Wednesday, March 18, 2026

কালো হরিণ চোখ (পর্ব ৫)

0
343

#কালো_হরিণ_চোখ (পর্ব ৫)
নুসরাত জাহান লিজা

প্রিয়ম আজ এসেছে রেস্টুরেন্টে। ওকে দিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাতে চায় একটা ট্রাভেল এজেন্সি। সেটা নিয়েই আলোচনা করতে এসেছে। নতুন এজেন্সি, প্রফেশনালদের ডিমান্ড বেশি, নতুন একজনকে নিয়ে তারা কাজে আগ্রহী। প্রথমটা হবে সুন্দরবনের উপরে। ভালো হলে অন্যান্য ট্যুরিস্ট স্পটের উপরেও ওকে দিয়ে ডকুমেন্টারি ধরনের বিজ্ঞাপন করানো হবে।

ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে প্রিয়ম বেরিয়ে আসছিল। তখন ওর চোখ আটকে গেল সামনের ফুটপাতে। প্রকৃতি হেসে হেসে হাঁটছে। পাশে একটা ছেলে কী যেন বলছে, মেয়েটা সেটা শুনেই হাসছে। কই এভাবে মন খুলে হেসে তো ওর সাথে মেয়েটা কখনো কথা বলেনি!

ছেলেটা কে? ওর বয়ফ্রেন্ড? হলেই বা ওর কী এসে যায়। ব্যাপারটাকে সে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে বাসায় ফিরে এলো। অথচ ওর এখন যাবার কথা ছিল সিয়ামের সাথে দেখা করতে। ওর খুব ভালো বন্ধু। চট্টগ্রামে একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। অনেকদিন পরে এসেছে, তাই ওর সাথে আড্ডা দিতে চায়। কিন্তু কেন যেন আজ একদম যেতে ইচ্ছে করছে না।

বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ল। রুবিনা ডাকলেন, “কী রে, এই অসময়ে শুয়ে পড়লি কেন? শরীর খারাপ?”

“না মা, একটু ক্লান্ত লাগছে। তাই রেস্ট নিচ্ছি।”

রুবিনা বিছানায় প্রিয়মের মাথার কাছে বসলেন। এরপর ছেলের চুলে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলেন। প্রিয়ম মাথাটা মায়ের কোলে রাখল। এবার খানিকটা শান্তি মিলল।

***
প্রিয়ম গোধূলি লগ্নে তেমন একটা বাসায় থাকে না। আজ আছে, সে ছাদে এসে দেখল ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে প্রকৃতি বসে আছে। ওকে দেখেই প্রিয়মের দুপুরের কথাটা মনে পড়ল। সাথে সাথে কী এক জ্বলুনি বুকে বাজল।

সে এগিয়ে গিয়ে প্রকৃতির কাছ থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখেও কাছাকাছি দাঁড়াল। এরপর বলল,

“কেমন আছো প্রকৃতি?”

মেয়েটার মগ্নতা কাটল৷ সে প্রিয়মের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে উত্তরে বলল, “ভালো। আপনি কেমন আছেন প্রিয়ম ভাই?”

উত্তর না দিয়ে প্রিয়ম বলল, “আজ তোমাকে দেখলাম রাস্তায়।”

“তাই, ডাকেননি কেন?”

“তোমার সাথে একজনকে দেখলাম। সেজন্য ভাবলাম ডিস্টার্ব না করি।”

প্রকৃতি ভদ্রতাসূচক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হলো না, প্রিয়মের পরের কথায় ওর চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো।

“ছেলেটা কে? বয়ফ্রেন্ড বুঝি?”

“হলেও সেটা আপনাকে কেন বলব? সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নয় কী? আমি কি কখনো আপনার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেছি? আপনি আপনার হরিণ চোখের প্রেয়সীর সাথে কতদিনের প্রেম সেটা নিয়ে কিছু কখনো জিজ্ঞেস করেছি? তাহলে আপনি কেন প্রশ্ন করছেন? প্রিয়ম ভাই, একটা কথা বলি, আমার পার্সোনাল বিষয়ে কখনো প্রশ্ন না করলে খুশি হব।”

এতগুলো কথা হড়বড় করে বলে প্রিয়মকে কোনো সুযোগ না দিয়ে প্রকৃতি সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় নেমে গেল। হতচকিত ভাব কাটতে অনেকটা সময় লাগল প্রিয়মের। সে কী এমন প্রশ্ন করেছে যার জন্য এতটা রেগে যেতে হবে, বেচারা সেটাই ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছে না।

হতচকিত দশা কাটার পরে সর্ব প্রথম যেই প্রশ্ন মাথায় খোঁচা দিল তা হলো, কালো হরিণ চোখের প্রেয়সী বিষয়ক কথাটা। এটা তো প্রিয়মের নিগুঢ়তম কথা। যা সে কাউকে বলেনি। ওই মেয়ে কী করে জানল! প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে আরেকটা বিষয়ে নিজেকে নির্ভার করার চেষ্টা করল।

প্রকৃতির বয়ফ্রেন্ড থাকলে তার তো কিছু হবে না, থাকুক ওর বয়ফ্রেন্ড। ওর কেন মাথা ব্যথা হবে তাতে। ও তো অন্য একজনের অপেক্ষায় দিনাতিপাত করছে। একদিন নিশ্চয়ই সেই গভীর চোখের দেখা মিলবে। ওর ভালোবাসার টান কী করে সেই সুনয়না উপেক্ষা করবে! বরং খানিকক্ষণ আগের ভাবনায় ওর খানিকটা লজ্জাবোধ হলো। তবুও রাস্তায় প্রকৃতির সেই হাসি, যার উপলক্ষ অন্য একজন, সেই হাসিকে সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারল না পুরোপুরি।

***
প্রকৃতির আগামী পরশু একটা ক্লাসটেস্ট আছে। কিন্তু পড়া হচ্ছে না কিছুই। ভীষণ বিরক্ত লাগছে। বইতে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ অস্থিরতা কাটানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু পারল না।

প্রিয়মের উপরে ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ছেলেবেলায় এই ছেলেটা ওর খেলার সাথী ছিল। এই বাড়ির ছাদে, বা পাড়ার খেলার মাঠে অন্যদের সাথে খেলত। নাইন, টেনে পড়ার সময় যখন অনুভূতি সম্পর্কে বুঝতে শুরু করেছিল প্রকৃতি, তখন প্রিয়মের প্রতি অন্যরকম অনুভূতির টান সে উপলব্ধি করেছিল। কিন্তু কখনো বলা হয়নি। ভেবেছিল আরেকটু বড় হলে, যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে তখন বলবে।

এরমধ্যে প্রিয়মের এডমিশন টেস্টের আগে আগে তখন আর কয়েক মাস বাকি ছিল প্রকৃতির এসএসসি পরীক্ষার। সে ওর কাছে ফিজিক্স পড়তে যেত মাঝেমধ্যে।

একদিন গিয়ে দেখল প্রিয়মের ধূম জ্বর। রুবিনা ছেলের জন্য ঝাল খাবার রান্না করছিলেন। প্রকৃতি গিয়েছিল ওর ঘরে। ছেলেটা কীসব বলছিল জ্বরের ঘোরে। ভীষণ মায়া হয়েছিল ওর। বিছানার কাছাকাছি গিয়েছে, তখনই শুনল, প্রিয়ম কাউকে খুঁজছে৷ যাকে সে ভালোবাসে। যে চোখে ডুবে যাওয়া যায়, এমন চোখের এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে প্রিয়ম।

নতুন এই আবিষ্কারে প্রকৃতির ভীষণ কষ্ট হয়েছিল প্রথমে। তারপর প্রিয়মকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন প্রকৃতি তা লুকাতে মরিয়া হয়ে পড়ে৷ অজুহাত হয়ে সামনে আসে পড়াশোনার ব্যস্ততা। এসএসসি পরীক্ষা বলে কারোর মনে প্রশ্নও জাগে না। এরপর দিন যত গড়িয়েছে, প্রকৃতি নিজেকে তত লুকিয়েছে। মনকে অন্তরালে রাখার মোক্ষম হাতিয়ার ছিল রুক্ষ ভাষার প্রয়োগ।

প্রিয়ম যেন কোনোদিন জানতে না পারে, ওর দুর্বলতার একফোঁটাও যেন বুঝতে না পারে, তাই কখনো কাছেই আসতে দেয়নি, কাছে যায়ওনি। প্রিয়মও কখনো আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যায়নি। সে তখন ক্যামেরা আর সুনয়নার মোহে আচ্ছন্ন ছিল বোধহয়। থাক, তাতে প্রকৃতির কিছু যায় আসে না। আসলেই তাই! তাহলে আচমকা কোনো এক অলস দুপুরে মনের কোণে সে উঁকি দিয়ে যায় কেন! সে জানে না। তবে বরাবরের মতোই সে প্রশ্রয় দিতে চাইল না।

“আসতে পারি মা?”

আনোয়ার চিরন্তন হাসিতে দাঁড়িয়ে আছেন, “আরে বাবা, এসো তো।”

বাবা এসে বসলেন প্রকৃতির পাশের চেয়ারে।

“ব্যস্ত?”

“একটু। তবে তোমার জন্য আমার অফুরন্ত সময়।” উদ্ভাসিত হেসে বলল প্রকৃতি।

“তোর মন খারাপ মা?”

“কই না তো?”

“কিন্তু তোর মন খারাপ থাকলে তুই হাসলেও পুরো চোখ হাসে না। কী হয়েছে আমাকে বলা যায়?”

“তুমি আমাকে এত বোঝো কীভাবে বাবা?”

“তুই প্রকৃতি কন্যা। তোর জন্মের পরে পরে তোর মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন আমি তোকে সামলাতাম। কী ছোট্ট একটা পুতুল, যে হাসে, কাঁদে। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরতম দৃশ্য। যে প্রকৃতি আমাকে সবসময় বাইরে টানত, তুই আমাকে তার ডাক উপেক্ষা করালি। তোর মায়ের জন্য খানিকটা হয়েছিলাম, সেবার তোর মায়ায় আমি পুরোপুরি ঘরমুখো হলাম৷ তোকে বুঝব না!”

“কিন্তু কথাটা তোমাকে এখন বলা যাবে না বাবা। ভীষণ ব্যক্তিগত। তুমি কিছু মনে করলে না তো বাবা?”

“তুই বড় হয়েছিস মা। এটুকু প্রাইভেসি তোর প্রাপ্য। কেন জানিস? কারণ আমি জানি আমার মা কখনো আমাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করবে না। এটুকু শিক্ষা আর বোধ তার আছে।”

প্রকৃতির মন ভালো হয়ে গেল, ভীষণ ভীষণ ভালো। শুধু বলল, “বাবা, তুমি কি জানো, তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা?”

বাবা হাসলেন, প্রশ্রয়ের হাসি।
…………
(ক্রমশ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here