিতে চেয়ে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
” আপনি ক্লাস নেওয়ার সময়ও আমার উপর নজরদারি করেছেন! কিভাবে প্রোজ্জ্বল ভাই? আমি তো দেখলাম, আপনি খুব মনোযোগ সহকারেই ক্লাস নিচ্ছেন। ”

প্রোজ্জ্বল ভাই ঠোঁটজোড়া কুঞ্চিত করে পুনরায় আমার মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
” আমার মনোযোগের কথা বাদ দিয়ে নিজের পড়ায় মনোযোগ দে। ক্লাসে কি করছিলি তখন?”

প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে আমি ভ্রুজোড়া নাচিয়ে বললাম,
” দেখলাম, ক্লাসের কত মেয়ের রাতের ঘুম হারাম করেছেন আপনি। আপনার রূপ আর এটিটিউড এর জাদুতেই তো মেয়েগুলো ঘা’য়ে’ল।”

এ কথা বলতে না বলতেই মাথায় তৃতীয়বারের মতো গাট্টা মারলেন প্রোজ্জ্বল ভাই। পরপর তিনবার উনার দ্বারা মা’র খেয়ে তেঁতে উঠলাম আমি৷ তৎক্ষনাৎ গলার স্বর তীক্ষ্ণ এবং উঁচু করে রাগত স্বরে বললাম,
” সমস্যা কি? হ্যাঁ? সমস্যা কি আপনার? শুধু মা’রেন কেনো?”

আমার কথা শেষ হতে দেরি হলো তবে প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের আমার মুখ চেপে ধরতে দেরি হলো না। উনি তৎক্ষনাৎ আমার মুখ চেপে ধরে সতর্ক কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন,
” পাগল নাকি তুই? এতো জোরে কথা বলছিস কেনো? এটা বাড়ি না যে আমার সাথে একা থেকে এভাবে জোর গলায় কথা বলবি আর কেউ কিছু আঁচ করবে না। ”

উনার সতর্কবাণী শুনে মুহূর্তেই মিইয়ে এলাম আমি। মুখের উপর হতে উনার হাত সরিয়ে বললাম,
” আচ্ছা আচ্ছা, সরি। কিন্তু আপনি আমাকে এভাবে আর কত মা’র’বেন?”

প্রোজ্জ্বল ভাই আমার প্রশ্ন শুনে কিয়ৎক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলেন। অতঃপর চেয়ার ছেড়ে উঠে রুম হতে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
” যতদিন না তুই শুধরাবি নিজেকে। এখন লেকচার ক্লাসে যা। আর কলেজ শেষে পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকিস। একসাথে যাবো।”
এই বলে উনি চলে গেলেন। অতঃপর আমিও ক্লাসে চলে এলাম।

—–

ক্লাস শেষ হলেই বাড়ি যাওয়ার কথা থাকলেও প্রোজ্জ্বল ভাইয়ের ডিপার্টমেন্ট মিটিং এর কারণে তা হলো না। ফলস্বরূপ ক্লাস শেষ হওয়ার পরও বাড়ি না ফিরে কলেজেই থাকতে হবে আমাকে। প্রথমে একা একা কমনরুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু দশ মিনিট যেতেই প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে যাই। কারণ একে তো আমার কাছে কোনো ফোন নেই। তার উপর সাড়ে ছয় ঘণ্টা ক্লাস করে দিনশেষে এখন আর পড়ার মুড রইলো না। তাই কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা শেষে অভ্র ভাইয়ের কাছে যাওয়া সিদ্ধান্ত নিলাম। যেই ভাবা সেই কাজ। কলেজ থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম হসপিটালে।

হসপিটালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড দিয়ে সার্জারি ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার পথ। আরো দুটো পথ আছে। তবে নতুন হওয়ায় আপাতত এই একটা পথই আমার জানা আছে।
কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ধীরেসুস্থে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। ভীষণ আগ্রহ নিয়ে দেখছি ইমার্জেন্সি কেসের পেশেন্টদের হন্তদন্ত করে ছোটাছুটি। উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকের চাহনিতেই একরকম আতঙ্ক ও ভয় দেখে আমার মন খারাপ হলো। মায়া হলো তাদের জন্য। তবে হবু ডাক্তার হিসেবে নিজেকে এই বলে বুঝালাম যে, ডাক্তারদের হতে হয় কঠোর, শক্ত ও অনুভূতিহীন। কেননা ভবিষ্যতে রোজ রোজ এমন পেশেন্টদের দেখতে হবে, তাদের চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু এদের দুঃখ কষ্ট, যন্ত্রণা দেখে যদি আমি নিজেই আবেগী ও দূর্বল হয়ে পড়ি তাহলে এদের চিকিৎসা দিতে আমার হাত কাঁপবে না? এজন্যই নিজেকে করতে হবে শক্ত ও দৃঢ়।
এসব বলে নিজেকে বুঝাতে না বুঝাতেই অকস্মাৎ একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হলাম। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড হওয়ায় সেখানে হন্তদন্ত করে একটা এক্সিডেন্ট করা পেশেন্টের আগমন ঘটলো। স্ট্রেচারে তাকে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাদা কাপড়ের স্ট্রেচার রোগীর র’ক্তে একাকার হয়ে গিয়েছে। চেহারার বাম পাশ প্রায় থেতলে গিয়ে মুখের মাংস ও হাড়ও দেখা যাচ্ছে কিঞ্চিৎ। বাম পাশের হাতটা ভেঙে স্ট্রেচারের পাশে ঝুলে পড়েছে। কোনোমতে জ্ঞানে থাকা রোগী শরীরের এ তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে, গোঙাচ্ছে। এ পুরো দৃশ্যটা হঠাৎ করেই আমাকে ভাইয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ভাইয়ারও তো এমন অবস্থা হয়েছিলো। না, এর চেয়েও খারাপ হয়েছিলো ভাইয়ার সাথে। তার পুরো শরীর র’ক্তে জর্জরিত, শরীরের মাং’স কে’টে ঝুলে পড়া৷ কি এক বী’ভ’ৎ’স দৃশ্য!

অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ পুরো দৃশ্যটা আমি নিষ্পলক চাহনিতে চেয়ে দেখলাম। অতঃপর রোগী যখন আমার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করে চলে গেলো তখন আমার চোখের পলক পড়লো। মুহূর্তেই অস্থির হয়ে এলাম আমি৷ ভাইয়ার ঘটনাটি বারবার মনে পড়তে লাগলো। গলা শুকিয়ে এলো। আমি কোনোমতে নিজেকে সামাল দিয়ে অভ্র ভাইয়ের কাছে চলে এলাম। অভ্র ভাই তখন মেডিকেল অফিসারদের রুমে বসে ছিলেন। রুমে আর কেউ ছিলো না বিধায় আমি অনুমতি না নিয়েই রুমে ঢুকে পড়লাম৷ অভ্র ভাইয়ের সামনে একটা চেয়ারে ধপ করে বসে টেবিলে মাথা লাগিয়ে বসে পড়লাম।
প্রচণ্ড অস্থির অনুভব হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

আমার এ অবস্থা দেখে অভ্র ভাই চেয়ার ছেড়ে উঠে আমার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। এক গ্লাস পানি এগিয়ে বললেন,
” হঠাৎ কি হলো চন্দ্রিমা? এমন করছো কেনো? পানি খাও। ”

আমি মাথা তুলে গ্লাস হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে ফেললাম। অতঃপর নিজেকে স্বাভাবিক করতে চোখ বন্ধ করে বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। চেষ্টা করলাম, ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ঐ রোগীর কথা ভুলে যেতে। পাঁচ মিনিট এভাবে থেকে অতঃপর ধীরেধীরে চোখ মেলে চাইলাম। সামনে তাকিয়ে দেখলাম অভ্র ভাই আমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে। উনার চাহনিতে স্পষ্ট দুঃশ্চিতার ছাপ। আমাকে চোখ মেলতে দেখেই উনি জিজ্ঞেস করলেন,
” এখন বেটার ফিল করছো তো?”

আমি প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ছেড়ে বৃথা হাসার চেষ্টা করে বললাম,
” হ্যাঁ। এখন আগের চেয়ে ভালো লাগছে।”

” আচ্ছা। কি হয়েছিলো তোমার? হঠাৎ এভাবে এসে বসে পড়লে যে?”

অভ্র ভাইকে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের পুরো ঘটনাটা বললাম। অভ্র ভাই তা শুনে মৃদু হাসলো। উঠে গিয়ে চেয়ারে বসে আমাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললো,
” এই সামান্য একটা এক্সিডেন্ট দেখে এতো অস্থির হয়ে পড়ছো তুমি! পেশেন্ট সামলাবে কি করে?”

আমি ঈষৎ অভিযোগের সুরে বললাম,
” আপনি তো জানেনই অভ্র ভাই, ভাইয়ার ঐ ঘটনা সচক্ষে দেখার পর এমন র’ক্ত, কাঁ’টা”ছে’ড়া দেখলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। অস্থির হয়ে পড়ি। মনে হয়, এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো। ”

অভ্র ভাই আলতো হেসে আমার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। আশ্বস্ত সুরে বললেন,
” শুনো চন্দ্রিমা, তুমি এখন ডাক্তারি পেশায় এসেছো। এ পেশায় না চাইতেও প্রায় প্রতিদিন এসব কেস চোখে পড়বে। হ্যাঁ, তুমি যদি ক্লিনিক্যাল লাইনে ক্যারিয়ার না গড়ে ব্যাসিক লাইনে যেতে চাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু ক্লিনিক্যাল লাইনে এমন কেস দেখতেই হবে। যখন ওয়ার্ড শুরু করবে, ইন্টার্নি করবে, তখন এসব দেখেই দিন পার করতে হবে৷ বিশেষ করে ফরেনসিক এর অটোপসি ক্লাসে তো আরো বেশি ভয়ানক অবস্থা। রীতিমতো সারা শরীর কে’টে ছিঁ’ড়ে ফেলা হয় সেখানে। তখন কিভাবে দেখবে এসব?”

আমি নিরুত্তর রইলাম। অভ্র ভাই পুনরায় বললেন,
” এজন্য এখন থেকে নিজেকে শক্ত করো চন্দ্রিমা। এগুলো দেখার অভ্যাস করো। চঞ্চলের খু’নে’র দৃশ্যগুলো মাথা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টা করো। আর বলবো, সময় পেলেই ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে বা এখানে চলে এসো। এখন থেকেই এসব দেখে র’ক্ত৷ কা’টা ছেঁ’ড়ার প্রতি যে ভয়ভীতি আছে তা জয় করার চেষ্টা করো। তাহলে ভবিষ্যতে ওয়ার্ডে গিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না। বুঝলে?
আর হ্যাঁ বেশি অস্থির লাগলে হাতের মুঠো শক্ত করে জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস ছাড়বে। দরকার হলে পানি খাবে। কিন্তু পেশেন্টদের ঐ অবস্থা দেখে পালিয়ে আসবে না৷ এমন করলে নিজের ভয়কে জয় করবে কি করে?”

অভ্র ভাইয়ের অনুপ্রেরণা এবং আশ্বস্তমূলক বাণী শুনে আমি কিছুটা সাহস পেলাম। মৃদু হেসে বললাম,
” চেষ্টা করবো অভ্র ভাই। ”

” কি ব্যাপার অভ্র? মেয়েটা কে? ওভাবে হাত ধরে আছো কেনো?”

অপরিচিত এক কণ্ঠস্বর কর্ণপাত হতেই অভ্র ভাই তড়িঘড়ি করে আমার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমিও হন্তদন্ত করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বিপরীত দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম, এপ্রোন পরে হাতে স্টেথোস্কোপ নিয়ে একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে উনি অভ্র ভাইয়ের সিনিয়র। উনাকে দেখেই অভ্র ভাই দ্রুত উনার নিকটে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
” সরি সরি শাওন ভাই। আপনি একটু বাইরে আসুন। কথা আছে। ”
এই বলে লোকটিকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অভ্র ভাই তাকে নিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
®সারা মেহেক

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here