#কাছে_দূরে ??
#muhtarizah_moumita
#পর্ব___৫৩
প্রকৃতির আলো ফুটেছে অনেকক্ষন। চারপাশে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। মনোরম পরিবেশ। সূর্যের তাপ একদম শূন্য। গাছের ডালপালা গুলোর ফাঁকফোকর থেকে সূর্যের আলো এসে পড়লো হীরের মুখে। তৎক্ষনাৎ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো তার। চোখ জোড়া কুঁচকে নিয়ে আবার খুলে তাকালো। চোখ খুলতেই প্রথমে সাবাবের মুখটা ভেসে উঠলো। সাবাব বেঘোরে ঘুমচ্ছে। হীর সাবাবের বুকে মাথা রেখে ঘুমচ্ছিলো। এখন উঠার সময় হয়েছে। হীর অলস ভঙ্গিতে সবাব কে ছেড়ে উঠে বসলো। এক মিনিটের মধ্যে ভাবলো বড়মা আর বাবাই বাড়ি ফিরেছে কিনা! ভাবতে ভাবতে নীচে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। শাড়ির আঁচলটা মেঝে থেকে তুলি ভালো করে জড়িয়ে নিলো গায়ে। নিজেকে একদম পরিপাটি করে নীচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলেই এক অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসলো। হীর থমকে গিয়ে পেছন মুড়ে তাকালো। এই শব্দ ফোনের ভাইব্রেট করার শব্দ। তার ফোন তো এখানে নেই। রাতে নিজের রুমেই ফেলে এসেছে। সাবাবের ফোন হবে। হীর বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে সাবাবের ফোন খুঁজতে লাগলো। বিছানার শেষ মাথায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে সাবাবের ফোন। হীর হাঁটুতে ভর করে সেখানে গিয়ে ফোনটা উঠাতেই দেখলো মীর কল করেছে। কলটা রিসিভ করার মাঝেই কেটে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠলো -85 missed call! হীরের মনে কামড় দিলো। এতো গুলো মিসড কল! ওখানে সব ঠিক আছে তো? হীর ঝটপট বিছানা থেকে নেমে সাবাবের কাছে গেলো। সাবাবকে ডাকতে নিলেই আবারও ভাইব্রেট করে ওঠে ফোন। হীর সাবাবকে ডাকতে নিয়েও ডাকেনা। তার মন তাকে বারবার কলটা রিসিভ করার জন্য বলছে। অস্বস্তি হচ্ছে বটে কিন্তু সে নিরুপায়। ওদিকের খোঁজ জানা তারও জরুরি! হীর কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাস থেকে ভেসে এলো মীরের ব্যস্ত গলা,
—-‘ ভাই ওদের সন্দেহ হয়েছিলো আমরা ওদের উপর নজরদারি করছি। আর তাই ফাঁদ পেতে আমাদের প্ল্যানে আমাদেরই ফাঁসিয়েছে। কিরন আর তরীকে ওরা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে! আমার মাথায় তো এটাই আসছে ওদের সন্দেহ কি করে হলো? সন্দেহ হওয়ার কোনো চান্সই নেই! আমার মনে হয় ওদের কেউ ইনফর্ম করেছে! হয়তো কেউ জানে আমরা এখানে এসেছি! আমার মাথা কাজ করছে না রে! তরী আর কিরনকে আমরা কি করে উদ্ধার করবো? ভাই তুই চলে আয় মালয়েশিয়া! আমার মাথা কাজ করছেনা! কি রে বল কিছু?-
হীরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো! তরী আর কিরনকে ওরা তুলে নিয়ে গেছে! বড় কোনো ক্ষতি না করে দেয়। হীর কলের লাইনটা কেটে দিলো। ‘কেউ ওদের ইনফর্ম করেছে’ কথাটা মাথার মধ্যে বেজে উঠলেই চোখ বন্ধ করে নিলো হীর। কে ইনফর্ম করবে? কে? ফট করে মাথার মধ্যে বেজে উঠলো ‘বাবাই’। হ্যাঁ। জানলে একমাত্র বাবাই-ই জানবে। কেননা বেশ কিছুদিন ধরে বাবাইও হয়তো নোটিশ করেছে সাবাবের টিম মেম্বাররা,তরী,মীর কেউ নেই। অথচ রাতুল,ইনান আছে। হয়তো তারা কোথাও কোনো মিশনে গিয়েছে। হয়তো তার ছেলেই পাঠিয়েছে। আর সাবাব যেহেতু তার বাবাই আর ছোট মায়ের খুনের রহস্য ঘাটছে হতে পারে সন্দেহের বসে তাদের মালয়েশিয়া পাঠিয়েছে। বাবাই আন্দাজ ঢিল ছুঁড়েছে। কিন্তু লেগে গেছে। হতেই পারে। হীর সাবাবের ফোনটা ফেলে দিয়ে দৌড়ে গেলো নীচে। রুবি ডাইনীংএ খাবার সাজাচ্ছে। হীরকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—-‘ আফা কি হয়ছে আফনের? এমনে পাগলের লাহান ছুট দিয়া আইলেন ক্যা?’
হীর ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—-‘ বড়মারা ফিরেছে?’
—-‘ হ ফেরছে তো। খালাম্মায় তো রান্না করতাছে!’
—-‘ আর বাবাই?’
—-‘ বড় সাহেব তো হের ঘরে। অফিস যাইবোনা? তৈয়ার হইতাছে।’
হীর আর দাঁড়িয়ে না থেকে ছুটে গেলো আজিম সাহেবের ঘরে। আজিম সাহেব গলার টাই ঠিক করছিলেন। আয়নার মধ্যে থেকে নিজেকে দেখতো দেখতেই হঠাৎ ভেসে উঠলো হীরের মুখ। তিনি ভাবলেন চোখের ভুল। কেননা সেদিন থেকে সে সারাক্ষণ হীরকে তার সামনে দেখতে পায়! তাই সেদিকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলেন। হীর তার দিকে কুটিল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শান্ত কন্ঠে বলল,
—-‘ কিরন আর তরীকে কেন কিডন্যাপ করালে বাবাই?’
হীরের কঠিন প্রশ্নে চমকে উঠলেন আজিম সাহেব। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পেছন মুড়ে তাকিয়ে বললেন,
—-‘ তুমি?’
হীর তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পূরনায় বলল,
—-‘ কিরন আর তরীকে কেন কিডন্যাপ করালে বাবাই?’
আজিম সাহেব থতমত চেহায় দেখলো হীরকে। এড়িয়ে যাওয়ার ভান করে বললেন,
—-‘ তুমি আমার ঘরে কেন এসেছো? বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে!’
হীর বাঁকা হাসলো। হীরের হাসি দেখে আজিম সাহেবের চোখ মুখ শুকিয়ে এলো। অজানা ভয়ের ছাপ পড়লো মুখে। ভয়ে আমতা আমতা করে পূনরায় বলল,
—-‘ আমার সাথে এসব অভিনয় করবেনা হীর। বয়স হয়েছে তো কি হয়েছে? আমি চাইলেই আগের আজিমে পরিনত হতে পারি।’
হীর তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
—-‘ চাইলেই পারো। কিন্তু সেই চাওয়া অব্দি টিকলে তো বা-বা-ই।’
আজিম সাহেবের বুক কেঁপে উঠলো। হীরকে সে ভয় পাচ্ছে। থমথমে কন্ঠে বললেন,
—-‘ মানে? কি বলতে চাও তুমি?’
হীর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—-‘ কিরন আর তরীকে ছেড়ে দিতে বলো!’
আজিম সাহেব মিইয়ে পড়ে বললেন,
—-‘ কিরন আর তরী কে ছেড়ে দিতে বলবো মানে? হীর তুমি কি বলছো আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা!’
হীর রাগে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছে। অধৈর্য্য হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
—-‘ আমি খুব ভালো করেই জানি মনিকে তুমি ইনফর্ম করেছো ওরা মালয়েশিয়া গেছে মনির ব্যাপারে সব ইনফরমেশন কালেক্ট করতে। আর ওরা তোমার কথাতেই ওদের দু’জনকে কিডন্যাপ করিয়েছে যাতে আমি মালয়েশিয়া যেতে পারি। মনির ফাঁদে পা দিতে পারি! তাই তো?’
আজিম সাহেব ভড়কে গেলেন হীরের কথায়। জড়ানো গলায় বারবার ঢোক গিলতে লাগলেন। হীর পূনরায় বলল,
—-‘ ওদের যদি কিছু হয়ে যায় বাবাই আমি তোমাকে ছাড়বো না। ভয়ংকর মৃত্যু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমার পাপের ঘড়া পূর্ন হয়েছে। এবার আমিও দেখবো তুমি কি করে পার পাও!’
এই বলেই হীর হনহনিয়ে চলে গেলো। আজিম সাহেব তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে ধপ করে বসে পড়লো। তার শরীর ঠিক লাগছেনা। প্রেশার বেড়ে গেছে। শরীর থেকে ঘাম ছুটছে। হীরের কথা গুলো বারবার মাথার মধ্যে বারি খেতে লাগলো। তিনি যে এখন আর সেই পুরনো আজিম নেই। একথা সবাইকে তিনি কি করে বোঝাবেন। সাবাব যে হারে এই রহস্যের পেছনে পড়েছে তাতে যে খুব শীঘ্রই সে ধরা পড়ে যাবে। তার মুখোশ খশে পড়বে।
হীর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলো নিজের ঘরে। তাকে কিছু একটা করতেই হবে। তার কারনে আর কোনো মানুষের প্রান যেতে পারেনা। সেটা সে কিছুতেই হতে দিতে পারেনা। তাকে যে করেই হোক তরী আর কিরনকে বাঁচানোর উপায় খুঁজতে হবে।
রুমের সামনে পা রাখতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো সাবাবের গলা। এতক্ষণে সাবাব সবটা জেনে গেছে। মীর তাকে আবার কল করেছে। হীর নিঃশব্দে গিয়ে সাবাবের পেছনে দাঁড়ালো। সাবাব কথা বলছে কারোর সাথে। আর পায়চারি করে যাচ্ছে। হীর তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই সাবাব গম্ভীর গলায় ডেকে উঠলল তাকে,
—-‘ দাঁড়াও হীর।’
হীরের পা জোড়া থমকে গেলো। সাবাব হঠাৎ তার সাথে এই স্বরে কথা বলছে কেন? নিজের মনকে প্রশ্ন করতে নিলেই সাবাব আবারও বলে উঠলো,
—-‘ ছাদে বসে কি তুমি কারোর কল পিক করেছিলে?’
হীর দম আঁটকে কিছু একটা ভেবে ফট করে উত্তর দিলো,
—-‘ ধরেছিলাম! ঘুম ঘুম চোখে খেয়াল করিনি কে ছিলো।’
হীরের জবাবে সাবাব সন্তুষ্ট হলো। তাহলে হীর মীরের কথা কিছুই শোনেনি। মীর ভুল ভুঝেছে অযথাই। সাবাব মৃদুস্বরে বলল,
—-‘ ওকে। তুমি এক কাজ করো দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আমাদের ব্যাগ প্যাক করে ফেলো। আমি একটু আসছি।’
এই বলে সাবাব হাঁটা ধরলে হীর কিছু না জানার ভান করে বলে,
—-‘ কে কল করেছিলো তখন? কোনো সমস্যা হয়েছে? আর আমরা হঠাৎ কোথায় যাবো? কিসের ব্যাগ প্যাক করবো।’
সাবাব পেছন মুড়ে মুচকি হেসে জবাব দেয়,
—-‘ হানিমুনে যাবো। মালয়েশিয়া। কিছু ভালো ভালো ড্রেস দেখে প্যাক করে নাও।’
এই বলে যেতে নিয়ে আবারও দাঁড়িয়ে পড়ে। পূনরায় পেছন মুড়ে বলে,
—-‘ তখন মীরের কল ছিলো। ওরাও মালয়েশিয়া আছে। ছোট্ট একটা সমস্যা হয়েছে। ভাবলাম গিয়ে ঘুরেও আসি আর প্রবলেমের সলিউশনও বের করে আসি।’
হীর মনে মনে প্রশান্তির নিঃশ্বাষ ফেললো। সাবাব চলে গেলে হীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে,
—-‘ আমি আসছি মনি। এবার সামনাসামনি মোকাবিলা হবে। বি রেডি।’
#চলবে_
[ বিঃদ্রঃ কিছু ব্যাক্তিগত সমস্যায় জড়িয়ে যাওয়ায় লিখতে পারছিলাম না। তাছাড়া শারীরিক অবস্থাও ভালোনা! আজও বেশি লিখতে পারিনি। একটু মানিয়ে নিবেন সবাই। এরপর থেকে রেগুলার হওয়ার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ ]
[ বিঃদ্রঃ এতদূর কষ্ট করে পড়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করবেননা। যদি ছোট্ট একটা মন্তব্যে আপনার মতামত জানাতে কষ্ট হয়। ধন্যবাদ। ]