#কাছে_দূরে
#পর্ব___৫২
—-‘ হোয়াট! মনির হাজবেন্ড কি বলছিস? তোর কোথাও একটা ভুল হচ্ছে মীর। আমি-
—-‘ না ভাই। আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। আমি ঠিকই বলছি। মনি বিয়ে করেছেন। ইভেন উনার একটা মেয়েও আছে।’
সাবাব বসা থেকে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালো। সে তার নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা। মনি বিয়ে করেছে সেটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু সত্যি তো! এটা কি করে সম্ভব! তাহলে বাবাইও মনির সম্মন্ধে সঠিক জানতো না?
—-‘ আমরা টানা ৪৮ঘন্টা যাবত একটু একটু করে ইনফরমেশন জোগাড় করেছি ভাই। ভাঙ্গা ভাঙ্গা অংশ গুলো জোড়া লাগিয়ে আমরা এই তথ্যে পৌঁছতে পেরেছি যে মনি বিবাহিত। ইভেন তার মেয়েও আছে। মেয়েটা কিছুদিন হলো কলেজ পাস করে বেরিয়েছে। ইয়ার, আমার মাথায় এটা ঢুকছেনা যদি মনি রিয়াদ স্যারকে ভালোইবাসতো তাহলে বিয়ে করলো কেন? আর যখন করলোই সেটা সবার থেকে লুকাল কেন? কি স্বার্থ আছে এর পেছনে? আমি রাতুলের থেকে রিয়াদ স্যারের খুনের সব ডিটেইলস শুনেছি। আমার মাথা এখনও ভনভনিয়ে ঘুরছে এই ভেবে একজন মহিলা কিভাবে এতোটা ডেঞ্জারাস হতে পারে? হাউ?’
—-‘ প্রশ্ন তো হাজারটা আছে মীর। কিন্তু উত্তরের ঘরা শূন্য। আর একটু একটু করে এই উত্তরের ঘরা আমাদের পূরন করতে হবে।
—-‘ হ্যাঁ ঠিক বলেছিস।’
—-‘ শোন, তোরা এক কাজ কর।’
—-‘ বল।’
—-‘ ওখানে আর দুটো দিন থেকে মনির হাজবেন্ড এন্ড উনার মেয়ে সম্মন্ধে সব ধরনের ইনফরমেশন কালেক্ট কর। আর প্রতি একঘন্টা পরপর আমাকে আপডেট দিতে থাক।’
—-‘ ওকে।’
—-‘ আর শোন, নিজেদের প্রতি খেয়াল রাখিস। বিশেষ করে তরী আর কিরন। ওদের সেফটি সবার আগে।’
—-‘ চিন্তা করিস না ভাই। আমি আছি তো।’
সাবাব স্মিত হেসে বলল,
—-‘ সাবধানে থাকিস।’
—-‘ ওকে ভাই। ছাড়লাম এখন।’
—-‘ হু।’
সাবাব ফোনটা নামিয়ে বিছানার উপর রাখলো। আরেকটা বাড়তি দুঃশ্চিন্তা এসে সামনে দাঁড়ালো। মনি বিয়ে করেছে! মনি বিয়ে করেছে সেটাই তো সবচেয়ে বড় রহস্য! বিয়ে করে মেয়েও জন্ম দিয়েছে। এমনকি সে মেয়ে কলেজ পাসড। সাবাবের বুক চিঁড়ে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মাথাটা ধরে যাচ্ছে সব চিন্তায়। শরীরটা প্রচন্ড দুর্বল লাগছে। বাবাই আর ছোটমায়ের মৃত্যুর বর্ননা তাকে এতোটা ভেঙে দিবে জানলে সে কখনও এই রহস্য উদঘাটনই করতো না। কখনই না। এভাবেই অপরাধীদের শাস্তি দিতো। কিছু না জেনে ছোট মা আর বাবাইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ থেকে শাস্তি দিতো।
—-‘ মাথা ধরেছে?’
হীরের গলা। সাবাব মুখ উঁচিয়ে তাকালো। হীর উৎসুক নয়নে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাবাব নিজের দুর্বলতা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
—-‘ না। সদ্য ঘুম ভাঙলো তো। তাই একটু-
—-‘ মিথ্যে বলে লাভ কি?’
সাবাব ঘাবড়ানো মুখে তাকালো। গলা পরিস্কার করে কিছু বলতে নিলেই হীর হাত বাড়িয়ে তার কপালে ঠেকালো। গুনী ভঙ্গিতে বলল,
—-‘ জ্বর আর আসবেনা মনে হয়।’
—-‘ তুমি থাকলে জ্বর কি করতে আসবে।’
—-‘ এই যে এসেছিলো? তখনও তো আমি ছিলাম।’
—-‘ তখন তো-
—-‘ তখন তো কি? আমার থেকে জ্বরকে বেশি আপন লেগেছিলো তাই তো?’
—-‘ কেউ যদি ইচ্ছে করে পর হতে চায় তাহলে আমার আর আমার জ্বরের কি দোষ?’
সাবাবের সাবলীল কন্ঠে হীর মুচকি হাসল। সাবাবের কপাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে চলে গেলো আলমারির সামনে। সাবাবের জন্য তোয়ালে আর জামাকাপড় বের করে আনতে। তোয়ালে বের করে ছাই রঙা টি-শার্ট টা ধরে টান দিতেই হাত ফস্কে কিছু একটা পড়ে গেলো নিচে। হীর কপাল কুঁচকে হাতের ফাঁক দিয়ে নীচে তাকালো। কিছু একটা জ্বলছে। ভালো করে তাকাতেই হীর যেন আকাশ থেকে পড়লো। অবাকের শীর্ষে পৌঁছে জিনিসটা হাতে উঠাতেই কুঁচকানো কপাল খানা কুঁচকে কপালের মাঝে সৃষ্টি করলো অসংখ্য ভাজ। তার হাতে তার মায়ের সেই লকেটটা। যেটা কিছুদিন আগেই সে হারিয়ে ফেলেছিলো। এটা সাবাবের আলমারিতে মানে এটা সাবাবের কাছেই ছিলো এতোদিন।
হীরকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাবাবও উঠে গেলো আলমারির কাছে। পেছন থেকে হীরের হাতে তোয়ালে দেখলেও লকেটটা তার চোখে পড়েনি। সে তোয়ালে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে কিছু বলতে নিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো হীরের হাতে ধরে রাখা লকেট টা। এই সেরেছে! সেই কবেই এটা সে নিজের কাছে এনে রেখেছে আর তো দেওয়াই হয়নি হীরকে। এবার হীর নির্ঘাত তার পিন্ডি চটকাবে। নির্ঘাত চোরের অপবাদ দিতে ছাড়বেনা। সাবাব ঢোক গিলে বড় করে নিঃশ্বাস নিলো। দম ফুরিয়ে গেলে চলবেনা। দম বজায় রাখতে হবে।
পেছনে সাবাবের অস্তিত্ব আবিস্কার করতেই অগ্নি দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো হীর। সাবাব তোয়ালে নেওয়ার জন্য এগিয়ে নেওয়া হাত গুটিয়ে নিয়ে ‘ভেরি ইনোসেন্ট’ টাইপ ফেইস করে ফেলল। দাঁত কেলিয়ে হাসার চেষ্টা করার মাঝেই হীর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
—-‘ এটা তোমার কাছে কি করে এলো?’
সাবাব লকেট টার দিকে তাকিয়ে না চেনার ভান করে বলল,
—-‘ ক..ককি এটা?’
—-‘ দেখতে পাচ্ছো না এটা কি?’
সাবাব ঢোক গিলে হীরের হাত থেকে তোয়ালে টা ছো মেরে কেঁড়ে নিয়ে পালাতে লাগলো। হীর দ্রুত পায়ে সাবাবের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। সাবাব যেতে না পেরে থমকে দাঁড়ালো। হীর একহাত কোমরে চেপে লকেটটা সাবাবের সামনে ঝুলিয়ে ধরে বলল,
—-‘ কেন নিয়েছিলে আমার লকেট টা!’
—-‘ আমি নেই নি। আই সোয়্যার! সেদিন রাতে-
—-‘ একদম বাজে কথা বলবে না। তুমি না নিলে এটা তোমার কাছে কি করে এলো? প্লেনে চড়ে?’
—-‘ না প্লেনে চড়ে আসেনি। এসেছে তো-
—-‘ এসেছে তো কি? কিভাবে এসেছে?’
—-‘ তুমি চটে যাচ্ছো কেন?’
—-‘ চটবো না? তুমি জানো এটার জন্য আমার কতরাত ঘুম হয়নি। কোথায় কোথায় না খুঁজেছি এটা!’
—-‘ আর তুমি কি জানো এই ছোট্ট জিনিসটা জবে থেকে আমার কাছে এসেছে তবে থেকে কতটা প্রশান্তির ঘুম হয়েছে আমার। তোমার এই ছোট্ট লকেকটা পেয়ে আমার মনে হয়েছিলো পুরো তুমিটাই আমার কাছে চলে এসেছো।’
সাবাবের শীতল কণ্ঠে হীরের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। হীর কথায় পটু হওয়া স্বত্বেও মুহুর্তেই ভুলে গেলো সে সাবাবকে কি বলবে?
সাবাব হীরের দিকে এক ধাপ এগিয়ে হাত বাড়িয়ে লকেটটা নিজের হাতে তুলে নিলো। হীর অনাকাঙ্ক্ষিত আশংকায় কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। তবে সাবাব সেটা ধরতে পারলো না। সে একমনে লকেটটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
—-‘ যেদিন এটা আমার সঙ্গে করে এই ঘরে প্রবেশ করলো সেদিনই খুব কড়া গলায় আমাকে বলল, যতদিন না হীরপরিকে নিজের করে এই ঘরে তুলতে না পারছো ততদিন আমার মুখ দেখা বন্ধ। ততদিন আমাকে ছোয়াও বন্ধ। যেদিন হীরপরিকে নিয়ে আসবে সেদিন আমার মুখ দেখবে। জানো, আমি কিন্তু ওর কথা শুনি নি! আমি এটা তোমাকে দেওয়ার জন্য সকালেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে তোমাকে দেওয়াই হলো না৷ তারপর এই লকেট তো আমাকে আরও বড় হুমকি দিয়ে বসলো, ‘তোমাকে না বারন করেছি আমাকে এ-ঘর থেকে বের করবে না। তবুও কেন বের করলে? তোমার সাহস কি করে হলো? আমি যেখানে ছিলাম আমাকে আবার সেখানেই রাখো। অন্যথা ঘোর অন্যায় হবে।’ আমি তো ওর কথা শুনে ভয়েই ওকে লুকিয়ে রাখলাম।’
হীর খিলখিল করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে মনের অজান্তেই সাবাবের হাতটা শক্ত করে ধরলো। সাবাব মুগ্ধ নয়নে হীরের হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। হীর হাসতে হাসতে বলল,
—-‘ আমার লকেট এতো কথা জানে আমার তো জানাই ছিলো না।’
সাবাব মুচকি হেসে বলল,
—-‘ আমার হীরপরিটাও যে এতোটা মন খুলে হাসতে পারে সেটাও যে জানা ছিলো না।’
সাবাবের কথায় হীরের হাসি নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। যেটা দেখে সাবাবের মুখটাও মলিন হয়ে উঠলো। হীর নিজের হাতটা সাবাবের হাত থেকে সরিয়ে নিতে চাইলেই সাবাব তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো বলল,
—-‘ আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি হীর। তবুও তুমি হাসো।’
হীর একপ্রকার জোর করেই সাবাবের থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নিলো। সাবাবকে তাড়া দিয়ে বলল,
—-‘ জলদি ফ্রেশ হয়ে নীচে এসো। বড় মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
—-‘ কেন?’
—-‘ কিছু জরুরি কথা বলবেন নাকি। তুমি এসো আমি যাচ্ছি।’
কথাটা বলেই হীর হাঁটা ধরলো। সাবাব তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
—-‘ আমার থেকেই কেন পালিয়ে বেড়াও? বাকি সবার মতো আমিও কি তোমার কাছের কেউ হতে পারিনা?’
সাবাবের কন্ঠটা করুন শোনালো। হীরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে না চাইতেও দাঁড়িয়ে পড়লো। কিন্তু জবাব দিলো না কোনো। চুপচাপ বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
________________
সাবাবের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে বেশ লেট হলো আজ। এতখানি রাত করে বাড়ি ফেরাতে মায়ের বকায় আজ সে ইন্ডিয়া থেকে পাকিস্তানে গিয়েও পড়তে পারে। তার মা সব পছন্দ করলেও লেট করে বাড়ি ফেরা কোনো কালেই পছন্দ করেন না। সাবাব আল্লাহর নাম নিয়ে বাসার ভেতর পা রাখতেই যেন আঁতকে উঠল। বাড়িটা পুরো অন্ধকারে তলিয়ে আছে। আহমেদ ভিলা কোনোদিন সব গুলো আলো বন্ধ করা দূর কখনও এক কোনের একটা আলোও নিভিয়ে রাখেনি। তবে আজ কি হলো? বাড়ির সবাই ঠিক আছে তো? নাকি কিছু হয়েছে? হীর! হীরের কোনো ক্ষতি হলো না তো? সাবাবের ভেতরে ঝড় শুরু হলো। সে অন্ধকার হাতড়েই ছুটে গেলো নিজের রুমে। তার রুম একই অবস্থায় আছে। অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। সাবাব হীর বলে চেঁচিয়ে উঠলো। শূন্য বাড়ি যেন খা খা করে উঠলো তার চিৎকারে! সাবাব হয়রান হয়ে ছুটে গেলো মা-বাবার ঘরে। এ-ঘরও খালি। কেউ নেই। বাড়িতে নেহাল আর সানিয়াও তো ছিলো। তারাও কেউ নেই। কোথায় গেলো সবাই? কেউ কোনো ক্ষতি করলো না তো তার পরিবারের। তবে কি এতদূর এসেও শেষ রক্ষা করতে পারলো না সাবাব? সাবাবের বুকের ভেতর হাহাকার শুরু হলো। মনে পড়তে লাগলো রিয়াদ কনিকার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা। সাবাব মা,বাবা, হীর, সানি বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। তার পরিবারের কিছু হয়ে গেলে যে সে বেঁচে থেকেও মরে যাবে। সাবাবের শরীর দুর্বল হয়ে পড়লো। শরীর যেন ভেঙে আসতে চাচ্ছে। চেয়েও সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। তার সুক্ষ্ম মস্তিষ্ক তাকে সঙ্গ দিচ্ছে না। তার মন তাকে আরও ঘাবড়ে দিচ্ছে। বিপদের আশংকা বার্তা দিচ্ছে। সিঁড়ি ধরে বসে পড়লো সাবাব। এমন উদ্ভট আচরন করলে চলবে না। নিজের মস্তিষ্ককে জাগাতে হবে। কাজে লাগাতে হবে! যদি কেউ তার পরিবারকে কিডন্যাপ করে তবে কে করতে পারে? মনি? কিন্তু মনি কি করে করবে! লোক দিয়ে। মনির ভাড়া কড়া লোক সাবাবের ঠিক করা সিকিউরিটি গার্ডের চেয়ে বেশি কর্মঠ নয়। সুতরাং মনির লোক বাড়ি বয়ে এসে তার পরিবারকে কিডন্যাপ করিয়ে নিয়ে যাবে সেটা সম্ভব নয়। আর রইলো বাকি দু’জন। যাদের পরিচয় এখনও গোপন। তবে কি তারা-? না তারাও হবেনা। সবার ক্ষোভ হীরের প্রতি। তারা কিডন্যাপ করলে কেবল হীরকে করবে! পুরো পরিবারকে তুলে নেওয়ার ভুল করবেনা। সাবাবের মস্তিষ্ক তার সঙ্গ দিলো আঁচমকাই! মন বলল পুরো বাড়ি একবার না খুঁজে বোকামো করলে চলবে না। কেননা বাড়ির সবকিছুই একদম স্বাভাবিক কেবল আলোটা বাদে। সাবাব ছুটে গেলো গার্ডেনের দিকে। পুরো গার্ডেনের এ মাথা থেকে ও মাথা অব্দি তন্নতন্ন করে খুঁজলো সবাইকে। কিন্তু কেউ নেই। এখন কেবল বাকি আছে বাসার ছাদ। যদি ওখানেও কেউ না থাকে তবে তাকে তার ডিউটি শুরু করতেই হবে। আর একমিনিট দাঁড়িয়ে না থেকে সাবাব ছুটে গেলো ছাদে। ছাদে পা রাখতেই ঘটলো যেন মিরাক্কেল। চোখের পলক পড়ার মাঝে আহমেদ ভীলা ভেসে উঠলো আলোয় আলোয়। ঝলমল করতে লাগলো চারপাশ। সাবাবের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। ছাদে কে আছে দেখার জন্য এপাশে আসতেই প্রদর্শন হলো জ্বলজ্যান্ত এক পরীর। সাবাবের মুখটা হা হয়ে গেলো মুহুর্তেই। সামনে দাঁড়িয়ে আছে হীর। পরনে মেরুন রঙের একটা সিল্ক শাড়ি। চোখে পাপড়ি গুলো চমক দিচ্ছে মেকাপের হালকা সাজে। তার নীচেই দক্ষ হাতে টেনেছে মোটা কাজলের রেখা। নাকে জ্বলজ্বল করছে সাদা ছোট্ট একটা পাথর। আর ঠোঁট খানা চমৎকার লাগছে গাঢ় লাল লিপস্টিকে। গলাটা খালি রেখেছে। কানে পড়েছে চেইন বিশিষ্ট লম্বা দুল। হাত ভর্তি রেশমি চুড়ি। শাড়ি বিশেষ পাতলা হওয়াতে সাবাব নির্লজ্জ হলো আরেকটু নীচে নেমে আসতে। হীরের পাতলা কোমরে তার দেওয়াই কোনো এক বিশেষ কোমরবন্ধনী পড়েছে। কোমরবন্ধনীর গায়ে পাথরের কাজ গুলো রঙবেরঙের আলোতে চিকমিক করে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। হীরের এমন রুপে সাবাবের বুকের ভেতর থেকে শীতল কিছু নেমে গিয়ে তার শরীর ঠান্ডা করে দিলো। মনের ভেতর যতটা ভয় কাজ করছিলো সবটা নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো। তার মনের মাঝে ঝেকে বসলো এক অদ্ভুত ভালোলাগা। ভালোবাসার মানুষটাকে খুব কাছ থেকে পাওয়ার তৃষ্ণা।
সাবাবকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হীর মুখ টিপে হাসলো। সে মনে মনে যে প্ল্যান করেছিলো আখেরে সেটা ফললো। সাবাবকে সে ভয় দেখাতে সফল হয়েছে। সাবাবের গায়ে চেক শার্টটা ঘামে ভিজে উঠে নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। কপালটা এখনও চিকচিক করছে ঘামে। মাথার সিল্কি চুলগুলো ঘাম লেপ্টে আছে কপালের মাঝে। গলার কাছটাতেও ফোঁটা ফোঁটা জল দেখা যাচ্ছে। এ সবটাই হচ্ছে সাবাবকে ভয় দেখানোর ফল। কিন্তু একটা বিষয় হীরের চোখের পড়তেই নিজের মধ্যে অপরাধ বোধ মাথাচাঁড়া দিয়ে উঠলো। সাবাবের চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে। চোখ থেকে জলও গড়িয়েছে। তবে সেটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না। তবে সাবাবের চোখের লালচে আভায় হীর ঠিকই বুঝতে পারলো।
হীরের ভাবনার মাঝেই সাবাব এক অদ্ভুত কাজ করে ফেললো। হীরের দিকে তেড়ে এসেই ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলো হীরের গালে। হীর চড় খেয়ে নীচে পড়তে নিলেই সাবাব নিজেই ধরে ফেললো। হীর গালে হাত দিয়ে ঠোঁট উল্টে তাকালো সাবাবের দিকে। সাবাব অগ্নি দৃষ্টি তাকিয়ে আছে হীরের দিকে। হীর মুখটাকে কাঁদো কাঁদো করে ফেলে বলল,
—-‘ মারলে কেন?’
সাবাব জবাব না দিয়ে হীরকে হেঁচকা টান মেরে বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো। বুক ফুলিয়ে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
—-‘ আমাকে এতোটা হয়রান করার শাস্তি। বাড়িতে ঢুকে এমন অবস্থা দেখে কতটা ঘাবড়ে গিয়েছি ভাবতে পারছো? পাগলের মতো হয়ে গেছি!’
হীর সাবাবকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল,
—-‘ তাই বলে এতো জোরে মারবে! লেগেছে না আমার?’
সাবাব মুখ টিপে হাসলো। হীর গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালো। সাবাবের চোখ হীরের পিঠে পড়তেই পূনরায় বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো সাবাবের। সাবাব প্যান্টের পকেট থেকে সকালের লকেটটা বের করে সামনে ধরলো। হীর তখন চলে যাবার সময় আর নেয়নি এটা। আর এখন যেহেতু তার গলাটা খালিই রেখেছে তার মানে হীর লকেটটা তার হাতেই পড়তে চায়। সাবাব ছোট ছোট ধাপ ফেলে এগিয়ে গেলো হীরের দিকে। হীরের পিঠের সাথে তার বুক এলিয়ে কাঁধে থুতনি রেখে একপ্রকার জড়িয়ে ধরলো। হীর কেঁপে উঠে লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আস্তে করে বলল,
—-‘ কি করছ!
সাবাব মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—-‘ এখনও তো কিছুই করলাম না। কিন্তু ম্যাডাম আপনি আজ যে ট্রিকস করে রেখেছেন তাতে তো প্রতি পদক্ষেপে আমি আহত হচ্ছি। ভরসা দিতে পারছিনা ঠিক কতক্ষণ এভাবে থাকতে পারবো।’
হীর লজ্জা পেয়ে দু’হাতে নিজের মুখ আড়াল করে নিলো। সাবাব মুচকি হেসে বলল,
—-‘ এই সব অ্যারেঞ্জমেন্ট নিজের হাতে করেছো?’
—-‘ হু।’
—-‘ পার্ফেক্ট। আর আমার বউটাকে এতো কিউট করে কে সাজালো?’
—-‘ আমিই সাজিয়েছি।’
—-‘ কেন?’
—-‘ তোমার জন্য-
কথাটা মুখ ফস্কে বলে ফেলে মুখ চেপে ধরলো হীর। জিভ কেটে সাবাবের দিকে আঁড়চোখে তাকাতে নিলেই সাবাব হেসে ফেললো। আচমকা হীরের ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বলল,
—-‘ আজ বলবে তো ভালোবাসো আমায়?’
সাবাবের ছোঁয়ায় হীর পাথর হয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
—-‘ বলবো! তার আগে-
সাবাব মুখ তুলে বলল,
—-‘ তার আগে? তার আগে কি?’
—-‘ তার আগে আমার লকেট আমাকে ফেরত দাও।’
সাবাব নিজের হাতের দিকে তাকালো। হীরকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হীরকে লকেটটা পড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
—-‘ইশশ, এমন ভাবে বলছো যেন কেঁড়ে নিয়েছি তোমার থেকে।’
হীর মুচকি হেসে বলল,
—-‘ তাহলে কি করে নিয়েছো?’
হীরের প্রশ্নে সাবাব থমকে গেলো। তার মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা। যেদিন নিজের অজান্তেই সে হীরের খুব কাছে চলে গিয়েছিলো। আর ঘোরের মাঝে এক অদ্ভুত কাজ করতে গিয়ে এই লকেটটা তার সাথে চলে এসেছিলো। সাবাবকে চুপ হয়ে যেতে দেখে হীর তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। প্রশ্নবিদ্ধ মুখ করে বলল,
—-‘ চুপ হয়ে গেলে কেন? বলো?’
হীরের প্রশ্নে সাবাবের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল। সাবাব হীরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে হীরকে পূনরায় উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে হীরের কাঁধে থুঁতনি রেখে বলল,
—-‘ ভাবছিলাম।’
—-‘ কি ভাবছিলে?’
#