#কাছে_দূরে ??
#muhtarizah_moumita
#পর্ব___৫৪
এশিয়ার একটি ছিমছাম গুছানো শহর মালেশিয়া।প্রতিবছর অসংখ্য ভ্রমণপিয়াসী বাংলাদেশি মালেশিয়াতে ঘুরতে আসেন। ঘুরতে যাবার জন্য পছন্দের তালিকায় মালেশিয়ার নাম প্রথম ৩ টি দেশের মধ্যেই আছে। মুলত মালেশিয়া একটি মুসলিম প্রধান দেশ। এবং এর রাজধানী কুয়ালালামপুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মালেশিয়াতে মাত্র একটিই ঋতু। আর সেটা হলো,বর্ষা। তাই এখানে প্রায় প্রতিদিনই কম বেশি বৃষ্টি হয়। বাইরের আবহাওয়াটা গরম অনুভূত হয়। সম্পূর্ণ দেশ জুড়ে দেখা যায় পাহাড়ি রাস্তা আর বন-জঙ্গল। ডক্টর মাহাথির মোহাম্মদকে বলা হয় আধুনিক মালেশিয়ার জনক। দীর্ঘ ২৭ বছরের পরিশ্রম তার বিফলে যায়নি। আজ মালেশিয়া পৃথিবীর একটি উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটি কুয়ালালামপুর মূল শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। কুয়ালালামপুর বিমান বন্দরে অবতরন করার পর মূল শহরে আসতে হলে টেক্সি অথবা বাস যোগে আসতে হবে। কুয়ালালামপুরে অবস্থান করার জন্য থাকার হোটেল বুকিট বিনতাং এলাকা বেছে নিলে ভালো হয়। এখানে পর্যটক হিসেবে মালয়েশিয়া এসে বুকিট বিনতাং এলাকায় থাকলে সব রকমের আনন্দ উপভোগ করা যায়। বেশির ভাগ পর্যটক মালয়েশিয়া আসার পর থাকার জন্য বুকিট বিনতাং এলাকার হোটেল গুলোই বেছে নেন। হোটেলের ভাড়া দিন প্রতি ৫০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত থেকে ৫০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত।
মালয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় হোটেল গুলোর মধ্যে একটি হলো টাইমস স্কয়ার। সাবাব আর হীর গিয়ে টাইমস স্কয়ারের এপার্টমেন্টগুলোতে উঠেছে। এখানে দিব্যি থাকার সাথে ঘরোয়া ভাবে সব আয়োজনই থাকে। মীররা আগে থেকে রয়্যাল বেনতানে ছিলো। সাবাব চলে আসায় তারাও এসে একই এপার্টমেন্টে উঠেছে।
মালয়েশিয়া এখন সময় -22:01। হীর-সাবাব মালয়েশিয়া এসে পৌঁছেছে ঘন্টা তিনেক পেরিয়ে গেছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই মনিকা জেনে গেছে তাদের আসার খবর। নিশ্চয়ই আবার নতুন কোনো ছক কষতে বসেছে! মীরের মুখ শুঁকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ইভানেরও একই অবস্থা। মাহদী আর আভিক পায়চারি করে যাচ্ছে। সাবাব ব্যলকনির থাই ধরে অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। রাত হলেও ল্যাম্পপোস্টের উজ্জ্বল আলোয় রাস্তাঘাট দিনের মতো মনে হচ্ছে। বারেবারে থেকে থেকে গুরিগুরি বৃষ্টি হচ্ছে। যা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মনে হচ্ছে শিশির পড়ছে। হীর পাশের রুমে শুইয়ে আছে। শুইয়ে শুইয়ে ভাবছে হায়েনার রাজ্যে তো এসে পড়লো কিন্তু এবার হায়েনাকে কি করে স্বীকার করা যায়? কি করে তাদের গর্তে তাদেরকেই ফেলা যায়? অন্যমনস্ক হয়ে সেও ভেবে যাচ্ছে এসব!
মীর অস্থিরতা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সাবাবের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে ধৈর্য্যহারা কন্ঠে বলল,
—-‘ এবার আমরা কি করবো ভাই? ওরা যদি ওদের দু’জনের কোনো ক্ষতি করে দেয়?’
মীরের কন্ঠটা কেমন করুন শোনালো! সাবাবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। স্বান্ত্বনা দিয়ে মীরকে কি বলা যায় ভেবে পেলো না সাবাব। মীরের মুখটা কেমন হয়ে আছে। সে যে তরীকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছে ভীষণ। সাবাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে মীরের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—-‘ এতো দুশ্চিন্তা করিস না দোস্ত। দেখ আমরা এমন একটা সিচুয়েশনে পড়ে গেছি যেখানে আমরা চাইলেই কিছু করতে পারবোনা। আমরা চাইলেও ওদের উপর হামলা করতে পারবো না। আমাদের বুঝেশুনে ধাপ ফেলতে হবে। হুট করে কিছু করতে গেলেই আমরা বিপদে পড়ে যেতে পারি। যার ফল স্বরূপ তরী আর কিরনের আরও বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্লীজ ইয়ার সামলা নিজেকে! আমি তোর কষ্ট টা ফিল করতে পারছি। তাছাড়া ওদের লাইফ রিস্ক হোক এমন কিছুই আমরা করতে পারিনা!’
মীরের চোখ জোড়া টলমল করছে। চোখের ভেতর আগুনের লাভা ফুটছে। জড়ানো গলায় ঢোক গিলে দেয়ালের বুকে স্ব জোরে ঘুষি দিয়ে চাপা আর্তনাদ করে উঠলো। মীরের পাগলামিতে উপস্থিত সবাই ভড়কে গেলো। সাবাব মীর বলে চেঁচিয়ে উঠলো। সাবাবের চিৎকার পাশের রুমে পৌঁছাতেই দৌড়ে এলো হীর। তার বুক কাঁপছে! আবার কার বিপদ হলো?
মীর নীচে বসে পড়ে থরথর করে কাঁপছে। সাবাব বোবার চোখে তাকিয়ে আছে মীরের দিকে। দেয়ালে ঘুষি দেওয়ায় মীরের হাত ফেটে রক্ত ঝড়ছে। ব্যাথা এবং রাগ দুটোই মীরকে ঝাপটে ধরেছে। মীর যেন কিছুই ভাবতে পারছেনা তরীকে ছাড়া। রিয়াদ-কনিকার মৃত্যুর বর্ণনা শুনে এক অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেছে তার মনে! যদি কোনো ভাবে ওরা তরীর সাথে এসব কিছু করে? তাহলে যে সে বেঁচে থেকেও মরে যাবে।
মীরের হাত থেকে রক্ত ঝড়তে দেখে দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো হীর। হীরের চিৎকারে আরও একবার ভড়কে গেলো বাকিরা। দূরে হীরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাবাব অসহায় চোখে তাকালো। সবটা যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে যেমনটা ভেবেছিলো সেরকম কিছুই হচ্ছে না। সব এলোমেলো ভাবে অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। হীর একপ্রকার দৌড়ে এলো এদিকে। মীরের হাতে রক্ত দেখে সাবাবের দিকে তাকালো। করুন কন্ঠে বলল,
—-‘ এটা কি করে হলো?’
—-‘ তুমি আবার এখানে কেন আসতে গেলে?’
সাবাবের কথায় বিশেষ পাত্তা দিলো না হীর। মীরের সামনে বসে করুনস্বরে বলল,
—-‘ ভাইয়া তুমি এসব কেন করছ বলো তো? কি হয়েছে তোমার? আমায় বলো?’
মীর টলমল চোখে দেখলো হীরকে। হীরকে দেখে তরীর মুখটা ভেসে উঠলো মীরের সামনে। সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ভাঙা কন্ঠে বলে উঠলো,
—-‘ মনি তরী আর কিরনকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে হীর! ১০ঘন্টা পার হয়ে গেলো। এখনও ওদের কোনো খোঁজ আমরা পাইনি! জানিনা কি হতে চলেছে ওদের সাথে। আমার মাথা কাজ করছেনা।’
মীর মুখ ফস্কে মনির নাম নিয়ে ফেলাতে সবাই চমকে উঠলো। মনির নাম শুনে হীর কতটা ভয়ংকর রিয়াকশন দিবে সেই ভয়ে। কিন্তু সবার চমকানো ভাবকে হীর দিগুণ বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
—-‘ ভাইয়া, তুমি একদম চিন্তা করো না। এই যে তোমার বন্ধু চলে এসেছে না? এখন আর কোনো চিন্তা নেই। এবার কোনো না কোনো উপায় ঠিকই বের হবে। তরী আপু, কিরন ওদের ঠিকই উদ্ধার করতে পারবে। তোমার তরীকে তোমার কাছে ঠিকই ফিরিয়ে আনবে। তুমি মিলিয়ে নিও!’
হীরের কথায় সাবাব সহ প্রত্যেকেই হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। মনি তরী এবং কিরনকে কিডন্যাপ করে নিয়েছে অথচ হীর একটুও চমকালো না? অবিশ্বাস্য চোখে দেখলো না? মনির ব্যাপারে এসব মিথ্যে অভিযোগ শুনবো না বলে চেঁচালোও না? কিন্তু কেন? রহস্য টা কি? হীর এতো নর্মাল রিয়াকশন কি করে দিচ্ছে? কি করে?
মীর জড়ানো গলায় ঢোক গিলে হীরের মুখের দিকে তাকালো। চোখের জল গড়ানোর পূর্বেই দ্রুত হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো। মেকি হাসি দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—-‘ তুমি ঠিক বলছো তো বোন?’
হীর মৃদু হেসে মীরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—-‘ ঠিক বলছি ভাইয়া। এবার তুমি একটু রেস্ট নাও। তোমার রেস্টের দরকার।’
মীর পাশ ফিরে সাবাবের দিকে তাকাতে সাবাবও হ্যাঁ সুচক মাথা নেড়ে বলল,
—-‘ হীর ঠিকই বলেছে। তোর রেস্টের দরকার। আয়।’
সাবাব মীরকে বিছানার কাছে নিয়ে যেতে হীরও উঠে তাদের রুমে চলে গেলো। সাবাব তার যাওয়ার পানে একবার তাকিয়ে ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
পাঁচ মিনিট বাদে সাবাব রুমে ঢুকলে দেখে বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কিছু কাগজ। হীর ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সাবাব রুমে ঢুকে কাগজ গুলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হীরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো,
—-‘ এগুলো কি?’
সাবাবের গলা পেয়ে হীর কিঞ্চিৎ চমকে উঠলো। পেছন মুড়ে দেখলো কাগজগুলো হাতে নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সাবাব। হীর মৃদু হেসে এগিয়ে এলো সাবাবের দিকে। সাবাবের থেকে কাগজ গুলো নিজের হাতে তুলে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
—-‘ আমার সম্মন্ধে তোমার মনে অনেক প্রশ্ন চলছে। আগে সেগুলোর উত্তর দেই?’
হীরের কন্ঠ নিস্তেজ। কিন্তু কথাগুলো কেমন ধারালো। সাবাব অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দেখছে হীরকে। কেমন অপরিচিত লাগছে হীরকে। মনে হচ্ছে এই হীরকে সে চিনেনা। সাবাব প্রশ্ন করার আগেই হীর উত্তর দিতে লাগলো,
—-‘ আমি জানি আমার মা-বাবার খুনের পেছনে কারা কারা আছে। আর আমি এও জানি কারা তারা? কি তাদের পরিচয়? আর তারা কেন এসব করেছে আর আজও করে যাচ্ছে!’
হীরের কথায় সাবাবের বুকের ভেতরে হাতুড়ির বারি পড়লো। হীর এসব কি বলছে? তার বিশ্বাস হচ্ছে না৷ তার চোখ,কান সবাই যেন ধোঁকা দিচ্ছে তাকে।
হীর বিছানার অপরপ্রান্তে গিয়ে তার লাগেজটা টেনে সাবাবের সামনে আসলো। নীচে বসে লাগেজের লক খুলে কাপড়চোপড় সব বের লকারের মতো দেখতে ছোট্ট একটা বক্স বের করলো। তার গায়ে সোনার নকশা করা। হীর সেটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সাবাবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
—-‘ এটা আমাদের বড়বাবার(দাদার বাবা) ছিলো। তারপর উত্তরাধিকারী সূত্রে এটা চলে এলো দাদাভাইয়ের কাছে। আর তারপর আমার বাবার কাছে। এতে কি আছে আমি জানিনা। কখনও খুলে দেখিনি তবে আন্দাজ করতে পারছি এতে বড়বাবার গুপ্তধনের সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে। এখানে অনেকগুলো চাবির গোছা আছে যে গুলো দিয়ে বড়বড় সুরঙ্গ খুলে। আর সেই সুরঙ্গের মধ্যে স্বর্নলংকারে ভরপুর। এর একটা সুরঙ্গ কোনো ভুল হাতে চলে গেলে তারা পৃথিবী ধ্বংস করার মতো ক্ষমতায় চলে যেতে পারে। বাবার মৃত্যু কেবল শত্রুতায় নয় এই গুপ্ত সম্পদের জন্যও হয়েছে। ছোট বেলায় যখন আমি তোমাদের বাড়িতে এলাম তখন আমার এসব সম্মন্ধে কোনো ধারনাই ছিলো না। আমি জানতামই না এসবের কথা। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর আমাদের বাড়িটা কোর্টের অর্ডারে তাদের হেফাজতে চলে যায়। আমার যখন ১২চলে তখন থেকেই আমি এসবের রহস্য খুঁজতে থাকি। কি অপরাধে আমার বাবা-মাকে মরতে হলো? কি দোষ ছিলো তাদের? আমি সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই ছুটে যেতাম সেখানে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর অসংখ্য পুলিশ,ব্রিগেডিয়ার,গোয়েন্দা তাদের মার্ডার কেস সল্ভ করতে এসেছেন কিন্তু কেউ শেষ অব্দি টিকতে পারেন নি। সবাই কোনো না কোনো ভাবে মারা যেতেন। রহস্যজনক হলেও সবাই একটা রহস্য সমাধানের একই পর্যায়ে এসে মারা যেতেন। মারা যেতেন না,তারা মারা হতো। যখন শুনতাম নতুন কোনো পুলিশ বা ব্রিগেডিয়ার এসেছেন নতুন কেস নিয়ে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতাম। মনেমনে ভাবতাম আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করবো। তাদের আমি সব ভাবে সাহায্য করবো। কারোর কারোর সাথে তো যোগাযোগ হয়েওছিলো কিন্তু শেষ অব্দি তাদেরও একই অবস্থা হতো। তাদের মৃত্যুতে আমি দিশেহারা হয়ে যেতাম। বাবা-মায়ের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন হতে হতে হতো না। তাই ঠিক করলাম আর কারোর উপর নয় এবার আমি নিজে রহস্য উদঘাটন করবো। তোমার ধারনা ভুল ছিলো, আমার উপর একটা নির্দিষ্ট বয়স থেকে নয় আমার উপর সর্বদাই এট্যাক হতো। কিন্তু এট্যাক কারীরা সফল হতো না। আমি কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে যেতাম। একদিন বাড়ির গার্ডদের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে গেলাম বাড়িতে। বাড়িটা তখন শুনশান নীরবতায় খা খা করছিলো। চোখের পলক পড়তেই আমার সামনে ভেসে উঠলো আমার ছোট বেলা। বাবার গলা জড়িয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি মাথায় করে ফেলছে ছোট্ট হীরপরি। মেয়ের এমন নিষ্পাপ হাসিতে বাবার মুখটা অদ্ভুত মায়ায় ঘিরে আছে। মা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে আর আমাকে বারবার মেকি সুরে রাগ দেখিয়ে নিজেও হাসতে হাসতে বসে পড়ছে আমাদের পাশে। হঠাৎ করে সবটা মিলিয়ে গেলো। ভেসে উঠলো মায়ের আত্মচিৎকার! বুকটা কেঁপে উঠলো আমার। মা হীর বলে চিৎকার করে ছাদ থেকে পড়ে গেলো। কয়েক মুহুর্তের জন্য আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিতো। আমি বস পড়তাম ওখানে। দুহাতে মুখ চেপে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠতাম।
তখন আমার পাশে কেউ ছিলোনা। আমি একা ছিলাম। আর তাই নিজেকে একাই গড়লাম। কারোর উপর নির্ভর ছাড়া একাই বাঁচতে শিখলাম। এভাবে করেই রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে এবাড়ি আসতাম। যদি কিছু খুঁজে পাই সেই আশায়। অবশেষে খুঁজেও পেলাম।’
এটুকু বলে থামলো হীর। ‘অবশেষে খুঁজেও পেলাম’ কথাটা শুনতেই বুকের ভেতর শীতল কিছু বয়ে গেলো সাবাবের। হীরের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
—-‘ কি খুঁজে পেলে?’
—-‘ ডায়েরি।’
—-‘ ডায়েরি? কার?’
—-‘ বাবার। বাবার পার্সোনাল ডায়েরি ছিলো ওটা। যেটায় কি লেখা ছিলো মা-ও কখনো পড়েনি। বাবা ওটা চিলেকোঠার ঘরে একটা ভাঙাচোরা বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখতো। বাবার বয়স যখন ১০ তখন থেকেই বাবা ডায়েরি লেখা শুরু করে। আর ওটা তখনেরই ছিলো। বাবার জীবনে ছোট থেকে বড় অব্দি যত ঘটনা ছিলো সব ঐ ডায়েরিতে লেখা আছে। বাবা আমায় নিয়ে প্রায়ই যেতো চিলেকোঠার ঘরে। আমায় পাশে রেখে আনমনে কিসব লিখতো। একদিন আমার হঠাৎ মনে পড়লো চিলেকোঠার কথা। মন বলছিলো সেখানে গেলে কিছু তো একটা পাব। আর পেয়েও গেলাম। বাবার পার্সোনাল ডায়েরি হাতে পেলাম। যখন তড়িঘড়ি করছিলাম বেরিয়ে আসার জন্য তখন ধরা খেলাম একটা ছেলের হাতে। ছেলেটা আমার থেকে বেশি হলে বছর দুয়েক বড় হবে। ছেলেটা আমার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলল, তুমি হীর না? আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। ভয়ে গলা শুঁকিয়ে আসছিলো। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি, এতদূর এসে এভাবে পিছিয়ে যেতে পারবোনা। মনেমনে তৈরি হলাম ছেলেটাকে আঘাত করে পালাবো এখান থেকে। হতে পারে ও কোনো শত্রু! আমি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গিয়ে ঠেকলাম পরিত্যক্ত আমাদের ডাইনিং টেবিলের কাছে। হাত পেছনে বাড়িয়ে হাতে যা পেলাম ছুঁড়ে মারলাম ওর দিকে। ভাগ্যিস ও বুঝে সরে গিয়েছিলো। নয়তো সেদিন ওর মৃত্যু নিশ্চিত ছিলো। নিজের এমন বিভৎস কাজে নিজেই ভড়কে গেলাম। ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ভড়কানো গলায় বলল, হীর আমি সিয়াম। তুমি আমায় চিনতে পারছোনা? ওর কথা শুনে আমার হুট করে মনে পড়ে গেলো মালিকাকার কথা। তারমানে ও মালিকাকার ছেলে সিয়াম। সিয়ামও রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে এখানে আসতো। রহস্য খুঁজত। তারপর থেকে আমরা দু’জনে এক হয়ে রহস্য খুঁজতে আরম্ভ করলাম। শত্রুরা টের পেয়ে গেলো আমি বাবার একটা পার্সোনাল ডায়েরি খুঁজে পেয়েছি। এরপর ওদের আক্রোশ আরও দিগুণ বেড়ে গেলো। ওদের এই ডায়েরি টা চাই। ওরা যতদিনে খবর পেয়েছে আমি ডায়েরি পেয়েছি ততদিনে আমার ডায়েরি পড়া শেষ। গুপ্তধনের সমস্ত ডিটেইলস যে পেইজগুলোতে ছিলো আমি সেগুলো ছিঁড়ে ফেলি। কিছুদিন বাদে ডায়েরিটা চুরি হয়ে যায়। বুঝে যাই এটা শত্রুরাই সরিয়েছে। তবে তখন আর এটা নিয়ে ভাবিনা কারন ওদের যেটা প্রয়োজন ছিলো সেটা আমি আগেই নষ্ট করে দেই। আমি আবারও লেগে পড়ি কাজে। বাবার সিক্রেট রুমে যাওয়ার প্রানপন চেষ্টা করি কিন্তু তিন বছরে একদিনও সফল হইনি। অবশেষে একদিন পেরেছি। বাবার সিক্রেট রুমে কিছু কিছু পেপার আর এই বক্সটা উদ্ধার করি। হাতে সময় বেশি না থাকায় আরও বেশ কিছু পেপার নিয়ে আসতে পারিনি। তবে তা পরবর্তীতে নিজের দক্ষতায় হাসিল করি। এখানে মনির বিরুদ্ধে সব ডিটেইলস আছে। তোমরা চাইলেই মনিকে বিনা নোটিশে এরেস্ট করতে পারো। কিন্তু আমি চাই না তোমরা ওকে এরেস্ট করো। কারন মনিকে এরেস্ট করলে মনি তার পাপের যথাযোগ্য শাস্তি পাবেনা। আমি চাই মনিকে নিজের হাতে শাস্তি দিতে। আর তার ব্যবস্থা তুমি করবে। পারবেনা?’
হীরের সব কথা শুনে সাবাব নিজের মতামত দিতে ভুলে গিয়েছে। হাতে ছোট্ট লকারটা নিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। হীর সাবাবকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে চেতনা ফিরিয়ে বলল,
—-‘ কি হলো? পারবে না আমার জন্য এটুকু করতে?’
সাবাব চমকে উঠে তাকালো! ক্ষণকাল ক্ষণকাল পেরোতে বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—-‘ আমি তোমার জন্য সব কিছু করবো হীরপাখি। কিন্তু আমার মনে শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরছে, এই যে এতোকিছু ঘটে গেলো,ওরা তোমার উপর এতবার এট্যাক করেছে, বারবার মারতে চেয়েছে তুমি কখনও প্রতিবাদ কেন করোনি? আর আমরা যে সিয়ামের বাড়িতে গিয়েছিলাম তখন তো তুমি এমন ভাব করলে যে তুমি কখনও জানতেই না সিয়াম মালিকাকার ছেলে। কেন করেছিলে এমন? কি কারন ছিলো এসবের পেছনে?’
—-‘ আমি কখনও প্রতিবাদ করিনি সেটা ভুল। আমি নিজেকে প্রটেক্ট করার জন্য লড়েছি। তবে যাদের সাথে লড়েছি তারা আর বাঁচেনি। তাই শত্রুরা জানতেও পারেনি আমি লড়াই করতে জানি কিনা। আমি ওদের সামনে নিজেকে এমন ভাবে তুলে ধরেছি যাতে ওরা বুঝতে পারে আমাকে চাইলেই মেরে ফেলা সহজ। আর এটা ভেবেই ওরা ভুল করবে আমাকে বারবার আঘাত করার। আমি কখনও আঘাত সহ্য করেছি আবার কখনও পাল্টা আঘাত করেছি। যখন আমি আঘাত সহ্য করেছি তখন আমি ওদের সম্মন্ধে ডিটেইলস কালেক্ট করেছি। দিনের পর দিন এভাবেই করে এসেছি। কিন্তু আমি কখনও চাইনি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ গুলো আমার এই রুপ জানুক। তাই কখনও তোমাদের সামনে আমি আমার এই রূপে আসেনি। আর তাই সবটা প্ল্যান মতো করেছি আমি আর সিয়াম। তোমাকে ধাপে ধাপে এগোতে সাহায্য করেছি আমরা দু’জন। কারন এই রহস্যের পেছনে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের নাম উঠে আসলে তুমি সহ্য করতে পারবেনা।’
—-‘ আর কে কে আছে এর পেছনে?’
—-‘ আর কে কে আছে সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। মনে রেখো কেউ আমাকে মারতে চায় আবার কেউ আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কেউ মারতে চায় ভালোবাসা হারানের ক্ষোভে আর কেউ বাঁচিয়ে রাখতে চায় সম্পত্তি পাওয়ার লোভে। এটা একটা ধাঁধা। যেদিন সবটা সামনে আসবে সেদিন এই ধাঁধার রহস্যের সমাধান হবে।’
—-‘ কিন্তু হীর-
—-‘ কোনো কিন্তু না! অপেক্ষা করো একটু পরেই মনির কল আসবে।’
—-‘ তুমি কি করে জানলে?’
—-‘ মনি এখন নিজের জন্য নয় অন্য কারোর জন্য কাজ করবে। গুপ্তধনের লোভ তারও আছে। মনি ফোন করে আমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে। তুমি কিন্তু না করবে না। না করলেই কিরন আর তরী আপুর লাইফ রিস্ক। মনি যা বলবে তুমি শুধু হ্যাঁ বলে যাবে।’
সাবাব ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
—-‘ অসম্ভব! আমি কখনও তোমাকে ঐ নরকে যেতে দিবোনা!’
হীর মলিন হেসে সাবাবের হাতের উপর হাত রেখে বলল,
—-‘ তুমি না বলবে না এটা হবে আমাদের ট্র্যাপ! যে ট্র্যাপে মনি পা দিবে। সো, ডোন্ট সে নো।’
#চল